শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১৪

তৃতীয় পর্ব : ১৮৮৫-১৮৯১

এ সময়টি মীরের উজ্জ্বল সময়। এ পর্বে তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্ম ‘বিষাদ-সিন্ধু’, তিনি রচনা করেন। এ সময়ের রচনা ‘বিষাদ-সিন্ধু’, ‘সঙ্গীত লহরী’, ‘গোজীবন’, ‘বেহুলা গীতাভিনয়’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ প্রভৃতি।

চতুর্থ পর্ব : ১৮৯২-১৯১১

এ সময়কালে মীর মশাররফ হোসেন স্বজাত্ববোধে রচনা করেছেন নানা ইসলামী গ্রন্থ। ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’, মৌলুদ শরীফ’, ‘মুসলমানদের বাংলা শিক্ষা প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ’, ‘বিবি খোদেজার বিবাহ’, ‘হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ’, ‘মদিনার গৌরব’, ‘মোস্লেম বীরত্ব’, ‘আমার জীবনী’ ‘বিবি কুলসুম প্রভৃতি। এ সময়ের লেখায় শিল্পগুণ নানা ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে ‘আমার জীবনী’ ও ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ ‘বিবি কুলসুম’ গ্রন্থে শিল্পগুণ ব্যবহৃত হয়নি। এ সময়ের লেখাকে অনেক সমোলোচক তাঁকে যুক্তিহীন ধর্মীয় আচছন্নে বিপন্ন মানসিকতার দায়ভার চাপিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর ওপর এক তরফা দায়ভার চাপানো ন্যায়সঙ্গত নয়। তিনি এ সময়ে কেবল স্বজাতীয় মুসলমানদের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, শিক্ষার বিমুখতা, পশ্চাৎপদতা দেখে ব্যথিত হয়েছেন। তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে সে বিষয়গুলো তুলে ধরে তার প্রতিকারকল্পে সাহিত্য রচনা করেছেন। এখানে তাঁর ভাষা ব্যবহাররীতি যেমন প্রশসাংসার দাবিদার তেমনি তা সমকালীন সমাজের ঐতিহাসিক দলিল। মুসলমান সমাজের গ্লানির চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন আন্তরিকতার সাথে। এ প্রসঙ্গে তাঁর লেখা----‘৬০ বৎসর পূর্বে (বর্তমান থেকে প্রায় ২০০ বছর পূর্বে) বঙ্গে মুসলমান কী রুপ শোচনীয় দশা ছিল তা ভাবিলে অঙ্গ শিহরিয়া ওঠে। আমি সেই দুর্ঘটনা যাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি তাহাই জীবনীতে সন্নিবেশিত কবির। জাতীয় বিদ্যা শিক্ষায় শৈথিল্য, জাতীয় ভাব রক্ষায় শৈথিল্য, শাসন, বিচার, রাজ্য বিভাগ, সমগ্র বিভাগেই মোসলমান শূন্য। বিজাতীয় ভাষার কল্যাণে রাজপুরুষদিগের সহিত মাখামাখি ভাব। কাজেই নির্জীব নিরক্ষর বঙ্গীয় মুসলমান কার্যে তাহাদেরই আদর্শ গ্রহণ করিয়াছিলেন। অনেক বড় বড় জমিদার ধনী মুসলমান জোড়া জোড়া প্রতিমা তুলিয়া আশ্বিন মাসে প্রতিমা কল্যাণে হাজার হাজার বাহবা গ্রহণ করিয়াছিলেন।’ (আমার জীবনী পৃষ্ঠা-৮৪)। অন্যত্র----‘আমি সেই সময়ের কথা বলিতেছি। পঠন পরিচ্ছেদ হিন্দুয়ানী, চালচলন হিন্দুয়ানী, রাগ ক্রোধ হিন্দুয়ানী, কান্নাকাটি হিন্দুয়ানী, মুসলমানদের নামও হিন্দুয়ানী। যথা- সামসুদ্দিন - সতীশ, নাজমুল হক-নাজু, বোরহান-বীরু, লতিফ-লতু, মশাররফ-মশা, দায়েম-ডাশ, মেহেদি-মাছি, ফজলুল করিম-ফড়িং এই প্রকার নামে ডাকা হয়।’ (মশাররফ রচনা সম্ভার পৃষ্ঠা-২৫০)।

শিক্ষার ক্ষেত্রে তৎকালীন মুসলমানদের অনীহা ও অবজ্ঞার প্রসঙ্গে তাঁর মাতামহীর মনোভাব এভাবে ব্যক্ত করেছেন। -------

‘কুমার খালিতে ইংরেজি স্কুল হইয়াছে, বাটি হইতে ছয় মাইল ব্যবধান, তারপর ইংরেজি পড়িলে পাপ তো আছই। আর মরিবার সময় গিডিমিডি করিয়া মরিতে হইবে। আল্লাহ রাসূলের নাম মুখে আসিবে না। তার পরেও আত্মিয় স্বজন, গুরুজনদের ধারণা যে, ইংরেজি পড়িলে একরুপ ছোটখাটো শয়তান হয়। দাঁড়াইয়া প্রস্রাব করে, সরাব খায়। হালাল হারাম প্রভেদ নাই। পাক নাপাকে জ্ঞান থাকে না। মাথার চুল খাট করিয়া নানা ভাবে ছাঁটে সাহেবী পোষাক পরে।’ (আমার জীবনী) মশাররফ হোসেন কেবল মুসলমান সামাজের দুর্দশা, সংস্কার, রক্ষণশীলতা ও সঙ্কীর্ণতার বিষয়কে তুলে ধরেননি এর প্রতিকারকল্পে তাঁর সযত্ন সাহিত্য প্রয়াস লক্ষণীয়। বিষাদসিন্ধু সাহিত্যের শিল্পগুণে প্রশংসিত। তা সত্বেও মুসলমান সমাজে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত। মশাররফ হোসেনের পরচিয় তিনি সাহিত্য শিল্পী। মানবিক মূল্যবোধই সাহিত্যের আসল উপাদান।

Additional information