শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১৭

হা ধর্ম। তোমার ধর্ম লুকালো ভারতে, জমিদার অত্যাচারের ডুবিল কলঙ্কে।

সোমপ্রকাশ পত্রিকা নাট্যকাহিনীর সত্যতার প্রতি এভাবেই মতামত প্রকাশ করেছিলেন-----

যাহারা কলিকাতায় বা তাহার সন্নিকট বাস করেন তাহারা মনে করিতে পারেন গল্পটি অত্যুক্তি দোষে দূষিত। আমরা মনে করি না। আমরা দূর মফস্বলস্থ কোনো কোনো জমিদারের চরিত বৃত্তান্ত বিশেষরুপে অবগত আছি। তাহাতে কোনোরুপেই আমাদের এরুপ বোধ হইতেছে না যে গল্পটাতে অতুক্তি দোষের গল্প আছে। গ্রন্থকার দূর মফস্বলে বাস করিয়া থাকেন, অতএব মফস্বলের জমিদারেরা যে সকল কাণ্ড করেন তাহা তাহারা অবহিত নয়। হয়তো এরুপ ঘটনা হইয়াছে, তাহার অন্যতম জ্ঞাতি যে অত্যাচার করিয়াছেন, তিনি স্বচক্ষে দেখিয়া তাহার বর্ণনা করিয়াছেন। গল্পটির সামান্যভাবই তাহার রুঢ় বর্ণনায় যথার্থ সপ্রমাণ করিয়া দিতেছে। আমাদিগের স্পষ্ট বোধ হইতেছে, গ্রন্তকারের যদি কিছু মিথ্যা যোগ করিবার ইচ্ছা থাকিত তিনি নানা প্রকার অলঙ্কার দিয়া গল্পটিকে সুশোভিত করিয়া তুলিতেন।

মীর মশাররফ হোসনে তাঁর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, জমিদার দর্পণ হাতে লিখিয়া আমার বাটিতে কুমারখালিতে কয়েকবার অভিনয় করা হয়। শেষ অভিনয় দিনে আনার মোল্লাকে (এই মোল্লার স্ত্রীই জমিদারের অত্যাচারে প্রাণ হারাইয়াছিল) উপস্থিত করিয়া দেখান হইয়াছিল। সত্য ঘটনামূলক অভিনয় করার সময় নাট্যেল্লিখিত ব্যক্তিগণ সকলেই জীবিত। (আবুল আহসান চৌধুরী মীর মশাররফ হোসেন, িসাহিত্যকর্ম ও সমাজচিন্তা বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা-১৮৬)। বাস্তম ঘটনা অবলম্বনে রচিত বলে জমিদার ও তাদের সহযোগী অনুগত গোষ্ঠী মীরের প্রতি প্রবল রুষ্ট হল। নাটকটি মীরের জ্ঞাতিভাই পদমদীর নবাব মীর মোহাম্মদ আলীকে উৎসর্গ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-----‘সামান্য উপহার স্বরুপ, অবজ্ঞাসহ কীঙ্করের ন্যায় জমিদার দর্পণ সম্মুখে ধারণ করিতেছি। একবার কটাক্ষপাত করিয়া যত্নে রক্ষা করিবেন। এই আমার প্রার্থনা। অনেক শত্রু দর্পণখানি ভগ্ন করিতে প্রস্তুত হইতেছে।’

সত্য ঘটনা অনুসরণে রচিত জমিদার দর্পণ ঊনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মই নয় এটা দলিল বিশেষ। মীরের এ সাহসী কর্ম কেবল সাহিত্য কর্মে নয় আজও শোষক, লম্পট, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিল্পকর্ম। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ (১৮৬০) নাটক প্রকাশের তের বছর পর জমিদার দর্পণ নাটক প্রকাশিত হয়। এ সময় দর্পণ নাটক লেখার একটা প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। তারমধ্যে কালের দলিল হিসেবে নীল দর্পণের মতো জমিদার দর্পণ নাটকের ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জমিদারি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন প্রচণ্ড আঘাত ইতিপূর্বে অন্য কোনো সাহিত্যিকের রচনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ চেতনার বিস্ময়কর পরিচয়। তাঁর রচনাসমূহ শৈল্পিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কালোত্তীর্ণ শিল্পের মর্যাদায় অভিষিক্ত।

সভা সমিতিতে মশাররফ হোসেনের সংশ্লিষ্টতা

মশাররফ কিছু কিছু সভা সমিতির সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। টাঙ্গাইলের অবস্থাকালে তিনি বেশ কয়েকটি সংগঠনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। কুষ্টিয়ার ‘স্টুডেন্টস মাজকারাতুল ইসলমা - ই - কুষ্টিয়া’র সঙ্গে তার যোগ ছিল। তাই এই সংগঠনের এক অনুষ্ঠানপত্র (১১ মে, ১৯০২-সভাপতি) ও শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের (১৮৬০-১৯৩৩) দিনলিপি থেকে জানা যায়।

Additional information