শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-৭

কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল পাংশার বাগমারা গ্রামের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, জাতীয় চেতনার দিশারী ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু। নজরুল বন্ধুত্বের গভীর আলিঙ্গনে মোতাহার হোসেনকে ডাকতেন, আমার মতিহার। তাদের বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তাঁর অমর প্রতিদান। মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র গবেষক, শিল্পী সনজিদা খাতুন রচিত ‘মোতাহার হোসেন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা এল তাদের বাড়িতেই থাকতেন। নজরুল যেমন ছিলেন জাতীয় চেতনায় বিদ্রোহী সত্ত্বার অধিকারী তেমনি দৈহিক শক্তি প্রয়োগে বিদ্রুপ নিরসনের নায়ক। একদিন ঢাকায় দুইদল যুবক পরস্পর ঝগড়ার পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে নজরুল তা নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুলের কথা তারা শুনছিল না। এক পর্যায়ে নজরুল একটি লাঠি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘোরাতে থাকেন এবং সকলকে তাড়িয়ে দেন। এই লাঠি নিয়েই মোতাহার হোসেনের বাসায় যান। এই লাঠিটি দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিল আর লাঠির নামকরণ হয়েছিল নজরুল মারা লাঠি। বন্ধুত্বের সূত্রে নজরুল কয়েকবার মোতাহার হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগমারা এসেছেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম সহসঙ্গী মোতাহার হোসেনের উদ্দেশ্যে ‘দাড়ি বিলাপ’ কবিতাটি রচনা করেন। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় কোনো প্রফেসর বন্ধুর দাড়ি কর্তন উপলক্ষে লেখা আছে।

হে আমার দাড়ি

একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি

আমারে কাঙ্গাল করে শূন্য করি বুক

শূন্য এ চোয়াল আজি, শূন্য এ চিবুক।

কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই দাড়ি কামাতেন না। দাড়ি ওঠার ১১ বছর পর তিনি একবার দাড়ি কর্তন করলে কবি এ কবিতাটি রচনা করেন। এ প্রসঙ্গে পাথেয় ১৩৩৫ সালে ঢাকার সাপ্তাহিক দরদীতে এবং দাড়ি বিলাপ মাসিক ‘শান্তি’তে প্রকাশিত হয়। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় উল্লেখিত কোনো প্রফেসর বন্ধু হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (নজরুল রচনাবলী, প্রাগুপ্ত, পৃ-৬৫৫)। ঢাকার বিদূষী কন্যা ফজিলাতুননেসার সঙ্গে নজরুল প্রণয়ে প্রয়াসী হন। এর মাধ্যম ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। শিল্পী কাজী আবুল কাশেম (রাজবাড়ি) নজরুলের লেখা ‘দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ কার্টুন এঁকে নজরুলকে দেখান। নজরুল তা দেখে খুব হেসেছিলেন।

সাহিত্যিক কাজী আবদুল ওদুদ (বাগমারা নিবাসী) কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত গুণগ্রাহী ছিলেন। এদিকে কাজী মোতাহার ও আবদুল ওদুদ একই গ্রামবাসী ও হরিহর বন্ধু। কাজী নজরুল আবদুল ওদুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সূত্রে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনে উভয়কে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৯) রচনা করেন। চল্লিশের দশকের প্রথমে আব্দুল ওদুদ কলিকাতাবাসী হন। এ সময় কাজী নজরুল ও তার পরিবারের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সাল। নজরুল পরিবারে তখন দুরাবস্থা। নানাভাবে নজরুলের চিকিৎসা করান হলেও উন্নতি নেই। আর্থিক অনটন লেগেই আছে। আব্দুল ওদুদ পরিবারে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। কবির উন্নত ও শেষ চিকিৎসার জন্য কবিকে ইউরোপ পাঠান দরকার। অনেক টাকার প্রয়োজন। কাজী আবদুল ওদুদের উদ্যোগে কলিকাতায় ‘নজরুল সাহায্য সমিতি’ গঠন করা হল। তাঁর উদ্যোগেই নজরুলকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তারপর ভিয়েনা। নজরুল সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এভাবেই রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।

Additional information