শতবছরের রাজনীতি

শতবছরের রাজনীতি

রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকাশের সাথে রাষ্ট্রপরিচালনায় সুসম্মত নীতিমালা রাজনীতির সংজ্ঞাভূত। প্রাচীন গ্রীসে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটলেও প্রকৃত রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সপ্তদশ শতক থেকে সরব হতে শুরু করেন। হসব, লক, রশো, থেকে শুরু করে ম্যাকিয়াভেলী, লিংকন, হেরন্ড লাস্কী, গার্নার, মার্কস, রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনীতি বিষয়ে নানা তত্ত্ব ও মতামত ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় একক ব্যক্তির শাসনের বিপরীতে গণমানুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। এ সময় ইউরোপ, আমিরেকায় গণতান্ত্রিক ধারা প্রভূত বিকাশ লাভ করে এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠে। অবশ্য ঊনিশ শতকে এসে রাষ্ট্র চেতনার ক্ষেত্রে কার্লমার্কসের আবির্ভাব নবচেতনার উন্মেষ ঘটায়। গণতন্ত্রের বিপরীতে উৎপাদন ও সমাজশাসনে রাষ্টীয় ক্ষমতার ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। ভারতবর্ষে রাজনীতির ধারা বহুবিধ হলেও এর বিকাশের

ধারণা পেতে আমাদের ইতিহাসের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে হবে। বলা হয় এক সময় বৃটিশ রাজ্যে সূর্য অস্তমিত হত না। প্রাচ্য আর পাশ্চত্য জুড়ে তারাই ছিল দখলদার। স্বজাতীয়দের মাতৃভূমি ছলে, বলে, কৌশলে দখল করে তারা রাজত্ব গড়ে তোলে। বৃটিশ রাজত্ব অধিনস্থ দেশকে বলা হত উপনিবেশ। অন্য দিকে বিশ শতকের শুরু থেকে মার্কসের সমাজতান্ত্রিক ধারা প্রবল হয়ে ওঠায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিপরীতে কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক প্রবল হয়। ভারতবর্ষে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, বৃটিশ শাসনকালে নানারুপ জাতিসত্ত্বার বিকাশ ঘটে। ফলে গণতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম এবং হিন্দু ও মুসলিম জাতিসত্ত্বার বিকাশ ও অধিকার সুরক্ষায় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ নানা ধারায় বিকাশ লাভ করে। পাল, সেন, সুলতান, মোগল, শাসনকালে সম্রাট-সাম্রাজ্য, রাজা-রাজ্য, নবাব-নবাবী এমনধারায় প্রজাপালন, প্রজা শাসনে রাজ্য পরিচালিত হত। ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের ফলাফলে ভারত যেভাবে উপনিবেশিক শাসনের জালে আটকা পড়ে তা থেকে মুক্তিলাভ করতে লেগেছে ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এ সময়কাল ভারতে স্বদেশীয় প্রজার স্বার্থ, অধিকার, স্বাধীকার, স্বাধীনতা অর্জনে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্তদানের মধ্য দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটে। বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে  সন্ন্যাস ও ফকির বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, নীলবিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার লড়াই, পাগল বিদ্রোহ, মুজাহিদ আন্দোলন, ওহাবী আন্দোলন, ফারায়জী আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশী, স্বরাজ, অনুশীলন, যুগান্তর ইতিহাসে খ্যাত। এসব আন্দোলনের ফলাফল যাই হোক আন্দোলনসমূহ রাজনীতির গতিধারা এবং ভারতবাসীকে অধিকার সচেতন করে তোলে। ঊনিশ শতকের শেষে নিয়মতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে কংগ্রেস গঠন (১৮৮৫) এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ গঠন (১৯০৬) ভারতবর্ষে রাজনীতিতে মূল ধারার সৃষ্টি করে যা বিশ শতকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রুপ লাভ করে। কংগ্রেস এবং মুসলিমলীগের সৃষ্টিলগ্নে রাজবাড়ির রাজনীতিতে সচেতন মানুষের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়। কংগ্রেস গঠনকালে জলধর সেন গোয়ালন্দ মডেল হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। (চরিতাবিধান, বাংলা একাডেমী, পৃ-১৮৭)। ধারণা করা যায় এ বিদ্যালয়টি ছিল তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাট সংলগ্ন তেনাপচা দুর্গাপুর বা জামালপুরে। তিনি ঐ বিদ্যালয়ের ছাত্রও ছিলেন। জলধর সেন তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন-----‘১৮৮৬ অব্দের শেষভাগে ডিসেম্বর মাসে কলিকাতা নগরীতে জাতীয় মহা সমিতির (কংগ্রেসের) দ্বিতীয় জাতীয় অধিবেশন হয়। সেই অধিবেশনে আমি গোয়ালন্দের জনসাধারণ কর্তৃক প্রতিনিধি হয়ে যাই।’


জলধর সেনের নেতৃত্বে গোয়ালন্দ কংগ্রেসের কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস নেতা অশ্বিনী কুমার গোয়ালন্দ কংগ্রেসের সভায় উপস্থিত হয়ে দেশের শাসন ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ দাবি করেন। এ ধারার রাজনীতির মধ্যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি জাতির আত্মবিকাশের স্বার্থের সাথে উপনেবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করার স্বার্থও জড়িত থাকে। পাশাপাশি ১৯১৯ সালের রুশ বিপ্লবের সফলতায় মার্কস, লেনীন জনপ্রিয় হওয়ায় কমিউনিস্ট আন্দোলন দানা বাঁধে। রাজনীতির ধারায় এরা বামপন্থী বা লেফটিস্ট বলে পরিচিত। ১৯৪৭ এরপর ভাষা ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায় সংগ্রামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতি নানা ডালপালায় বিকশিত হয়। হোসেন শহীদ সহরোওয়ার্দী, একে ফজলুল হক, মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিশেষ করে পূর্ব-পাকিস্তানে মুসলিমলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, নিজামে ইসলাম, গণতান্ত্রিক পাটি, খিলাফতে রব্বানী, ইত্যাদি রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ এর ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৯ এ গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামসহ বামপন্থী ধারা জাতীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটায়। শত বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ধারায় রাজবাড়ি জেলার রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংক্ষেপ বিবরণ।

সন্ন্যাস ও ফকীর বিদ্রোহ

রাজবাড়ি থেকে ২ স্টেশন পশ্চিমে বেলগাছি। বেলগাছির অদূরে রথখোলা যেখানে আজও রথের মেলা বসে। এ রথখোলা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থান। এ স্থানের সাথে জড়িয়ে আছে প্রাচীন অনেক স্মৃতির সাথে ফকীর ও সন্ন্যাস বিদ্রোহের চিহ্ন। ভবানী পাঠক বরেন্দ্র নিবাসী (রঙ্গপুর) জনৈক ব্রাহ্মণ সন্তান, যিনি ইংরেজদের নিকট দস্যুসর্দার বলে পরিচিত। মূলত তিনি সন্ন্যাস বিদ্রোহের নেতা। বাল্যকালে রীতিমত স্বাস্থ্যচর্চা করে তিনি জন্মভূমির দুঃখে কাতর হতেন। ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী রংপুর অঞ্চলে প্রভুত্ব স্থাপন করে ইংরেজ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলেন। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে তা বিপ্লবের রুপ ধারণ করে। ইতিহাসে তা সন্ন্যাস বিদ্রোহ বলে পরিচিত। প্রায় ৫০ সহস্র অনুচর পরিবেষ্টিত পাঠক ইংরেজ হৃদয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। এ সময় বড়লাট ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। প্রথমে উত্তর অঞ্চলে এ বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা বাংলার পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। রংপুর, বগুড়া, রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর অঞ্চলে সন্ন্যাস বিদ্রোহ দেখা দেয়। সন্ন্যাসীরা গ্রাম অঞ্চল থেকে তরুণদের রিক্রুট করে দল ভারি করত এবং গ্রাম থেকে ধনীদের সম্পদ লুণ্ঠন করে দলের শক্তি বৃদ্ধি করত। ১৭৭২ সালে ক্যান্টেন টমাসের নেতৃত্বে ইংরেজ সৈন্য বঙ্গপুর সন্ন্যাসীদের পথরোধ করলেও সংঘর্ষে ক্যাপ্টেন টমাস নিহত হন। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে শাহাজাদা সুবেদার বাকের জঙ্গের নেতৃত্বে ফকীর বিদ্রোহ দেখা দেয়। ইংরেজরা যাকে ফকীর মজনু শাহ বলত। ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী,  ফকীর মজনু শাহ রাজা দয়াশীল, মুছা শাহ প্রমুখের নেতৃত্বে সন্ন্যাসী ও ফকীর বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ কের। রাজবাড়ি জেলার বেলগাছির রথখোলায় এ অঞ্চলে তারা প্রধান আখড়া গড়ে তোলে। এ আখড়াকে কেন্দ্র করে তারা গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, সোনাপুর অঞ্চলে বিদ্রোহ বিস্তার করতে সমর্থ হয়। অনেকে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রম মঠও প্রস্তুত করে। এ সমস্ত মঠের স্মৃতি কথা লোকমুখে জানা যায়। বেলগাছির রথখোলায় ফকীর--সন্ন্যাসীদের আশ্রমস্থল হিসেবে একটি জীর্ণ ঘরকে এখনো চিহ্নিত করা হয়।


ফরায়েজী আন্দোলন

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা বিশেষ করে ফরিদপুর জেলার জনগণ ফারায়েজী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফারায়েজী আন্দোলনের নেতা ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লা (১৭৮১-১৮৪০) এবং তার ছেলে পীর মোহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২)। হাজী শরিয়তুল্লা মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাহাদুরপুরের শ্যামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওহাবী আন্দোলনের দীক্ষিত হয়ে বঙ্গে জামাত সৃষ্টি করে ওহাবী আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনই বঙ্গে ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিত। ফরায়েজী আরবী শব্দ অর্থ অবশ্য পালনীয়। ইসলাম ধর্ম অনুসারে কোরান ও হাদিসের নির্দেশাবলী সমাজে প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানদের আবশ্যিক কর্তব্য।

তিনি ইসলাম বিরোধী রীতিনীতি পরিত্যাগ করে মুসলমানদের প্রকৃত মুসলমান হতে উপদেশ দেন। হাজী শরিয়তুল্লা প্রথমে তৎকালীন মুসলমান সমাজকে বেদাত থেকে মুক্ত করার জন্য সামাজিক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। প্রতিবেশী হিন্দুদের দেখাদেখি মুসলমানেরা সেদিন পীর পূজা, মনসা পূজা, কবর পূজা, শীতলা পূজা ইত্যাদি সংস্কারে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ সব শরিয়ত বিরোধী কাজ থেকে মুসলমান সমাজকে ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য হাজী শরিয়তুল্লাহ ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে তার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে সমর্থ হন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি তার নেতৃত্বে গঠিত ফরায়েজী জামাতকে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন।

তিনি শুধু ধর্মীয় সমাজ সংস্কারের ভূমিকায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি তিনি ইংরেজ অধিকৃত এ উপমহাদেশকে ‘দারুল হরব’ বলে ঘোষণা দেন। তিনি বিধর্মী অধিকৃত দেশে মুসলমানদের ঈদের জামাত জায়েজ নয় বলে ফতোয়া দেন। তৎকালীন দারুল হরব বক্তব্য জনসাধারণের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী জেহাদী মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমত এ আন্দোলন ফরিদপুর জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল পরে তা বাকেরগঞ্জ ও ঢাকা অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। হাজী শরিয়তুল্লার পুত্র মোহসিন উদ্দিন (দুদুমিয়া) ফরায়েজী আন্দোলনেক রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেন। তিনি পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে দারুল হরব বলে ঘোষণা করেন এবং ইংরেজ শক্তি উৎখাতের উদ্দেশ্যে জেহাদ ঘোষণা করেন। ১৮৪০ সালের দিকে পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন প্রচণ্ড রুপ লাভ করে। গ্রামাঞ্চলে পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে একজন প্রচারকের পিছনে প্রায় ৮০ হাজার লোক থাকত। পরবর্তীতে দুদুমিয়া ইংরেজ শক্তি সমর্থক নীলকর সাহেব ও জমিদার শ্রেণির সাথে কয়েকটি সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তিনি নীলচাষের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে ক্ষেপিয়ে তোলেন এবং নীলবিদ্রোহের সহায়তা দেন। রাজবাড়ি অঞ্চলে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পরে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে কবর পূজা, মনসা পূজা, শীতলা পূজার প্রভাবে ইসলামের মূল শরিয়ত থেকে মুসলমানগণ দূরে সরে যায়। সোনাপুর, বালিয়াকান্দি অঞ্চলে ফরায়েজী আন্দোলনের প্রভাব পড়ে বেশি। পীর দুদুমিয়ার নেতৃত্বে এ অঞ্চলে নীলবিদ্রোহের প্রসার ঘটে। তোফাজ্জেল হোসেন জজ সাহেব ফরায়েজী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

স্বদেশী-অনুশীলন-যুগান্তর

স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল বঙ্গভঙ্গকে (১৯০৫) কেন্দ্র করে। বঙ্গভঙ্গ ভারত মাতার ব্যবচ্ছেদ, এ অনুভূতি তীব্র ক্ষোপের সঞ্চার করে। প্রথমে এ আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলেও পরে তা বয়কট ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রুপ নেয়।


১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর আসাম, ঢাকা, রাজশাহী, চট্রগ্রাম নিয়ে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। এতে পূর্ববাংলা ও আসাম নামে প্রদেশের উদ্ভব ঘটে। ঢাকা রাজধানী ও চট্রগ্রাম বিকল্প রাজধানী নির্বাচিত হয়। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবনাকালে হিন্দু নেতাদের মনে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তারা পত্রিকায়, বক্তৃতা মঞ্চে একে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তা বিরোধী, বঙ্গমাতার অঙ্গছেদ এরুপ নানা বিশেষণে আখ্যায়িত করে। সঞ্জীবনী পত্রিকা স্বদ্বেশীয় নিবন্ধে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে সামগ্রিক বয়কট যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা ভেবেছিল নতুন প্রদেশে মুসলমানেরা হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর বাঙালি হিন্দুরা হবে সংখ্যালঘু। তারা স্বদেশেই হবে পরবাসী। এছাড়া ঢাকায় রাজধানী হলে কলিকাতার গুরুত্ব হ্রাস পাবে। ১৯০৫ খৃস্টাব্দে ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হবার দিন স্থিরকৃত হল। সেদিন কংগ্রেস শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন রাখীবন্ধন উৎসবের প্রচলন করেন। বাংলার মানুষ যে ভাই ভাই তার প্রতিক হিসেবে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে দেন। আন্দোলন প্রতিবাদ সত্ত্বেও বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হল। কিন্তু বয়কট, স্বদেশীর শপথ, সংযুক্ত বাংলা, বন্ধে মাতরম ধবনি নিয়ে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিনে কলিকাতা কালিঘাটের কালিমন্দির প্রাঙ্গণে বহুসংখ্যক মানুষ সমবেত হয় এবং লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গকে স্বৈরাচারী, অপ্রয়োজনীয় কুকীর্তি বলে নিন্দা করে এবং বয়কট আন্দোলনের শপথ নে। এ আন্দোলনের শুরুতেই সাহেবদের খানা তৈরী করতে উড়িষ্যার পাচকরা অস্বীকার করল, মুচিরা সাহেবদের জুতা মেরামত করল না, ধোপারা কাপড় পরিস্কার করতে রাজি হয় না।

এভাবে ধনী, দরিদ্র, উঁচু, নিচু, শহর নগর গ্রামবাসী সকলেই বয়কট আন্দোলনে যোগদান করলে সে আন্দোলন এক শক্তিশালী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। স্বদেশী আন্দোলনে ছাত্রসমাজ অংশগ্রহণ করে। বিলেতি বস্তু সংগ্রহ করে সেগুলিকে অগ্নিসংযোগ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন, দ্বীজেন্দ্র লাল রায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপধ্যায় প্রভৃতি রচিত স্বদেশী গান বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তোলে। মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গানের পালা, বাংলার শহর ও গ্রামে গ্রামে স্বদেশীকতার বন্যা এনেছিল। ‘ছেড়ে দাও রেশমী চুড়ি বঙ্গনারী, কভু হাতে আর পরো না’ ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় তুলে নেরে ভাই’ প্রভৃতি গান গ্রামে, গঞ্জে শহরে বন্দরে সকলের মুখে মুখে গীত হয়ে এক অভূতপূর্ব জাগরণের সৃষ্টি করেছিল।

সরকারি দমননীতি, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, সাংগঠনিক দুর্বলতা ইত্যাদি কারণে আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। বৃটিশ সরকার বঙ্গবিভাগ সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এদিকে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে স্বরাজের ধ্বনি উত্থিত হয়। এসময় আন্দোলনকারীরা চরমপন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত হয়ে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। সারাদেশে বিপ্লবীরা বিপ্লবের মন্ত্র ছড়াতে থাকে। বাংলা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্রের বহু গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কলকতায় যুগন্তর এবং ঢাকায় অনুশীলন সমিতি উল্লেখযোগ্য। সারাদেশে অনুশীলন সমিতির শাখা গড়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্যে দেহচর্চায় লাঠি খেলা, কুস্তি, কুচকাওয়াজ, ছোরাখেলা অনুশীলন করত। আর বিপ্লবী সংগঠন কার্যকলাপ গোপনে চলত। বিপ্লবীরা সে সময় অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। তারা পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্ণর ফুলার সাহেবকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়। কলিকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব স্বদেশীয় বিপ্লবীদের লঘু অপরাধে গুরুদণ্ড দিতে থাকে। বিপ্লবীরা কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করে। নিক্ষেপ করলে ব্যারিস্টার কেনেডি ও তার মেয়ে নিহত হন। পালিয়ে যাবার সময় মোকামা স্টেশনে ধরা পড়লে প্রফুল্ল চাকি নিজের রিভলবরের গুলিতে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম বসু গ্রেফতার হন।


পরে ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হয় (১৯০৮)। ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে সারা ভারতবর্ষের শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর উদ্দেশ্যে রচিত ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটি আজও মর্মবেদনায় ব্যথিত করে। রাজবাড়ি স্বদেশী আন্দোলনের ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। রেলপথের সহজ যোগাযোগের কারণে স্বদেশীদের গুপ্ত সংগঠন বিস্তার লাভ করে। বেলগাছি, রামদিয়া, বালিয়াকান্দি, সমাধিনগর, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, খানখানাপুর অনুশীলন ও যুগান্তর কর্র্মীরা মজবুত সংগঠন গড়ে তোলে। কংগ্রেস কর্মীদের নিরব সমর্থন থাকায় গুপ্ত সংগঠনগুলোর কাজ করার সুবিধা হয়। রাজবাড়ির প্রফুল্ল কর্মকার, শ্যামেন ভট্রাচার্য, অবণী লাহিড়ী, অনিল লাহিড়ী, সমর সিংহ, আশু ভরদ্বাজ দ্বারা অনুশীলন সমিতি পরিচালিত হয়। অনুশীলন যুগান্তর যে বিপ্লব ও আন্দোলন গড়ে তোলে তা সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। কংগ্রেস, মুসলিমলীগ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে সাথে বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড চলতে থাকে।

১৯০৭ সালে স্বদেশী আন্দোলনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ফরিদপুরে অম্বিকাচরণ মজুমদারকে সভাপতি ও আব্দুর রহমানকে সম্পাদক করে ফরিদপুর জেলা সমিতি গঠিত হয়। স্বদেশী আন্দোলন পূর্ববঙ্গে বিশেষ করে বরিশাল ও ফরিদপুরে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। ফরিদপুর জেলাতেই অনুন্য একহাজার সভা অনুষ্ঠিত হয় (ফরিদপুরের ইতিহাস, আনম আবদুস সোবহান, পৃষ্ঠা-২৭০)। স্বদেশী আন্দোলনের সময় পাংশার রওশন আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় ঐতিহ্যবাহী ‘কোহিনুর’ পত্রিকা এবং ফরিদপুর ‘হিতৈষিণী’ পত্রিকা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের নানা গল্পকথা এখনো রাজবাড়ির প্রবীনদের মুখে শোনা যায়। বিশেষ করে ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে রচিত গান জেলার জনমানুষের নিকট এখনো খুব প্রিয়।

স্বদেশী আন্দোলনে পাংশার রওশন আলী চৌধুরী এক কিংবদন্তি নাম। তিনি কেবল কংগ্রেসের রাজনীতির প্রতি সারাজীবন অনুগতই থাকেননি, সাথে সাথে স্বদেশেী আন্দোলনে অত্র অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। পাংশায় ‘স্বদেশ বান্ধব’ সমিতি গঠন (১৯০৫) করে আন্দোলনের পক্ষে এ অঞ্চলে জনমত গড়ে তোলেন। তাঁর আদর্শে অনুগত হয়ে যুব বৃদ্ধ উদ্বুদ্ধ হয়। পাংশাকে তখন ‘স্বদেশী সংঘখানা’ বলা হত। স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ‘বয়কট আন্দোলন দিয়ে। বৃটিশ কাপড় ও লবণ বর্জন এবং দেশীয় বিকল্প ব্যবহারের আহবান সারা প্রদেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশী কাপড়ের দোকানের সামনে ছাত্র-যুবকদের পিকেটিং ছিল নিত্যকর্ম। তমিজ উদ্দিন খান তখন খানখানাপুর সুরাজ মোহিনীর ছাত্র। তার আত্মজীবনী থেকে-----‘আমরা বেশিরভাগ ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। স্লোগান দেয়া ছাড়াও অনেক রকম কাজ করতে হতো।

