শিল্পসংস্কৃতি

শিল্পসংস্কৃতি

স্মতট পদ্মাবতী কুমার তালক মণ্ডলীয় ভূ-খণ্ডে সংস্কৃতির ধারা সতত প্রবহমান। দশম শতকীয় চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের ব্রাহ্মণ্য আনুকূল্য থেকে শুরু করে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধারণ করে আছে এই মণ্ডলীয় স্থান। উত্তরে পদ্মা আর দক্ষিণে গড়াইয়ের সমতটীয় স্থান বিশেষে বৌদ্ধ সংঘারাম, সুলতান মোগল শাসনকালে মসজিদ স্থাপত্য, সীতারামের নানা কীর্তি, নাটোর রাজের দোলমঞ্চ, নানা স্থানে প্রাচীন মাজার, মন্দির, মূর্তি প্রাচীন সংস্কৃতির নিদর্শন। পদ্মা গড়াইয়ের স্রোতধারায় এ তটীয় ভূমির মানুষের উর্বর মানস গঠনের বিশেষত্ব লক্ষণীয়। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান পর্যন্ত সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, নৃত্য, খেলার জগতে এই মণ্ডলীয় স্থান দেশ তথা বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। প্রাচীন মণ্ডলীয় এ স্থানের ব্যাপ্তি অষ্টাদশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরিদপুরের পশ্চিম ও নদীয়ার পূর্বপ্রান্ত। এ প্রান্তিকে জন্ম নিয়েছেন মীর মশাররফ হোসেন,

কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, অক্ষয় কুমার মৈত্র, কাঙ্গাল হরিনাথ, জলধর সেন, জগদীশ গুপ্ত, পরিমল গোস্বামী, সন্তোষ কুমার এর মতো দেশবরেণ্য সাহিত্যসেবী। ছেউরিয়ায় লালন শা, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠি এই মণ্ডলে। পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী আবুল কাশেম, বিশ্ববিখ্যাত ট্যাপিস্ট্রি শিল্পী রশিদ চৌধুরী, শ্রেষ্ঠতম জাতীয় পদকপ্রাপ্ত মনসুর উল করিম এই মাটির সন্তান। উপমহাদেশের তৎকালীন একমাত্র জলতরঙ্গ বাদক বামনদাস গুহরায়, সেতারাবাদক করিম বক্স, দেশবরেণ্য যাত্রাশিল্পী রাজা ভাই, খ্যাতনামা শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া, বেতার ও টিভির নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শাহীনুর বেগম, নৃত্য শিল্পী দীপ্তি গুহ, আব্দুস সাত্তার কালু আন্তর্জাতিক সাঁতারু মুন্নি আক্তার ডলি, লন টেনিস খেলোয়াড় শীবলাল ও হীরালাল, ফুটবলের কিংবদন্তি নূর হোসেন, শ্রেষ্ঠ দৌড়বিদ শহীদুন্নবী আলম, রাজবাড়ির মানুষ। অস্কার বিজয়ী নাফিজ বিন জাফর, চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি রোজিনা, শাবনুর রাজবাড়ির সন্তান। সাহিত্য সঙ্গীত বিনোদন কেবল সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয় বহন করে না। মানুষের জীবন জীবিকার চলমান ধারা তথা ভাষা, শিক্ষা, আচার আচরণ, খেলা মেলা সংস্কৃতির অঙ্গ। আবহমানকালের গণমানুষের জীবন বিকাশের ধারায় লোকজ ঐতিহ্যও সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান।

