শিল্পসংস্কৃতি - পৃষ্ঠা নং-১০

তাঁর ভাষায় তখনকার মেয়েছেলেগুলো নিতান্ত হতভাগা, প্রকৃত পশুর মধ্যে গণনা করিতে হইবে। বাস্তবিক মেয়েছেলেগুলোর হাতে কাগজ দেখিলে সেটি ভারি বিরুদ্ধ কর্ম জ্ঞান করিয়া বৃদ্ধা ঠাকুরানীরা অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন। সে সময়ে সামাজিক অবস্থা ছিল এমন যে মেয়েরা লেখাপড় শিখলে বিধবা হয়। সংসারে অকল্যাণ হয়। মেয়েরা আয় করবে না। লেখাপড়া শেখা মেয়েদের জন্য প্রয়োজনহীন। খ্যাতনামা গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া’ গ্রন্থের ৪৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন----‘রাসসুন্দরীর ‘আমার জীবন’ বাংলায় প্রকাশিত প্রথম আত্মজীবনী। ১৮৭৫ সালে এ গ্রন্থ যখন প্রকাশিত হয় তখন তাঁর সামনে আত্মজীবনীর কোনো আদর্শ ছিল না। তাছাড়া পরবর্তীতে যারা আত্মজীবনী রচনা করেন, তিনি তাঁদের মতো আনুষ্ঠানিক লেখাপড়াও শেখেননি। অথবা তাদের মতো তাঁর সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি ছিল না। কিন্ত সরলতা এবং আন্তরিকতার গুণেই তাঁর আত্মজীবনীটি কেবল উল্লেখযোগ্য নয় কাঠামো এবং রচনাশৈলীর জন্যও এ গ্রন্থটি বাংলা আত্মজীবনীর ইতিহাসে একটি স্থায়ী আসন দাবি করতে পারে।’

‘আমার জীবন’ এর সূচীপত্র

প্রথম

মঙ্গলাচরণ-পৃ-এ

প্রথম রচনা-পৃ-৫

কবিতা স্তর : বালিকাকাল, ছেলেধরার ভয়, গঙ্গাস্নানে গমন স্কুলের কথা।

দ্বিতীয় রচনা

কবিতা, আমার ভয় ও দয়া মাধব ঠাকুর, আমি মায়ের মেয়ে, বাড়িতে আগুন ধরা, আমরা তিন ভাইবোন নিরাশ্রয়, দয়ামাধবকে ডাক, পোড়া ভিটায় পরমান্ন। মানুষ না ঠাকুর?

তৃতীয় রচনা

কবিতা, ঠাকুর কে? মহামন্ত্র পরেমেশ্বরের নাম, আমার ছেলে, খুড়ীমার কথা, আমার প্রথম শোক, বিবাহের কথা, মা তুমি কি আমার পর করে দিবে? বিবাহের আয়োজন, আমি মায়ের কোলছাড়া হইলাম।

চতুর্থ রচনা

কবিতা, নৌকার মধ্যে, আমার ক্রন্দন ও লোকের সান্তনা, আমার আর এক মা, নতুন বধু, শ্বশুর বাটী, মাটির সাপের গল্প, আমার সংসারে কাজ, সেকালের বৌদের নিয়ম।

পঞ্চম রচনা

কবিতা, আমার লেখাপড়া শিখিবার সাধ, সেকালের লোকের আলোচনা, পরমেশ্বর তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও, রামদিয়া গ্রামের কথা, আমার পুত্র ও কন্যা, সংসারের বিবরণ।

ষষ্ঠ রচনা

কবিতা, আমার লেখাপড়া শিখিবার প্রথম বাসনা, স্বপ্নে চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য ভাগবতের একখানি পাতা, লেখা পড়ায় লোক নিন্দায় ভয়, সেকালের লোকচার।

সপ্তম রচনা

কবিতা, গৃহিনী কর্মের ভার, আমার তিনটি ননদ, জয়হরি খোরার কথা, আমার সন্তান ও সংসার সুখ।

রামসুন্দরী নিঃসন্দেহে রাজবাড়ি তথা বাঙালির গর্ব। অথচ আমরা রাজবাড়ির মানুষ এত নিকটে থেকেও আজ পর্যন্ত তাকে চিনতে পারিনি। তিনি হয়ত আমাদের অচেনাই থেকে যেতেন যদি না আমার স্নেহধন্য ছাত্রী দেবাহুতি চক্রবর্তী এক পিঞ্জরে বাঁধা বিহঙ্গীর ‘আমার জীবন’ শিরোনামে পত্রিকার পাতায় না লিখতেন। (দৈনিক সংবাদ পত্রের সংবাদ সাময়িকীতে ২৯/১০/০৯ এ প্রকাশিত) এবং ০৮/০১/০৯ তারিখে রাজবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরিতে রাসসুন্দরীর দ্বিশত জন্ম বার্ষিকী পালনের আয়োজন না করতেন। দেবাহুতি চক্রবর্তী পেশায় আইনজীবী। ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী, সাহিত্যসেবী, প্রগতিবাদী ঐতিহ্য সন্ধানী এবং নারী নেত্রী। বর্তমানে মহিলা পরিষদের সভানেত্রী। নিজেকে নিয়োজিত রাখেন নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। নারী অধিকারের প্রবক্তা। এ বছর কলিকাতায় রাসসুন্দরীর আমার জীবন গ্রন্থটি হাতে পান। বলাবাহুল্য তিনি গ্রন্থটির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং রাজবাড়ির ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় পেয়ে তিনি অহঙ্কা বোধ করেন। নানাভাবে তিনি দূর অতিতের অচেনা রাস সুন্দরীকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে সচেষ্ট হন।

Additional information