বিদেশী কাপড়ের দোকানের সামনে পিকেটিং করতাম। কাজ না হলে জোর করে লিভারপুলের লবণের পোটলা অসতর্ক ক্রেতাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মারাতাম। আমাদের দাপট অপ্রতিরোধ্য। আইন ও শৃংখলা একেবারে অন্তর্নিহিত হলো।’ (কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি, তমিজ উদ্দিন খান পৃষ্ঠা-২৯)।

এ সময় একদল স্বেচ্ছাসেবীর বিরুদ্ধে গুণ্ডামীর অভিযোগ আনা হয়। রাজবাড়ির একজন ম্যাজিস্ট্রেট নাসির (তমিজ উদ্দিন খানের আত্মীয়) ও তার দলের বিচার করেন। ফরিদপুরের দুইজন উকিল পূর্ণচন্দ্র মিত্র ও নলিনীকান্ত সেন তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন। ত্রিশ টাকা জরিমানা করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। (তখনকার দিনে ত্রিশ টাকা বর্তমানে প্রায় ৫ মন চাউলের দামের সমান)। আন্দোলন কিছুদিনের জন্য দমন থাকলেও তা চলতে থাকল। সরকারের দমননীতিও চলতে থাকল। সব স্কুলের ছাত্রদের উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছিল। এ বছর (১৯০৬) রাজবাড়ি অঞ্চলের ছাত্রদের ম্যাট্রিক পরীক্ষার পাসের হার ছিল মাত্র শতকরা পঁচিশ ভাগ। ছাত্ররা এ বছরটাকে ‘হত্যার বছর’ বলত (প্রাগুপ্ত, পৃষ্ঠা-২৯)।


স্বদেশী আন্দোলনকালে মীর মশাররফ হোসেন পদমদি অবস্থানকালে ‘বিবি কুলসুম’ গ্রন্থ লিখছিলেন। তাঁর কথায়------‘স্বদেশী আন্দোলনে কুলসুম বিবি অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের দুই তিনজন ব্যতিত সকলের ঘরের খবর সন্ধান করিয়া  বলিতেন যে, ইহাদের এরকম ঝকমারী কেন? ঘরে তন্দুল নাস্তি ও দিকে ধনকুবের  অদ্বিতীয় রাজশক্তিসম্পন্ন বৃটিশজাতি, বিদ্যাবুদ্ধিতে জগতশ্রেষ্ঠ, শাসন সভ্যতার জগতে সর্বজাতির আদর্শ এবং অগ্রাণী বিচার ক্ষেত্রে ধীর-স্থির। এমন নিরপেক্ষ রাজার বিরুদ্ধ বিরক্তির কারণ হইয়া কী লাভ হইবে? দিদিমনিরা সভাসমিতি করিয়া হাতের বলয় এবং অন্য অলঙ্কার পর্যন্ত খুলিয়া দিয়া দেশ উদ্ধার করিতেছেন’ (মীর মশাররফ রচনা সম্ভার পৃষ্ঠা-৪৫২)। ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের লেখায় ‘১৯০৬ সালেই অসিল রাজবাড়ি ওয়ার্কাশপের কর্মীদের সঙ্গে আমাদের স্কুলের ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। ইহার কিছুকাল পরেই আসিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। আসির অনেক ঝামেলা। ছেলেরা বিলাতি লবণ জলে ঢালিয়া দিতে লাগিল। মেয়েরা স্কুলে পিকেটিং করিয়া স্কুল পরিচালনা প্রায় অচল করিয়া দিল। নানা বিভ্রাটে প্রায় হাবুডুবু খাইতে লাগিলাম। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। সম্রাট পঞ্চম জর্জ আসিলেন ভারত পরিদর্শনে। দিল্লীতে বসিল করোনেশন দরবার। সম্রাট বঙ্গভঙ্গ নাকচ করিয়া দিলেন। ভাঙ্গা বাংলা আবার জোড়া লাগিল। আনন্দের সীমা নাই। প্রতি জেলায় ও মহকুমায় উৎসবের ধুম পড়িয়া গেল। শোভাযাত্রা, সভা, যাত্রাগান, থিয়েটার, কীর্তন, কবিগান ভাসান ইত্যাদি কিছু বাকি থাকিল না। লক্ষ লক্ষ টাকা জলের মতো খরচ হইয়া গেল।’ এ থেকে বোঝা যায় স্বদেশী আন্দোলন রাজবাড়িতে শক্তিশালী রুপ ধারণ করেছিল।

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন

বৃটিশ ভারতে বৃটিশদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন অন্যতম। বিশ শতকের শুরু থেকে তিরিশের দশক পর্যন্ত বৃটিশদের বিরুদ্ধে নানা আন্দোলন, সংগ্রাম বৃটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে তোলে। এ সময়টি ছিল ‍বৃটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের অগ্নিযুগ। এ সময়ের মধ্যে অনুশীলন, স্বদেশী, খেলাফত, অসহযোগ, কমিউনিস্ট আন্দেোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব, প্রবল আকার ধারণ করে। কংগ্রেস, মুসলিমলীগ, প্রজাসমিতি প্রভৃতি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে ওঠে। এ সময়ের মধ্যেই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মদান করেন (১১-০৮-১৯০৮ খ্রি.) এবং প্রফুল্ল চাকীর আত্মহত্যা, (০১-০৫-১৯০৮) ইংরেজের শাসন থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে খ্যাতনামা বিপ্লবী বিনয়, বাদল, দীনেশ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যোগ দেন এবং শহীদ হন। ১৯৩০ সালে সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্রগ্রামে অস্ত্রগার লুণ্ঠন, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ এবং আহত অবস্থায় পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দার (১৯৩২)। বৃটিশ শাসকদের হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস কম বিস্তৃত নয়। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরিয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন, পীর দুদুমিয়ার নীলবিদ্রোহ, খেলাফত আন্দোলন ইতিহাস খ্যাত। এসব আন্দোলন যেমন ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তেমনি তা পশ্চাৎপদ মুসলমানদের স্বজাতীয়বোধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। খেলাফত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে মওলানা মুহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়ের দ্বারা। বৃটিশশাসনের শুরু থেকেই মুসলমানেরা বিদ্বেষ ও আত্মভিমানে ইংরেজদের থেকে দূরে থাকে। তৎকালীন তুর্কী সুলতানের প্রতি মুসলমানরা অনুরক্ত থাকে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) পরাজিত তুরস্কের প্রতি মিত্রপক্ষের (বিশেষ কর বৃটিশদের) মুসলমান দেশ মাত্রই বিরক্তির সৃষ্টি করেছিল। বিষয়টি ভারতবর্ষের মুসলমানদের মনেও গভীর রেখাপাত করে। আলী ভ্রাতৃদ্বয় মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে বৃটিশ সরকারের ন্যাক্কারজনক ভূমিকার নিন্দা করেন এবং শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ আন্দোলন খিলাফত আন্দোলন নামে খ্যাত। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর খেলাফত দিবস পালিত হয়। একে ফজলুল হক এবং মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলায় খেলাফত আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর ফজলুল হকের সভাপতিত্বে খিলাফত বৈঠকের প্রথম অধিবেশন দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয়। (বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রম, একেএম রইস উদ্দিন খান, পৃষ্ঠা-৬১৫)। ১৯২০ সালে আইমান মঞ্জিলে খেলাফত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

খেলাফত আন্দোলনের পাশাপাশি শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কলিকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে (৪ সেপ্টেম্বর ১৯২০) মহাত্মা গান্ধী ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব করে। সর্বস্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয়। খেলাফত ও অসহযোগের যুগপৎ আন্দোলন দুর্বার গতিলাভ করে এবং ইংরেজ শাসকের ভিত কাঁপিয়ে তোলে।

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে হিন্দু ও মুসলমানগণ এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করে। উকিল ব্যারিস্টারগণ আদালত ত্যাগ করেন, ছাত্র-ছাত্রীগণ স্কুল কলেজ পরিত্যাগ করে। শ্রমিকরা কারখানা ত্যাগ করে। সর্বত্র স্বদেশী পণ্য ব্যাবহারের হিড়িক পড়ে। দেশের সর্বত্র ধর্মঘট এবং বিলেতি কাপড় ও অপরাপর সামগ্রি বর্জনের দরুন উম্মাদনার সৃষ্টি হয়। চরকায় সুতা কেটে খদ্দর পরা শুরু হয়। মানুষ কার্পাশ বুনে তুলাচাষ আরম্ভ কার্পাশ বুনে তুলাচাষ আরম্ভ করে। এলাকাভিত্তিক পল্লী সংগঠন গড়ে ওঠে। রাজবাড়িতে খেলাফত ও অসহযেগ আন্দোলনে যোগ দেন মৌঃ তমিজ উদ্দিন খান, চারুপ্রভা সেন, সোনাপুরের নরেশ ঘোষ, পাংশার এয়াকুব আলী চৌধুরী, রওশন আলী চৌধুরী, পাটকিয়া বাড়ির ইসমাইল হোসেন বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট আবদুল মাজেদ, সমর সিংহ, খানখানাপুরের বিজন ভট্রাচার্য, মাজবাড়ির আহম্দ আলী। সুসাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী আর এস কে ইনস্টিটিউশনের শিক্ষকতা পরিত্যাগ করে খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি কংগ্রেসের কর্মী ছিলেন। আন্দোলন করার জ্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। খানখানাপুরের প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা, কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর স্মামী বিজন ভট্রাচার্য আন্দোলনরত অবস্থায় রাজবাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন। (চরিতাভিধান, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা-২৪৬)।

মাজবাড়ির (সোনাপুর) আহম্মদ আলী একটি পল্লী সংগঠন গড়ে তোলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এমনিতেই রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতী সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। অসহযোগ আন্দোলনের সময় এসব তাঁতশিল্পীরা দেশীয় কার্পাসের সুতায় কাপড় উৎপাদন করে আন্দোলনকারীদের সাহায্য করত। রাজবাড়িতে অসহযোগ আন্দোলনকালে কার্পাশ বপন শুরু হয় তা দীর্ঘদিন চলে। অসহযোগ আন্দোলন বিষয়ে তমিজ উদ্দিন খান এর আত্মজীবনী এ কথাই প্রমাণ করে যে, অসহযোগ আন্দোলন, সাঈদ আহমদ দেহলভীর ওহাবী আন্দোলন, সবই ভারত থেকে বৃটিশ শাসনের সমাপ্তি ঘটানোর সংগ্রামে সাহায্য করেছে। গান্ধী বলেছেন মুসলমান হচ্ছে গুণ্ডা আর হিন্দু কাপুরুষ। অসহযোগের তাৎক্ষণিক কাল ছিল নৈরাশ্যজনক। বিপুল বিশৃংখলা সৃষ্টি হওয়ায় সরকার নিষ্ঠুর দমন নীতি গ্রহণ করে। আন্দোলন চলতে লাগল গোপনে। গোয়ালন্দে এ্যালেন সাহেবকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল। মিঃ ও মিসেস আশু বসু ও শামসুল আলম খুন হলেন।’ (কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি)।


তমিজ উদ্দিন খান এভাবেই রাজবাড়িতে গোয়ালন্দ, খানখানাপুর, পাংশা, বালিয়াকান্দি অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কথা লিখেছেন। গান্ধীজীর অহিংসা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে তমিজ উদ্দিন খান কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং এ অঞ্চলে অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। মূলত অসহযোগ আন্দোলন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছিল এবং উভয় জাতিকে ইংরেজ বিতাড়নে একজাতিতে পরিণত করেছিল।

ইংরেজ বিতাড়নে তাদের শাসন ও পণ্যবর্জনসহ সকল ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করাই অসহযোগ আন্দোলনের মূল মন্ত্র। তৎকালীন সময়ে ফরিদপুরে অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বে দেন হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধর। তমিজ উদ্দিন খান অসহযোগে যোগদানের সাথে সাথেই তিনি কংগ্রেসের জেলা  কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি কেবল ওকালতীয় গাউন ছাড়া বিদেশী পোশাক বর্জন করে খদ্দর পরা শুরু করেন। এ সময় খেলাফত কমিটিগুলো প্রত্যেক জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এক যোগে কাজ করতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলন গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। রাজবাড়ির প্রায় প্রতি গ্রামে চরকায় সুতা কাটা শুরু হয়। বিশেস করে অসহযোগকারীদের চরকাকাটা বাধ্যতামূলক ছিল। অসহযোগ ও খিলাফতীদের ‘বন্দে মাতরম’ ‘আল্লাহু আকবর’ ‘গান্ধিজীকে জয়’, ‘আলী ভাইদের জয়’, ‘হিন্দু মুসলিমের জয়’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সরকার কংগ্রেসের কার্যকলাপ বে-আইনী ঘোষণা করে। তমিজ উদ্দিন খান উপর গেপ্তারী পরওয়ানা জারি হয়। তিনি কারাবন্দি হয়ে অমানবিকভাবে এগার মাস জেল খাটেন।

প্রজা সমিতি

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় কংগ্রেস ও মুসলিমলীগ ক্রমান্বয়েই সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে থাকে। উভয় দলের জনপ্রতিনিধি জনস্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বৃটিশ শাসনের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক ও অধিকতর স্বাধীনতাকামী। পাশাপাশি মুসলিম লীগ সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমানদের অধিকার আদায়ে তৎপর দেখা যায়। ফলে অনেক উদার মনোভাবাপন্ন মুসলিম নেতাকে কংগ্রেসী হতে দেখা যায়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পাশাপাশি বাংলার বিশেষ করে পূর্ববাংলার মুসলমান ও হিন্দু প্রজাদের স্বার্থ আদায়ে প্রজা সমিতি, প্রজা পার্টি গঠিত। দেশের ডাকসাইটে রানৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রজা পার্টির নেতৃত্ব দেন, আন্দোলন করেন, প্রাদেশিক পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করেন, প্রাদেশিক সরকার গঠন করে প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাশ করেন। বাংলার ব্যাঘ্র বলে পরিচিতি একে ফজলুল হক ও প্রজা পার্টি থেকে প্রাদেশিক সরকারের প্রধানমন্ত্র্রী হন।

রাজবাড়ির মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর), আলীমুজ্জামান চৌধুরী (রাজবাড়ি-বেলগাছি) প্রজা সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর দালিলিক গ্রন্থের লেখক রাজনীতিবিদ, প্রজাপ্রেমী, সংগঠক, আইনজীবী কিংবদন্তি নাম আবুল মনসুর আহমেদ প্রজা সমিতির স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রজা সমিতি ও প্রজা আন্দোলন তাঁর হাতেই রোপিত হয়। তিনি ময়মনসিংহের মানুষ। সারাদেশেই তখন জমিদারদের দোর্দণ্ড প্রতাপ। জমিদারদের অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে কিশোর বয়সেই রাজনীতি সচেতন সভা ডাকেন। মুক্তাগাছার জমিদার শ্রীযুক্ত যতীন্দ্র নারায়ণ আর্চায বার্ষিক সফরে (১৯১৬) এলে কয়েকটি দাবি পেশ করেন। তার মধ্যে কাচারিতে প্রজাদের বসার স্থান নির্ধারণ। সে সময় সাধারণ প্রজাদের বসার জন্য চট ও মাতুব্বর প্রজাদের বসার জন্য লম্বা বেঞ্চির ব্যবস্থা করা হত। তিনি প্রজাদের জন্য চটের বদলে পাটির ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে এ দাবি মেনে নেওয়া হয়। এভাবেই শুরু প্রজা অধিকার আদায়ের দাবি।


একে ফজলুল হক, মৌলবী আবুল কাশেম, খান বাহাদুর আলীমুজ্জামান চৌধুরী (রাজবাড়ি) মওলানা মোহাম্মাদ আকরাম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী, মৌলবি তমিজ উদ্দিন খান (রাজবাড়ি) তাঁরা গরিব প্রজাদের জন্য কাজ করে আসছিলেন (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর আবুল মনসুর আহম্মদ পৃষ্ঠা-১২)। এরপর খেলাফত অসহযোগ (১৯২০), পল্লী সংগঠক, বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৪) স্বরাজ্য দল (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ১৯২৩) কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হিন্দু মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টা ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ কংগ্রেস ত্যাগ করেন ১৯২৯ সালে নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি গঠন করেন। এই সমিতির সভাপতি হন স্যার আব্দুর রহিম এবং সেক্রেটারী হন মওলানা আকরাম খান, মৌলবী তমিজ উদ্দিন খান জয়েন্ট সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। অন্যান্যারা হলেন মৌঃ মুজিবুর রহমান, একে ফজলুল হক, কান বাহাদুর আবুল মোমিন (সিআইসি)। প্রজা সমিতির চৌদ্দ দফার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিল বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারদের উচ্ছেদ, খাজনার নিরিখ, হ্রাস, নায়েব সেলামী রহিতকরণ, খাজনা ঋণ মওকুফ, মহাজনী আইন প্রণয়ন, সালিশীবোর্ড গঠন, হাজা-মজা-নদী সংস্কার, প্রতি থানায় হাসপাতাল স্থাপন, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করণ, পূর্ববাংলায় স্বায়ত্ব শাসন।

১৯৩৫ সালের পর প্রজা আন্দোলন নামে তা পূর্ববাংলার সব জেলাতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত কৃষক প্রজা পার্টি ছিল মুসলমানদের নিয়ে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পার্টি। মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত দল আর প্রজা সমিতি মুসলমানদের সংগঠন হলেও হিন্দু মুসলিম সাধারণ প্রজার স্বার্থে কাজ করে। মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেছিলেন ‘হিন্দুরা যেমন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস নামে হিন্দু প্রতিষ্ঠান চালায় আমরাও তেমনি অসাম্প্রদায়িক প্রজা সমিতি নামে মুসলিম প্র্রতিষ্ঠান চালাইব।’ তাদের স্লোগান ছিল, ‘লাঙ্গল যার মাটি তার।’ এ সময় ফরিদপুর থেকে ‘লাঙ্গল’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। আর রাজবাড়ি-পাংশা থেকে খোন্দকার নাজির উদ্দিন ‘খাতক’, ‘কাঙ্গাল’ ‘গুর্খা’ নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং কৃষক প্রজা সংগঠিত করেন। কৃষক প্রজা সমিতি ক্রমে একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গণদাবি আদায়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং ফলশ্রুতিতে ১৯৩৭ সালের পার্লামেন্টারী নির্বাচনে কৃষক প্রজাপার্টি ও মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকারের হক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। উক্ত মন্ত্রীসভার প্রধান হন কৃষক প্রজা পার্টির নেত একে ফজলুল হক।

হক মন্ত্রীসভায় ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিশী বোর্ড স্থাপন, ১৯৩৯ সালে প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাস হয়। ১৯৪০ সালে মহাজনি আইন, প্রাথমিক শিক্ষা আইন অনুসরণে স্কুল বোর্ড গঠন, মাধ্যমিক শিক্ষা আনয়ন বিল পাস হয়। ‍ঋণ সালিশী বোর্ড ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন পাশে কৃষক প্রজা ভূমি অধিকারে লাভবান হয়। তারা সম্পত্তির মালিকানা লাভে স্বত্ত্ববান হতে শুরু করে। জমিদার, মহাজনের, ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজবাড়ির মৌঃ আহমদ আলী মৃধা প্রজা সমিতি সদস্য ও ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রজা সমিতির সংগঠিত করে কৃষকদের মধ্যে গণচেতনা সৃষ্টি করেন। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিরক্ষর কৃষকেরা প্রজা সমিতি, হক সাহেব ও হক সাহেবের প্রজাস্বত্ত্ব আইন ও ঋণ সালিশী বোর্ড বিষয়ে জানত। তারা মনে-প্রাণে হক সাহেবকে ভালোবাসত। আহমদ আলী মৃধা হক সাহেবকে ক্যাবিনেটে প্রজাপক্ষের পাস করা আইনকে বলতেন ‘হক সাহেবের কাচো চিৎ করা আইন।’ কচ্ছপকে চিৎ করা হলে যেমন উপুড় হওয়ার চেষ্টা করেও উপুড় হতে পারে না তেমনি হক সাহেবের পাস করা আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে কেউ গরীব প্রজাকে ঠকাতে পারত না। এ কথাটি এখনো রাজবাড়ির অনেক বৃদ্ধদের মুখে শোনা যায়। ‘সালিশী বোর্ড প্রজাস্বত্ত্ব আইন ও মহাজনি আইনে বাংলার কৃষক প্রজার জীবনে এক শুভ সূচনা হল। তারা কথিত আসন্ন মৃত্যুর হাত হতে বাঁচিয়া গেল। ফলে হক মন্ত্রীসভার এই দুই তিনটা বছরকে বাংলার মুসলমানদের জন্য সাধারণভাবে কৃষক প্রজাখাতকদেদর জন্য বিশেষভাবে একটা স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে।’ (আমার দেখা রাজবাড়ির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমেদ, পৃষ্ঠা-১৩৭)


সুভাষ বসুর নেতৃত্বে রাজবাড়ির উত্তপ্ত রাজনীতি

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক কিংবদন্তি নাম। সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের নেতাসহ স্বরাজ আন্দোলন, আজাদ হিন্দ ফোর্স সংগঠন, অন্তর্ধান আজও নানা রহস্যের জাল বিস্তার করে আছে। তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে উল্কার মতো দেখা দিয়ে, সবার চোখ ধাঁধিয়ে রাতারাতি হারিয়ে যান। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও চিত্তরঞ্জন দাস স্বাধীনতাকে তরান্বিত করার জন্য কংগ্রেসের উপদল হিসাবে স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তখন সহকারী হিসাব পেয়েছিলেন তরুণ প্রতিভাবান এবং লড়াকু নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুকে। সুভাষ চন্দ্র বসু আই সিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও ইংরেজদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে এই পার্টি অধিকাংশ হিন্দু আসনে জয়ী হয়। গোয়ালন্দ সে সময় পূর্ববাংলার প্রবেশ পথ এবং রেল যোগাযোগে স্বরাজ আন্দোলনের পূর্বকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হত। সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হন এবং কংগ্রেস ও স্বরাজ ঐক্যবদ্ধ সূত্রে হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যের প্রচেষ্টা করেন। স্বরাজের সূত্র ধরে রাজবাড়ি ও গোয়ালন্দে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও সমাজসেবীদের সমাবেশ ঘটে। সূর্যনগরের হরিণধরার বৃন্দাবন দাস স্বরাজ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সাহিত্যসেবী অবধুত তাঁর কালজয়ী ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ গ্রন্থখানি বৃন্দাবন দাসের নামে উৎসর্গ করেন। স্বরাজ আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট হন মনোমহন ভাদুড়ী, কুমার বাহাদুর, নারায়ণ চক্রবর্তী, জাহ্নবী কুণ্ডু প্রমুখ। স্বরাজ আন্দোলনের মিশ্রণ সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে নানা স্থানে দাবি আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। এত্র এলাকায় গোয়ালন্দ মৎস্যজীবী আন্দোলন সংগঠিত হয়।

জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁর সময়ে ১৯৩৭ সালে রাজবাড়ি ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ সময়েই সূর্যনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুভাষচন্দ্র বসু’ কটন মিল। ১৯৪০ সালে সাবেক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সুভাষ বসু কলিকাতা কংগ্রেস ও কলিকাতা মুসলিম লীগের মধ্যে এক চুক্তি ঘটান। চুক্তির ভিত্তিতে কলিকাতা করর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়ী হন। এরপরেও তিনি হিন্দু ও মুসলিম লীগের ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। ইতিমধ্যে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক পার্টি গড়ে তোলেন। এ সময় তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রচেষ্টায় সিরাজ-উদ-দৌলাকে বাঙালি জাতীয়তার প্রতীকরুপে জীবন্ত করা এবং প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার সত্যাগ্রহ গ্রহণ করেন। এসময় তরুণ নেতা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন লাল মিয়া (ফরিদপুর) তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেন। প্রতিদিন শত শত সত্যাগ্রহী নেতা গ্রেফতার হতে থাকে। সুভাষ বসু গ্রেফতার হন এবং ১৯৪০ সালে আন্দোলনের মুখে মুক্ত হন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি কারো সাথে দেখা দিতেন না। নিজের ঘরে কাউকে ঢুকতেও দিতেন না। নির্ধারিত সময়ে ঠাকুর খাবার রেখে দরজায় টোকা দিয়ে চলে আসত। ১৯৪১ সালের ২৪ জানুয়ারি দেখা গেল খাবার পরে আছে, দরজা খোলা, সুভাষ বসু নেই। সুভাষ অন্তর্ধান হলেন।

১৯৪১ এর ২৬ জানুয়ারি তিনি দেশত্যাগ করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে কাবুল হয়ে রাশিয়ায় যান। জার্মানিতে এসে জার্মান সরকারের অনুরোধে একটি অস্থায়ী ভারত সরকার গঠন করেন। এরপর ইউরোপ থেকে সাবমেরিনযোগে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর পার হয়ে ১৯৪৩ এর ২ জুলাই সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। ১৯৪৩ এর ৪ জুলাই রাসবিহারীবসু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ‘আজাদ হিন্দ ফৌজে’র  সর্বময় কর্তৃত্ব সুভাষ বসুর হাতে সমর্পণ করেন।

তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধে জার্মানির পক্ষে জাপান আর বিপক্ষে বৃটিশ। সুভাষ বসু ইংরেজ তাড়ানোর কৌশল হিসাবে জাপানের পক্ষ সমর্থন করেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ সরাসরি জাপান সৈন্যদের সাহায্য করেন। যৌথবাহিনী মনিপুর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।


রাজবাড়ি পূর্ব থেকেই অনুশীলন, কমিউনিস্ট, স্বরাজ বিপ্লবীদের ঘাঁটি ছিল। বিপ্লবী দলের প্রবীন ও তরুণ নেতা আজাদ হিন্দু ফৌজের শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলে। এ বাহিনীর বিশেষত্ব ছিল বহু স্থানীয় ও বহিরাগত মহিলা এতে যোগ দেয়। বর্তমান রাজবাড়িতে রহিমুন্নেসা কিন্ডার গার্টেন স্থানটি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এই স্থানে দেবেন সিং ও কালু মজুমদারের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। সুভাষ বোসের প্রতিকৃতির ব্যাস ও সাদা শাড়ি পরে সুঠামদেহী বিপ্লবী মহিলারা লাঠি মহড়া দিত এবং স্লোগান তুলত-----‘আসামের গুণ্ডামী চলবে না-চলবে না।’ বর্তমান রাজবাড়ি প্রেসের সামনে কালু মজুমদারের জয়কালী মন্দির ক্যাবিন ছিল। বাতেন মার্কেটের স্থানে লোহার গরাদ দেওয়া আটকানো (যা ষাটের দশকে দেখা যেত) স্থানটি ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের নিভৃত নিবাস। কলেজ পাড়ায় দাসের ডাঙ্গী বলে পরিচিত স্থানে ছিল সুভাষ বসু খদ্দর ফ্যাক্টরি  (তথ্য-প্রবীন ব্যবসায়ী জগলু ভাই)। রাজবাড়ি বর্তমান আজাদী ময়দানের নাম এ সময় থেকে শুরু হয়। আজাদ হিন্দু ফৌজের প্রকৃত নেতৃত্ব দেন মনমোহন ভাদুড়ী। তিনিই অত্র অঞ্চলে আজাদ হিন্দু ফৌজের সংগঠিত করেন। কলিংপঙে তিনি আজাদ হিন্দু ফৌজের ক্যাপটেন হিসাবে নেতৃত্ব দেন। তিনি মাদারীপুরের মানুষ হলেও গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ি বসবাস করে নেতৃত্ব দান করেন। সুভাষ বসুর গ্রন্থের ক্যাপ্টেন ভাদুড়ী চরিত্রটি মনমোহন ভাদুড়ীর।

সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের ১৯৪৪ এর ১৮ মার্চ বৃটিশবাহিনীকে পরাজিত করে ইস্ফল ও কোহিসার দুটি বৃটিশ ঘাঁটি দখল করে। এসময় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ প্রায়। ঘোষণা করা হয় ফরমোজার তাইহুকু বিমান ঘাঁটিতে বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ বসুর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর রহস্য  এখনো প্রশ্নবোধক। অনেকে মনে করেন সেদিন কোনো বিমান বিমান দুর্ঘঘটনা ঘটেনি এবং তিনি মারা যাননি। এ রহস্য নিয়ে এখনো নানা সংবাদ শোনা যায়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব

বৃটিশ শাসনকালে ভারতে বাঙালি, বিহারী, অসমিয়া, উড়িয়া, তামিল, পশতু, নিন্দি, সিন্ধি, কাশমিরী প্রভৃতি জাতগোষ্ঠীর মধ্যে সাত কোটি মুসলিম। জাতিসত্ত্বায় সংখ্যা লঘিষ্ঠ মুসলমান পৃথক রাষ্ট্রভূমির স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়ে উঠে। হিন্দু-মুসলিম দ্বিজাতি তত্ত্ব ও নানা মতভেদে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পথ সরল ও মসৃণ ছিল না। নানা সংঘাত, কুটকৌশল, রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা, আপোস-মীমাংসায় তা কার্যকর হয়। পাকিস্তান আন্দোলন পূর্ব থেকে শুরু হলেও এর দানা বাঁধে ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে দিয়ে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে একে ফজলুল হক কর্তৃক পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন ও এর সমর্থনে মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও পাকিস্তান দাবি ও মুসলিম শক্তি বেড়ে যায়। লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় মুসলমানদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটে।

‘এটাই মুসলীম লীগের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক পজেটিভ পদক্ষেপ। লাহোর প্রস্তাবই মুসলিম ভারতের রাজনৈতিক আদর্শতে গোটা ভারতের রাজনৈতিক দাবির সহিত সম্ভাব্যপূর্ণ করে তোলে। মুসলিম লীগ আর ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী থাকে না। হয়ে ওঠে স্বাধীনতার দাবিদার।’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর, পৃষ্ঠা-২৪৯)।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পূর্বে বঙ্গের মুসলমানেরা নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত ছিল। মুসলিম লীগ ভারতের স্বাধীনতা থেকেও বেশি গুরুত্ব দিয়েছে মুসলমানদের নানা অধিকার আদায়ে।


১৯২০ সালে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনে কম সংখ্যক মুসলমান তা সমর্থন করে। মুসলমানরা তখনও খেলাফত আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এই অসহযোগর মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উপলদ্ধি আসে অসহযোগের পথে স্বরাজ আসা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি কয়েকজন সর্বভারতীয় নেতার সঙ্গে মিলে কংগ্রেসের একটি উপদল হিসাবে স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। ১৯২৩ সালে নভেম্বর মাসে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে হিন্দু আসনগুলোর অধিকাংশ এ পার্টির প্রার্থীরা জয়ী হয়। এ সময় মুসলমান সদস্যদের সমর্থন আদায় করেন চিত্তরঞ্জন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মুসলমানদের সহযোগিতা ছাড়া কারো পক্ষেই ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়। সে জন্য নির্বাচনের পরের মাসে ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে মুসলমানদের সাথে তিনি একটি হিন্দু মুসলিম প্যাস্ট করেন। এই প্যাস্ট অনুযায়ী মুসলমানদের বড় ছাড় দেওয়া হয়। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ছাড় ছিল শতকরা ৫৫টি চাকরি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত রাখা। তাছাড়া গুরু কোরবানীতে বাধা না দেওয়া, মসজিদের কাছে বাজনা না বাজান ইত্যাদি। ইতিমধ্যে ১৯২৫ সালে জুন মাসে চিত্তরঞ্জন দাস মৃত্যুবরণ করেন এ সময় নেতৃত্বের সঙ্কট দেখা দেয়। সুভাষ বসু এ সময় কারাগারে বন্দি। এ পরিবেশে জোরদার হয়ে উঠে উগ্রবাদী, সন্ত্রাসবাদী এবং ধর্মীয় রাজনীতি। এ সময় ইংরেজদের সহায়তাকারী মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা এগিয়ে আসেন স্যার আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী বলতে স্যার আব্দুর রহিম ও অনুসারীদের যা ছিল তা হল মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং হিন্দু ভদ্রলোকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি হ্রাস করা। এটা তিনি করতে চেয়েছিলেন বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মুসলমানদের সংগঠিত করে এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সমর্থন আদায় করে। ১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন মুসলিম আসনের ৩৯টির মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আবদুর রহিমের দলের প্রার্থীরা।

ধীরে ধীরে মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে সে জোয়ারের মুখে ফজলুল হক টিকে থাকতে পারেনি। ফজলুল হকের পর প্রধানমন্ত্রী হন নাজিমুদ্দিন কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই দেশে গর্ভনরের শাসন চালু হয়। এরপর ১৯৪৬ সালে আবার নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন হোসেন শহীদ সহরোওর্য়াদী (স্যার আবদুর রহিমের জামাতা)। মুসলিম লীগের আমলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে দুটি ঘটনা ঘটে তা হলো ১৯৪৩ এর মন্বত্তর  এবং কলিকাতায় নজিরবিহীন দাঙ্গা। দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় ১৯৪২-৪৩ জাপানিবাহিনী বার্মার পথ ধরে ভারতের ত্রিপুরা পৌঁছে যায়। উল্লেখ্য দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানীর পক্ষ অবলম্বন করে জাপান। জাপান একবারে কলিকাতার ওপর বোমা ফেলতে পারে এমন অবস্থা।

সুভাষ বসুও জাপান জার্মানীর সহায়তা নিয়ে তার ‘আজাদ হিন্দু ফৌজকে’ মনিপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এই পরিবেশে বার্মা থেকে চালের আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া জাপানিবাহিনী বা আজাদ হিন্দু ফৌজ দেশে ঢুকলে যাতে খাদ্যশস্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ না নিতে পারে তার জন্য সরকার প্রচুর চাল কিনে মজুদ করে এবং নৌকা আটক করে রাখে। সেবার বঙ্গদেশে ফসলও ভালো হয়নি। অন্যদিকে চালের দামের বাড়তি দেখে ব্যবসায়ীরা চাল মজুদ করে। আবার সরকারের নিকট যে চাল ছিল তা নৌকার অভাবে যথাসময়ে বন্টন করা সম্ভব হয়নি। এভাবে তৈরি হয় মানুষের তৈরি এক দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষে বেসরকারি হিসাবে প্রায় ত্রিশ লক্ষ লোক মারা যায়। ফ্যানের আশায় এবং ভিক্ষা করতে করতে শহরে বন্দরে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ মরে পড়ে থাকে। এরপর ১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন আসে। বৃটিশ সরকার ভারত বিভক্ত করতে চায়নি।


এ সময় মুসলমানদের আরো রাজনৈতিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্য ভারতের প্রদেশগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়। এটা মুসলিম লীগ মেনে নেয়নি। কংগ্রেসের সভাপতি জওহরলাল নেহেরুও নন। দেশ বিভাগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগের তরফ থেকে ঐ বছরের ১৬ আগস্ট ডাইরেক্ট এ্যাকশন পালন করার কর্মসূচী দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ঐ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। যাতে সাধারণ লোকেরা ঐ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করতে পারে। অনেকের মতে তিনি দাঙ্গায় অংশ নেওয়ার জন্য মুসলমানদের সংগঠিত করেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে মন্ত্রী হিসেবে তিনি লাল বাজারের পুলিশের সদর দপ্তরে বসে থাকেন। দাঙ্গা থামানোর কতটা প্রচেষ্টা করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। এই দাঙ্গায় চারদিনে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু মুসলমান নিহত হয়।

আল্লামা ইকবালকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা (পাঞ্জাবের পি, কাশ্মীরের কে, ইন্ডাজ (সিন্ধু) এর আই এবং বেলুচিস্থানের স্থান) বলা হয়। পাকিস্তানের প্রথম প্রস্তাবনায় বাংলার নাম থাকে না। তবে বিভক্তির কালে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তানের অংশ মুসলমানদের জন্য স্বাধীন দুটি রাষ্ট্য হতে পারত। একে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাবে ঐ কথাটিই বলেছিলেন। ভারতের মুসলিম মেজরিটি অংশ নিয়ে তারা স্বাধীন ভূখণ্ড পাবে। কিন্তু মুসলিম লীগ সভাপতি জিন্নাহ পরবর্তীতে এ দাবি মেনে না নিয়ে একক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দেন। বাংলার মুসলিম নেতৃবৃন্দ জিন্নাহর কৌশল ও ব্যক্তিত্ত্বের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে বাংলার পূর্ব অঞ্চলের মুসলিম গরিষ্ঠ অংশ নিয়ে হল পূর্ব-পাকিস্তান এবং পাঞ্জাবের সিন্দু, উত্তর পশ্চিম সিমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান  নিয়ে হয় পশ্চিম-পাকিস্তান। এভাবে উভয় পাকিস্তান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পাকিস্তান। রাজধানী হয় করাচী। প্রেসিডেন্ট হন কায়েদা আজম মোহামম্মদ আলী জিন্নাহ।

রাজবাড়ি জেলায় তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মৌঃ তমিজ উদ্দিন খান, খান বাহাদুর ইউসুফ হোসেন, আহম্মদ আলী মৃধা, ডা. একেএম আসজাদ, অধ্যক্ষ কেতাব উদ্দিন আহম্মদ, মোঃ হাতেম আলী (পিএলএল শালমারা), মৌঃ ইসমাইল হোসেন (নাড়ুয়া) হাজী আবদুস সাত্তার (মৃগী) এ্যাডভোকেট আবদুল মাজেদ (রাজবাড়ি), আব্দুল গনি (সেক্রেটারী, মুসলিম লীগ), অ্যাডভোকেট আবদুল জলিল, হানিফ মোল্লা (গোয়ালন্দ), আব্দুল গফুর (বাচ্চু মাষ্টারের পিতা) মোঃ হাবিবুর রহমান (রাজবাড়ি), আমজাদ হোসেন জোয়ারদার (রাজবাড়ি), অধ্যাপক আব্দুল গফুর (বেলগাছি) অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল (রাজবাড়ি), ফখরউদ্দিন আহম্মেদ, আবদুর রহমান মৃধা প্রমুখ বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

 পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিমলীগের নেতৃত্বাধীন অত্র অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায় আন্দোলন গড়ে তোলে। তাদের মুখে স্লোগান থাকে লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রতি ভাবাবেগে কালুখালির অদূরে একটি হাটকে ‘পাকিস্তানের হাট’ নামকরণ করে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী লিয়াকত আলীর নাম অনুসারে নাড়ুয়অ ইউনিয়নে নব প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়, ‘লিয়াকত আলী মেমোরিয়াল হাই স্কুল।’ বৃটিশ রাজের অবসান এবং পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র গঠন মুসলমানরা বড় প্রাপ্তি মনে করে।

পাকিস্তান পরবর্তী রাজনীতি

(১৯৪৭-১৯৭১)

আবুল মনসুর আহম্মদ এর কথায়, ‘এ জন্যই পূর্ববাংলা ফাউ এর ধান কাউ এর ধান টিয়ায় খাইলে গৃহস্তের আপত্তি হয় না।


পাকিস্তান হাসিসের আগে এদের দরকার ছিল ভোটের। পাকিস্তান হাসিলের পর এদের দরকার পাটের।’ (রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃষ্ঠা-২২৯)। ভারতীয় হিন্দু মুসলমানদের ছিল সুমহান । ঐতিহ্য ও আদর্শ। সুপ্রাচীন সভ্য আর্যজাতি বংশ পরস্পরায় দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করেছে। ধর্ম, শিল্প, সাহিত্যে মননশীলতার উৎকর্ষ সাধনে এ জাতি রেখেছে অনবদ্য অবদান। অন্যদিকে মুসলমান জাতি পশ্চম এশিয়াসহ ভারথে প্রায় ৮০০ বছর ধরে বিজ্ঞান, স্থাপত্য,  শিল্প, সাহিত্য, চেতনা বিকাশে হিন্দুদের চেয়ে কম অবদান রাখেনি। ফলে ভারতবর্ষকে উভয় জাতিস্বত্ত্বার ভিত্তিতে ভিন্ন দুটি রাষ্ট্রের উদ্ভব আধুনিক চেতনার পরিপন্থী নয়। পণ্ডিত নেহেরু মহাত্মা গান্ধী, মিঃ জিন্নাহ, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দীর মতো ‍উদারপন্থী নেতৃবৃন্দ তা বুঝেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। মি. জিন্নাহ  যে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা শুনিয়ে আসছিলেন বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা গেল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজধানী হল করাচী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৯ মাস পর জিন্নাহর ঢাকা আসা, ভাষার প্রশ্ন, নেতাদের কোটারী স্বার্থ উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগে পকেটস্থ করা, পূর্বপাকিস্তানি মুসলিমলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি, জিন্নাহর চরম একদলীয় মনোভাব পূর্ব-পাকিস্তানিদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করে। মূলত মুসলমানরা যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল আল্লামা ইকবালের সে স্বপ্নের পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ববাংলা ছিল না। পাকিস্তান যখন হয়েই গেল আর পূর্ববাংলা ‘ফাউ’ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল তখন ‘ফাউ’ এর প্রতি টান না থাকাই স্বাভাবিক। জিন্নাহ, লিয়াকত আলী তারা আগে চেয়েছিল। পাকিস্তানের জন্য মুসলমানদের ভোট আর পাকিস্তান হওয়ার পরে চায় পাট। উভয় ক্ষেত্রেই স্বার্থ জড়িত। এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাঙালির প্রকৃত পরিচয় বাংলা ভাষার প্রতি কেন্দ্রীয় শাসকদের চরম অবজ্ঞা এবং কৌশলে বাঙালির উপর উর্দু চাপিয়ে দেয়া। তারা মানি ওর্ডার ফরমে, ডাকটিকেটে, মুদ্রায় সরকারি কাজকর্মে ইংরেজির সাথে উর্দু ব্যবহার করতে শুরু করে। এ ছাড়া আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব, বাংলা লেখার মধ্যে আরবী, ফারসী শব্দের ব্যবহার বাঙালিদের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া শুরু করে। ফলে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন রাজবাড়ির ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর (একুশে পদক ভূষিত) মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, হামিদুল হক (ভোলা মিয়া), মরহুম অধ্যক্ষ বদোরুদ্দেজা টুকু মিয়া, মুনশি তফাজ্জল হোসেন, অ্যাডভোকেট সামসুল আলম। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের মন্ত্রী নাজিমুদ্দিন কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছিলেন না। ফলে তারা বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনে সচেষ্ট হন। ইতিমধ্যে ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্টের পর কৃষক শ্রমিক আন্দোলনের নেত মওলানা ভাসানী আসাম থেকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) আসেন। একে ফজলুল হক রাজনীতিতে কিছুটা নিস্ক্রিয় ছিলেন। হোসেন শহীদ সহরওয়ার্দী থেকে যান কলকাতাতে। পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন লিয়াকত আলী খানের দোসর নওয়াব খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিনরা। রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আতাউর রহমান খান, শামসুল হক, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, হাজী দানেশ, তাজউদ্দিন আহমেদ, অলি আহাদ প্রমুখ থকন তুরণ নেত। এদের নিয়েই মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী শুরু করেন বিরোধীদলীয় রাজনীতি। ১৯৪৮ সালে রাজশাহী অঞ্চলের সাঁওতাল সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে কৃষক বিদ্রোহ হলে তা দমনে পাকিস্তান সরকার এক অমানুষিক পন্থা অবলম্বন করে। ইলামিত্রসহ বহু প্রগতিশীল নেতা কর্মীর উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। ইলা মিত্রের চিকিৎসা দেন রাজবাড়ির স্বনামধন্য ডা. কেএস আলম। এই অত্যাচারের মধ্যে দিয়েই গড়ে ওঠে বিরোধী রাজনৈতিক স্রোতধারা। তরুণ নেতারা এই আন্দোলন সংগঠিত করে এবং নেতৃত্বে থাকেন মওলানা ভাসানী।