জীবনের বিকাশমান ধারায় নগর জীবনে আমরা আধুনিক হয়ে উঠি। জীবন, জীবিকা, আবাসনসহ পরিবর্তন আসে সাহিত্যে, সংগীতসহ তাল লয়ে। মিথ, লোকগাথা, ধূয়া, জারি, সারি, অষ্টক, ভাসান, খোল, করতাল থেকে আমরা সরে আসি লাইলী মজনু,তবলা, সেতারে। যাত্রা, নাটক, ফুটবল, সাঁতার, ভলি, ক্রিকেট আসে নব সংস্করণে। রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিকতার ধারায় আমরা সম্পৃক্ত হই। প্রায় দু’শো বছরের অন্তগর্ভে লালিত রাজবাড়ি জেলার সঙ্গীত, নৃত্য, যাত্রা, নাটক, খেলাধুলা, লোকজ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ইংরেজ শাসনকালের শুরু থেকে আমাদের সংস্কৃতির ধারায় নানা পরিবর্তন ঘটতে থাকে। সঙ্গীত সাহিত্য ছাড়াও খেলাধুলার বিষয়ও নতুন আঙ্গিকে ধরা দেয়। তা সত্ত্বেও লোকজ ঐতিহ্যের সামান্যতম ঘাটতি হয়নি। গাজীর গান, রামযাত্রা, রামপ্রসাদী, ধূয়া, বিয়ের গীত, অষ্টক গান, ভাসান যাত্রা, লাটিখেলা, নৌকা বাইচ এতটুকু গৌরব হারায়নি। রাজবাড়ি, পাংশা, বালিয়াকান্দির বিশেষ করে জঙ্গল ইউনিয়নে ছিল অনেক অষ্টক গানের দল। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম -বিরহের অষ্টক পালার সুর খোলা বাতাসে দিগন্তের মাঠ পেরিয়ে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে যেত। সারা চৈত্র মাস জুড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এ দলগুলো নেচে গেয়ে শ্রোতাদের মোহিত করত। অনুষ্ঠিত হত বিভিন্ন স্থানে জারি ও বিচারগান। গ্রামে গ্রামে ভাসান যাত্রা অনুষ্ঠিত হত। বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী ফিরত মুখে মুখে। রাজবাড়ি এলাকায় অনেক নামীদামী লোকজ গানের শিল্পী ছিলেন। সূর্যনগরের হাজেরা বিবি বিচার গানের কিংবদন্তি নাম। ফরিদপুরের হালিম বয়াতি এবং হাজেরা বিবির বিচার গানের প্রতিযোগিতায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটত। রাজবাড়ির কুমড়াকান্দি গ্রামের লোককবি ও মরমী সাধক নাছির শাহ ফকিরের গান এখনো মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। ‘ধর যাইয়া মুর্শীদের পায়,খেয়াল করলে পাইবা পরিচয়’


ক্ষুদ্র বৃহৎ গ্রাম আচ্ছাদনে এ জেলায় মোগল শাসনকাল থেকে বাণীবহ, বেলগাছি, পাংশা, রাজবাড়ি, খানখানাপুর, আড়কান্দি, সোনাপুর, বহরপুর, উন্নত জনপদে পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে রেল স্থাপনের ফলে গোয়ালন্দ বাংলার অন্যতম বন্দর এবং ১২টি রেল স্টেশন ও পার্শ্ববর্তী হাট বাজারে নগর জীবন বিশেষ করে রাজধানী শহর কলিকাতার নাগরিক জীবনের ছোঁয়া লাগে। মোগল শাসনকালে বাণীবহে নাগরিকতার উন্মেষে সঙ্গীত, নৃত্য, কীর্তন, ভজন, রাধাকৃষ্ণ পালা অনুষ্ঠিত হত। নবাব শাসনকালে নাটোর রাজ রামজীবনের নামে রথের মেলা বসত বেলগাছিতে। রথের মেলায় রথযাত্রা, লোকসঙ্গীত অনুষ্ঠিত হত। পুরাতন এবং নব্য জমিদার মিলে রাজবাড়িতে ছোট বড় জমিদারের সংখ্যা পঞ্চাশের কম নয়। এসব জমিদারেরা ছিল ভদ্রলোক শ্রেণির জমিদারদের দ্বারা সংস্কৃতির রুপান্তর ঘটতে থাকে। নাচঘর, লক্ষ্ণৌয়ের বাঈজী, সুরাপান আমোদ প্রমোদের উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে। এর সাথে আমদানী হয় থিয়েটার, যাত্রা, পালা গান। সঙ্গীত কলা থেকে শুরু করে বাদ্য বাজনার যন্ত্রের নাম, তাল, সুর, লয়ের, পরিবর্তন ঘটতে থাকে। রাজবাড়ির বেলগাছির জমিদার করিম বক্স ছিলেন বিখ্যাত সেতার বাদক। কথিত আছে একবার খাজনার দায়ে তাঁর জমিদারী নিলাম হলে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। একদিন তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে বসে আপন মনে সেতার বাজাচ্ছিলেন। দূর থেকে নবাব সেতারের সুর শুনে তাঁকে কাছে ডেকে পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। তাঁর সকল পরিচয় পেয়ে জমিদারী ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর সেতার বাদনের প্রসংশা করেছেন।

