শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-৯

আমি পাকের ঘরে পাক করিতে করিতে শুনিলাম কর্তা (স্বামী) বিপিনকে ডাকিয়া বলিতেছেন বিপিন, আমার চৈতন্য ভাগবত পুঁথি এখানে থাকিল। আমি যখন তোমাকে লইয়া যাইতে বলিব তখন তুমি লইয়া যাইও। বলিয়া তিনি বাহির বাটিতে গেলেন। আমি এই কথা শুনিলাম। তখন আমার মনে যে কি পর্যন্ত আনন্দ হইল তাহা বলা যায় না। আমি অতিশয় পুলকিত মনে তাড়াতাড়ি গিয়া দেখিলাম, সেই চৈতন্য ভাগবত খানি বিদ্যামান।’ সে সময়ে শিক্ষার সঙ্কট এবং বইপত্রের আকার আয়তন ইত্যাদির বিষয়ে রাসসুন্দরীর আমার জীবন গ্রন্থখানি ঐতিহাসিক দলিল। তিনি লিখেছেন-----‘এখনকার পুস্তক সকল যে প্রকার, সেকালে এ প্রকার পুস্তক ছিল না। সে সকল পুস্তকে কাঠের আড়িয়া লাগান থাকিত। ঐ আড়িয়ায় নানা প্রকার চিত্র বিচিত্র ছবি আঁকাইয়া রাখিত। এক এক পুস্তকে এক এক প্রকারের ছবি থাকিত। আমিত লিখতে পড়িতে জানি না। কী রুপে ঐ পুস্তক চিনিব। আমি কেবল ঐ চিত্র পুত্তলিকা দেখিয়া ঠিক করিয়া রাখিলাম। পরে পুস্তকখানি ঘরের মধ্যে রাখিলে ঐ পুস্তক হইতে একটি পাতা খুলিয়া রাখিলাম। (পুঁথির পাতা সুতা দিয়া গাঁথা থাকিত, তাই একটা পাতা খুলিয়া নেওয়া সম্ভব হইয়াছিল)। পুস্তকের পাতাটি লইয়া আমি ভারী মুসকিলে পড়িলাম। হাতে করিয়া ভাবিতে লাগিলাম, কী করিব? কোথায় রাখিব?  কোথায় থুইলে কে দেখিবে। মনে মনে স্থির করিলাম যেস্থানে রাখিলে আমি সত্তর দেখিব অথচ অন্য কেহ না দেখে এমন স্থানে রাখা উচিত। আর কোথা রাখিব রান্নাঘরে হেসেলের কাছে জ্বালানি খড়ির নিচে লুকাইয়া রাখিলাম।’