এর পরপরই বিরোধীদল গঠনের উদ্দেশ্যে কিছু মুসলিম লীগ নেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রথমে নারায়ণগঞ্জে ও পরে টাঙ্গাইলে কর্মী সম্মেলন করে নেতাদের কাজের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মুসলিমলীগের দরজা খুলে দেবার দাবি করেন।

নেতারা কর্ণপাত না করায় ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন কর্মীরা নিজেরা নিজেরাই মুসলিমলীগ গঠন করেন। সরকারি মুসলিমলীগ হতে পার্থক্য দেখাবার জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন ‘আওয়ামী মুসলিমলীগ’ এভাবেই মুসলিমলীগের বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী (জনগণের)মুসলিমলীগ দল গঠিত হয়। ১৯৫৫ সালে ২২ অক্টোবর কাউন্সিল সভায় আওয়ামী মুসলিম থেকে মুসলিম বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ করা হয়। রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে। শেখ মুজিবুর রহমান এর উপস্থিতিতে রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ গঠনে সভাপতি থাকেন ডা. এস এম ইয়াহিয়া। সম্পাদক থাকেন মরগুব আহম্মেদ। সদস্য থাকেন অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম মৃধা, মোঃ হারুন, ডা. জলিলুর রহমান প্রমুখ। পরবর্তীতে গোয়ালন্দ মহকুমার আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকেন শামসুজ্জামন চৌধুরী (বাদশা ভাই), সম্পাদক আকবর আলী, সদস্য মরগুব আহম্মেদ, ডা. জলিলুর রহমান প্রমুখ। ষাটের দশকের প্রথম ভাগে সভাপাতি নির্বাচিত হন কাজী হেদায়েত হোসেন। এ সময় সম্পাদক থাকেন ডা. জলিলুর রহমান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকেন অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী, একে এম নুরুজ্জামন, অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী, শামসুজ্জামান চৌধুরী, ডা. জয়নাল আবেদিন, এবিএম নুরুল ইসলাম, মোঃ মোসলেম উদ্দিন মৃধা, গওহর মণ্ডল, মশারফ হোসেন, আব্দুল ওয়াহাব বিশ্বাস প্রমুখ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী এমএল এ নির্বাচিত হন।

১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগের অংগ সংগঠন ছাত্রলীগ  দলটির শক্তিশালী ভিত রচনা করে। ছাত্রলীগ থেকে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন চিত্তরঞ্জন গুহ। আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন, নাজিবুর রহমান, ফরিদ আহম্মেদ, ফকীর আব্দুর রাজ্জাক, এটিএম রফিক উদ্দিন, মকসুদ আহম্মেদ রাজা, আনোয়ার হোসেন, কাজী ইকবাল ফারুক, ফকীর আবদুল জব্বার, মকসেদ আলী, জিল্লুল হাকিম, গণেশ নারায়ন চৌধুরী (সন্তু) রেজাউল হক রেজা, আশরাফ আলী প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতা পার্টির আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৩ সালে রাজবাড়ি কলেজে নানা বাধা বিপত্তির মুখে ছাত্রবৃন্দ জেলায় প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ছাত্রলীগের নেপথ্যে নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা দেন কাজী হেদায়েত হোসেন। আওয়ামী লীগ ছয় দফার আন্দোলন, ‘৬৯ এর গণআন্দোলন, রেলশ্রমিক আন্দোলনসহ স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

দেশের স্বাধীনতা অর্জনে আওয়ামী লীগের অবদান প্রশ্নাতীত। স্বাধীনতা উত্তরকালে কাজী হেদায়েত হোসেন, মোঃ মোসলেম উদ্দিন মৃধা, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ দলটির নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৫ সালে পট পরিবর্তনে দলটি সঙ্কটে নিপতিত হয়। এ সঙ্কট উত্তরণে দলটিকে সচল রাখেন অ্যাডভোকেট সামসুল হক, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুস সালেহীন (সভাপতি), মকসুদ আহমেদ রাজা, একেএম নুরুজ্জামান, মহসীন উদ্দিন (বতু ভাই), কাজী কেরামত আলী, জিল্লুল হাকিম, নাসির উদ্দিন, আব্দুল হাই, নুরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান, ফকীর আবদুল জব্বার, আকবর আলী মর্জি (মুর্জি ভাই) গণেশ নারায়ণ চৌধুরী সন্ত, অশোক বাগচি,  এসএম নওয়াব আলী প্রমুখ।


 ভাষা আন্দোলন

শত বছরের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ভাষা আন্দোলন অধিকার আদায়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম আন্দোলন। মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্দোলনটি এক অনন্যতার প্রতিক। এ কারণে ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল জাতীয়ভাবে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অতি গুরুত্ব ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয়। ভাষা আন্দোলনের ফলাফল সুদূর প্রসারী। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সমকালীন বাস্তবতায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। রাষ্ট্র গঠনের পূর্ণাঙ্গ শর্ত মেনে পাকিস্তানের জন্ম না হলেও পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরা এ রাষ্ট্রের মাধ্যমে তাদের আত্মবিকাশের স্বপ্ন সাধ লালন করেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের স্বল্পকালের মধ্যেই মি. জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় শাসকদের মনোভাবে পূর্ব-পাকিস্তানের সচেতন নাগরিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীসহ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে মোহভঙ্গের সৃষ্টি হয়। সরকারি কাজ কর্মে তারা বাংলা ভাষাকে অবহেলা এবং উর্দুর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শন করতে থাকে। তারা মানি অর্ডার ফর্মে, ডাকটিকেট, মুদ্রা এবং সরকারি কাজকর্মে উর্দু ব্যবহার শুরু করে। ১৯৪৭ এ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পূর্ব থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী মহল ভেবে আসছিলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র কী হবে? বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা বা উর্দু যাই হোক তা উভয় ভাষাভাষী মানুষের উপর কি প্রভাব বিস্তার করবে? ১৯৪৭ এর জুন মাসে যখন ঘোষণা করা হয় যে, দেশ বিভাগের ফলে বঙ্গ প্রদেশও বিভক্ত হবে তখন আবুল মনসুর আহম্মেদ, কাজী মোতাহার হোসেন (রাজবাড়ি), মোঃ শহীদুল্লাহ, আবদুল হক, মাহমুদুর রহমান জাহেদী, ফররুখ আহমেদ এ প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষক মিলে আবুল কাশেমের  নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিশ গঠন কেরন। তমুদ্দন মজলিশ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে  একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। উক্ত পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন ভাষার দাবিতে প্রবন্ধ পেশ করেন।

পরবর্তী বছর এ প্রশ্নে কাজী মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অধ্যাপক সমিতি’ গঠিত হয়। এভাবে ভাষার দাবি জোড়ালো হয়ে উঠতে থাকে। ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত্র ঘটে ১৯৪৮ সালের শুরুতে। এ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে পাকিস্তানের গণপরিষদে কাজের ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের প্রস্তাব দেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সে প্রস্তাব জিন্নাহ ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরোধীতায় নাকচ হয়ে যায়। এ সময় থেকে ভাষা আন্দোলন বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে দানা বাধতে শুরু করে। সকল ছাত্র সংগঠন মিলে ১১ মার্চ ১৯৪৮ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে।  ১১ মার্চ এই পরিষদ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করে। তাদের উপর পুলিশি হামলা চালান হয়। ১১ মার্চের পরপরই মি. জিন্নাহ ঢাকায় আসেন এবং বিশাল জনসভায় ঘোষণা দেন উর্দুই হবে রাষ্ট্র ভাষা। এর কয়েকদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্র শিক্ষকদের সভায় ঐ একই কথা বললে অনেকে এর প্রতিবাদ করেন। এভাবে ভাষাকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয় তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলাকে পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারি কাজে ব্যবহৃত হবে বলে আশ্বাস দিলেও ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা সফরে এসে ঘোষণা করেন প্রাদেশিক ভাষা কি হবে তা ঠিক করবে প্রদেশের লোকেরা কিন্তু রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু।

এর অর্থ পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারি কাজসহ চিঠিপত্র আদান প্রদান স্থাপনা এমন কি দৈনন্দিন জীবনে উর্দুর ব্যাপক প্রচলন থাকতে হবে। মোগল, ইংরেজ শাসনকালে যেমন ফারসী ও ইংরেজি জেকে বসে তেমনি উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে উর্দুর ব্যাপক প্রসারে মাতৃভাষা বাংলার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দানা বাধে।


তদুপরি মাতৃভাষার স্থান হবে উর্দু ও ইংরেজির পশ্চাতে। এ কারণেই মাতৃভাষার অস্তিত্ব ও সম্মান টিকিয়ে রাখতে হবে। খাজা নাজিমউদ্দিনের ঘোষণার প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্রদের সর্বদলীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে হরতাল পালিত হবে। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিুউর রহমান, রফিক, সালামসহ আরো কয়েকজন। জানা যায় অনেকের লাশ গুম করা হয়। অনেকে গুলি ও লাঠির আঘাতে আহত হন। অনেকে গ্রেপ্তার হন। এ ঘটনা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীরা বের হয়ে আসে। দোকানপাট ও রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সারা দেশব্যাপী খবর বিস্তার লাভ করে। পরের দিন ঢাকাসহ দেশের মফস্বল শহরে মিছিল, মিটিং, শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় সৈনিক ও আজাদ পত্রিকা বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ভাষা আন্দোলন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন রাজবাড়ির কয়েকজন শিক্ষক, ছাত্রনেতা, সরকারি কর্মচারী। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড, কাজী মোতাহার হোসেন (বাগমারা,পাংশা), অধ্যাপক আব্দুল গফুর (দাদপুর, বেলগাছি), আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী (কাঁটাখালি, বরাট) সামসুল আলম (রাজবাড়ি), হামিদুল হক ভোলা মিয়া (সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ি), বদরুদ্দোজা টুকু মিয়া (সূর্যনগর, রাজবাড়ি), মুন্সি মোঃ তোফাজ্জল হোসেন (পাতুরিয়া, পাংশা)। রাজবাড়ির ভাষা সৈনিকদের পরিচিতি যথাস্থানে আলোচিত।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিরাপরাধ ছাত্র ও জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে রাজবাড়ি শহর ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ছাত্র জনতা একেএম আসজাদ, সমর সিংহ, আবুল কাশেম মৃধা, হাবিবুর রহমান প্রমুখ এর নেতৃত্বে ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬/৭ হাজার মানুষ আজাদী ময়দানে সমবেত হন এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরে তারা ডানলপ হলে (বর্তমান চিত্রা হল) মিলিত হন। এ প্রসঙ্গে সৈনিক পত্রিকা ১৯৫২-১৬ মার্চ প্রতিবেদনে-----

‘২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখ ঢাকার নিরীহ ও নিরপরাধী ছাত্র ও জনসাধারণের উপর পুলিশের অমানুষিক গুলিবর্ষণের সংবাদ এই মহকুমায় মাত্র প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মহকুমার সর্বত্র স্কুল ও হাট বাজার বন্ধ রাখা হয়। প্রায় ৭/৮ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ও জন সাধারণ শোকযাত্রার সহিত বিক্ষোভ করিতে করিতে বিভিন্ন দিক হইতে আসিয়া রাজবাড়ি আজাদী ময়দানে সমবেত হয়। বেলা বার ঘটিকার সময় উক্ত আজাদী ময়দান হইতে শোভাযাত্রা সহকারে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, পুলিশী জুলুম চলবে না, বন্দি ছাত্র ও জনগণের মুক্তি চাই, অপরাধী কর্মচারীদের কঠোর শাস্তি চাই ইত্যাদি ধবনি করিয়া বিক্ষোভ করিতে করিতে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে এবং বেলা তিন ঘটিকায় রাজবাড়ি ডানলপ হলে আবুল কালাম  মোহাম্মদ আসজাদ - এর সভাপতিত্বে এক সভা হয়। সভায় নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলি গৃহীত হয়-----

১। এই সভা ঢাকায় নিরীহ ছাত্র ও জনগণের প্রতি পুলিশের বর্বরোচিত গুলি চালনা ও জঘন্যতম জুলুমবাজীর তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছে।

২। এই সভা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি নিয়োগ করিয়া উক্ত জঘন্যতম কাজের জন্য দায়ী ও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির বিধানে দাবি জানাইতেছে।

৩। এই সভা অচিরে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে গ্রহণ করিবার জন্য দাবি জানাইতেছে।


৪। এই সভা ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্র এবং জনসাধারণকে অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দিবার জন্য দাবি জানাইতেছে।

৫। এই সভা নুরুল আমিন মন্ত্রীসভার পদত্যাগ দাবি করিতেছে। এভাবেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভাষার দাবিতে রাজবাড়ির জনগণ একাত্মাতা ঘোষণা করে এবং ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

যুক্তফ্রন্ট (১৯৫৪) ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ

মাওলানা ভাসানী, সহরোওয়ার্দী এবং তুরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহামানসহ নিবেদিত কর্মীর দ্বারা আওয়ামী লীগ খুব জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। প্রতি জেলা ও মহকুমায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এদিকে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে কৃষক শ্রমিক পার্টি। জনপ্রিয় এ নেতার কারণে কৃষক শ্রমিক পার্টিও শক্তিশালী রুপ ধারণ করে। এ ছাড়া মুসলিম লীগের বিপরিতে নেজামে ইসলাম, গণতন্ত্রী, খেলাফতে রব্বানী কাজ করে আসছিল।

এ সকল দল মিলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিপরীতে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে এবং ইতিহাস খ্যাত ২১ দফা রচনা করে। এই ২১ দফার মধ্যে অন্যতম দফা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে চিরস্থায়ী করার জন্য শহীদ মিনার নির্মাণ, প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান বর্ধমান হাউসকে বাংলাভাষার সেবাকেন্দ্র ইত্যাদি। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৩টি, কৃষক শ্রমিক ৪৮টি, নেজামে ইসলাম ২২টি গণতন্ত্রী ১৩টি, খেলাফত রব্বানী ২টি। মুসলিম লীগের এতবড় ভরাডুবি তারা কখনো আন্দাজ করতে পারেনি। এরপর ১০ জন মন্ত্রী নিয়ে হক মন্ত্রীসভা গঠিত হয়।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী। রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফজলুল হক ও ভাসানী তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে হক সাহেবের নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মূলত ‘হক-ভাসানী’ স্লোগানে পরিণত হয়। ‘হক-ভাসানী জিন্দাবাদ’  স্লোগানে তখন এ অঞ্চলের কৃষক শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হন। বিপরীতে মুসলিমলীগ থেকে আহম্মদ আলী মৃধা নির্বাচন করে পরাজিত হন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিমলীগের ভরাডুবি তারা মেনে নিতে পারেননি। বলা যায় তারা ওঁত পেতে ছিল। ইতিমধ্যে আদমজীতে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়। দাঙ্গায় শত শত মানুষ মারা যায়। এর দায়ভার হক সাহেবের উপর চাপানো হয়। ১৬ জুন ১৯৫৪ হ হক সাহেবকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্র থেকে শক্তিশালী গভর্নর হিসেবে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পাঠানো হয়। তিনি হুমকি দেন ফজলুল হক দেশদ্রোহী, ভাসানীকে গুলি করে হত্যা করব। ১৯৫৪’র  অক্টোবর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ  কর্তৃক গণপরিষদ বাতিল করা হয়। মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমান (মন্ত্রী) সহ প্রায় দুই হাজার নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। হক সাহেব নজরবন্দি হন। ভাসানী তখন বিদেশে। গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক গণপরিষদ বাতিলের প্রতিবাদে তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ি) কর্তৃক সিন্ধু হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। সিন্ধু হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করে। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সুপ্রীম কোর্টে আপীল দায়ের করে। সু্প্রীম কোর্টের নির্দেশে ১৯৫৫ এর জুন মাসে নতুন গণপরিষদ গঠিত হয়। 


ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে না গণতন্ত্র না স্বৈরতন্ত্রের রাজনীতির ধারায় শাসনকার্য চলতে থাকে। এরমধ্যে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচিত হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত এ শাসনতন্ত্রের ইস্কন্দার মির্জা প্রেসিডেন্ট থাকেন। অতপর ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবরে এক আচমকা ঝড়ে সব তছনছ হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নলালিত জনগণের শাসননামীয় গণতন্ত্রের প্রথম মৃত্যু ঘটে। জারী হয় ফিল্ড মার্শাল আইউব খান কর্তৃক সামরিক শাসন। শাসনতন্ত্র রহিত হল। মার্শাল আইউব খান মার্শাল ‘ল জারী করেন। আইন প্রণয়নের সর্বময় ক্ষমতা তার ইচ্ছাধীন হল। জনগণের ইচ্ছার আইন ভেঙ্গে গেল। বলা হল জনগণ ভোট দিতে জানেনা। বিশেষ করে বাঙালি নাকি ডাণ্ডায় ঠাণ্ডা। মার্শাল ‘ল জারীর পর পরই গ্রেপ্তার হন মাওলানা ভাসানী, হামিদুল হক চৌধুরী, শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মনসুর আহমেদসহ এগারজন নেতা। নিমিষে আইউব খানের নাম গ্রামে গঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে গেল।

আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। গ্রামের স্কুলে পড়ি। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। পত্রিকা পাঠ চলত না। সমগ্র ইউনিয়নে কয়েকটি রেডিও ছিল। সব সংবাদ প্রচার হত মুখে মুখে। সত্য মিথ্যা যাই হোক মুখে মুখে সংবাদ প্রবাহের শক্তি কিন্তু কম নয়। শিক্ষক, ছাত্র, সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আইউব খানের নাম শোনা যেতে লাগল। খেটে খাওয়া মানুষের মুখে শুনতে পেতাম ‘আইউব আলী জিন্দাবাদ।’ তারা হঠাৎ করেই হক-ভাসানীর নাম ভুলে গেল।

ঐ বয়েসেই বুঝে ফেললাম আইউব খান দেশের রাজা, আর বোধ হয় ঐ বয়েসে বুঝেছিলাম, রাজা হতে হলে মিলিটারী হতে হয়। কিন্তু এখন বুঝি মিলিটারী হলেও রাজা হওয়া যায় বটে তবে সে রাজার নাম স্বৈর রাজা, আসল রাজা নয়। জনগণের নিয়মতান্ত্রিক রাজা নয়। আইউব খান নিয়মতান্ত্রিক রাজা না হওয়া সত্ত্বেও মার্শাল ‘ল জারী হওয়ার প্রায় চার বছরের মধ্যে পূর্ব বা পশ্চিমপাকিস্তানে আইউব বিরোধী কোন আন্দোলন হয়নি।’ ১৯৬২ সালে করাচিতে শহীদ সহরওয়ার্দী নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হলে ঢাকার ছাত্র, জনসাধারণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল সমাবেশ হয়। বলা যায় আন্দোলনের যে ঢেউ সাগরবক্ষে উত্থিত হল সে ঢেউই ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনের ঢেউয়ের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কারণ ৬২ এর আন্দোলন, হামিদুর রহমান  শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬ দফার আন্দোলন, ১১ দফার আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনের ঢেউ গণআন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছিল।

১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কলেজটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন গভর্নর আযম খান। উদার মনোভাবের এই উর্দুভাষী শাসনকর্তা অল্প সময়েই দেশের মানুষের মন জয় করে নেন। রাজবাড়িতে যখন আসেন তখন এখানকার এক যুবক চিত্তগ্রাহী একটি ফুলমাল্য অর্পণ করায় আযম খান খুশি হয়ে তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেকদিন যাবৎ তাকে আযম খানের ছেলে বলা হত। আযম কান কর্তৃক তাকে লেখা পত্র আমি দেখেছি। সূচনা থেকেই রাজবাড়ি কলেজ রাজবাড়ি জেলায় রাজনীতি চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের আউব বিরোধী ছাত্র-সংগ্রামে কলেজের ছাত্রবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ সময়ই চিত্তরঞ্জন গুহ, আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন, নজিবুর রহমান, ফরিদ আহমেদ প্রমুখ ছাত্রনেতা শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেন ডা. ইয়াহিয়া, কাজী হেদায়েত হোসেন, অমলকৃষ্ণ, ডা. জলিলুর রহমান, বাদশা ভাই, মুন্নু মিয়া, মরগুব আহমেদ প্রমুখ।


আইউব বিরোধী সকল কর্মসূচী কলেজের ছাত্রবৃন্দ বিশেষভাবে পালন করত। মকসুদ আহম্মেদ রাজা, নাজিবুর রহমান, কাজী ইকবাল ফারুক, আনোয়ার হোসেন, ফকীর আব্দুল জব্বার, জিল্লুল হাকিম, আবদুল মতিন, গণেশ নারায়ণ চৌধুরী, মোকসেদ আলী, ফকীর আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ইতিমধ্যে আইউব খান বুনিয়াদী গণতন্ত্রের (Basic Democracy) এক নতুন ধারণার সূচনা করেন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে অনেক নেতা বুনিয়াদী গণতন্ত্রী হয়ে ওঠেন। এ সময় আইউব সমর্থনকারী ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফ্রন্ট (NSF) রাজবাড়ি কলেজে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। রঞ্জু ভাই, বাহারুল ইসলাম, সুব্রত সরকার প্রমুখ ভূমিকা রাখেন। সুব্রত সরকার বর্তমানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য।

