শিল্পসংস্কৃতি

শিল্পসংস্কৃতি

স্মতট পদ্মাবতী কুমার তালক মণ্ডলীয় ভূ-খণ্ডে সংস্কৃতির ধারা সতত প্রবহমান। দশম শতকীয় চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্য থেকে শুরু করে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধারণ করে আছে এই মণ্ডলীয় স্থান। উত্তরে পদ্মা আর দক্ষিণে গড়াইয়ের সমতটীয় স্থান বিশেষে বৌদ্ধ সংঘারাম, সুলতান মোগল শাসনকালে মসজিদ স্থাপত্য, সীতারামের নানা কীর্তি, নাটোর রাজের দোলমঞ্চ, নানা স্থানে প্রাচীন মাজার, মন্দির, মূর্তি প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন। পদ্মা গড়াইয়ের স্রোতধারায় এ তটীয় ভূমির মানুষের উর্বর মানস গঠনের বিশেষত্ব লক্ষণীয়। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান পর্যন্ত সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, নৃত্য, খেলার জগতে এই মণ্ডলীয় স্থান দেশ তথা বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। প্রাচীন মণ্ডলীয় এ স্থানের ব্যাপ্তি অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরিদপুরের পশ্চিম ও নদীয়ার পূর্বপ্রান্ত। এ প্রান্তিকে জন্ম নিয়েছেন মীর মশাররফ হোসেন,

কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, অক্ষয় কুমার মৈত্র, কাঙ্গাল হরিনাথ, জলধর সেন, জগদীশ গুপ্ত, পরিমল গোস্বামী, সন্তোষ কুমার এর মতো দেশবরেণ্য সাহিত্যসেবী। ছেউরিয়ায় লালন শা, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠি এই মণ্ডলে। পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী আবুল কাশেম, বিশ্ববিখ্যাত ট্যাপিস্ট্রি শিল্পী রশিদ চৌধুরী, শ্রেষ্ঠতম জাতীয় পদকপ্রাপ্ত মনসুর উল করিম এই মাটির সন্তান। উপমহাদেশের তৎকালীন একমাত্র জলতরঙ্গ বাদক বামনদাস গুহরায়, সেতারাবাদক করিম বক্স, দেশবরেণ্য যাত্রাশিল্পী রাজা ভাই, খ্যাতনামা শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া, বেতার ও টিভির নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শাহীনুর বেগম, নৃত্য শিল্পী দীপ্তি গুহ, আব্দুস সাত্তার কালু আন্তর্জাতিক সাঁতারু মুন্নি আক্তার ডলি, লন টেনিস খেলোয়াড় শীবলাল ও হীরালাল, ফুটবলের কিংবদন্তি নূর হোসেন, শ্রেষ্ঠ দৌড়বিদ শহীদুন্নবী আলম, রাজবাড়ির মানুষ। অস্কার বিজয়ী নাফিজ বিন জাফর, চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি রোজিনা, শাবনুর রাজবাড়ির সন্তান। সাহিত্য সঙ্গীত বিনোদন কেবল সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। মানুষের জীবন জীবিকার চলমান ধারা তথা ভাষা, শিক্ষা, আচার আচরণ, খেলা মেলা সংস্কৃতির অঙ্গ। আবহমানকালের গণমানুষের জীবন বিকাশের ধারায় লোকজ ঐতিহ্যও সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।

জীবনের বিকাশমান ধারায় নগর জীবনে আমরা আধুনিক হয়ে উঠি। জীবন, জীবিকা, আবাসনসহ পরিবর্তন আসে সাহিত্যে, সংগীতসহ তাল লয়ে। মিথ, লোকগাথা, ধূয়া, জারি, সারি, অষ্টক, ভাসান, খোল, করতাল থেকে আমরা সরে আসি লাইলী মজনু,তবলা, সেতারে। যাত্রা, নাটক, ফুটবল, সাঁতার, ভলি, ক্রিকেট আসে নব সংস্করণে। রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিকতার ধারায় আমরা সম্পৃক্ত হই। প্রায় দু’শো বছরের অন্তগর্ভে লালিত রাজবাড়ি জেলার সঙ্গীত, নৃত্য, যাত্রা, নাটক, খেলাধুলা, লোকজ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ইংরেজ শাসনকালের শুরু থেকে আমাদের সংস্কৃতির ধারায় নানা পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সঙ্গীত সাহিত্য ছাড়াও খেলাধুলার বিষয়ও নতুন আঙ্গিকে ধরা দেয়। তা সত্ত্বেও লোকজ ঐতিহ্যের সামান্যতম ঘাটতি হয়নি। গাজীর গান, রামযাত্রা, রামপ্রসাদী, ধূয়া, বিয়ের গীত, অষ্টক গান, ভাসান যাত্রা, লাটিখেলা, নৌকা বাইচ এতটুকু গৌরব হারায়নি। রাজবাড়ি, পাংশা, বালিয়াকান্দির বিশেষ করে জঙ্গল ইউনিয়নে ছিল অনেক অষ্টক গানের দল। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম -বিরহের অষ্টক পালার সুর খোলা বাতাসে দিগন্তের মাঠ পেরিয়ে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে যেত। সারা চৈত্র মাস জুড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এ দলগুলো নেচে গেয়ে শ্রোতাদের মোহিত করত। অনুষ্ঠিত হত বিভিন্ন স্থানে জারি ও বিচারগান। গ্রামে গ্রামে ভাসান যাত্রা অনুষ্ঠিত হত। বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী ফিরত মুখে মুখে। রাজবাড়ি এলাকায় অনেক নামীদামী লোকজ গানের শিল্পী ছিলেন। সূর্যনগরের হাজেরা বিবি বিচার গানের কিংবদন্তি নাম। ফরিদপুরের হালিম বয়াতি এবং হাজেরা বিবির বিচার গানের প্রতিযোগিতায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটত। রাজবাড়ির কুমড়াকান্দি গ্রামের লোককবি ও মরমী সাধক নাছির শাহ ফকিরের গান এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। ‘ধর যাইয়া মুর্শীদের পায়,খেয়াল করলে পাইবা পরিচয়’

Additional information