গ্রন্থটি বিষয়ে দীনেশ চন্দ্র সেনের উক্তি-----‘গৃহকর্তী মুখবন্ধে লিখিয়াছেন ১২১৬ সালে চৈত্রমাসে আমার জন্ম হয়। আর এই ১৩৩৩ সালে আমার বয়ক্রম ৮৮ হইল। এই জীবনখানি ব্যক্তিগত কথা বলিয়া উপেক্ষা করা চলে না। ইহা প্রাচীন হিন্দু রমণীর একটি খাঁটি নক্সা। যিনি নিজের কথা সরলভাবে কহিয়া থাকেন। তিনি অলক্ষিতভাবে সামাজিক চিত্র অঙ্কন করিয়া যান। অক্ষর জীবন পুস্তকখানি শুধু রাসসুন্দরীর কথা নহে, উহা সেকেলে হিন্দু রমণীদের সকলের কথা। এই চিত্রের মতো যথাযথ ও অকপট মহিলা চিত্র আমাদের বাঙ্গলা সাহিত্যে আর নাই। এমন মনে হয় এই পুস্তকখানি লিখিত না হইলে বাঙ্গলা সাহিত্যের একটি অধ্যায় অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইত।’ শ্রী জ্যেতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর গ্রন্থটির প্রস্তাবনায় লিখেছেন-----‘এই গ্রন্থখানি একজন রমণীর লেখা। তাই বিশেষ কৌতুহলী হইয়া আমি এই গ্রন্থপাঠে প্রবৃত্ত হই। মনে করিয়াছিলাম যেখানে কোনো ভালো কথা পাইব সেখানে পেনসিলের দাগ দিব। পড়িতে পড়িতে দেখি পেনসিলের দাগে গ্রন্থ কলেবর ভরিয়া গেল। বস্তুত ইহার জীবনের ঘটনাবলী এমন বিস্ময়জনক এবং ইহার লেখায় এমন একটি অকৃত্রিম সরল মাধুর্য আছে যে গ্রন্থখানি পড়িতে বসিয়া শেষ না করিয়া থাকা যায় না।’ রাসসুন্দরীর জীবনী কেবল সাহিত্যঘনিষ্ঠ নয় তাঁর লেখায় এ অঞ্চলের প্রায় পৌনে দু’শ বছরের সামাজিক অবস্থা, সামাজিক সংঘাত, মানুষের আশা নিরাশা, রক্ষণশীলতা, রমণীদের অবরুদ্ধতার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি ভর রামদিয়ার গৃহবধু। বহরপুর ইউনিয়নের বহরপুরের ৮/৯ কিলো পশ্চিমে বড় রামদিয়া কালুখালি ভাটিয়াপাড়ার রেল লাইনের স্টেশন। রামদিয়ার পাশে তেঁতুলিয়া, কুরশী, বহরপুর, আড়কান্দির সামনে ক্ষীণতোয়া চন্দনা নদী। বড় রামদিয়াই উচ্চারণ ভেদে ভররামদিয়া। সে সময়ের নানা সংঘাত তার লেখায় পাওয়া যায়। ‘রামদিয়ার চার পাশেই নমশুদ্র, জেলে এবং মুসলমান প্রজা। হঠাৎ তাহাদের মধ্যে মারামারি বাধিয়া গেল। মাছমারা কোঁচ, দা, কুড়াল, প্রভৃতি লইয়া উন্মত্তের মতো যখন তাহারা একদল আর একদলের উপর ঝাপাইয়া পড়িবার  উপক্রম করিতেছে, এমন সময় অবগুণ্ঠিতা হইয়া ঐ দলের মাঝে দাড়াইলাম অন্তপুর ছাড়িয়া একবারে বিলের ধারে-----ওরে কর্তামা আইছেন ফিসফিস ধ্বনি উঠিল এবং অল্পক্ষণের ভিতরেই সমস্ত বিবাদের মীমাংসা হইয়া গেল।’

সে সময় কুরশীর প্রতাপশালী জমিদার নবাব মীর মহাম্মদ আলী জ্ঞাতি ভাই মীর সামসুল হুদা জোরপূর্বক সীতানাথের জমিদারীর অংশত দখল করতে আসেন। স্বামী কার্যোপলক্ষে রংপুরে গিয়েছেন। রাসসুন্দরী নিজেই সেখানে উপস্থিত হয়ে পর্দার আড়াল থেকে সামসুল হুদাকে বললেন, ‘আপনি উচ্চবংশীয় ও মহাবিদ্বান। দরিদ্র প্রজার উপর অত্যাচার আপনার হুকুমে হইতেছে। আমি কি করিয়া ইহা বিশ্বাস করিব? সামসুল হুদা হিন্দু নারীর এ ভাষণে এত মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে সসম্মানে কুর্নীশ। করিয়া তখনি এক স্বীকৃতিপত্রে এই বলিয়া স্বাক্ষর করিলেন যে আজ হইতে এই পুরুষানুক্রমিক বিধান একেবারে শেষ হইয়া গেল।’ সে সময়ের নারী সমাজের শিক্ষা এবং প্রতিকুলতার দালিলিক নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁর লেখা থেকে।

Additional information