১৯৫৬ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাপ করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। ন্যাপের কার্যক্রম সারাদেশে স্বপ্লসময়ে সম্প্রসারিত হয়। রাজবাড়িতে ন্যাপের নেতৃত্ব দেন অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম মৃধা। তিনি ফরিদপুর জেলার সভাপতি থাকেন। পরবর্তীতে ন্যাপ ভেঙ্গে মোজাফ্ফর ন্যাপ গঠিত হলে সভাপতি থাকেন এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার)। উল্লেখ্য ১৯৬২ সালে ২৬ এপ্রিল পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের জন্ম হয়। পূর্ব-পাকিস্তানে এর নামকরণ করা হয় পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মোহাম্মদ সুলতান। সংগঠনটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবে কখনো কমিউনিস্ট আবার কখনো ন্যাপের ছত্রছায়ায় কাজ করে। রাজবাড়িতে ন্যাপ গঠনের পর ১৯৬৫ সালে আমিনুর রহমান (পানু), শিবেন্দ্রনাথ কুণ্ডু আবুল ফালাহ প্রমুখ ছাত্রদের দ্বারা ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হয়। এদিকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ধারায় রাজবাড়ি শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিল। ১৯৬৩ সালে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে আদর্শিক কারণে মহাবির্তক শুরু হয়। ফলাফলে বাংলাদেশে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী এ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। মার্কসীয় তত্ত্বে মস্কোপন্থীকে সংশোধনবাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়।

যুদ্ধ ও শান্তির প্রশ্নে, বিপ্লবের প্রশ্নে, জাতীয় আন্দোলনের প্রশ্নে, সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, আব্দুল হক চীনের মতামতকেই সমর্থন করেন। অন্যদিকে মণি সিং মস্কোর মতবাদকে সমর্থন করেন। কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন ছাত্র ইউনিয়নও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের ১-৩ এপ্রিলে ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন (রাশেদ খান মেনন) গ্রুপ ও মতিয়া (মতিয়া চৌধুরী) গ্রুপে বিভক্ত হয়। রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের নেতৃত্বে থাকেন আমিনুর রহমান (পানু), আবদুর রহমান, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আবুল হাসেম, আবদুল আজিজ (পিন্টু মোল্লা) প্রমুখ। মতিয়া গ্রুপের নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাত্তার, শিবেন্দ্রনাথ কুণ্ডু প্রমুখ। পার্টি নেতৃত্বে মেনন গ্রুপে থাকেন ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা সমর সিং। মতিয়া গ্রুপের নেতৃত্বে থাকেন আশু ভরদ্বাজ, কমরেড মখলেসুর রহমান। ১৯৬৯ এর ৪ জানুয়ারি পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ, পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি চীনপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত), পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ মস্কোপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত) এবং পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগ (আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই কর্মসূচিতেই ছাত্র-জনতা এক হয়ে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ আন্দোলন শুরু হয় এবং অতিসত্তর বিশেষ করে আসাদুজ্জামান (আসাদ) শহীদ হওয়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ জেলা পর্যায়ের সকল কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। সে ছিল এক দুর্বার আন্দোলন। পুলিশের শত বাধা ছাত্রদের হার মানাতে পারে নাই।


আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রাজনীতির সাথে তেমনভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। কিন্তু ছাত্রদের বাঁধভাঙ্গা মিছিল যখন এসএম হলের পাশ দিয়ে যেত, গগণবিদারী স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হত তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না। মিছিলে শামিল হতাম। আন্দোলনে প্রথম শহীদ হন আসাদ (২০ জানুয়ারি)। সে দিনটি স্মৃতিতে অম্লান। সকাল ১০টার দিকে এসএম হলের পাশ দিয়ে যাওয়া মিছিলে শরীক হলাম। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ পার হতেই পুলিশের বাধা। ছাত্ররা পিকেটিং শুরু করে। আমি মেডিকেল কলেজের দোতলায় উঠে আসি। এক পুলিশকে দেখলাম রক্তাক্ত অবস্থায় ছাত্ররা নিয়ে আসছে। এরপর হলে ফিরে আসলাম। আনুমানিক বেলা ১২টার দিকে হল থেকেই গুলির শব্দ শুনলাম। ১০/১৫ মিনিট পরে খবর এল আসাদ গুলিতে শহীদ হয়েছেন। প্রায় আধাঘন্টা পর জানতে পারলাম আসাদের লাশ নিয়ে ছাত্ররা এস এম হলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে লাশের মিছিলে শরীক হলাম। মিছিল বলাকা সিনেমা হল হয়ে এ্যালিফ্যান্ট রোড ঘুরে শহীদ মিনারে এল। আমি এমনি উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে মিছিলে শরীক হয়েছিলাম যে, শহীদ মিনারে এসে দেখলাম নগ্ন পা এবং পরনে লুঙ্গী ছাড়া শরীরে আর কোনো কাপড় নেই। এ স্মৃতি ভুলবার নয়। এখনো ৬৯ এর গণ-আন্দোলনের স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মতো ভেষে ওঠে। রাজবাড়িতেও ১১ দফার ভিত্তিতে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। রাজবাড়ি কলেজে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছাত্র-ইউনিয়ন (মতিয়া)  সম্মিলিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের ফকীর আব্দুল জব্বার, গণেশ নারায়ণ, এমজি মোস্তফা, জিল্লুল হাকিম, আবদুল মতিন, কাজী মতিন, রেজাউল হক, শহীদুন্নবী আলম, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আব্দুস সাত্তার, সৈয়দ আশরাফ আলী (হাসু) প্রমুখ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে ১১ দফার ভিত্তিতে রাজবাড়িতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলন শহর থেকে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে যায়। আপামর জনসাধারণ এ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। সংঘবদ্ধ এ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের ভিত রচনা করেছিল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব-পাকিস্তানে শতকরা আটানব্বই ভাগ ভোট পেয়ে আইন পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ রাজবাড়ি থেকে এম এন এ নির্বাচিত হন এবিএম নুরুল ইসলাম। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচিত হন কাজী হেদায়েত হোসেন ও মোসলেম উদ্দিন মৃধা। লেখক এ নির্বাচনে কালুখালি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। মানুষ স্বতঃ স্ফুর্তভাবে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করে। এরপর ইয়াহিয়া ভুট্রোর যোগসাজশে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন থেকে বঞ্চিত করে। নানা ঘটনায় শুরু হয় ‍মুক্তিযুদ্ধ। (মুক্তিযুদ্ধ পর্বটি যথাস্থানে আলোচিত)। আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক সনদ ৬ দফা পেশ করেন। পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাধীকারসহ সকল স্তরের মানুষের শোষণ ও বঞ্চানার অবসান ছিল এই ছয় দফার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ছয় দফার ভিত্তিতে সারাদেশে আন্দোলন শুরু হলে শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজবাড়িতে ছয় দফার ভিত্তিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা কাজী হেদায়েত হোসেন, অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী, ডা. জলিলুর রহমান, ডা. এস এ মালেক, একেএম নুরুজ্জামান (মুন্নু মিয়া), মরগুব আহমেদ, আব্দুল ওয়াহাব বিশ্বাস, বাদশা চৌধুরী, রোকন চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন মৃধা, ডা. জয়নাল আবেদীন প্রমুখ। ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন চিত্তরঞ্জন গুহ, আমজাদ হোসেন, আবদুল লতিফ বিশ্বাস, নাজিবর রহমান, মকসুদ আহমেদ রাজা, ফরিদ আহমেদ, কাজী ইকবাল ফারুক, ফকীর আব্দুল জব্বার, আকবর আলী মর্জি, জিল্লুল হাকিম, গণেশ নারায়ণ চৌধুরী (সন্ত), আমিনুর রহমান আবি, এমজি মোস্তফা প্রমুখ। ছয় দফার আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনই ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে রুপ নেয়।


স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধের অবসানে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রেখে ১৯৭২ সালে শাসনতন্ত্র রচিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে ৭ মার্চ প্রথম পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের সাফল্যের লক্ষ্যে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০০টি সিটের মধ্যে ২৯২টি আওয়ামী লীগ ৭টি অন্যপক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়। বিরোধী পক্ষের সাতটির মধ্যে জাসদ ৩টি, জাতীয় লীগ ১টি ও নির্দলীয় ৩জন নির্বাচিত হন। রাজবাড়ি থেকে নির্বাচিত হন কাজী হেদায়েত হোসেন ও মোসলেম উদ্দিন মৃধা। বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ন্যাপের দুই অংশ এবং কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী থাকলেও নির্বাচনে ভালো ফলাফল করেনি। নৌকার জোয়ার পূর্বের মতো থাকে। এরমধ্যে ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ভিয়েতনাম দিবস উপলক্ষে ছাত্রদের মিছিলের ওপর গুলি চালায়। মতিউল ইসলাম (রাজবাড়ি) ও আরেকজন নিহত ও অনেকে আহত হয়। মোজাফ্ফর ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নই সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল (রাজনীতির পঞ্চাশ বছর পৃষ্ঠা-৬২৫)। নিহত মতিউল ইসলাম রাজবাড়ির মোসলেম উদ্দিন মৃধার ছেলে। মতিউল ইসলামের মৃত্যুর প্রতিবাদে কমরেড কমল গুহ’র নেতৃত্বে আজাদী ময়দানের সভায় বিপুল সমাবেশ ঘটে। কমরেড আশু ভরদ্বাজের সভাপতিত্বে এ সময় কমল গুহ তীব্রভাষায় নিন্দা জানায়

এ সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল রাজবাড়িতে প্রবল বিরোধী ভূমিকা পালন করে। অ্যাডভোকেট চিত্তরঞ্জন গুহ ও আবদুল মতিন (পাংশা) জাসদের নেতৃত্ব দেন। বিশেষ করে পাংশা জাসদের ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল। সে সময় আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে পাংশায় জাসদ এত শক্তিশালী ছিল যে, তাদের নিয়ন্ত্রন করতে সরকারকে হিমসিম খেতে হয়। এ সময় অনেক জাসদকর্মী নিহত হন এবং অনেকে আত্মগোপন করেন। জাসদ নেতা আব্দুল মতিন আত্মগোপন থেকে দলকে পরিচালিত করেন। চিত্তরঞ্জন গুহ গ্রেপ্তার ও কারারুদ্ধ হন। রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র সংগঠনগেুলোর মধ্যে জাসদ খুব শক্তিশালী ছিল এবং আশির দশকের শেষ পর্যন্ত জাসদ কতৃত্ব বজায় রাখে। এমজি মোস্তফা, কাজী মতিন, আহমেদ নিজাম মন্টু, সোহান আহম্মেদ, আবদুল হামিদ, মনির হোসেন, লুৎফর রহমান (লাবু) প্রমুখ নেতৃত্ব দেন।

বিরোধীদল হিসেবে ন্যাপ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ন্যাপের নেতৃত্ব দেন আব্দুল মোমেন (বাচ্চু মাস্টার), আব্দুস সাত্তার, ওয়াজিউল্লাহ মন্টু প্রমুখ। ১৯৭৩ সালে মোজাফ্ফর হোসেনে এবং ১৯৭৪ সালে মওলানা ভাসানী রাজবাড়িতে সভা করেন। উক্ত সভায় তিনি সরকারকে তীক্ত ভাষায় সমালোচনা করেন।

স্বাধীনতার পর পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশ স্বাধীন হলেও তারা পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি নামেই রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। পার্টির মেনিফেস্টোর দেয়াল লিখন ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজবাড়ি বিশেষ করে ধুঞ্চি, কলেজপাড়া, ড্রাইস, বিনোদপুর, সেগুনবাগিচা, সজ্জনকান্দা এবং মফস্বলে ভবদিয়া, দ্বাদশী, মিজানপুর, মাটিপাড়া পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম বিস্তার লাভ করে। নেতৃত্বে থাকেন ছমির উদ্দিন, মওলা বক্স, রকিবুল হাসান মেহেদি, মকুবল হোসেন বাবু, আকতার হোসেন, সাকের আলী, আরমান আইনউদ্দিন, কেরামত, কাশেম প্রমুখ। আন্ডার গ্রাউন্ডে থেকে নেতৃত্ব দেন আল্লা নেওয়াজ খায়রু, দুলাল মোল্লা, ঝন্টু মোল্লা প্রমুখ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ট্রাজেডির পর রাজনীতির ধারা পাল্টে যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর অনুপ্রেরণায় উপ-রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার কর্তৃক জাতীয়তাবাদী - গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠন করেন। ১৯৭৮ এ মে জাগদল, ভাসানী ন্যাপ, ইউপিপি মুসলিমলীগ, তফশীলী ফেডারেশনের সমন্বয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠন করেন।


রাজবাড়িতে এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার) সভাপতি এবং পাংশায় নাসিরুল হক সাবু সম্পাদক এবং এটিএম আব্দুর রাজ্জাককে সাংগঠনিক সম্পাদক করে জাগদল গঠিত হয়। এরপর জাগদল ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের নেতৃত্বে আসেন আক্কাস আলী মিয়া ছাত্র নেতৃত্বে থাকেন অ্যাডভোকেট এমএ খালেক, আজিজুল হক (টোকন) কামরুজ্জামান প্রমুখ। ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হলে রাজবাড়িতে নেতৃত্বে থাকেন অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা, এটিএম আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক, নঈম আনসারী, আতাউর রহমান আতা, আবুল হোসেন মাসুদ, বকুল, সামাদ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম মৃধা প্রমুখ। ১৯৭৯ এর ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা (এম) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আশির দশকের শেষ ভাগ থেকে বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। বিগত দুই দশক যাবৎ ছাত্রদল অনেকাংশে কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। গাজী আহসান হাবিব, স্বপন, সিরাজুল আলম চৌধুরী, খায়রুল আনাম বকুল, মিজানুর রহমান, জায়েদ আল কাওসার, নাসির উদ্দিন নাসির, মোঃ মহিউদ্দিন, আব্দুর রাজ্জাক সরদার প্রমুখ নেতৃত্ব দান করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং দীর্ঘ নয় বছর শাসনকাজ পরিচালনা করেন। তিনি জাতীয় পার্টি গঠন করেন। রাজবাড়িতে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে থাকেন অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম মৃধা। ১৯৮৮ নির্বাচনে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হন আব্দুল লতিফ মুন্সি ও আব্দুল মতিন। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯১ এর সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ি-১ থেকে অ্যাডভোকেট  আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরী এবং রাজবাড়ি-২ থেকে ডা. একেএম আসজাদ  সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াজেদ চৌধুরীর মৃত্যুতে আসন শূন্য হলে কাজী কেরামত আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অ্যাডভোকেট আবদুল খালেক। ১৯৯৬ এর সংসদ নির্বাচনে কাজী কেরামত আলী এবং জিল্লুল হাকিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ এর সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ি-১ এ আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ি-২ এ নাসিরুল হক সাবু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে রাজবাড়ি-১ থেকে কাজী কেরামত আলী এবং রাজবাড়ি-২ থেকে জিল্লুল হাকিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

 কমিউনিস্ট রাজনীতি

শোষনহীন, সাম্যবাদী সমাজ গঠনে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি মহামতি কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস প্রচারিত কম্যিউনিজম তত্ত্ব থেকে কমিউনিস্ট শব্দের উদ্ভব। সভ্যতার ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সুংসংবদ্ধ সমাজ গঠনের ইতিহাস সুপ্রাচীন নয়। কয়েক হাজার বছর ধরে মানবজাতি যে সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্র শক্তির অধীনে সম্পদ, সম্পাত্তির অধিকারভোগে অভ্যস্থ-----তা সুখকর নয়। প্রকৃতির আলো বাতাসের সমঅধিকারের মতো মানুষ ভূমি, আয়, উৎপাদনের সমভাগী নয়। অথচ এর উপরও সকল মানুষের ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার আছে। প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সম্পদ কেবল স্বল্প সংখ্যক মানুষের কজ্বায়। সঞ্চিত সম্পদ আহরণে মৌলিক ভূমিকা পালনকারী বেশির ভাগ মানুষ অবহেলিত, বঞ্চিত, লাঞ্চিত, শোষিত, ক্ষেত্রবিশেষে ঘৃন্য। রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তনে সমাজবদ্ধ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক ন্যায্য হিস্যা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় তারই যুক্তিমাফিক তত্ত্ব পরিকাঠামো দাঁড় করান হয় স্যোসালিজম ও কমিউনিজম তত্ত্বে। অবশ্য মার্কসের পূর্বে লুইব্লা, সেন্ট সাইমন, চার্লস ফুরিয়র, রর্বাট ওয়েন, থোমাস মূর এমন কি বার্নাড ‘শ এমন সমাজ ভাবনার কথা বলেছেন।


তবে সে সব ভাবনা হিসেবী বা যুক্তিভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। কেবল মার্কস সমাজ বিবর্তন, মানবিক অধিকার ও উৎপাদনের মৌলিক তত্ত্ব বিশ্লেষণে, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রকৃত রুপরেখা নির্ণয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল উপস্থাপন করেন। এ মডেলটির বিশেষত্ব হল প্রচলিত ব্যক্তিমালিকানায় ভোগ দখলের পরিবর্তে চাই সামাজিক দখল, প্রচলিত শাসন উৎপাদন বন্টনের বিপরীতে চাই নবচেতনায় কৌশলী রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র গঠন সহজ নয়। কারণ যারা প্রচলিত রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী তারা সস্পদ লিপ্সা, ভোগ, দখল, বিসর্জন দিবে তা ভাবা অবান্তর। তাই শত্রুশক্তিকে পরাজিত করে নব রাষ্ট্রের পত্তনে চাই বঞ্চিত মানুষের সংঘবদ্ধ শক্তি ও বিপ্লব। এ কারণে প্রয়োজন দল ও পার্টি।

১৯১৮ সালে মার্কস এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পার্টির এশতেহার প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে মার্কস এঙ্গেলসের মতবাদ ‘মার্কসবাদ’ নামেই সুপরিচিত। এঙ্গেলেসের মৃত্যুর পর রাশিয়ায় লেনিন ও স্ট্যালিন ও স্ট্যালিন মার্কসের মতবাদকে গ্রহণ করে জনগণের সার্বিক মুক্তির জন্য কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। অনেক বছর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি লক্ষ কোটি শ্রমজীবী মানুষ সশস্ত্র সংগ্রাম তথা বিপ্লবের মাধ্যম রাশিয়ায় জারতন্ত্রকে উৎখাত করে ১৯১৯ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। ইতিহাসে এটাই প্রথম শ্রমিক বা প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র।

রাশিয়ার শ্রমিক রাষ্ট্রের সফলতায় বিশ্বের নানা দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। ১৯২১ সালে চীনে, ১৯১৮ সালে অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, গ্রীস, পোল্যন্ড, হাঙ্গেরী; ১৯১৯ সালে যুগোস্লোভাকিয়া, নেদারল্যান্ড, মেক্সিকো, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়। বৃটেন, ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি জন্মলাভ করে। এশিয়ায় ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর সোভিয়েট ইউনিয়নের তাসখন্দে অর্থাৎ প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। তাতে ছিলেন সস্ত্রিক এম এন রায়, সস্ত্রিক অনিল মুখার্জী, মুহম্মদ আলী, মুহম্মদ শরীফ সিদ্দিকী প্রমুখ। পার্টির নামকরণ হয় সিপিআই। অবিভক্ত বাংলায় ১৯২৮ সালে মাত্র ৪ জন পাটি সদস্য ছিলেন। তারা  হলেন মুজাফ্ফর আহমদ, আব্দুল রাজ্জাক, সামছুল হুদা ও আবদুল হালিম। ১৯৩০ সালে প্রথম জেলা কমিটি গঠিত হয় বঙ্গের  বর্ধমান জেলায়। এরপর ১৯৩৪ সালে হুগলি জেলায়। পূর্ববাংলায় সিলেট জেলা কমিটি গঠিত হয় ১৯৩৪ সালে, কুমিল্লা ১৯৩৭ সালে। যশোর ও খুলনা কমিটি গঠিত হয় ১৯৩৮ সালে।

চট্রগ্রাম ১৯৩৭ সালে। রংপুর সিপিআ এর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে জনযুদ্ধ, ১৯৪১ সালে কাউরে কৃষ্ণাঙ্গ সংগ্রাম, ১৯৪৬ সালে তেলেঙ্গানা, ১৯৪৬-১৯৪৮ তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয় কলিকাতাতে। নয়জনকে নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। তারা হলেন সাজ্জাদ জহির, খোকা রায়, নেপাল নাগ, জামালুদ্দিন বুখারী, আতা মুহম্মদ ইব্রাহীম, মনি সিং, কৃষ্ণবিনোদ রায় ও মনসুর হাবিবুল্লা।

১৯২০ সালে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের পর থেকেই ভারতবর্ষে বিশেষ করে বাংলায় এর ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়। অনুশীলন, স্বরাজ, স্বদেশী বিপ্লবীদের অনেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করে। রাজবাড়ি বিভিন্ন কারণে কমিউনিস্টদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। রেলসূত্রে কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সহজ যোগাযোগ, গোয়ালন্দ উভয় বাংলার দ্বারপথ, রেল শ্রমিক ও গোয়ালন্দ ঘাট কুলীদের দাবি দাওয়া আদায়ে গণসংগঠন, পার্টি গঠন ও আন্দোলনের ভিত তৈরি করে। কমিউনিস্ট আন্দোলনের শুরু থেকেই অত্র অঞ্চলে আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন বর্তমান রাজবাড়ি জেলার কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে সমর সিংহ, আশু ভরদ্বাজ, শ্যামেন ভট্রাচার্য, সত্য মিত্র, প্রফুল্ল কর্মকার, মনমোহন ভাদুড়ি,


