শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১৩

মশাররফ হোসেন জমিদার পুত্র। পিতা বাংলা চিঠিপত্র এবং জমিদারী সংক্রান্ত কাজ দশ বছরের বালক মশাররফকে দিয়ে করাতেন। তাঁর গদ্য সাহিত্যের সূচনা ঘটে পনের বছর বয়সের মধ্যে। তিনি প্রথম গদ্য বই পড়েন সংস্কৃতি সাহিত্যিক বানভট্রের কাদম্বরী গ্রন্থের বাংলা ভাবানুবাদের ভাবানুবাদ। এর উপলদ্ধি তাঁর কাছে কষ্টকর ছিল। সাহিত্য পাঠের প্রতি বাল্যকাল থেকেই তিনি নিষ্ঠাবান ছিলেন। ১৮৬৫ সালে তিনি যশোর জেলার মক্তারপুরে বাস করতেন। মুক্তারপুর থাকাকালে তিনি কলিকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ এবং কাঙ্গাল হরিনাথ কর্তৃক সম্পাদিত কুমারখালি থেকে প্রকাশিত ‘গ্রাম বার্তা’ পত্রিকায় লিখতেন। তিনি নিজেও কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতৈষী’ প্রত্রিকার সম্পাদনা করতেন। পরে পাংশা থেকে প্রকাশিত রওশন আলী সম্পাদিত ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেখা প্রকাশিত হত। মুসলমান লেখকদের ‘সোনাভান’ ‘আমীর হামজা’ সাহিত্য থেকে মশাররফ সুললিত, শক্তিশালী গদ্য সাহিত্যের জন্ম দেন।

বঙ্কিম চন্দ্র ও মীর মশাররফ হোসেন স্বীয় ক্ষেত্রে মৌলিকত্বের দাবিদার। রত্নবতী প্রকাশের আগে বঙ্কিমের যে ‍দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল তা মশাররফ হোসেন পড়েননি। বিষয়টি তাঁর লেখা আমার জীবনী থেকে জানা যায়। বঙ্কিম ও মশাররফ সমসাময়িক, তবে তাঁরা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নিজেদের জগতে বাস করতেন। তবে তাদের গদ্যের উৎস ছিল অভিন্ন। রামনাথ বসু, উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয় কুমার দত্ত এবং সর্বোপরি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক পরিশীলিত ও উন্নত সাহিত্য বঙ্কিমচন্দ্র ও মশাররফ হোসেনের গদ্যের মূল অবলম্বন। এখানে মীর নিজস্ব স্টাইল অবলম্বন করেছেন যার সকল চরিত্র মানুষ। বিশেষ করে সাধারণ, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। সে সময়ের একমাত্র নগরী কলিকাতায় সময় কাটিয়েছেন, সপরিবারে বসবাস করেছেন কিন্ত তাঁর জীবনের প্রধান অংশ কাটিয়েছেন বাংলার অতি বিস্তৃত অঞ্চলে। বহু বিচিত্র মানুষের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। ছিল ব্যাপক ঘনিষ্ঠতা। কুষ্টিয়া, পদমদী, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার, বগুড়া, কৃষ্ণনগর তাঁর জীবনের ঘনিষ্ঠ অংশ। তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থক্লিষ্টতা, জীবন সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব কলহ, শ্রেণি বিশেষের লাম্পট্য, বিলাসিতার সকল বৈচিত্রের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। সকল বিষয়কে তিনি সততার সাথে সত্যনিষ্ঠ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে। এ কারণেই তিনি ‘সত্যকথন ও সত্য ভাষণের’  সাহিত্যশিল্পী বলে মূল্যায়িত। তিনি একাধারে গল্প, নাটক, প্রহসন, নক্সা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, আত্মজীবনী, কবিতা, ধর্মীয় গ্রন্থ, ট্রাজেডি রচনা করেছেন। সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর দীপ্ত পদচারণা রয়েছে। তাঁর রচনায় তদানীন্তন অভিজাত ও দরিদ্র মুসলমান, বৃটিশদের নিপীড়ন, শোষণ, জমিদারদের লাম্পট্য, রক্ষণশীলতা, পশ্চাৎপদতায় সমাজ অগ্রায়নের চিত্র পাওয়া যায়।

তাঁর সাহিত্য সাধনার চল্লিশ বছরকে ৪টি পর্বে ভাগ করে তাঁর সাহিত্য কর্মের চেতনা, সমৃদ্ধি, বন্ধ্যাত্ব, শিল্পবোধের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

প্রথম পর্ব : ১৮৬৯-১৮৭৩

এ সময় তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির শুরুর কাল। কিন্তু পারিবারিক নানা সংঘাতে তিনি সাহিত্যের প্রতি অতিমনোযোগী হয়েছেন তা বলা যাবে না। এ সময় বিষয়াদীর বিবাদসহ দাম্পত্য সঙ্কট সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এ পর্বে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ রত্নবতী (১৮১৯), ‘গৌড়ি সেতু’ বা গড়াই ব্রিজ (১৮৭৩), ‘বসন্ত কুমারী’ নাটক (১৮৭৩) এবং জমিদার দর্পণ (১৮৭৩)।

দ্বিতীয় পর্ব : ১৮৭৪-১৮৮৪

মীর মশাররফ হোসেন এ সময় বিবি কুলসুমকে বিবাহ করেন। এ সময়ে তাঁর জীবনে দাম্পত্য সঙ্কটকাল এবং সৃষ্টির ক্ষেত্রে শূন্যকাল বলা হয়। স্বপত্নীদের যন্ত্রণায় বিদীর্ণ মশাররফেএ সময় কিছুই লেখেননি। কেবল একটি ক্ষুদ্র প্রহসন ‘এর উপায় কী’  ১৮৭৫ এ তিনি রচনা করেন।

Additional information