শতবছরের রাজনীতি-২ - পৃষ্ঠা নং-২

তাঁর নেতৃত্বে এ ধর্মঘটের মাধ্যমে শ্রমিকদের জন্য নানা দাবি দাওয়া আদায় করা সম্ভব হয়। তখন থেকেই তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে তিনি রেলওয়ে এ্যাকাউন্টস লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এছাড়া তিনি চাকরির কর্মস্থল সূত্রে চট্রগ্রাম ব্যাংক কর্মচারী লীগ, চট্রগ্রাম পোর্ট কর্মচারী লীগ, কালুরঘাট জুট কর্মচারী লীগ ও পূর্ব-পাকিস্তান রেলওয়ে কর্মচারী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মুসলিমলীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট না থাকলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবির প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল। মূলত তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের দাবি আদায়ের নেতা। ১৯৫২ সালে তিনি নিখিল পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশনের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর লেখনীর মাধ্যমেও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করেছেন। চট্রগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়’ পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন। ফরিদপুরের সৈয়দ আবদুর রবের পত্রিকায় এবং জগদীশ ভট্রাচার্যে ‘প্রাত্যই’ পত্রিকায় কাজ করেছেন। চৌধুরী হারুন অর রশীদের ‘আওয়াজ’ পত্রিকায় ছদ্মনামে ‘পাকি অর্থনীতির উপর এক নজর ও পাকিস্তান অর্থনীতির উপর আরেক নজর’ প্রকাশিত হলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে লেখাটি কলিকাতা থেকে প্রকাশিত সত্যেন মজুমদারের ‘সত্যযুগে’ প্রকাশিত হলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি পান। জেলে থাকাবস্থায় তাঁর পরিবারের সাহায্যের জন্য রেলওয়ে শ্রমিকরা চট্রগ্রামে ‘মোসলেম নগর’ নামে একটি হস্তশিল্প বসান। জেল থেকে মুক্তি পেয়েও তিনি প্রায় দু-বছর পাংশায় নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকেন। অতঃপর তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং ১৯৫৬ সালে গোয়ালন্দ মহকুমায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৮ সালে তিনি ড. কাজী মোতাহার হোসেনের অনুরোধে হাবাসপুর কাশিমবাজার হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক এবং পরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি অবকাঠামো ও ফলাফলে জেলার অন্যতম বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৯৭০ সালে তিনি চাকরি ত্যাগ করে রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এমপিএ নির্বাচিত হন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে রাজবাড়ি মুক্তিযুদ্ধ কমিটি গঠনে তাঁর অবদান স্মরণীয়। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর রানাঘাট থেকে কলিকাতার সল্টলেক পর্যন্ত যুদ্ধশিবিরগুলোর দায়িত্ব তাঁর উপর পড়ে। তিনি নিষ্ঠার সাথে তা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নিরবে নিভৃতে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। মানবপ্রেমী, নিষ্ঠাবান কর্মী, নিবেদিত রাজনীতিবিদ, দক্ষ শিক্ষক, সংগঠক মোসলেম উদ্দিন মৃধা ১৯৯২ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন।

ডা. এসএম ইয়াহিয়া

রাজবাড়ি জেলা তথা দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের কাছে নিমতলার ডাক্তার ইয়াহিয়া অতি পরিচিত ব্যক্তি। বাজারের মধ্যে তার ডিসপেনসারির নিকট একটি বড় নিমগাছ ছিল। নিবেদিত প্রাণ এই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের হাতের ছোঁয়ায় হাজার হাজার রোগী রোগমুক্তির পর তাঁর (ইয়াহিয়া) প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। তাঁর হোমিওপ্যাথিক প্রাকটিসের হাত তুলনাহীন। দীর্ঘ ৫০ বৎসরের বেশি তিনি এ পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। ডা. ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর আত্মীয়। ডা. ইয়াহিয়া রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘদেহী, অমায়িক ব্যবহারের এই মানুষটি রাজনীতিতে অনেককাল জড়িত থাকলেও তাঁকে বিশেষ কোনো দলের লোক বলে মনে হয় নাই। তিনি যেন একজন ডাক্তার, একজন মানুষ, একজন সেবক। বয়সের ভারে চলাফেরা করতে অসুবিধা হওয়ায় তিনি নিজ বাড়িতে রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিতেন। সম্প্রতি তিনি পরলোকগমন করেছেন।

Additional information