শান্তি রঞ্জন সেন, অবনী লাহিড়ী, মোখলেসুর রহমান, আনসার আলী, আব্দুস সাত্তার, আল্লা নেওয়াজ খায়রু, দুলাল মোল্লা, কমলকৃষ্ণ গুহ, শিবেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, মতিউল ইসলাম, জ্যোতিশংকর ঝন্টু, আবুল কালাম ইতিহাসখ্যাত নাম। বাম ধারার এ নেতৃবন্দ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনসহ শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী ভূমিকা রেখে গেছেন। অসহযোগ আন্দোলন, রেলশ্রমিক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, গোয়ালন্দ মৎসহজীবী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে ছাত্র আন্দোলন, আজাদ হিন্দু ফোর্স গঠন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন,  আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণ-আন্দোলনসহ স্বাধীনতা পরবর্তীতে শ্রমিক শ্রেণির দাবি আদায়ে কমিউনিস্ট পার্টির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে (১৯৩৯) রাজবাড়ি জেলার কমিউনিস্টবৃন্দ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩৪ সালে বালিয়াকান্দির কোড়কদিতে স্টুডেন্ট ফেডারেশন গঠন করা হয়। নেতৃত্ব গ্রহণ করেন সত্য মিত্র ও আশু ভরদ্বাজ। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে ফরিদপুরে ছাত্রদের উদ্যোগে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। রাজবাড়িতে সমর সিংহ, শ্যামেন ভট্রাচার্য ও আরো অনেকে নেতৃত্ব দেন। বেঙ্গল প্রদেশিক স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে ছিলেন সমরসিংহ ও পৃপেন রায়।

স্বাধীনতার পূর্ব রাজবাড়িতে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী লেনিনবাদী) এম এল (পিকিংপন্থী) প্রতিপত্তি বিস্তার করে। ১৯৬৬ সালের জুন মাসে সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, নজরুল ইসলাম, আব্দুল হক, শরদিন্দু দস্তিদার, দেলওয়ার এই ছয়জনকে নিয়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে পিকিংপন্থীদের যাত্রা শুরু। মনি সিং এর নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থীদের নেতৃত্বে থাকেন আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ। এ সময় ইউনিয়ন পিকিংপন্থী ও মস্কোপন্থী দুই ভাগে বিভক্ত হয়। ছাত্র ইউনিয়নের পিকিংপন্থী নেতৃত্বে থাকেন রাশেদ খান মেনন এবং মস্কোপন্থীর নেতৃত্ব দেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী। রাজবাড়িতে পিকিংপন্থীর নেতৃত্বে দেন আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আব্দুর রহমান, আকতার হোসেন, দুলাল মোল্লা, ঝন্টু মোল্লা, পিন্টু মোল্লা, আবুল হাশেম, আবুল ফালাহ প্রমুখ। সার্বিক নেতৃত্ব দান করেন সমর সিংহ। মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন আব্দুস সাত্তার, শীবেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, কমল গুহ প্রমুখ। আব্দুস সাত্তার সাবেক ফরিদপুর জেলার সভাপতির দায়িত্বে থাকেন। সার্বিক নেতৃত্ব দান করেন কমরেড আশু ভরদ্বাজ।

১৯৭৮ সালে ২৬-২৮ জানুয়ারি পার্টির প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়। এই প্লেনামে পার্টিগুলির নাম বাতিল করে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি নাম গ্রহণ করা হয়। এ সময় পার্টি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসুচিকে সামনে রেখে সাম্রাজ্যবাদ মুক্ত নতুন সমাজ, অর্থনীতি, নতুন জীবন, নতুন প্রত্যয় ও নতুন মূল্যবোধের আহবান জানায়। ১৯৭৯ সালে মে দিবস উপলক্ষে পার্টির আহবান ছিল ‘সাম্রাজ্যবাদ ও সামান্তবাদ মুক্ত মুক্তিযুদ্ধ স্বার্থক হউক। জিয়া সরকারকে উৎখাত করো। উৎখাত করো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে। গড়ে তোল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার।’ (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট আন্দোলনের রুপরেখা, কমরেড আমজাদ হোসেন, পৃ-১০৪)। বিপ্লবী কমিউনিস্ট  পার্টি আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল এবং জিয়াকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলে আখ্যায়িত করে। এ সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকেন আবদুল হক। জনযুদ্ধ নামে এক প্রচারপত্র বিলি হত। রাজবাড়ি ও পাংশায় এর ব্যাপক প্রচার এবং পার্টির প্রসার ঘটে। ১৯৭৮ সালের মে মাসে তিনটি বাম রাজনৈতিক দল কয়েকটি প্রগতিশীল সংগঠন ও শ্রেণিসংগঠনের সমন্বয়ে গণফ্রন্ট গঠিত হয়। এতে শরীক হয় এম এল সিপিবি, পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), সাম্যবাদী দল (নগেন), চাষী সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় ছাত্রদল। গণফ্রন্ট ছিল প্রকাশ্য সংগঠন। আহবায়ক ছিলেন শরবিন্দু দস্তিদার।


কমিটিতে ছিলেন আব্দুল মতিন, টিপু বিশ্বাস, ওহিদুর রহমান, আল্লা নেওয়াজ খায়রু (রাজবাড়ি) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ-১ (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের রুপ রেখা, আমজাদ হোসেন, পৃষ্ঠা-১৯৫)।

১৯৭৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসে গণফ্রন্ট, ন্যাপ, জাগমুই, ইউপিপি, সাম্যবাদী দল (তোয়াহা) গণতান্ত্রীক ফ্রন্ট গঠন করে। পার্টি ১৯৮০ সালে তাত্ত্বিক মুখপত্র শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশ করে। মার্কসবাদী লেনিনবাদী পরিচিতিতে নিপীড়িত শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্তদের শ্রেণিসংগ্রামের বিপ্লবী হিসেবে দাঁড় করাতে সচেষ্ট হয়। রাজবাড়িতে গণফ্রন্টের নেতৃত্বে দেন আল্লা নেওয়াজ খায়রু, আনছার আলী, ছমির উদ্দিন প্রমুখ। এসময় থেকে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, মঞ্জুরুল আলম দুলাল, আতাউর রহমান আতা পার্টির নেতৃত্ব দান করেন। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই কমিউনিস্ট পার্টিগুলো কাজ করে এসেছে। তবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আদর্শ, রাজনীতি, অর্থনীতির পরিবর্তনে বিভিন্ন সময়ে পার্টির আদর্শ উদ্দেশ্য বিশ্ব প্রেক্ষাপটে কৌশল গ্রহনে নানাভাবে বিভক্ত হয়েছে। এ উদ্দেশ্য নিয়েই রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিন বাদী) নাম পরিবর্তন করে ওয়ার্কাস পার্টি রাকা হয়। পরবর্তীতে পার্টি মেনন-রনো নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের প্রচেষ্টা নেয়। অতপর ১৯৯২ সালের মে মাসে উভয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টির নাম পরিগ্রহ করে। সূচনালগ্ন থেকেই রাজবাড়িতে ওয়ার্কাস পার্টি সংগঠিত হতে থাকে। ওয়ার্কাস পার্টির নেতৃত্ব দেন------ জ্যোতিশংকর ঝন্টু, আরমান আলী, রেজাউল হক রেজা, সুশান্ত কুমার প্রমুখ।

১৯৯০ সালে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, আমলা, মুৎসু্দ্দি পুঁজিবাদ ও সামান্তবাদ উচ্ছেদের লড়াইয়ে সকল দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তির একটি বিপ্লবী কর্মসূচিভিত্তিক ফ্রন্ট গড়ে তোলা হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, জারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল, পুঁজিবাদ ও সামান্তবাদ উচ্ছেদে জাতীয় ছাত্রদল, (জাতীয়বাদী ছাত্রদল নয়) জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, লেখকশিবির প্রগতিশীল বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলে। ছাত্র মৈত্রী রাজবাড়ি কলেজে শক্ত ভিত গড়ে তোলে। কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদ নির্বাচনে একক কর্তৃত্ব বজায় রাখে। নেতৃত্বে থাকেন ------ প্রভাত কুমার দাস, আলতাফ মাহমুদ পিয়াল, মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপন, সফিকুল ইসলাম, রকিবুল হাসান (মেহেদি), বিপ্লব প্রমুখ।

ওয়ার্কাস পাটির বিক্ষুদ্ধ একটি অংশ ১৯৯৪ স্বতন্ত্র ভূমিকা গ্রহণ করে পৃথক  হয়ে পড়ে। এই অংশের নেতৃত্ব দেন টিপু বিশ্বাস। ওয়ার্কাস পার্টির নেতৃত্ব সম্পর্কে বলেন----‘এরা কয়েক বছর ধরে কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলনে আছেন বলে শাসন এবং নিজেদের অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, কুকাজকে মার্কসবাদের সৃজনশীলতার নামে পাশ করিয়ে নেন----অতপর নিজেদের নেতা হিসেবে অমরত্ব দান করে বড়ই কৌতুক অনুভব করেন।’ (আমজাদ হোসেন, পষ্ঠা-২৬৯)। ১৯৯৫ সালে টিপু বিশ্বাস ওয়ার্কাস পার্টি থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় গণফ্রন্ট এর অস্তিত্ব ঘোষণা করেন। তারা কয়েকটি সংগঠনের সৃষ্টি করে, এ ফ্রন্ট গঠন করেন। এ সংগঠনগুলো টিপু বিশ্বাসের সভাপতিত্বে ‘জাতীয় কৃষক ক্ষেত মজুর সমিতি’ বলে আত্মাপ্রকাশ করে। উল্লেখ্য ডা. এস এ করিমের নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হয়। জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের রাজবাড়িতে নেতৃত্বে আছেন আনিসুর রহমান, (সহকারী অধ্যাপক কামরুল ইসলাম কলেজ, গোয়ালন্দ) রবিউল আলম, জাচ্চু মিত্র। বর্তমানে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি এর নেতৃত্বে আছেন কমরেড আবুল কালাম, সৌমেন দান ভরত প্রমুখ।


আলোকিত ব্যক্তিত্ব

তমিজ উদ্দিন খান

বৃটিশ শাসক ও শোষকের কবল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতবাসীর প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ অধ্যায়ের অন্যতম এক মনীষী তমিজ উদ্দিন খান। বিশ শতকের সূচনা থেকে বৃটিশ রাজত্বের অবসানকাল (১৯৪৭) পর্যন্ত আন্দোলন, সংগ্রাম নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পদচারণার লক্ষ্য করা যায়। এমন কি পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবকালে নবগঠিত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি রচনায় তাঁর অবদান স্বরণীয়। স্বদেশী, অসহযোগ, স্বরাজ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে তাঁর দীপ্ত পদচারণা দেখা যায়। আবার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় কখনো প্রাদেশিক কখনো কেন্দ্রীয় শাসনের মূখ্য ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণোজ্জ্বল। তাঁর কর্মমূখর জীবনকাল এমন এক সময়ে ব্যপ্ত যখন ভারতের মুসলমানগণ নিজেদের আত্মোপলদ্ধি ও আত্মপ্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল। বলা যায় স্যার সৈয়দ আহমদের পুনর্জাগরণের সফল বাস্তবায়ন  ঘটে তাঁর সৃষ্টকালের প্রান্তসীমায়। 

তমিজ উদ্দিন খান ১৮৮৯ সালের চৈত্র মাসে রাজবাড়ি জেলার রাজবাড়ি শহরের পূর্বপ্রান্ত ইতিহাস বিজড়িত খানখানাপুর গ্রামে তৎকালীন পশ্চাৎপদ এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জানা যায় তাঁর পূর্ব পুরুষেরা এসেছিল পশ্চিম থেকে। পিতামহ শরিয়তুল্লার জমি সাতবার পদ্মার ভাঙ্গনে নিপতিত হওয়ায় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পিতা আমির উদ্দিন খানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। দারিদ্রের সাথে কঠোর মোকাবেলা করে পরিবারটি টিকে থাকে। তমিজ উদ্দিন খানের মাতা কুলসুম বিবি ছয় মেয়ে ও দুই ছেলের জন্ম দেন। তাদের মধ্যে অনেকেই শৈশবে মারা যায়।

শত বছর পূর্বে দরিদ্র মুসলমান কৃষকের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার তেমন ঘটেনি। থানা কিংবা মহকুমায় একজনও উচ্চ শিক্ষিত লোক ছিল না। দরিদ্র কৃষকের পক্ষে শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হত না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও ছিল কম। তমিজ উদ্দিন খানের হাতেখড়ি স্বগৃহে। এরপর তিনি ঝপু খানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখা তেমন ভালো হয়নি। তিনি খানকানাপুর মিডল ইংলিশ (ME) স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলটি অল্পদিনের মধ্যেই হাই ইংলিশ স্কুলে পরিণত হয়। স্থানীয় জমিদার ও স্কুলের মালিক বিপিন বিহারী রায়ের স্ত্রীর নামে স্কুলটির নামকরণ হয় খানখানাপুর সুরাজ মোহিনী ইনস্টিটিউট। এ বিদ্যালয় থেকে ১৯০৬ সালে ইংরেজিতে লেটার মার্কস নিয়ে এনট্রান্স পাস করেন। এখানেই পিতা অভাব অনটনের কারণে শিক্ষার ইতি টানতে বলেন। কিন্তু ইচ্ছা এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকায় তিনি কোচবিহার কলেজে ভর্তি হন এবং আই এ পাস করেন। অতপর কলিকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইতিহাস, ও দর্শন ও ইংরেজিতে অনার্সসহ বিত্র পাস করেন। এরপর তিনি পেসিডেন্সী কলেজ থেকে ইংরেজিতে এম এ ও ল-কলেজ থেকে ল পাস করেন। তিনি সাবেক ফরিদপুর জেলার প্রথম মুসলিম অনার্স গ্রাজুয়েট। ছেলের লেখাপড়ার খরচ বহন করা পিতার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ায় পিতা ছেলের বিবাহের ব্যবস্থা করেন।


তমিজ উদ্দিন খান রাজবাড়ি শহরের নিকটবর্তী চরনায়নপুর গ্রামের বিত্তবান ও হোমিও চিকিৎসক বশির উদ্দিন সাহেবের মেয়ে রাহতুন নেসার (বিবাহের পর রাবেয়া) সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন আমোদপ্রিয়। মাছ ধরা, সাঁতার টামবাড়ি, লাঠিখেলা, ক্রিকেট, হাডুডু, ফুটবল, ঘুড়ি উড়ানো, যাত্রা, কবিগান সবই ছিল তাঁর প্রিয় সখ।

‘বয়কট’ ও ‘স্বদেশী’  আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে ‘বয়কট’ পরে তা ‘স্বদেশী’ আন্দোলনে রুপ নেয়। এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ফরিদপুরের ‘অম্বিকা চরণ মজুমদার’। সহসাই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথম তিনি পাঁচুরিয়া বিপিন পাল ও ডা. গফুরের বক্তৃতা মঞ্চে গৃহীত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলেন, মুসলমানদের পক্ষ থেকে আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করছি। `I support the resolution on be half of the Muslim community' (The test ot time my - life and days, by Tamijuddin khan, Page-29). এ সময় তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র। বৃটিশ কাপড় ও লবণ বর্জনে তিনি ছাত্র ও জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন। বন্দে মাতরম ধ্বনি সহকারে বিদেশী কাপড়ের দোকানের সানে দল বেঁধে স্লোগান দেওয়া তার নৈমত্তিক কর্ম হয়ে দাঁড়ায়।

শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি প্রথমে কলিকাতায় ও পরে ফরিদপুর জেলা স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন এরপর তিনি স্বাধীন ব্যবসা ও জনসেবায় আত্মনিয়োগের উদ্দেশ্যে ফরিদপুর বার এ যোগ দেন। আইনব্যবসায় যোগদান করার পর ফরিদপুর পৌরসভার কমিশনার এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। তিনি এ সময় ফরিদপুরে প্রজা সম্মেলনের ব্যবস্থা করেন। দীনেশচন্দ্র সেন সভাপতি এবংতমিজ উদ্দিন খান সেক্রেটারী ছিলেন। তিনি ফরিদপুর আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। তিনি ১৯১৫ সালে মুসলিম লীগের সদস্য পদের টিকেট ক্রয় করেন কিন্তু সক্রিয় হয়ে ওঠেননি।

পাক ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯১৯ সালে রাউলাট আইন ছিল রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপ দমন, গ্রেপ্তার ও দমন পীড়নের কালো আইন। এর প্রতিবাদে মি. জিন্নাহ লেজিজলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন এবং গান্ধী সত্যাগ্রহের আহবান জানিয়ে অসহযোগের মাধ্যমে রাউলাট আইনকে বয়কট করতে বললেন। এ নিয়ে বোম্বে গোলযোগ বাধে। দুইজন কংগ্রেসী কর্মী গ্রেফতার হন। জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে দুইজন ইউরোপীয় ব্যাংক কর্মচারীকে হত্যা করে। জেনারেল ডায়ারের উপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভার দেওয়া হয়। এরপর ঘটে জালিয়ান ওয়ালবাগের নৃশংসতম  হত্যাকাণ্ড।

এ নৃশংস হত্যায় ভারতবাসী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হল। তারা স্বরাজের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে একযোগে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় তমিজ উদ্দিন খান মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কংগ্রেসে যোগ দেন এবং রাজবাড়ি ফরিদপুরে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বে দান করেন। এ সময়েই তিনি কংগ্রেসের ফরিদপুর জেলা কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অসহযোগ ও খেলাফত যুগপৎ আন্দোলন বৃটিশ সিংহাসনের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিল। প্রাচীন হিন্দু ঋষিদের মতো মহাত্মা গান্ধীর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব বৃটিশ রাজকে বিব্রত করে তোলে। এ সময় সরকারের দমন নীতি কঠোতম করা হল। তমিজ ‍উদ্দিন খানকে গ্রেফতার করা হল। জেলে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। ১৪ মাস জেলে থাকার পর ১৯২১ সালে তিনি ‍মুক্তি পান ইতিমধ্যে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন থিতিয়ে পড়েছে। স্বরাজ দুরাশা । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টির প্রতিও অনুরক্ত ছিলেন তিনি। স্বরাজ দুরস্থ হলেও তিনি সক্রিয় ভূমিকায় থাকেন। কিন্তু এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলমানদের প্রতি হিন্দুরা মারদাঙ্গা হয়ে উঠল।


তাঁর পিতার মৃত্যু, বই ব্যবসার ক্ষতি, আর্থিক দুরবস্থা ইত্যাদি কারণে ১৯২৫ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। এ সময় তিনি ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। আঞ্জুমান-ই-ইসলামী সেক্রেটারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে সচল করেন। আইন ব্যাবসায় ফিরে যান। ১৯২৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফরিদপুর জেলা দুটি কনস্টিটিউশন। ফরিদপুর সদর ও গোয়ালন্দকে নিয়ে একটি। মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জকে নিয়ে অন্যটি। তখন স্বরাজ পার্টি ছাড়া নির্বাচন করার জন্য কোনো সুনিয়ন্ত্রিত দল ছিল না। বেশির ভাগ প্রার্থী ছিলেন স্বতন্ত্র। এ নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার পুত্র চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন লাল মিয়া। কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। একে ফজলুল হক লাল মিয়াকে সমর্থন দেন। বিরাট আয়োজনের এ নির্বাচনে তমিজউদ্দিন খানের পক্ষে সাধারণ গরিব প্রজা। বিপুল ভোটে তিনি জয়ী হন। লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে থাকাকালীন খান প্রজা পার্টির সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। ভোট কমিশন ও শিক্ষা পরামর্শ কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি স্যার আবদুর রহিম, খাজা নাজিমুদ্দিন এসব মন্ত্রীদের সাথে কাজ করেন। এ সময় তিনি পশ্চাৎপদ মুসলমানদের জন্য ভোটাধিকার ও শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখতে সমর্থ হন। তিনি দরিদ্র কৃষকের জমি হস্তান্তরের অধিকার নিয়ে লড়েছিলেন। ভূমি দখল আইন প্রণয়নে তাঁর অবদান ছিল। প্রজা পার্টির পক্ষ থেকে আইনসভায় জোরালোভাবে সংগ্রাম করেছিলেন। বর্গা চাষীরা এতে আশার আলো দেখতে পায়।

বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্থায়িত্বকাল ছিল স্বল্পকালীন। ১৯২৯ সালে ব্যবস্থাপক সভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়। ১৯৩০ এর নির্বাচনে তিনি গোপালগঞ্জ-মাদারীপুর থেকে কংগ্রেসের মনোনয়নে জয়ী হন। ফরিদপুর-গোয়ালন্দের সিট আলীমুজ্জামান চৌধুরী পক্ষে ছেড়ে দেন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেস প্রার্থী হুমায়ুন কবিরকে পরাজিত করে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭-১৯৪১ পর্যন্ত বঙ্গীয় সরকারের ফজলুল হক মন্ত্রীসভার কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম দপ্তরের মন্ত্রী এবং ১৯৪৩-১৯৪৫ পর্যন্ত খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৫-১৯৪৬ পর্যন্ত ভারতীয় আইন সভার সদস্য। ১৯৪৬ এ চতুর্থবার বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪০ সালে লাহোরে গুরুত্বপূর্ণ সভায় পাকিস্তান প্রস্তাব আনেন একে ফজলুল হক। এ সভায় তমিজ উদ্দিন খান বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ঢাক-ময়মনসিংহ থেকে কেন্দ্রীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হন। ফরিদপুরের নিজস্ব সীট লাল মিয়ার জন্য ছেড়ে দেন। স্যার হালিম গজনবী ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে জয়ী হন।

