শতবছরের রাজনীতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৫

আক্কাস আলী মিয়া

আক্কাছ আলী মিয়া রাজবাড়ি জেলা তথা অত্র এলাকার স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব আক্কাস আলী মিয়া ১৯৩৮ সালে উত্তর দৌ্লতদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ওকিল উদ্দিন মিয়া। সাত বছর বয়সে পিতৃহারা এবং ৮ বছর বয়সে মাতৃহারা আক্কাস আলী মিয়া দাদীর স্নেহে লালিত পালিত হতে থাকেন। অতপর পাবনা জেলার বেড়া উপজেলাধীন ঢালার চরে বোনের আশ্রয়ে থেকে চর জাজিরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে রাজবাড়ির রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে (আর এস কে) ভর্তি হন। বিদ্যালয়ে লেখাপড়া বেশিদূর অগ্রগামী হয়নি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর সমাপ্তি ঘটে। তবে পরিণত জীবনে তিনি পাঠ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ধর্মীয় বিদ্যাসহ নান বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর সাথে ধর্ম, রাজনীতি, সমাজ সংগঠন নিয়ে কথা বললে স্বল্প শিক্ষিত বলে মনে হত না। যে কোনো বিষয়ে তাঁর ধ্যান ধারণা ছিল স্বচ্ছ। আত্মোপলদ্ধির বিষয়টি ছিল তাঁর সহজাত। তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী। ঘোরপ্যাঁচ রেখে কথা বলতেন না।

স্বাধীনচেতা আক্কাস আলী মিয়া কৈশোর থেকে আর্থিক বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পদ্মা যমুনার সঙ্গমস্থলের জল মহালের জলকর আদায়ের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। জলমহালের জমিদারীকালে তিনি ‘মালেক সাব’ বলে সাধারণ পরিচিতি লাভ করেন।

মৎস্য ব্যবসায়ী ও চরাঞ্চলের মানুষ তাঁর আদেশ উপদেশ মেনে চলতে থাকে। তিনি হয়ে ওঠেন তাদের নেতা। জলমহালের নানা বিবাদ বিসম্বাদ বিচক্ষণতার সাথে মিমাংসা করতেন। তাঁর অধীনে পানসি নৌকা, রকেট নামের বৃহৎ নৌকা, লাঠিয়াল, মাঝি, নায়েব, গোমস্তার বিরাট বহর কাজ করত। ১৯৬২ সালে তিনি ঢালার চর ইউনিয়নের মেম্বার এবং পরে উক্ত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময় থেকে তিনি রাজবাড়ি শহরে বসবাস শুরু করেন। অবশ্য ৪০ এর দশকে ঢালার চরের ভাঙ্গন শুরু হলে উক্ত চরের বিপুল সংখ্যক  মানুষ রাজবাড়ি শহরে বেড়াডাঙ্গা, লক্ষীকোল, বিনোদপুর, ধুঞ্চি এবং শহরের আশেপাশে বসতি গড়ে তোলে। তারা প্রায় সবাই আক্কাস মিয়া অনুসারী বলে পরিচিত ছিল যা এখনো বর্তমান রয়েছে। এই গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ চরের মানুষ বলে তাদের ধারণা পরিচিতি আছে। আক্কাস আলী মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তিনি কল্যাণী ক্যাম্পে বিশেষ তায়িত্ব পালন করেন।

তিনি রাজবাড়ি শহরের বিপুল মানুষের সমর্থনে ১৯৭৩ সালে রাজবাড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কাজী হেদায়েত হোসেনের সাথে রাজবাড়ির ‘দুই ব্যঘ্রের লড়াই’ বলে পরিচিত এ নির্বাচন ঐতিহাসিক নির্বাচন বলে মানুষ আজও স্মরণে রেখেছে। সে নির্বাচন সাজসজ্জা, প্রচার প্রচারণা, আনন্দ উল্লাস বিবিসি কর্তৃক প্রচারিত হত। তিনি দ্বিতীয়বার পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন রাজবাড়ির হাট বাজারের উন্নতিসহ পৌর মার্কেটের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। আক্কাস আলী মিয়া জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠার পূর্বে জাগদলের প্রতিষ্ঠাতা। পরে বিএনপির সভাপতি ও সংগঠক। ১৯৮৬ নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। অত্র এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন। দৌলতদিয়া ঘাট স্থাপন, দৌলতদিয়া পর্যন্ত রেল সংস্থাপন তাঁর সম্মণীয় কাজ। ফরিদপুরের শ্রারামদি ঘাট স্থাপন পরিকল্পনাটি বাতিল করে তা দৌলতদিয়ায় স্থাপন আক্কাছ আলী মিয়ার প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল। দৌলতদিয়া ঘাট স্থাপনের ফলে রাজবাড়ি জেলার গুরুত্ব বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি একজন ইসলামী চিন্তাশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি কোর-আন হাদিস বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান রাখতেন এবং আধুনিক চেতনায় ব্যাখ্যা দিতেন। তিনি বেড়াডাঙ্গা রহিমুন্নেছা ইসলামী কিন্ডার গার্টেন ও ইসলামী জীবন গবেষণার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সন্তানেরা জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আক্কাছ আলী মিয়া ২০০০ সালে পরলোকগমণ করেন। রাজবাড়ি জেলা স্কুল মাঠে তাঁর জানাযা সম্পন্ন হয়। রাজবাড়ির মানুষের মনে এখনো তাঁর স্মৃতি অম্লান। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে আক্কাছ আলী স্মৃতি পরিষদ গঠিত হয়েছে।

Additional information