রাজবাড়িতে রাজা সূর্যকুমার, পদমদীর মীর মোহাম্মদ আলী, বেলগাছির করিম বক্স ও ফয়েজ বক্স, পাঁচুরিয়ার দ্বারকানাথ ঠাকুর, পাংশার ভৈরব নাথ, বাণীবহের গীরিজা শংকর মজুমদার, জামালপুরের নলীনি বাবু এবং বহরপুর ও বারবাকপুরের জমিদার, পাংশার রুপিয়াট জমিদার পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় নানা নামের থিয়েটার গ্রুপ ও সঙ্গীত দল, ক্লাব চাকারি গড়ে ওঠে। পূজা আহ্নিক উপলক্ষে যাত্রা, পালাগান, কীর্তন, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হত। জেলায় অবস্থিত চল্লিশটিরও বেশি নীলকুঠির দেওয়ান পত্তনিদার, জমিদার, রায় ও চৌধুরীদের আঙ্গীনায় নাচ গানের আসর বসত। নীলচাষের বিরুদ্ধে সে সময় আন্দোলন গড়ে ওঠে। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ, ও মীর মশাররফ হোসেনের জমিদার দর্পণ নাটক মঞ্চায়ন হত সাধারণ সচেতন গোষ্ঠির দ্বারা। এসব নীলচাষ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করেছে। কুমারখালি কাঙ্গাল হরিনাথের ‘গ্রাম বার্তা’ পাংশার রওশন আলী চৌধুরীর ‘কোহিনুর’ রতনদিয়ার প্রফুল্ল কুমারের ‘অঞ্জলী’ পাংশার নাজির হোসেনের ‘কৃষক’ ও ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা অত্র সংস্কৃতি প্রবাহের নবদিগন্তের সূচনা করে। রাজা সূর্যকুমার ছিলেন সংস্কৃতিবান ও সঙ্গীত প্রিয়। ত্রৈলোক্যনাথ লিখেছেন ‘রাত্রে রাজবাড়ির চেহারা বদলাইয়া যাইত। বৈঠকখানায় গান বাজনা আমোদ প্রমোদ চলিত। কিছুদিন পর নরেন্দ্রনাথকে পোষ্যপুত্র লওয়া হইল। তখন রাজবাড়ি হইতে মদ’ত উঠিয়া গেলই, বাদ্যযন্ত্র সব পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বিলাইয়া দিলেন। --------- বলিলেন, এসব থাকিলে ছেলে নষ্ট হইবে। তাহার লেখাপড়া কিছুই হইবে না।’ এটি ছিল রাজার বাড়ির অন্তঃপুরের ঘটনা। এ থেকে বোঝা যায় তখন কী রুপ সঙ্গীত চর্চা হত। রাজার বাড়িতে পুত্রোষ্টিযজ্ঞ খুব ধুমধাম হয়। যাত্রা থিয়েটার বাজী পোড়ানো ইত্যাদি বহু অর্থ রাজা ব্যয় করেন।