বাংলায় তমিজ উদ্দিন খান এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তিনি যে আসন থেকে নির্বাচন করতেন সেখান থেকেই বিজয়ী হতেন। তিনি দিল্লীর কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তখন কেন্দ্রে জওহর লাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী ও লিয়াকত আলী খান অর্থমন্ত্রী। তমিজ উদ্দিন খানকে ডেপুটি স্পীকার হওয়ার কথা ওঠে। তিনি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তখন ভারত স্বরাজ অর্জনের পথে। কংগ্রেস তখন ভারতের স্বপ্ন দেখছিল। এ সময় মুসলিমলীগ এ্যাকশন দিবস পালন করে। ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ কোলকাতায় এ দিবস পালন করা হয়। হিন্দুরা এর বিরোধিতা করায় দাঙ্গা বাধে। বহু মুসলমান নিহত হয়। এদিকে নোয়াখালিতে প্রচুর হিন্দু নিহত হয়। মহাত্মা গান্ধী ও সহরোওয়ার্দী নোয়াখালিতে অবস্থান করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনেন। এই দাঙ্গায় প্রমাণ হয় হিন্দু ও মুসলমানদের রাষ্ট্র ভিন্ন হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৭ এর ভারতের আইনে এ ধারণা লিপিবদ্ধ হয়। ১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। যুক্ত ভারতের সম্পদ ও ঋণের ভাগ-বাটোয়ারা করার উদ্দেশ্যে গঠিত পার্টিশন কাউন্সিলে তমিজউদ্দিন খান সদস্য ছিলেন।


পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গণপরিষদের সভাপতি ও তমিজ উদ্দিন খান সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে মি. জিন্নাহর সাথে তাঁর অবিরাম আলাপ চলতে থাকে। ১৯৪৮ এ জিন্নাহর মৃত্যু হলে নাজিমুদ্দিন গভর্নর জেনারেল হন এবং পূর্ববাংলায় নরুল আমিন প্রধানমন্ত্রী হন। তমিজ উদ্দিন খান পার্লামেন্টারী পার্টি কর্তৃক আইন সভার সভাপতি মনোনীত হন।

এসময় সারাদেশে পাঞ্জাবের প্রাধান্য বিরাজ করতে থাকে। শাসনতন্ত্রের মূলনীতিতে ইসলামের ভূমিকা, কেন্দ্রের অধিক ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্র ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন, তমিজ উদ্দিন খান শাসনতন্ত্র রচনায় বারংবার তাগিদ দিতে থাকেন। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রয়ারি ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে পুলিশ গুলি চালালে অনেকে শহীদ ও আহত হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তমিজ উদ্দিন খান প্রধানমন্ত্রীকে সত্তর সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ দিতে থাকেন। এরই মধ্যে অনেকে মুসলিমলীগ থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। শাসনতন্ত্র রচিত না হওয়ায় গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ হতে থাকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। মুসলীমলীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। কিন্তু ভারত শাসন আইনের ৮২ ক ধারা অনুযায়ী গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করেন। তমিজ উদ্দিন খানকে নতুন মন্ত্রী সভায় যোগদান করতে বলা হয়। তিনি কেবল মন্ত্রীত্ব প্রত্যাখানই করলেন না, ১৯৫৪ সালের গণপরিষদ ভেঙ্গে দেওয়ার সিদ্ধন্তকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় তিনি গণপরিষদের সভাপতি ইস্কন্দার মীর্জা, গণপরিষদের সেক্রেটারী এবি আহমেদ গুরমানী বাসায় চড়াও হয়ে মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে বলেন নচেৎ বিপদ হতে পারে বলে জানায়। তমিজউদ্দিন খান জানান তোমরা কর্তব্য কর আমার কর্তব্য আমার উপর ছেড়ে দাও। ৭ নভেম্বর ১৯৫৪ একটি স্বরণীয় ঘটনার দিন। ঐ দিন তমিজ উদ্দিন খান গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে সিন্ধু প্রধান আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। সব হুমকি উপেক্ষা করে তিনি আদালতে উপস্থিত হন। ‘বাথ আইল্যান্ড’ সরকারি বাসভবনের কড়া নজর রাখা হয়েছিল। তিনি গোপনে মোটর রিক্সা করে কোর্টে পৌছালেন। কেউ তাকে ধরে ফেলে ভেবে ৭ নভেম্বর কোট লাইব্রেরিতে কাটান।

ঐ মামলা সমগ্র দেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশবাসী শান্ত এ মানুষটির সাহস দেখে অভিভূত হয়। জায়নাজাজ হাতে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অনবরত  প্রার্থনার দৃশ্য ছিল লক্ষ্য করার মত। এই সব দরিদ্র মানুষ বুঝত না গণতন্ত্র কী? কিন্তু তারা হৃদয় দিয়ে তমিজ উদ্দিন খানের পক্ষ নিয়ে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সমর্থন দিয়েছেন। এ মামলায় তমিজ উদ্দিন খানের জয় হয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করায় ১৯৫৬ সালের সংবিধান রহিত হয়ে যায়। ১৯৬২’র মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ঘোষণা করা হয়। ১৯৬২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহ (কায়েদে আজমের ছোট বোন) পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপক সমর্থন পান। কিন্তু আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তমিজ উদ্দিন খানের অনিচ্ছা সত্ত্বেও পারিবারিক চাপে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে ফরিদপুর-ঢাকা আসন থেকে অংশগ্রহণ করেন এবং সহজেই জয়লাভ করেন। তিনি কেন্দ্রীয় আইন সভার ‘স্পীকার’ নিযুক্ত হন। আইয়ুব খান দেশের বাইরে গেলে দু’বার তাকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ১৯৬৩ সালের ১৯ আগস্ট রাজনীতির কিংবদন্তির এ নায়ক ইহলোক ত্যাগ করেন। বেতারে তাঁর মৃত্যু সংবাদ বারবার ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সব অফিস আদালত, স্কুল, কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক জানাজায় শরীক হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুতে সংবাদ পরিবেশিত হয়।


সকল স্তরের রাজনীতিবিদসহ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা শোকবার্তা পাঠান। ঢাকায় তাঁকে কবরস্থ করা হয়। ঘটনার ক্রমিকে জন্ম নেওয়া কালরেখা কেবল সম্মুখে ধাবমান। কোনো কোনো মানুষের ‘কর্ম ঘটনার কালের রেখা’ হ্রস্ব। আবার কোনো কোনো মানুষের কর্ম ঘটনার রেখা দীর্ঘ। বৃটিশ বিতাড়ন, গণমানুষের অধিকার আদায় এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর কর্ম ঘটনা রেখা তুলনামূলক অনেক দীর্ঘ। তাঁর এ কর্মসাধনা প্রেরণার উৎস হয়ে জনকল্যাণে আমাদের কর্ম-ঘটনার দীর্ঘ করবে।

আবু ইসমাইল সিরাজী

আবু ইসমাইল সিরাজী একজন চিকিৎসক ও অগ্নিযুগের রাজনীতিবিদ। তিনি পাংশা উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে ১৮৯৮ খ্রি. জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমএ পাস করে কলিকাতা কম্পারেবল মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৪ সালে তিনি নেতাজী সুভাস বসুর সংস্পর্শে আসেন এবং কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি আজাদ হিন্দু ফৌজের স্বশস্ত্র কমান্ডার হিসেবে তৎকালীন সময়ে অত্র এলাকায় আজাদ হিন্দু ফৌজকে সংগঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন ভাষাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইংরেজি, সংস্কৃতি, পালি, উর্দু, হিন্দি, ফারসি, ফ্রেন্স ভাষায় তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। রাজনীতি, সাহিত্য মানবসেবায় ছিলেন এক কিংবদন্তি পুরুষ। ১৯২২ সালে আর্য সাহিত্য সমাজের পক্ষ থেকে বিদ্যারত্ন ও ‘কাব্যনিধি’ উপাধি লাভ করেন। ১৯২৭ সালে গৌড়ীয় সর্ব বিদ্যায়তন হতে আদ্য পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন। মুসলিম জাগরণে তাঁর অবদান অসামান্য। ১৯৪৪ সালে তিনি মুসলিমলীগে যোগদান করে ১৯৪৭ এর পাকিস্তান আন্দোলনকালে বিশেষ সহায়তা দান করেন। তিনি মুসলিম লীগের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য নানা অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হন। কলিকাতার মেয়র নির্বাচনে হোসেন শহীদ সহরোওয়ার্দীর প্রতি একনিষ্ঠ সমর্থন ও তাঁর পক্ষে নিরলস কাজ করায় সোহরাওয়ার্দীর বিজয় সহজ হয়েছিল।

১৯৪৬ এর কলিকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার বিভৎসতায় তার কোমল হৃদয় বেদানাতুর হয়ে ওঠে। অসহায় মানুষের খাদ্য, আশ্রয় প্রদানের কর্মসূচী গ্রহণ করলে সোহরাওয়ার্দী তাঁকে রেডক্রসসহ নানাভাবে সাহায্য প্রদান করেন। সারা জীবন রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও পদের মোহ তাঁর ছিল না। রাজনীতির মাধ্যমে মানব সেবাই ছিল তাঁর ব্রত। শেষজীবনে আর্তমানবতার সেবায় ফিরে আসেন নিজ প্রবাসে। বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ নারী শিক্ষার প্রসারে হাতে নেন নানা উন্নয়নমূলক কাজ।

তাঁর পুত্র প্রকৌশলী আবু ইশরাত সিরাজী একজন সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী। তিনি জয়কৃষ্ণপুরে পিতার গড়া মাদ্রাসা আলীম পর্যায়ে উন্নীত করেন। পিতার স্বপ্ন লালনে এলাকায় অবহেলিত মানুষের জীবন মান উন্নয়নে নিজেকে ব্যাস্ত রাখেন। তিনি বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উপ-পরিচালক। তিনি মাদ্রাসার মেয়েদের নিয়মিত পোশাক, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করেন।


ইউসুফ হোসেন চৌধুরী

রাজবাড়ি জেলার তথা বাংলার অন্যতম রাজনীতিবিদ ছিলেন ইউসুফ হোসেন চৌধুরী। বিশ শতকের শুরু থেকে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলননের সংগ্রামসহ হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষণের রাজনীতি প্রবল হতে শুরু করে। এ লক্ষ্যে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে রাজনৈতিক সংগঠনকে মজবুত করে তুলতে সচেষ্ট হয়। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ইউসুফ হোসেন চৌধুরী প্রথমে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। কংগ্রেসে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত দেখে তিনি মুসলিমলীগে যোগদান করেন।

১৯৩৫ সালে প্রজ্ঞা ও কর্মদক্ষতায় মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা হিসেবে পরিগণিত হন। জমিদার ঘরে জন্মগ্রহণ করে প্রজাদের কাতারে শামিল হন। ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন আলিমুজ্জামান চৌধুরীর ভ্রাতা। সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপনে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর সুনাম সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।

১৮৯৮ সালে তিনি বেলগাছিতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফয়েজ বক্স চৌধুরী ছিলেন জমিদার। পরিবারেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়। পরবর্র্তী শিক্ষা কলিকাতায়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে বিএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ১৯২৫ সালে ‘ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। এ বছরেই তিনি ফরিদপুর বার সমিতিতে যোগদান করেন। জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, গোয়ালন্দ মহকুমা ইউনিয়ন বোর্ড সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ফরিদপুর জেলা বোর্ডের সদস্য এবং প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

১৯৩৫ সালে ভারতশাসন আইন অনুসারে (১৯৩৫ সালের শাসনতন্ত্র বলে পরিচিত) প্রাদেশিক আইন পরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। আইন পরিষদে মোট মেম্বার সংখ্যা ছিল ২৫০ জন। এরমধ্যে মুসলমান ১২২ জন, হিন্দু ৬৪ জন তফশীলী হিন্দু ৩৫ জন, ইউরোপীয়ান ২৫ জন ও এ্যাংলো ইন্ডিয়ান ৪ জন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ইউসুফ হোসেন চৌধুরী মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪২ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর মনোনীত হন। সমাজসেবার প্রতি একনিষ্ঠতায় বৃটিশ সরকার তাঁকে ১৯৪৩ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। দেশ বিভাগের সময় পর্যন্ত (১৯৪৭) তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক সরকারের আইনসভার সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং মুসলিম লীগের প্রথম চীফ হুইফ নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি শিক্ষা বিভাগের পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন। জাতীয় ইতিহাস কেবলমাত্র কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা একদলীয় মানুষের প্রচেষ্টার ফসল নয়। সর্বস্তরের সকল মানুষ, গোষ্ঠী ও দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথ বেয়ে ইতিহাসের গতিধারা চলতেই থাকে। এ ধারায় সকল মানুষের প্রচেষ্টার মধ্যেও কিছু মানুষ সাহস, সংযম, প্রজ্ঞা দিয়ে ইতিহাসের গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করেন। এমন মানুষ ছিলেন ইউসুফ হোসেনে চৌধুরী। রাজনৈতিক জীভনে এত সফলতার পরও পরিবারের আর্থিক সফলতা ছিল না।


জমিদারী উচ্ছেদ হওয়ায় এবং জনসেবায় নিয়োজিত রাখায় শেষজীবনে তাঁকে দারুণ সঙ্কটে পড়তে হয়। এক সময় টিবি রোগে আক্রান্ত হলে তাঁর সন্তান রশীদ চৌধুরী (বিখ্যাত শিল্পী) ছাত্র থাকাকালীন ঢাকায় চিকিৎসারত পিতার জন্য নিজের সাইকেল বিক্রি করে ওষধ ক্রয় করেন। এ মহান রাজনীতিবিদ ১৯৬৯ সালে পরলোকগমন করেন। তাঁর এক পুত্র রশীদ চৌধুরী ভূবন বিখ্যাত ট্রাপেস্ট্রী শিল্পী (মৃত) আর এক পুত্র নাসির হোসেন চৌধুরী রাজবাড়ি কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন (বর্তমানে আমেরিকাবাসী)। আর এক পুত্র নাজির হোসেন চৌধুরী (নীলু চৌধুরী) এমপি ছিলেন (বর্তমানে কানাডা বাসী) মেয়ে ডা. মাসুদা পিজি’র প্রখ্যাত সাইক্রটিস্ট (সম্প্রতি পরলোগমন করেন)। আর দুই পুত্র অবসরপ্রাপ্ত মেজর।

রওশন আলী চৌধুরী

তৎকালীন বৃটিশ ভারতে ইংরেজশাসন ও শোষনের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদি নাম রওশন আলী চৌধুরী। তিনি কেবল রাজনীতিতেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, তিনি ‘কোহিনুর’ পত্রিকার প্রকাশের মাধ্যমে ইংরেজ জাতির জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং মানুষকে সচেতন করে তোলেন। সে সময় কোহিনূর পত্রিকাকে কেন্দ্র করে সারা পূর্ববাংলায় স্বাধীকার সচেতনতার উন্মেষ ঘটে। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির স্বত্বাধিকারী, সম্পাদক ও কর্মাধ্যক্ষ। প্রায় দশ বছর পত্রিকাটি বিভিন্ন সময়ের ব্যবধানে প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৩০৫ সালে, বাংলা। এছাড়া তিনি কলিকাতা থেকে ইরানী ভাষায় প্রকাশিত ‘হাবলুল মতিন’ এবং ‘সোলতান’ নামক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন শুরু হলে তিনি পাংশায় ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’ গঠন করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। সারাজীবন তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে তিনি একজন সুপরিচিত নেত। এ সময়ে তিনি অত্র অঞ্চলে নেতৃত্ব দেন। খানখানাপুরের তমিজ উদ্দিন খান, মাজবাড়ির আহম্মদ আলী, পাংশার রওশন আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। ঘরে ঘরে চরকায় সুতা কাটা শুরু হয়। মানুষ বিলেতী পণ্য বর্জন করে। তিনি বাঙালি মুসলমানের ভাবজগতে সমাজ চেতনা ও প্রগতিশীল ধ্যান ধারনা সঞ্চারের প্রবক্তা হিসেবে ইতিহাস খ্যাত। তিনি ১৮৭৪ সালের পাংশার নারায়ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এনায়েতুল্লা চৌধুরী ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। ভাই সুসাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী। তিনি ১৯৩৩ সালে পাংশায় পরলোকগমন করেন।

খন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ

মাটির রস সিঞ্চনে যারা মানুষের প্রাণের সঞ্চারে নিবেদিত তারা এদেশের কৃষক, জেলে, তাঁতী, মজুর। অথচ এ শ্রেণি সমাজে অবহেলিত, উপেক্ষিত, পশ্চাৎপদ। পিছিয়ে পড়া এ বিরাট জনগোষ্ঠীর অগ্রগামীতায় যারা নিরলস কর্তব্য কাজে ব্যাস্ত থাকেন তারাই প্রকৃত অর্থে রাজনীতিক। খন্দকার নাজির হোসেন এমনি এক মানুষ। তিনি ‘কাঙ্গাল’, গুর্খা, কৃষক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন, নিরাপদ আশ্রয়ে তাদের অগ্রযানের পথকে প্রশস্ত করেছেন।


সে সময় ছিল না ছাপাখানার এত সুযোগ সুবিধা। নিজ প্রচেষ্টায় নিজ গ্রামে ছাপাখানা স্থাপন করে তিনি সাধারণ মানুষকে জীবন বিকাশের পথে সংগঠিত করেছেন, তাদের অভাব অনটনের কথা সকল মহলে তুলে ধরেছেন। প্রতিবাদী চেতনা বিকাশের জন্য তিনি বৃটিশ সরকার কর্তৃক কারাভোগ করেন। যখন বৃটিশ ভারতের মানুষ নানাভাবে বঞ্চিত, শোষিত সেই কালে পাংশা উপজেলাধীন ভেল্লাবাড়িয়া গ্রামে খন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদের জন্ম (১২৭৮ বাংলা)। রাজনীতির তাত্ত্বিক ধারায় নিজেকে না জড়ালেও রাজনীতির ছায়া থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন না। তিনি তৎকালীন যশাই ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। পাংশা থানা জমিয়াতুল ওলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি মাছপাড়া হাইস্কুল ও পাংশা শাজুঁই মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৩৬৫ (বাং) সালের ইহলোক ত্যাগ করেন।

সমরেন্দ্রনাথ সিংহ (সমর সিংহ)

সররেন্দ্রনাথ সিংহ সকল মহলে সমর সিংহ সমর সেন বা মাস্টার মশায় বলে পরিচিত ছিলেন। অকৃতদ্বার, ত্যাগী, সংগ্রামী এ মহান নেতার সাথে আমার পরিচয় ঘটে ১৯৭০ সালের ফেব্রয়ারি মাসে, কলেজ পাড়ায় আবুল হাসেমের বাড়িতে। আমি সবেমাত্র রাজবাড়ি কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছি। আবুল হাশেম (বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি গ্রহণ করেন) আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। আর্কষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী সমর সিংহের সহজ সরল কথায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। এমনিতেই তখন মার্কসীয় চেতনায় বিভোর থাকতাম। মার্কসের গভীর দর্শনগুলো যখন তিনি সহজভাবে বলতে থাকলেন তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় বিনত হলাম।

সমর সিংহ বাংলার কমিউনিস্টদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। আজীবন কমিউনিস্ট রাজনীতির দীক্ষা গুরু। রাজবাড়িতে কমিউনিস্ট পার্টি যখন সুসংগঠিত হয়নি, স্থানীয়ভাবে মতবাদ যখন প্রসার লাভ করেনি তখন নিরলস শ্রম ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তিনি এ কাজ সম্পন্ন করেন। তার পিতা উপেন সিংহ ছিলেন রাজবাড়ির উকিল ব্যাংকের সর্বশেষ কর্মকর্তা। ১৯২১ সালে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়। থেকে এন্ট্রাস (বর্তমান এসএসসি) পাশ করেন। অতঃপর ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যায়নকালে অল-ইন্ডিয়া ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন।

ঐ কলেজে দর্শন শাস্ত্রে অনার্সের ছাত্র থাকাকালে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। বৃটিশ সরকারের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। ১৯৪৭ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৫৮ তে আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক শাসন জারীর প্রথম দিনেই তিনি রাজবাড়ির রাহ্নবী কুণ্ডুর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন। প্রায় দু’বছর পর ছাড়া পান। ১৯৬৫ সালে রেল ধর্মঘটের সময় গ্রেফতার হন। ১৯৬৭ তে মুক্তি পান। ১৯৬৯ সালে ঢাকায় পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই বিপ্লবীসহ অনেককে গণসংবর্ধনা দেয়। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝিতে তিনি আত্মগোপনে চরে যান। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর উড়াকান্দা গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর লেখা ‘তিনটি আগুনের ফুলকি’ একটি ঐতিহাসিক দলিল। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে রাজবাড়ি খলিফা পট্রিকে ‘সমর সিংহ চত্বর’ নামকরণ করা হয়।


