শতবছরের রাজনীতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৯

মকসুদ আহমেদ রাজা

মকসুদ আহমেদ রাজা আজীবন রাজনীতিক। স্কুলজীবন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় রাজনীতি ব্যবসা নয়, রাজনীতি রাষ্ট্রীয় চেতনায় মানবকল্যাণের উত্তম কর্মপন্থা। এর দৃষ্টান্ত মকসুদ আহমেদ রাজা। পদ্মার কোলে জন্ম নেয়া মকসুদ আহমেদ রাজা বর্ষার উত্তাল তরঙ্গের মতো কখনো বিদ্রোহী আবার শীতের শান্ত ঢেউয়ের মতো নমনীয়। বক্তৃতা মঞ্চে তাঁর বজ্রকণ্ঠ শ্রোতার রক্তে তরঙ্গের ঢেউ তোলে। তাঁর সহাস্য মুখ, গৌড়কান্তি কোমল স্বভাব, বিনয়ী আচরণ আকৃষ্ট করে। ১৯৪৩ সালে আগস্ট মাসে পদ্মার তীরবর্তী সবুজ শান্ত জৌকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম মকবুল আহমেদ। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মরগুব আহমেদ রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় (রাজবাড়ি) বিশিষ ভূমিকা রাখেন। জৌকুড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে বেলগাছি আলীমুজ্জামান হাই স্কুল , কুষ্টিয়া এবং সর্বশেষে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ এবং রাজবাড়ি কলেজ থেকে বিত্র পাস করেন। স্কুলজীবন থেকেই রাজনীতিতে যোগদান। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে একনিষ্ঠ বিশ্বাসী । ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কাণ্ডারী। ১৯৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্কটের দিনে নির্ভিক কন্ঠে তাঁর সতত উচ্চারণ ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ রাজবাড়িতে আওয়ামী লীগের প্রদীপ শিখা বলে প্রতীয়মান হত। ঐ চারটি শব্দ এখন তাঁর স্বভাবে পরিণত। যখন যেখানে দেখা হয় জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে হাতে হাত মিলান। আদর্শের প্রতি এমন অনুরক্ততা কম মানুষের মধ্যে দেখা যায়। ষাটের দশকের প্রথম দিকে এ তুখোর ছাত্রনেতা রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংসদে সাধারণ সম্পাদক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ভিপি পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক এবং পরে প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। মকসুদ আহমেদ রাজা রেলশ্রমিক আন্দোলনে যোগদান করে ১৯৬২ সালে গেপ্তার হন এবং কারাবরণ করেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একসময় সাংবাদিকতার সঠিক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। অবজার্ভারসহ স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক দিক নির্দেশনামূলক ফিচার লিখতেন। তিনি সূর্যনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি, স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের সভাপতি থাকেন।

তিনি চন্দনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মকসুদ আহমেদ রাজা অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে সুপরিচিত। একটানা সাড়ে পাঁচ ঘন্টা বক্তৃতা দেয়ার রেকর্ড রয়েছে। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল জীবনযাপন করেন। একমাত্র আদর্শের বাস্তবায়ন ছাড়া তাঁর চাওয়া পাওয়ার কিছু নাই। মানব সেবাই তাঁর ব্রত। রাজবাড়ি উদীচী কর্তৃক তাঁকে ‘শ্রেষ্ঠ মানবসন্তান’ সম্মননা দেওয়া হয়।

কমরেড আনছার আলী শেখ

বয়সের ভারে নুজ্জ, তবুও প্রাণ শক্তিতে দীপ্যমান। একজন নির্লোভ মানুষ কমরেড আনছার আলী শেখ। সবার প্রিয় কমরেড আনছার ভাই। জন্ম ১৯৩৩ সালে পাবনা মৌকুড়ি গ্রামে দাদার বাড়িতে। শৈশব কেটেছে পার্বতীপুরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময় ন্বপরিবারে রাজবাড়ি দাসের ডাঙ্গী গ্রামে (বর্তমানে নিউকলোনি কলেজপাড়ায়) চলে আসেন। একদিকে বিশ্বযুদ্ধ অন্যদিকে দুর্ভিক্ষ। দারিদ্র আর ক্ষুধার সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ে ৬ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারটি। কাজ নেই,  ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ ছুটে যাচ্ছে শহরে। পড়াশুনার পাঠ শেষ ক্লাস ওয়ানেই। দারিদ্রতার জন্য ক্লাস টুতে উঠে লেখাপড়া আর চালিয়ে যেতে পারেননি। ক্লাস টুতে পড়ার সময় ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। সেই স্মৃতি এখনো তাঁকে আলোড়িত করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কিছু আগেই তাঁর পিতা মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর সংসার নির্বাহের জন্য ঘরামির কাজ বেছে নেন।

Additional information