শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১৬

মীরের বিশেষত্ব হল বৈচিত্রময় সাহিত্য রচনা। তিনি সাহিত্যকে গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে উদার চেতনা বিকাশের তাগিদে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিস্তৃত অঙ্গনে। চরিত্র চিত্রণে তার অন্যতম বিশেষত্ব হল বিক্ষেপ। ‘হায়রে পাতকী অর্থ, তুমিই সকল অনর্থের মূল’ মীরের এ উক্তি সঞ্চারিত হয়েছে সে কাল থেকে একালে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব সংঘাতই সমাজ উন্নয়নের দর্শন। এখানে প্রেম ভালোবাসার চেয়ে বৈষয়িকতার দ্বন্দ্ব বিক্ষেপের স্পষ্টতার ছাপ গভীর। অর্থনীতির অন্তদর্শনে টাকার এমন সংজ্ঞা কেউ দিয়েছেন বলে আমার জানা নাই।

‘হায়রে টাকা। কাটামুণ্ড ছাপযু্ক্ত রুপার ক্ষুদ্র একটি চাকতি তুমিই টাকা ! ও টাকা ! তোমার মহিমা অপার, ক্ষমতা অনন্ত। তোমাকে হাতে পাইলে মানুষ আত্মহারা, আত্মবিস্মৃত, আত্মজ্ঞানশূন্য, তত্ত্বজ্ঞানশূন্য, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া অনেকে অনেক কার্য করিয়া থাকে। তোমার অসাধ্য নাই। টাকা, আবার তুমিই ধর্ম, তুমিই কর্ম, তুমিই স্বর্গ, তোমাতেই নরক তুমিই পালক, তুমিই সংহারক,----হায় তুমিই চালক, তুমিই বন্ধু, তুমিই মান তুমিই অপমান, তোমাতেই দয়া মায়া, শত্রুতা, মিত্রতা, প্রণয় বিচ্ছেদ ভালোবাসা। অন্যপক্ষে তুমিই শয়তান। তুমি সত তুমিই সত তুমিই অসত। তুমিই পণ্ডিত, তুমিই বিদ্যান, রায় সাহেব, বাহাদুর, রাজা মহারাজা। আরো বলিব। তুমিই সুন্দর, অতি সুন্দর, তুমিই জীবন, তুমিই যৌবন। তোমাতেই গৌরব, তোমাতেই অন্ধাকার, তোমাতেই মিষ্টি তোমাতেই সৃষ্টি। তুমিই প্রকাশ্য, তুমিই গোপন। তোমাতেই পিরীত প্রণয় বিবাহ, তোমাতেই ঝগড়া, বিবাদ, বিবাহবিচ্ছেদ। তুমিই বল, তুমিই বৃদ্ধি। জনমে তুমি, জীয়ন্তে তুমি, জীবনান্তেও তুমি। ----- গাজী মিয়ার বস্তানী।

জৈবিক ও ভাব চেতনার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি মানুষের সামগ্রিক বিকাশ। মীরের সাহিত্যে উভয়ের সম্মিলন দেখতে পাই। বিষাদ সিন্ধু, বিবি কুলসুম, রত্নবতী (রুপকথামূলক গল্প), বসন্তকুমারী নাটক, সঙ্গীত লহরী, তহমিনা, টালা অভিনয় ইত্যাদিতে ভাবজগতের বিষয় অন্যদিকে------আমার জীবনী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গো-জীবন, গৌড়ি সেতু, জমিদার দর্পণ, গাজী মিয়ার বস্তানী জৈবিক তথা জীবন চেতনার বিষয় বিধৃত হয়েছে। শেষোক্ত গ্রন্থগলি মূলত জীবনের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক বিষয়ের সত্যনিষ্ঠ বিবৃতি।

মীর মশাররফ হোসেনের সুদীর্ঘ বছরের সাহিত্য সাধনার সবচেয়ে বড় অবদান জমিদার দর্পণ নাটক। প্রায় সোয়াশত বছর পূর্বে প্রকাশিত এ নাটকে তিনি জমিদারী ব্যবস্থার অভিশাপ, অপক্রিয়াই নয় তৎকালীন জীবন ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। নাটকটি মঞ্চস্থ হলে বিভিন্ন স্থানে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে পাবনায় সাধারণ মানুষের তুমুল লড়াই বেঁধে যায়। কেবল সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র বা শৈল্পিক গুণেই নয় সমাজচিত্রে বস্তুনিষ্ঠ রুপায়নের কারণেই সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও জমিদার দর্পণ আজাও বাঙালি পাঠকের নিকট পাঠনীয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল টেক্সট বুক বোর্ড উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির বাধ্যতামুলক বাংলা বিষয়ের সহপাঠ্য হিসেবে নির্বাচিন করেছে। মানব জাতির আর্থ সামাজিক বিকাশের ধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে সামন্তবাদ ও সামন্ত শাসন এক অমোঘ ধারা। এ ধারায় ইংরেজ শাসনকালের প্রত্যক্ষদর্শী মশাররফ হোসেন জমিদারী ব্যবস্থার কুফল, শাসক-শোষিত সম্পর্কের হৃদয়হীনতা, সাধারণ প্রজার উপর জমিদার শ্রেণির নির্মম নিস্পেষণ, জমিদার রাক্ষসের কাছে নারীর চরম লাঞ্ছনা এসব বিষয় উঠে এসেছে জমিদার দর্পণ নাটকে। সত্য কথনের নায়ক সাহিত্যিক অকপটে জমিদারদের লাম্পট্যের কথা বলতে যে শুরু করেছেন স্বপরিবারের চিত্র অবলম্বনে-----

‘নিরপেক্ষভাবে আপন মুখ দর্পণে দেখিলে যেমন ভালোমন্দ বিচার করা যায়, পরের মুখ তত ভালো হয় না। জমিদার বংশে আমার জন্ম, আত্মস্বজন সকলেই জমিদার, সুতরাং জমিদারের ছবি অঙ্কিত করিতে বিশেষ আয়াশ আবশ্যক করে না। আপন মুখ, আপনি দেখিলেই হইতে পারে। সেই বিবেচনায় জমিদার দর্পণ সম্মুখে ধারণ করিতেছি।’ এ থেকেই বোঝা যায় জমিদারী ব্যবস্থার বহুমাত্রিক রুপ অঙ্কনই ছিল মশাররফের মূল উদ্দেশ্য। নট-নটীর সঙ্গীতে জমিদার ব্যবস্থার অনাচার উপস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এভাবে-------

Additional information