শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১৫

এ উপাদানকে অক্ষুন্ন রেখে তিনি বিষাদসিন্ধুর বিষয়বস্তুকে এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন যেখানে গ্রন্থটির পাঠক প্রবল মানসিক বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ভাবাবেগেরে এ বেদনা সাহিত্য গণ্ডিতে কেবল ট্রাজেডি হিসেবে পাঠকের অশ্রুপাত ঘটায় না, গ্রন্থের পাঠক অবচ্ছন্ন চেতনায় আড়ষ্ট হয়। এখানে শিল্পের সাথে জীবন, জীবিকা এবং সমাজতত্ত্বের সমন্বয় ঘটেছে। এ বিষয়ে মুনীর চৌধুরীর অভিমত -----‘বিপরীত ধর্মী সরলতা ও জটিলতা, গতানুগতিতা, মৌলিকতা সাম্প্রদায়িকতা, ধার্মীকতা, গ্রাম্যতা ও নাগরীকতা, মধ্যযুগীয়তা ও আধুনিকতা, সকলই মীরের স্বভাবজাত। বিগত কালের  রসবোধ ও জীবন চেতনার যে প্রকাশ পুঁথি সাহিত্যে লক্ষ্য করি, মীর-মানস তার সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেনি।’  এ কথা সত্য যে, বিষাদ সিন্ধুর চেতনা মুসলমান সমাজকে নবচেতনার উন্মেষ ঘটায়। ফলে মুসলমান সমাজ গ্রন্থটিকে ধর্মীয় পুস্তক হিসেবে ভেবে নেয়। গ্রন্থটি মুসলমান সমাজের রেনেসাঁর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। এরপর মীর রেনেসাঁর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। এরপর মীর রেনেসাঁভিত্তিক হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ, হযরত বেলালের জীবনী, এসলামের জয়, মদিনার গৌরব, মোসলেম বীরত্ব হযরত মুহম্মদ (সঃ) নেতৃত্বে বদর থেকে খায়বর যুদ্ধ পর্যন্ত ঐতিহাসিক কাহিনী কাব্য রচনা করেন।

তিনি এখানেই শেষ করেননি। মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও মানবিক চেতনার বাস্তবমূখীতায় দাঁড় করিয়েছেন। মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থে তিনি যেমন মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনায় প্রবিষ্ট করেছেন তেমনি ধর্মকে ইহজাগতিক কল্যাণকামীতার কথা বলেছেন।

আল্লাহ এক।

আল্লাহ সকলের বড়।

আল্লার কোন দোষ নাই। কোন বদনাম নাই। আল্লাহর মতো কেহ নাই। তাহার মা বাপ নাই। তিনি সকলের খোরাক দেন। তিনি সকলকে বাঁচান। তিনি সকল সময় আছেন। সকল সময় থাকিবেন-----(মশাররফ রচনা সমগ্র পৃ-৪৯১) ‘২য় পাঠ পয়গম্বরের কথা’ খোদাতালার নেক বান্দা, বেগুনা অর্থাৎ পাপবিহীন। মানুষই পয়গম্বর হইয়াছেন। যিনি পয়গম্বর হন তিনি ভালো কাম করেন। খোদাতালার ইচ্ছা মানুষের যিনি প্রকাশ করেন তাঁকে পয়গম্বর বলে। তিনি ভালো কথা বলেন। মানুষ দিগকে মন্দ কাম হইতে ফিরাইয়া দেন অর্থাৎ মন্দকাম করিতে দেন না। আল্লাহুর কালাম সকলকে শুনান’---- ৪৯৩। মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা তৃতীয় পাঠে তিনি খোদাতালার কোদরত, পানি (জল), হাওয়া (বায়ু বাতাস), আগুন (অগ্নি), গাছপালা গাছগাছারা, ইত্যাদি।’ নিবন্ধকারের প্রতিটি পঙক্তিতে ধর্মীয় আশ্রয়ে সংস্কার মুক্ত মানস সৃষ্টির তাগিদ লক্ষ্য করার মত।

আমাদের সুখের জন্য, আমাদের ভালোর জন্য, আমাদের উপকারের জন্য আল্লাতায়ালা কত পদার্থ (জিনিষ দ্রব্য) প্রস্তত করিয়াছেন-----সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহার দয়া অনুগ্রহ বিষয়ে কত কহিব। দেখ এই জমিন, (মৃত্তিকা মাটি) জমিনের উপর কত লাখে লাখে জানদার এবং বেজান পদার্থ সচল রহিয়াছে। কেমন খোলা জায়গায় তাহারা রহিয়াছে। আমরা জমিনের উপর চলাফেরা করি। ঘরবাড়ি বানাইয়া তাহাতে থাকিয়া - থাকি। ফল মূল তরকারি কত রকম খাইবার জিনিস জমিনে পয়দা হয়। ঐ ফল মূল তরকারি কতক আমরা খাইয়া থাকি, কতক গরু, ভেড়া, ছাগ, উট, চারপায়া জানোয়াররা খাইয়া থাকে। আমরা মরিয়া গেলেও জমিন আমাদের কাজে লাগে। ঐ জমিতেই আমাদের মরা মানুষের কবর দেই। (৪৪৫ পৃষ্ঠা)

ছোট ছোট গাছ যাহা চাষ করা জমিতে হয়, প্রথম ঐ সকল গাছ দুর্বা ঘাসের মতো দেখায়। ক্রমে উলট পালট হইয়া ভারি হয়, ফুল হয়, ছ-মাসে ফল ধরে, অল্প দিনেই পাকে। যেমন ধান, গম, ছোলা, মটর, মুগ, অরহর, মশুরী, কলাই ইত্যাদি। ঐ সকল ফসলে আমাদের খাদ্যের কত সাহায্য হইতেছে (পৃষ্ঠা-৪৯৭)। মুসলমানের বাঙ্গালা শিক্ষা প্রথম ভাগের প্রথম অংশই একটি পাঠ্য পুস্তক। মশাররফ হোসেন এ বইয়ে বাংলা বর্ণমালাসহ বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, দুই অক্ষরে শব্দ, তিন অক্ষরে শব্দ, আকার, একার, সহজ কবিতা, পড়া শেখার নিয়ম, বাংলা বার মাসের নাম, বার চাঁদের নাম, গণনাসহ পরিপূর্ণ পাঠ্য বই রচনা করেন। আরবী ফার্সির অনুশীলনের যুগে প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষা শেখার বিষয়ে এটা তাঁর আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে।

Additional information