যাত্রাগান ব্যাপক সমাদর লাভ করে বিগত শতাব্দীর শুরু থেকে। যাত্রা, থিয়েটার, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রুপবান, ভাষান যাইহোক তখনকার দিনে ছেলেরা মেয়ে সেজে মঞ্চে অভিনয় করত। শ্যামবাজারের নবীনচন্দ্র বসুকে যাত্রাভিনয়ের স্রষ্টা বলা হয়। তখন কবি ভরতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর পালাই বেশি জনপ্রিয় ছিল। তিনিই মেয়েদের নিয়ে অভিনয় শুরু করেন। তারপর মদন মাস্টারের দল উল্লেখযোগ্য। নীলমণি কুম্ভর স্ত্রী যে দল পরিচালনা করতেন তা ‘বৌকুণ্ডর দল’ বলে পরিচিত ছিল। এরপর যাত্রা জগতে যথেষ্ট উন্নতি হয়। মতি রায়ের দল, পিতাম্বর পাইন, বাকেরশ্বর পাইন, ত্রৈলোক্য পাইন, বাশি অধিকার, সীতারা কোম্পানি, গজেন ভূঁইয়ার দল ইত্যাদি। এরমধ্যে রাজবাড়ির গজেন ভূঁইয়ার দল বৃটিশ বাংলায় সর্বো্চ্চ খ্যাতি লাভ করে। গজেন দত্ত প্রথমে কলিকাতায় মনমোহন থিয়েটারের অভিনেতা ছিলেন। পরে দেশে (রাজবাড়ি) এসে যাত্রা দলে যোগ দেন। আর জীতেন্দ্র ভৌমিকের ছিল ড্যান্সিং পার্টি। এই দুইজনের নামে সাধারণ দর্শক বলত, গজেন ভূঁইয়ার দল। এরপর আসে নানা নামের অপেরা পার্টি।


কালুখালি রতনদিয়া একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এ গ্রামে সঙ্গীত চর্চা সে সময়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়। এ গ্রামের জগচ্চন্দ্র ভট্রাচার্য ছিলেন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীত প্রিয়। জানকি চত্রবর্তী ছিলেন ভালো গায়ক। নীলমনি সরকারের পুত্র কুঞ্জুলাল ছিলেন তবলা বাদক। আকবর নামক একজন সানাই বাদক ও ওস্তাদ নদীয়া জেলা হতে রতনদিয়া আসেন। তিনি এখানেই থেকে যান এবং শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মাঝে মাঝে বাহির হতে বড় বড় গায়ক আসতেন। সে সময়ে ফরিদপুরে প্রভু জগবন্ধুর আবির্ভাব ঘটে। তৎকালীন ফরিদপুর জেলার প্রতিটি পল্লী ‘জয় জগবন্ধু বল হরিবল-------হরিপুরুষ জগবন্ধু মহাউচ্চাণে সঙ্গীতে রাজবাড়ি জেলার প্রতিটি হিন্দু পরিবারকে মুখরিত করে রাখত। শিল্পী রশীদ চৌধুরী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন-------‘তাদের পারিবারিক চৌহদ্দির মধ্যে আবহমান কৃষিসমান্ত সংস্কৃতি সোচ্চার ছিল। পহেলা বৈশাখে ঢোল বাজিয়ে নাচ, গান, মহররমের সময় লাঠিখেলা, যাত্রা, রাধাকৃষ্ণের পালা অনুষ্ঠিত হত।’

সাহিত্যিক-শিল্পী পরিচয় ও কবি আলাওল ------প্রসঙ্গ রাজবাড়ি

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করে থাকে। মধ্যযুগের বহুল আলোচিত কবি আলাওলের জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম বাংলার সুলতানি আমল গ্রন্থে ফতেয়াবাদ বলতে চট্রগ্রামের কোনো স্থানকে বুঝিয়েছেন। তবে তিনি আলাওলের জন্মস্থান নিয়ে কোনো শ্রশ্ন তোলেননি। এদিকে আরাকানের সভাকবি আলাওল নিজেই তাঁর আত্মকথন লিখেছেন এভাবে------

