শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১১

তিনি লিখেছেন----‘সম্পূর্ণ অবগুণ্ঠিতা এক ঘরোয়া নারী হিসেবে নিজের যুগ, নিজের কাল, নিজের পরিবেশের সমস্ত চিহ্ন তিনি শরীরে ও মনে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে তার প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ও নারীর মানবাধিকার অর্জনের সংগ্রামে তিনি যুগোত্তীর্ণ তো বটেই। তাঁর সমস্ত উপলব্ধি, কর্মতৎপরতা একদিকে তাঁর নিজের আত্মবিকাশ ও ‍মুক্তির জন অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘ জীবন এক পচাগলা সমাজের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদ। তাঁকে চেনা ও জানাটা আমাদের দায়িত্ব।’ এক নারীর প্রতি এক নারীর কর্তব্যনিষ্ঠায় কেবল অভিভূত হলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ভেদরেখা মোচন করে যুগলবন্ধী নারী ও পুরুষের কর্তব্য হবে জ্ঞানালোকে নিয়ত প্রজ্জ্বলিত হওয়া। রাসসুন্দরী দেবীর জন্ম ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে পাবনার পোতাজিয়া গ্রামে। ১২ বছর বয়সে বিবাহ রাজবাড়ির রামদিয়ার জমিদার বংশে সীতানাথের সঙ্গে। মৃত্যু ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে।

মীর মশাররফ হোসেন

মীর মশাররফ হোসেন অমর গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’র লেখক মীর মশাররফ হোসেন এক কালজয়ী নাম। ঊনবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক নতুন কালপর্বের স্রষ্টা। কাব্য, উপন্যাস, হেঁয়ালী, নাকটক, আত্মজীবনী, অনুবাদ, প্রবন্ধ, ধর্মীয় নানা আঙ্গীকের আশ্রয়ে তিনি সাহিত্য সাধনা করেছেন। মানব চেতনা, মানবকল্যাণ, জীবন সংগ্রাম ও আর্থিক মুক্তির চেতনায় তাঁর পঁচিশটি গ্রন্থ আজও পাঠক মহলে সমাদৃত। তাঁর লেখা ‘জমিদার দর্পন’ নাটকটি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাংলা বিষয়ের পাঠ্য। ভাষা ব্যবহার ও বর্ণশৈলীর মাধুর্যে তাঁর রচনা একটি বিশেষ ধারায় পরিণতি লাভ করে যা বাংলা ভাষায় ‘মশাররফি চলন’ বলে বিদ্যমান। কাহিনী বর্ণনায়, ভাষার ওজস্বীতায় ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থখানা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ট্রাজেডি। সাহিত্যসেবীদের মন্তব্য মীর মশাররফ হোসেন যদি কেবল বিষাদ সিন্ধুই লিখে থাকতেন এবং আর কোনো গ্রন্থ না লিখতেন তাহলেও তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে বেঁচে থাকতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশ এবং অপ্রকাশিত দশ। শ্রেণিভিত্তিক সমাজকাঠামোয় শ্রেণিদ্বন্দ্বের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারায় তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। প্রথিযশা এই সাহিত্যিক চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদিতে তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটায়। বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে তিন কোটিরও বেশি টাকায় ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র’ নির্মাণ করেছেন যা দেশবাসীর ‘সাহিত্য তীর্থস্থান’ বলা যায়। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে মীর মশাররফ হোসেন পরিষদ। পদমদির অদূরে সোনাপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘মীর মশাররফ হোসেন কলেজ’। রাজবাড়ি সরকারি কলেজের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীর মশাররফ হোসেন হল’। রাজবাড়ি জেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি সংসদ মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে থাকে দেশের বরেণ্য সাহিত্যসেবীকে।

সাহিত্য কেবল সমাজ দর্পণ নয়, সাহিত্য সমাজকে কলুষমুক্ত করে। সাহিত্যের শিল্পবোধের চেতনায় সমাজ সংসার অগ্রগামী হয়। ‘সত্যভাষণ ও সত্যকথন’ বলে পরিচিত মীরের সাহিত্যকর্ম তৎকালীন সমাজ চিত্রের দলিল। তাঁর ভাষা ব্যবহার রীতি প্রাঞ্জল,  সাবলীল, আকর্ষণীয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে উপাদান সৃষ্টিতে তিনি একটি কালপর্বের স্রষ্টা। তাঁর সাহিত্যকর্মের দ্বারা সিক্ত হয়েছিল সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষ। তাঁর সাহিত্যে যেমন তৎকালীন মুসলমান সমাজের রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে তেমনি ‘গো জীবন’, ‘টালা অভিনয়’, ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকের বক্তব্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমাজ সঙ্কট ও ‍বৃটিশ সামন্ত শ্রেণির শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তব্য। তৎকালীন সময়ে কৃষি উৎপাদন অত্যাবশ্যকীয় হালের গুরু মহামারীতে হ্রাস পেলে গো রক্ষায় তিনি রচনা করেন ‘গোজীবন’। এতে রক্ষণশীল মুসলমান মীরের প্রতি প্রতিবাদমুখর হয়। মশাররফ হোসেন তখন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে করিমন্নেসা স্টেটের ম্যানেজার। রক্ষণশীল মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখে নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় তিনি জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁকে কয়েকদিনের জন্য জেলে যেতে হয়।

Additional information