শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-২

ক্ষুদ্র বৃহৎ গ্রাম আচ্ছাদনে এ জেলায় মোগল শাসনকাল থেকে বাণীবহ, বেলগাছি, পাংশা, রাজবাড়ি, খানখানাপুর, আড়কান্দি, সোনাপুর, বহরপুর, উন্নত জনপদে পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে রেল স্থাপনের ফলে গোয়ালন্দ বাংলার অন্যতম বন্দর এবং ১২টি রেল স্টেশন ও পার্শ্ববর্তী হাট বাজারে নগর জীবন বিশেষ করে রাজধানী শহর কলিকাতার নাগরিক জীবনের ছোঁয়া লাগে। মোগল শাসনকালে বাণীবহে নাগরিকতার উন্মেষে সঙ্গীত, নৃত্য, কীর্তন, ভজন, রাধাকৃষ্ণ পালা অনুষ্ঠিত হত। নবাব শাসনকালে নাটোর রাজ রামজীবনের নামে রথের মেলা বসত বেলগাছিতে। রথের মেলায় রথযাত্রা, লোকসঙ্গীত অনুষ্ঠিত হত। পুরাতন এবং নব্য জমিদার মিলে রাজবাড়িতে ছোট বড় জমিদারের সংখ্যা পঞ্চাশের কম নয়। এসব জমিদারেরা ছিল ভদ্রলোক শ্রেণির জমিদারদের দ্বারা সংস্কৃতির রুপান্তর ঘটতে থাকে। নাচঘর, লক্ষ্ণৌয়ের বাঈজী, সুরাপান আমোদ প্রমোদের উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে। এর সাথে আমদানী হয় থিয়েটার, যাত্রা, পালা গান। সঙ্গীত কলা থেকে শুরু করে বাদ্য বাজনার যন্ত্রের নাম, তাল, সুর, লয়ের, পরিবর্তন ঘটতে থাকে। রাজবাড়ির বেলগাছির জমিদার করিম বক্স ছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক। কথিত আছে একবার খাজনার দায়ে তাঁর জমিদারী নিলাম হলে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একদিন তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে বসে আপন মনে সেতার বাজাচ্ছিলেন। দূর থেকে নবাব সেতারের সুর শুনে তাঁকে কাছে ডেকে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। তাঁর সকল পরিচয় পেয়ে জমিদারী ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর সেতার বাদনের প্রসংশা করেছেন।

রাজবাড়িতে রাজা সূর্যকুমার, পদমদীর মীর মোহাম্মদ আলী, বেলগাছির করিম বক্স ও ফয়েজ বক্স, পাঁচুরিয়ার দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাংশার ভৈরব নাথ, বাণীবহের গীরিজা শংকর মজুমদার, জামালপুরের নলীনি বাবু এবং বহরপুর ও বারবাকপুরের জমিদার, পাংশার রুপিয়াট জমিদার পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় নানা নামের থিয়েটার গ্রুপ ও সঙ্গীত দল, ক্লাব চাকারি গড়ে ওঠে। পূজা আহ্নিক উপলক্ষে যাত্রা, পালাগান, কীর্তন, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হত। জেলায় অবস্থিত চল্লিশটিরও বেশি নীলকুঠির দেওয়ান পত্তনিদার, জমিদার, রায় ও চৌধুরীদের আঙ্গীনায় নাচ গানের আসর বসত। নীলচাষের বিরুদ্ধে সে সময় আন্দোলন গড়ে ওঠে। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ, ও মীর মশাররফ হোসেনের জমিদার দর্পণ নাটক মঞ্চায়ন হত সাধারণ সচেতন গোষ্ঠির দ্বারা। এসব নীলচাষ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করেছে। কুমারখালি কাঙ্গাল হরিনাথের ‘গ্রাম বার্তা’ পাংশার রওশন আলী চৌধুরীর ‘কোহিনুর’ রতনদিয়ার প্রফুল্ল কুমারের ‘অঞ্জলী’ পাংশার নাজির হোসেনের ‘কৃষক’ ও ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা অত্র সংস্কৃতি প্রবাহের নবদিগন্তের সূচনা করে। রাজা সূর্যকুমার ছিলেন সংস্কৃতিবান ও সঙ্গীত প্রিয়। ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান বাজনা আমোদ প্রমোদ চলিত। কিছুদিন পর নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ’ত উঠিয়া গেলই, বাদ্যযন্ত্র সব পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন। --------- বলিলেন, এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে। তাহার লেখাপড়া কিছুই হইবে না।’ এটি ছিল রাজার বাড়ির অন্তঃপুরের ঘটনা। এ থেকে বোঝা যায় তখন কী রুপ সঙ্গীত চর্চা হত। রাজার বাড়িতে পুত্রোষ্টিযজ্ঞ খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা থিয়েটার বাজী পোড়ানো ইত্যাদি বহু অর্থ রাজা ব্যয় করেন।

যাত্রাগান ব্যাপক সমাদর লাভ করে বিগত শতাব্দীর শুরু থেকে। যাত্রা, থিয়েটার, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রুপবান, ভাষান যাইহোক তখনকার দিনে ছেলেরা মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয় করত। শ্যামবাজারের নবীনচন্দ্র বসুকে যাত্রাভিনয়ের স্রষ্টা বলা হয়। তখন কবি ভরতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর পালাই বেশি জনপ্রিয় ছিল। তিনিই মেয়েদের নিয়ে অভিনয় শুরু করেন। তারপর মদন মাস্টারের দল উল্লেখযোগ্য। নীলমণি কুম্ভর স্ত্রী যে দল পরিচালনা করতেন তা ‘বৌকুণ্ডর দল’ বলে পরিচিত ছিল। এরপর যাত্রা জগতে যথেষ্ট উন্নতি হয়। মতি রায়ের দল, পিতাম্বর পাইন, বাকেরশ্বর পাইন, ত্রৈলোক্য পাইন, বাশি অধিকার, সীতারা কোম্পানি, গজেন ভূঁইয়ার দল ইত্যাদি। এরমধ্যে রাজবাড়ির গজেন ভূঁইয়ার দল বৃটিশ বাংলায় সর্বো্চ্চ খ্যাতি লাভ করে। গজেন দত্ত প্রথমে কলিকাতায় মনমোহন থিয়েটারের অভিনেতা ছিলেন। পরে দেশে (রাজবাড়ি) এসে যাত্রা দলে যোগ দেন। আর জীতেন্দ্র ভৌমিকের ছিল ড্যান্সিং পার্টি। এই দুইজনের নামে সাধারণ দর্শক বলত, গজেন ভূঁইয়ার দল। এরপর আসে নানা নামের অপেরা পার্টি।

Additional information