আমি পরদেশী এক আলাওল হীন

রোষাঙ্গে পড়িনু আসি নিজের কুদিন।

গৌরমধ্যে প্রধান ফতেয়াবাদ দেশ

অতি পূণ্যবান স্থান নেই পাপ লেশ।

 দৈবচক্রে কার্যহেতু যাইতে নৌকা পথে

দরশন হইল দস্যু হারমাদের সাথে

শহীদ হইলা পিতা বুঝি বহুতর

যখম হইয়া আইনু রোষাঙ্গ শহর।

কবির বর্ণনাতে গৌর মধ্যে ফতেয়াবাদ উল্লেখ আছে। সুলতানি শাসনকালে বাংলার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল, ফতেয়াবাদ, খলিফাতাবাদ, মাহামুদাবাদ রাজ্য হিসেবে শাসিত হত। শাসনকেন্দ্র ছিল গৌর। কাজেই গৌরশাসিত ফতেয়াবাদ যে বর্তমান ফরিদপুর সে বিষয়ে সন্দেহ না থাকারই কথা। তবে প্রশ্ন হল ফতেয়াবাদের শাসনকেন্দ্র কোথায়? আলাওল তার আত্মকথনে যে হারমাদ জলদস্যুদের উল্লেখ করেছেন তারা পুর্তুগীজ জলদস্যু এবং হারমাদ নামে পরিচিত ছিল।


তারা ষোড়শ শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত এ অঞ্চলে দস্যু বৃত্তিতে লিপ্ত ছিল। সময়কালটা সম্রাট আকবর ও শাহজাহানের শাসনকাল। সম্রাট আকবরের শাসনকালে ভূষণা কেন্দ্রিক ফতেয়াবাদ রাজ্য শাসন করতেন মোগল সেনাপতি মোরাদ খাঁ। মোরাদ খাঁ অংশে আলোচনা করা হয়েছে। কোনো কোনো গবেষক আলাওলকে এ অঞ্চলের মানুষ কলে দাবি করেন। তবে তৎকালীন ফতেয়াবাদ বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর অঞ্চল বিশেষ। ফলে ফতেয়াবাদ হিসেবে মধ্যযুগের কবি আলাওল আমাদের সকলের।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রাজবাড়ি জেলার মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও আত্মীয়তার সূত্রে তাঁকে স্মরণে আনার এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত শিলাইদহে থেকে এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এই ঠাকুর এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান রাজবাড়ি জেলার অংশত।

‘গড়াই নদী কুষ্টিয়া ও কুমারখালির পদধৌত করে প্রবাহিত। এর তীরে ঠাকুর এস্টেটের তিনটি বড় বড় মহাল এবং গঞ্জ----কয়া, কুমারখালি ও জানিপুর। কিছুদূরে গড়াইয়ের একটি শাখা নদীর (ডাকুয়া খাল) তীরে ঠাকুর জমিদারীর পান্টিমহাল যশোর জেলার সীমানা------রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ যুগলবন্দি-প্রেক্ষণ।’ (আবুল আহসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা-২)

ঠাকুর এস্টেটের বিরাহিম পরগনার অন্তর্গত ছিল বর্তমান রাজবাড়ি জেলার পাংশার পাট্রা ইউনিয়নের ‘কয়া’ যা বর্তমানে জাগির কয়া। সে সময় পাংশার পশ্চিম অংশত কুমারখালি প্রশাসনের অন্তর্গত ছিল। বর্তমান জেলার পাংশা সীমানা শিলাইদহ সংলগ্ন। এছাড়া কবি দু’বার ট্রেনে রাজবাড়ি ও গোয়ালন্দ হয়ে ঢাকা যাতায়াত করেছেন। রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য দু’বার তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন। একবার বিজন স্কোয়ারে কংগ্রেস অধিবেশনে অন্যবার জোড়াসাঁকোর ভবনে। আমরা বিএ ক্লাসের কয়েকজন ছাত্র গিয়েছিলাম তাঁহার কাছে----তাঁহাকে অনুরোধ জানাইয়াছিলাম শেলীর Loves' Philosophy র The fountain mingles with the sea বঙ্গানুবাদ করিয়া দিন গানের ছন্দে ছন্দে। একটু দেখিয়া বলিলেন বস-----

নিঝর মিশিছে তটিনীর সালে

তটিনী ছুটেছে সাগর পানে,

পবনের মনে মিশিছে পবন,

চির সুখময় আমোদ ভরে।

ঐ দেখ গিরি চুমীছে আকাশ

ঢেউ পড়ে ঢেউ পড়িছে চলি


সে কুল বালারে কেবা না দুষিরে

ভাইটিরে যদি যায় সে ভুলি?

জগতে কেহেই নহে কো একালা

সকলি বিধির বিধান গুণে

একের সহিত মিলিছে অপরে

আমি কেন না, বা তোমারই মনে?

