শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-৮

রাসসুন্দরী দেবী

রাসসুন্দরী দেবীবাংলা গদ্য সাহিত্যে ১৭৮০ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত পণ্ডিতগণ বিপ্লবের কাল বলে চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এ সময়ের মধ্যে জোনাথান ডানকান, ফরস্টার, কেরী, ডিরোজিও, ঈশ্বর গুপ্ত, প্যারিচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পরিপূর্ণ আধুনিকায়নের কাজটি সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ, শরৎচন্দ্রসহ অনেকে সাহিত্যকে অতি উচ্চমানে অধিষ্ঠিত করেন। সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা অনেক। সেক্ষেত্রে অবরোধবাসিনী মহিলাদের সংখ্যা অত্যল্প। মহিলাদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো নাম রাসসুন্দরী দেবী (প্রথম জীবনী লেখিকা), কেলাসবাসিনী দেবী (প্রথম গদ্যগ্রন্থের লেখিকা), জ্ঞানদান নন্দিনী দেবী (প্রথম আধুনিক সাহিত্য), বিবি তাহেরন নেসা (প্রথম মুসলমান গদ্য লেখিকা), কৃষ্ণ ভবানী দাস (প্রথম নারী প্রগতিবাদী), বেগম রোকেয়া (প্রথম নারীবাদী)। সাহিত্য বিকাশের এ বিপ্লবের কালে তো নয়ই এর পরবর্তীতেও আত্মজীবনীকার সামান্য। তারমধ্যে রাস সুন্দরী প্রথম জীবনী লেখক। রাজবাড়ির ভররামদিয়াতে প্রায় ৮০ বছর স্বামীগৃহে বসবাস করেছেন। পারিপার্শিকতায় তিনি সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য। ফলে তিনি সাহিত্য বিকাশে যেমন স্মরণীয় তেমনি রাজবাড়ির এক মহীয়সী নারী।

সাহিত্য মূলত গদ্য,পদ্য, গল্প, উপন্যাসের ধারা। এ ধারার আত্মজীবনী দালিলিক উপন্যাস। উপন্যাসে যেখানে জীবন বিবৃতিতে কল্পনার আশ্রয় থাকে আত্মজীবনী সেখানে একবারেই জীবন কাহিনীর সত্যভাষণ। ফলে উপন্যাসের চেয়েও আত্মজীবনী অধিক মাত্রায় হৃদয়মোথিত সৃষ্টিকর্ম। রাসসুন্দরীয় সাহিত্য কর্মের ভাণ্ডার বিপুল নয়। তবে যে কাজটি তিনি করে গেছেন কাল বিচারে তা অমূল্য সম্পদ। যেকালে নারী তো নয়ই, পুরুষদের মধ্যেও এ অঞ্চলের গ্রাম সমাজের দু-দশ মাইলের মধ্যে পুঁথি পাঠের লোক মিলত না সে সময় রাসসুন্দরী আত্মপ্রচেষ্টায় কেবল পুঁথিপাঠ, ধর্মপাঠই আয়ত্ত করেননি, লেখেন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ-----আমার জীবন। গ্রন্থটির ভাষা মাধুর্য এতটাই শৈল্পিক যে গ্রন্থটি পাঠ করলে মনে হবে আধুনিক লেখকের কোনো লেখা পাঠ করছি।

‘ছেলেদের জন্য বাংলা স্কুল আমাদের বাড়িতেই ছিল। একজন মেমসাহেব সেই স্কুলে গ্রামের সমস্ত ছেলেকে লেখা ও পড়া শিখাইতেন। আমার খুড়া আমাকে কালো রঙের একটা ঘাঘড়া পরাইয়া একখানি উড়ালী গায়ে দিয়া সেই স্কুলের মেম সাহেবের কাছে বসাইয়া রাখিতেন। আমি সকল দিবস সেই স্কুলেই থাকিতাম। তখন ছেলেরা ক-খ চৌত্রিশ অক্ষর মাটিতে লিখিত, যুক্ত অক্ষরও লিখিত, পরে এক নড়ি হাতে লইয়া ঐ সকল অক্ষর উচ্চস্বরে পড়িত। আমি মনে মনে ঐ সকল পড়াই শিখিতাম।’ এখানে পাঠক কেবল সাবলীল ভাষার সাহিত্যে মুগ্ধ হবেন না এরমধ্যে ব্যবহৃত ঘাঘড়া, উড়ালি, নড়ি ইত্যাদি ব্যবহৃত শব্দ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উপাদান। এছাড়া ঊনিশ শতকের শুরুতে শিক্ষা প্রণালীর চালচিত্র পাওয়া যায় এখানে। তাঁর মেধার পরিচয় আছে, কারণ তিনি সেসব বিষয় অন্য সকলের সাথে লিখতেন না কেবল মনে মনে আয়ত্ত করেছেন। তিনি প্রকৃত অক্ষর পরিচয় লাভ করেন যখন তার বয়স ২৫ বছর। পাবনার পোতাজিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া রাসসুন্দরীর ১২ বছর বয়সে বিবাহ হয় রামদিয়ার জমিদার বংশে সীতানাথের সঙ্গে। যখন তিনি অক্ষরজ্ঞানী হলেন তখন তাঁর প্রথম সন্তান বিপিন বিহারীর বয়স সাত বছর।

মানুষের মানসিক শক্তি আর ঐশ্বরিক আবেদন, চেতনা বিকাশের অন্যতম শর্ত। এ বিষয়টি রাসসুন্দরীর মধ্যে ছিল সহজাত। তাঁর জীবনীতে লিখেছেন ----‘যিনি স্বপ্ন দেখলেন তিনি যেন চৈতন্য ভাগবত পড়িতেছেন। সেই অবধি দিনরাত পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি। আমাকে পড়তে শেখাও, আমি যেন চৈতন্য ভাগবত পড়িতে পারি। আহা কী আশ্চর্য ! দয়াময়ের কী দয়ার প্রভাব। আমি যেমন মনে মনে এই সকল চিন্তা করিতেছিলাম, অমনি তিনি আমার মনোবাঞ্চা পূর্ণ করিলেন।

Additional information