শ্যামেন ভট্রাচার্য

কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রাচার্য ১৯০৭ সালে কোড়কদির ভট্রাচার্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সীতানাথ ছিলেন ফরিদপুর কোর্টের জুরি এবং হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মানবতাবাদী এবং প্রতিবাদ মুখর। শৈশব কোনো শুদ্র বন্ধুর বাড়ি অন্ন বা কিছু খেয়েছিলেন বলে সমাজ তাকে উপনয়ন প্রায়শ্চিত্ত দেয়। মেধাবী ও জেদী শ্যামেনন্দ্রনাথ উপনয়ন প্রত্যাখান করলে শাস্তিস্বরুপ পরিবারের অন্য সকলের সাথে বসে খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি উঠোনে বসে খেতেন এবং নিজ হাতে থালাবাসন ধুয়ে অন্যস্থানে রাখতেন। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। জাতপাত তার কাছে পীড়াদায়ক মনে হয়। এসময়েই তিনি বলতেন মানুষ - জন্ম নিয়ে ভাগ হয় না। কর্মফল মানুষকে ভাগ করে। প্রকৃতির কোলে মানুষ সমভোগী এমন সত্য উচ্চারণে তিনি বাল্য বয়সেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। আর সামাজিক শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়াই করেছেন। সামন্ত সমাজে উৎপাদিত ফসলে প্রজা আর রাজার অংশিদারিত্বের দ্বন্দ্ব ছিল। সে দ্বন্দ্ব উসকে দেয় পরগাছা জমিদার শ্রেণি তাদের ভাগবন্টনের কূটকৌশল দ্বারা। এরই বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল এ অঞ্চলের কোড়কদি গ্রামের কয়েকজন জমিদার এবং সামন্ত পরিবারের সন্তান। তারা হলেন শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্রচার্য, অবনী লাহিড়ী, অনিল লাহিড়ী। শিক্ষিত সচেতন যুবকেরা কৃষকদের পাশে অবস্থান নেয় এবং ফসলের ভাগ বন্টনের দাবিতে কৃষকদের সচেতন ও সংঘবদ্ধ করে তোলেন। জানা যায়, তারা নিজেদের ধানের গোলা কেটে কৃষকদের মধ্যে ধান বিলি করেন। শ্যামেন্দ্রনাথ কোড়কদি স্কুল থেকে এন্ট্রাস এবং রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। বিগত শতকের বিশের দশকের শেষে বিপ্লবী অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য হন। এ সময় বাজবাড়ির আশু ভরদ্বাজ, সমর সিংহ, শ্যামেন ভট্রাচার্য, চারু প্রভা সেন, অনিল লাহিড়ী, অবনী লাহিড়ীর নেতৃত্বে অনুশীলন সমিতি শক্তিশালী সংগঠনে রুপ নেয়। এ আন্দোলন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্ররুপ ধারণ করে। শ্যামেন্দ্রনাথ গ্রেপ্তার হন। জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে ইংরেজি ও অর্থনীতিতে রেকর্ড নম্বর পেয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আবার তাকে জেলে যেতে হয়। শ্যামেন্দ্রনাথ তিরিশের দশকের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এ সময় সমর সিংহ, আশু ভরদ্বাজ, মনমোহন ভাদুড়ী, অনিল লাহিড়ী, সত্য মিত্র প্রমুখের নেতৃত্বে ফরিদপুর কমিউনিস্ট পার্টির দৃঢ় ভিত রচনা করা হয়। এ সময়ে তার উদ্যোগে ফরিদপুর কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন এ পদে থেকে জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

জীবনের চব্বিশ বছর কেটেছে জেলে। তার আহবানে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিত। তিনি একটি বাওড় ও বিলের মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটার ব্যবস্থা করেন যা আজও শ্যামেনবাবুর খাল বলে পরিচিত। কোড়কদির স্কুলটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে তিনি নানাভাবে অর্থ সংগ্রহ করে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি এ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষাকতা করেন। পরে বোয়ালমারী জর্জ একাডেমির প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে উক্ত বিদ্যালয় থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। এ সময় আইয়ুব খান এই বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যে কোনো কমিউনিস্ট সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবে না। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতে যান। ১৯৭৯ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।

অবনী লাহিড়ী

আবহমান বাংলার জীবন জীবিকার উৎস কৃষি। কৃষির চালনাকারী কৃষক। কিন্তু কৃষক সম্প্রদায় পরদেশী শাসনকালে কর্ষিত ভূমিতে মালিক নন। মধ্যস্বত্বভোগী নানা প্রকার বন্দোবস্তের কৌশলে  মালিকানা স্বত্বে কৃষকদের ফসলের সিংহভাগ গ্রাস করেছে। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটেই শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। উৎপাদিত ফসলের ভাগবন্টন হতে তিন ভাগে। দুইভাগ পাবে কৃষক। একভাগ মালিকের। এভাবে তেভাগা আন্দোলন দাঁনা বাধে। কৃষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ১৯৪৬-৪৭ এ দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, মেদিনীপুর, ২৪পরগনায় আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। উত্তর বাংলায় এ আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করেন কোড়কদির অবনী লাহিড়ী। অবনী লাহিড়ীর পিতা নলিনীমোহন উচ্চপদের চাকরিজীবী ছিলেন। বাবার চাকরিসূত্রে ১৯২৬ সালে অবন্তীমোহন কাবুলে যান। তিন বছর পর কোড়কদি ফিরে আসেন। বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক রাজনীতির অগ্নিঝরা সময়। এসময় তিনি রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে মহাত্মা গান্ধী ও সুভাষ বসুকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজবাড়িতে এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। এর বিরুদ্ধে সরকার ১৪৪ ধারা জারী করে। ১৫ বছর বয়সী অবনী কোড়কদি থেকে ১৮ মাইল হেটে এসে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন। এ অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৩ এ ম্যাটিকুলেশন পাস করে রিপন কলেজে ভর্তি হন। এরই মধ্যে তিনি রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। ১৯৩৪ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৩৮ এ ছাড়া পান। এরপর তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ১৯৩৮ এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এরপর তাকে উত্তরবঙ্গে পাঠন হয়। সেখানে ১৯৪২ এ ভারত ছাড় আন্দোলন, ৪৩ এর ভয়াল দুর্ভিক্ষ এবং ৪৬ এর তেভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখায় ইতিহাস স্থান করে নিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে অনেকের সাথে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘তিরিশ চল্লিশের বাংলা’ ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। কৃষক আন্দোলনের এ নেতা ২০০৬ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন।

কমরেড আশু ভরদ্বাজ

কমরেড আশু ভরদ্বাজ রাজবাড়িতে অতিপরিচিত নাম। তিনি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি কমিউনিস্ট প্রভাবিত অঞ্চল বিধায় তিনি রাজবাড়িতে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তিনি দীর্ঘদিন স্মৃতিশ চক্রবর্তীর (খোকন বাবু) বাড়িতে অবস্থান করেন এবং এ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি কমরেড কমলকৃষ্ণ গুহ, কমরেড আবুল কালাম প্রমুখের দীক্ষা গরু। স্বল্পভাষী, অকৃতদার, আশু ভরদ্বাজ ১৯২০ সালে অনুশীলন পার্টির বিপ্লবী দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালে গ্রেফতার হয়ে জেলে ও বন্দি শিবিরে আটক থাকেন।

তিনি অগ্নিযুগের বিপ্লবী বলে সামধিক পরিচিত। কোনো বৃটিশকে চড় মারতে গিয়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তার ফাঁসির আদেশ রদ করে তাঁকে আন্দামানে (কালাপানি) দ্বীপান্তরিত করা হয়। তখনকার দিনে কালাপানি এক মরণদ্বীপ। কোথাও পথঘাট নেই। যা আছে তা দুর্গম এবং শ্বাপদসঙ্কুল। কালাপানির বর্ণনায় ২৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের নেতা মওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন-----‘এ স্থানের প্রাতঃকালীন বায়ুও লু’র ন্যায় গরম ও ভয়াবহ। এখানকার অমৃতও হলাহলের চাইতেও মারাত্মক। এ স্থানের খাদ্য মানুষের উপযোগী নয়। এই দ্বীপের পানি সাপের বিষের চাইতেও মারাত্মক। এই দ্বীপে আকাশ হতে যাতনার বৃষ্টি ঝরে। এই দ্বীপের মেঘমালা শুধু নির্যাতন ও দুশ্চিন্তা বর্ষণ করিয়াই ক্ষান্ত হয়।’ ফজলে হক খায়রাবাদী সিপাহী বিদ্রোহে  বন্দি হন এবং শাস্তি স্বরুপ কালাপানিতে নির্বাসিত হন। (আজাদী আন্দোলন, পৃষ্ঠা-১৩)। বৃটিশ শাসনের অবসানকালে আশু ভরদ্বাজ রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দি থাকেন। ১৯৫২ সালে খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালান হলে ৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় তিনি বেঁচে যান। তিনি সর্বমোট ৩৩ বছর জেলে কাটান। আত্মত্যাগী এই রাজনীতিবিদ ২০০০ সালে রাজবাড়িতেই দেহত্যাগ করেন। কমরেড আশু ভরদ্বাজ এর দিনলিপি থেকে------------

এক মাস পরে আমাকে ফরিদপুর জেল হইতে ঢাকার কেন্দ্রীয় জেলে নেওয়া হইল। ডাণ্ডাবেড়ী খোলা হইল। কাজ দেওয়া হইল আধামণ করিয়া ডাইল ভাঙ্গার। আমি দুই-চার সের ডাইল ভাঙ্গিয়া ফেলে রাখি। আমার বিরুদ্ধে প্রতিদিন কেস হইতে লাগিল -----‘আমি ঠিকমত কাজ করি না বলিয়া।’ পরপর অনেকগুলি শাস্তি হইয়া চলিল যথা------পেনাল ডায়েট, চটকাপড়, ডান্ডাবেড়ী, শিকলবেড়ী নাইট হ্যান্ডকাপ, স্ট্যান্ডিং হ্যান্ডকাপ, সেল পানিসমেন্ট। শেষ পর্যন্ত একদিন জেল সুপারিনডেন্টকে অপমান করায় আমার ‘কালটুপী’ হইল। ইহার পর আমাকে আন্দামান পাঠাইবার ব্যবস্থা করা হইল। প্রথমে ঢাকা হইতে প্রেসিডেন্সি জেলে পরে আলিপুর জেলে নেওয়া হইল। সেখান হইতে আন্দামান। আন্দামানে এই সময় চারটা দাবি নিয়া অনশনের প্রস্তুতি চলছে। দাবিগুলি হইতেছে (১) সমস্ত রাজবন্দিকে আন্দামান হইতে দেশে ফেরত আনিতে হইবে। (২) সমস্ত রাজবন্দি ও ডেটিনিউকে মুক্তি দিতে হবে। (৩) মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণির বন্দি হিসাবে সকলকে রাখিতে হইবে। (৪) সমস্ত রাজবন্দিকে এক জেলে রাখিতে হইবে। সারা ভারতব্যাপী চলিল এই দাবির পক্ষে------দলমত নির্বিশেষে। রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু সকলেই দাবি সমর্থন করিয়া বিবৃতি দিল। হরেন মুন্সী ঢাকা জেলে অনশনে মারা গেল। তেত্রিশ দিন অনশনের পর সরকার দাবিগুলি মানিয়া নিল। অনশন ভঙ্গ হইল। আন্দামান হইতে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে সমস্ত রাজবন্দিকে ফেরত আনা হইল। দমদম ও আলিপুর আনিয়া রাখা হইল।

১৯৩৮ সালে ১লা জানুয়ারি সকলকে দ্বিতীয় শ্রেণি দেওয়া হইল। কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক হাজার ডেটিনিউকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল। রাজবন্দিদের ছাড়িবার ব্যাপারে বোর্ড করা হইল। ১৯৩৮ সালের এপ্রিলে মহাত্মা গান্ধী দুইবার দেখা করার জন্য জেলে আসিলেন। তাঁহার প্রশ্নের উত্তরে তাঁহাদের বলা হইল ‘এখন আমরা সশস্ত্র সংগ্রাম বা সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাসী নই।’ এই সময় আমাদের অধিকাংশই কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী হইয়াছে। গান্ধী বলিলেন------আমাকে এক বছর সময় দাও, তোমাদের মুক্তির চেষ্টা করিব। তোমরা কোনো কিছু করিও না। আমি ১লা মে কমিউনিসট পার্টির জেলা সংগঠন ‘কমিউনিস্ট কনসলিডেশনে’ যোগদান করি। আমাদের ‍মুক্তির সুপারিশ করার জন্য যে বোর্ড গঠিত হইয়াছিল তাহার মাধ্যমে অনেকে মুক্তি পাইল। অম্বিকা চক্রবর্তীসহ কয়েক জনকে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দিতে চাইল। আমার বেলায় বলা হইল-----একে আগেই একবার বিবেচনা করিয়া ফাঁসি হইতে বাঁচান হইয়াছে, আর বিবেচনা করা হবে না। ১৯৩৮ সালে দমদম যাবার আগে ঢাকা জেলের হরেন সেন আমাদের প্রতি নানা রকম দুর্ব্যবহার ও নির্যাতন করার চেষ্টা করে।

আমরা ইহার প্রতিবাদ করিয়া অনশন আরম্ভ করি। আমাদের একটি মাত্র দাবি----‘এই জেলার এখানে থাকা পর্যন্ত আমরা কোনো খাদ্য গ্রহণ করিব না।’ এগার দিন অনশনের পর আমাদের দমদম জেলে পাঠাইয়া দেয়। আমরা খাদ্য গ্রহণ করি সেখানে যাইয়া।

১৯৩৮ সালে এপ্রিলে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার পরে দমদম জেলে যাইয়া সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ইহার পরে আরো ৪/৫ বার সাক্ষাৎ করেন বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৩৯ সালে গান্ধীজীর কথার এক বৎসর পূর্ণ হইলে, আমরা তাহাকে চিঠি দেই। মহাদেব দেশাই (গান্ধীজীর পার্সোনাল সেক্রেটারী) গান্ধীজীর উত্তরসহ চিঠি নিয়া দেখা করেন। আমরা ইহাতে সন্তষ্ট হইতে না পারিয়া ১৯৩৯ সালের জুন হইতে মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করি। কয়েকদিন পরে গান্ধীজীর সেক্রেটারী পিয়ারীলালসহ ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের ১ম প্রেসিডেন্ট) আমাদের সাথে দেখা করেন। অনশন বন্ধ করিতে বলেন। ডা. বিধান রায়, শরৎ বোস, সুভাস বোস, লাহিড়ী, মোজাফফর আহম্মদ (কাকা বাবু), রবি সেনসহ বহু নেতা অনশন ভঙ্গ করার কথা বলেন। আমাদের রাজি করাইতে পারে না। এই দিকে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম দলগুলির নেতৃত্বে প্রবল আন্দোলন শুরু হইয়াছে। এই সময় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ হইতে গোপনে খবর পাঠায় ‘তোমরা আন্দোলনের নেতাদের উপর দায়িত্ব দিয়া অনশন ত্যাগ কর।’ সেরুপে ব্যবস্থা করা হইল। নেতারা আসিনেন, নেতাজী ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করিয়াছেন, তিনি বলিলেন------‘আপনারা অনশন ত্যাগ করিয়া আপনাদের দাবি আমাদের উপর ছাড়িয়া দেন। আগমী দুই মাসের মধ্যে ভারতব্যাপী আমরা এক বিরাট আন্দোলন গড়িয়া তুলিব মুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করিয়া।’ তাহাদের কথায় আমরা বলিলাম ‘যদি আলিপুরের বন্ধুরা রাজী হয় তাহা হইলে আমরা অনশন ত্যাগ করিব।’ নেতারা রাত নয়টার সময় আলিপুর রওয়ানা হইলেন। সেখানে তাহাদের সাথে কথা বলিয়া অনশন ত্যাগ করাইলেন। রাত এগারটায় দমদমে ফিরিয়া আসিলেন এবং অনশন ত্যাগ করাইলেন। চৌত্রিশ দিন পরে রাত বারটায় আমরা ঘোলের সরবৎ দিয়া অনশন ভঙ্গ করিলাম। নেতারা রাত বারটার পর জেল হইতে বিদায় লইলেন ----- আমি মুক্তির পরেই কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সদস্যপদ পাইয়াছিলাম। আমি ফরিদপুর জেলার পার্টির সাথে যোগাযোগ করিয়া রাজবাড়ি চলিয়া আসিলাম। রাজবাড়ির প্রফুল্ল কর্মকারের বাড়িতে আমি থাকি-খাই, আর পার্টির কাজ হিসেবে দায়িত্ব থাকে পার্টি বইপত্র, পত্রিকা প্রচার, বিক্রি করা এবং  ইবি রেল রোড ওয়ার্কাস ইউনিয়নে বসিয়া যোগাযোগ রক্ষা করা, শ্রমিকদের মধ্যে যাইয়া পরিচিত হওয়া, পদ্মা মৎস্যজীবী সমিতির কাজ করা।

সত্য মিত্র

১৯৭২ সালে পূর্ব-পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) ‘পার্টি প্লেনাম’ অনুষ্ঠিত হয়। এই প্লেনামে আবদুল হক, অজয় ভট্রাচার্য, সত্য মিত্র, শরদিন্দু দস্তিদার, ইদ্রিস লোহানী প্রমুখ পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট, সংগঠনকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করান (কমিউনিস্ট আন্দোলনের রুপরেখা, আমজাদ হোসেন, পৃষ্ঠা-৯১)। প্রখ্যাত নেতা সত্য মিত্র বালিয়াকান্দির কোড়কদিতে সম্ভ্রান্ত সান্যাল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

ষাটের দশকে এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন ব্যাপক প্রসার লাভ করে ১৯৬৩ সালে রেলধর্ম ঘটে তিনি সাজাপ্রাপ্ত হন। পিকিংপন্থী সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অনেক আন্দোলন সংগ্রামে কারাবরণ করেন। পার্টি প্লেনামের পর তিনি আব্দুল হক ও অন্যান্য ত্যাগী নেতাদের মতো আত্মগোপনে চলে যান।

প্রফুল্ল কর্মকার

রাজবাড়ির এক বিপ্লবী নাম প্রফুল্ল কর্মকার। তিনি রাধেশ্যাম জুয়েলার্সের মালিক রাধেশ্যাম কর্মকারের কনিষ্ঠ পুত্র। প্রফুল্ল কর্মকার বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে টেররিস্ট গ্রুপে যোগ দেন। পরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ফরিদপুর জেলার সম্পাদক হন। ৩০ এর দশকের প্রথম ভাগে তিনি কারারুদ্ধ হন।

 

 

 

মনমোহন ভাদুড়ী

বোয়ালমারীর ভাদুড়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া মনমোহন ভাদুড়ী দীর্ঘসময় গোয়ালন্দে অবস্থান করে মৎস্যজীবীদের সংগঠিত করেন। মনমোহন ভাদুড়ী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দু ফৌজের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে রাজবাড়িতে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করা হয়। বেড়াডাঙ্গা (বর্তমানে রহিমুন্নেসা মাদ্রাসা যেখানে) ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের আশ্রয় স্থল। অস্থানীয় অনেক মহিলা এর সদস্য ছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সকাল বিকাল মহড়া দিত। তিনি অনেক সময় জাহ্নবী কুণ্ডুর বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। ১৯৪৬ সালে কলিংপঙে বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধি তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন হিসেবে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর আত্মগোপনে রাশিয়া যান। নেতাজী সুভাষ বলছি ----সাড়া জাগানো গ্রন্থটির ক্যাপ্টেন ভাদুড়ী চরিত্রটি মনমোহন ভাদুড়ীর। ১৯৬৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আহম্মদ আলী মৃধা

আহম্মদ আলী মৃধা বহরপুর গ্রামের এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ প্রতিভা, অধ্যাবসায় আর দৃঢ় মননশক্তির দ্বারা তিনি রাজবাড়িতে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। রাজবাড়ি টাউন মক্তবের পূর্ব পাশে অবস্থিত নিজ বাসায় তিনি সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন।

আহম্মদ আলী মৃধা জয়েন্ট বেঙ্গল পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি একবার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ছিলেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি মোহন মিয়া, তমিজ উদ্দিন খান, খানবাহাদুর ইউসুফ হোসেন চৌধুরীর সহযোগী ছিলেন। অত্র অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের শিক্ষা দীক্ষা, কাজকর্মে উদ্বুদ্ধকরণে আহম্মদ আলী মৃধা বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন। বৃটিশ ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় নানাভাবে পিছিয়ে পড়ে। শ্রেণি বিন্যাসে তাদের অবস্থান থাকে নিম্নে। হিন্দু সম্প্রদায় এ সময় সমাজের কর্তৃত্ব করে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের জাগরণে আহম্মদ আলী মৃধা কাজ করেন গেছেন। মুসলমান যে কেউ তার নিকট যে কোনো ব্যাপারে সাহায্য চাইতে গেলে তাকে তিনি আত্মপত্যয়ী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলতেন। বিভিন্ন রকম কাজ করে উৎপাদন ও আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য উপদেশ দিতেন। তার পুত্রদের মধ্যে আহমদ মোর্তজা (মর্জি) আমেরিকায় “নাসার’ সম্পাদক। কন্যা নাসিম বানু বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ছিলেন। পুত্রবধু জাহানারা বেগম বিএনপি সরকার আমলে তৎকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

ডা. একেএম আসজাদ

ডা. একেএম আসজাদ এমবিবিএস করে মানব সেবার ব্রত নিয়ে এলাকায় চিকিৎসা শুরু করেন। সে সময় জেলায় আর কোনো এমবিবিএস ছিল কিনা তা জানা যায় না। ডা. আসজাদ এ সময়ের বড় ডাক্তার হয়েও অর্থের নেশায় বড় চাকরি গ্রহণ করেননি। আর্তমানবের সেবায় নিজেকে সমর্পণ করেছেন। ডাক্তার হিসেবে তাঁর ফি ছিল সামান্য। কিচিৎসার সাথে তিনি মানুষকে কর্মদ্যোগী হওয়ার উপদেশ দিতেন। পাংশার মাগুরাডাঙ্গী ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন (১৯২২)। পিতা কাজী আব্দুল মাজেদ ছিলেন বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতা। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। কাজী আব্দুল মাজেদের লেখা ‘বিশ্বরাজনীতি ও পাকিস্তান’ গ্রন্থখানা সমকালীন রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর পুত্র একেএম আসজাদ পাংশা জর্জ হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলিকাতায় লেখাপড় করেন। অতঃপর কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মুসলিমলীগের ছাত্র সংগঠনের ছিলেন অন্যতম নেতা। পরবর্তীতে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যোগদান করে গোয়ালন্দ মহকুমার মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

পাকিস্তানবাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণ থেকে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ডা. আসজাদের অসামান্য অবদান রয়েছে। ২৫ মার্চ কালরাতে তাঁর ভগ্নিপতি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী কমোডর মোয়াজ্জেম হোসেন পাকিস্তানবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হলে তিনি স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ি শহরে সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিকত করেন। পরে তিনি কুষ্টিয়ার যুদ্ধে নেতৃত্বে দেন। তিনি সারাজীবন ইসলামিক আদর্শের অনুসারী ছিলেন। কুরআন ও সুন্না’য় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। বেশভূষায় ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। স্বৈরশাসকের পতনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ি-২ আসনে জামায়াতে ইসলাম থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

Additional information