শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১২

তবে স্বজাতীয়দের পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, রক্ষণশীলতায় কাতর মীর মশারফরফ হোসেন তাদের ভ্রান্তির মোহ থেকে মুক্ত করার মানসে সাহিত্যে নানা আঙ্গিকতার আশ্রয় নিয়েছেন কিন্ত সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে তিনি আটকে থাকেননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের ধারায় ঊনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। আর তখন থেকেই বাংলা সাহিত্য সঠিক অর্থেই আধুনিক হয়ে ওঠেন ইংরেজি সাহিত্যের হিন্দু কলেজের অনুরাগী পাঠকদের দ্বারা। ডিরোজিও নতুন কথা শনিয়েছিলেন। কালীপ্রসাদ ঘোষ নতুন দৃষ্টি লাভ করেছিলেন। ইয়ংবেঙ্গলেরা নতুন বক্তব্য রেখেছিল। বিদ্যাসাগর পৌরণিক চরিত্রগুলোকে মানবিক চেহারা দিয়েছিলেন। ঈশ্বর গুপ্ত সমকালীন জীবনচিত্র সাহিত্যে আমদানী করেছিলেন। দেব দেবীর বদলে তিনি কবিতা লিখেছিলেন আনারস, আলু, ক্ষীর, নারকেল, ইংরেজি নববর্ষ, এমন কি তপসে মাছ নিয়ে। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, বিহারীলাল চক্রবর্তীর হাতে তা পাকাপোক্ত হয়। এ সময়কালের সাহিত্যে সমাজ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ নবচেতনা লাভ করে।

ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতায় মুসলমানদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন প্রথম সারির প্রথম সাহিত্যিক। মশাররফ হোসেনের জীবনকাল ১৮৪৭ থেকে ১৯১১। এ সময়টি বিচিত্র ও গতিশীল পরিবর্তনের কাল। এ সময় বাংলার সমাজ সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্ম রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বহুবিধ পরিবর্তন, সংঘাত সংঘটিত হয়েছে। তাঁর জীবনকালে এ দেশে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বহুবিধ বিদ্রোহ হয়েছে। সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৮-৫৯) প্রভৃতি সংগ্রামে মানুষ ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে। তাঁর সময়কালে জারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫) এবং মুসলীম লীগ (১৯০৬) গঠিত হয়। বঙ্গভঙ্গ, স্বরাজ, স্বদেশী আন্দোলন দানা বাঁধে। এ সময় হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়েছে। মুসলমানেরা নিজস্ব সংগঠন হিসেবে মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৫), মোহামেডান সোসাইটি (১৮৬৩), সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান (১৮৭৮) গঠিত হয়। কালের এ বিচিত্র ধারাতেই তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। বিচিত্র অভিজ্ঞাতার আলোকে সমাজচিত্রকে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা উপন্যাস, গল্প, হেঁয়ালী, আত্মজীবনী, নাটক, কবিতা সবই সমাজচিত্রের সত্যভাষণ।

তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ রত্নবতী প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। এর পূর্বে বিদ্যাসাগর ও মাইকেলের সবগুলো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমেরও একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের কল্যাণে বাংলা সাহিত্য আধুনিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত বাঙ্গালী মুসলমানরা তখনও পয়ার ছন্দে ত্রিপদীতে বটতলার দোভাষী পুঁথি রচনায় ব্যস্ত ছিলেন। মশাররফ হোসেনের পূর্ব পর্যন্ত পদ্যে লেখা মুসলমানদের একমাত্র রচনা তাহেরুন্নেসার একটি প্রবন্ধ যা বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সময়ের দিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যায় প্যারিচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৭)’ বঙ্কিম চন্দ্রের দূর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৫) ও কপাল কুণ্ডলা (১৮৬৬) প্রকাশের অব্যবহিত পরেই মীর মশাররফ হোসেনের রত্নাবতী প্রকাশিত হয়। রত্নবতী সাহিত্য প্রকাশের ভাষায় শক্তিশালী গদ্য রচনায় দক্ষতা প্রকাশ পায়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের মধ্যে একমাত্র মীর মশাররফ হোসেনেই সাহিত্য সৃষ্টির অগ্রপুরুষ। অবশ্য তা অর্জনের জন্য লেখককে দীর্ঘদিন গদ্য রচনায় অনুশীলন করতে হয়েছে। বার/তের বছর বয়স থেকেই তিনি বাংলায় হেঁয়ালী লিখতে শুরু করেন যা অল্প সময়ে ‘মশার হেঁয়ালী’ বলে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা প্রথম হেঁয়ালী----

কামারের মার ফেলে

পাঁঠার ফেলে পা

লবঙ্গের বঙ্গ ফেলে

বেছে বেছে খা

-----উত্তর : কাঁঠাল

Additional information