এভাবে কবি রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্কিত।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর স্পর্শ পেয়েছে রাজবাড়ির মাটি ও মানুষ। গোয়ালন্দ তৎকালীন বাংলার প্রবেশ পথ হওয়ায় তিনি রেলপথে ঢাকা, কুমিল্লা যাতায়াত করেছেন ট্রেন ও স্টিমারযোগে গোয়ালন্দ দিয়ে। পূর্ববাংলার প্রকৃতি ও মানুষের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধন। ১৯৪০ সালে গোয়ালন্দ ঘাটে বসে ‘আমি পূবর দেশের পুরনারী’ সঙ্গীত রচনা করেন।’ ১৯২৫ সালে মহাত্মাগান্ধী ফরিদপুরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগদানকালে গান্ধীজীর সাথে কাজী নজরুল ইসলামের পরিচয় ঘটে। নজরুলের কণ্ঠে তাঁর চরকার গান শুনে গান্ধীজী মুগ্ধ হন। সে সূত্রে নজরুল ইসলাম কংগ্রেসে যোগদান করেন। ১৯২৬ সালে নজরুল তমিজ উদ্দিন খান (খানখানাপুর, রাজবাড়ি) এর সাথে বঙ্গীয় বিধান সভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। নির্বাচনে কবির প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে ১২ অক্টোবর ১৯২৬ গণবাণীতে লেখা হয় ‘কালের বরেণ্য কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা বিভাগের মুসলমান কেন্দ্র হতে ভারতীয় ব্যাবস্থাপক সভার সদস্য পদপ্রার্থী হইয়াছেন’ (নজরুল রচনাবলী ২য় খণ্ড কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড-২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৭ পৃষ্ঠা-৫৪৮)। উল্লেখ্য তখন ফরিদপুর, রাজবাড়ি ঢাকা নির্বাচন এলাকাভুক্ত ছিল। তমিজ উদ্দিন খান তাঁর আত্মজীবনীতে ১৯২৬ সালের নির্বাচনে নজরুলের বিষয়ে কিছু বলেননি। এ নির্বাচন বিষয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে আবুল আহসান চৌধুরী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অপ্রকাশিত পত্রাবলীর গ্রন্থের ১৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-----‘হেমন্ত কুমার সরকার ও কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে ১৯২৬ সালে Bengal Peasants and worker's party প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখিত নানা তথ্যে প্রতীয়মান হয় ১৯২৬ এ নবগঠিত Bengal peasants and worker's party   থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন বা নির্দলীয় প্রার্থী হন। এ ক্ষেত্রে তমিজ উদ্দিন খান তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মোহন মিয়ার কথাই উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বহীন Peasants পার্টি বা উদীয়মান একজন কবিকে দুর্বল প্রার্থী ভেবে লেখার প্রয়োজন মনে করেননি। গোলাম মুরশীদ তাঁর হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থের ১৬৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-----

১৯২৬ সালের শেষ দিকে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ৩৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৮টি আসনে জয়ী হন আব্দুর হিমের দলের প্রার্থীরা। কাজী নজরুল ইসলাম তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। কৃষক শ্রমিকদের জন্য উচ্চকন্ঠে বিদ্রোহের বাণীও শুনিয়েছিলেন তিনি। তা সত্বেও মুসলমান প্রধান ফরিদপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তিনি জিততে পারেননি। কারণ আব্দুর রহিমের সাম্প্রদায়িকতার শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি। এ সময় রাজবাড়ি মানুষের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। আরএসকে স্কুলের গণিত শাস্ত্রের প্রাক্তন শিক্ষক দেব ভট্রাচার্য (ডা. মাখনলাল মহাশয়ের বাড়িতে দীর্ঘদিন ভাড়ায় বসবাস করতেন) এর নিকট থেকে জানা যায় নজরুল সেসময় তাদের স্থায়ী বসতি পাংশার রুপিয়াট জমিদার বাড়ির সাথে গভীর আত্মীয়তা গড়ে তোলেন।


দেবুর পিতা অতুল দত্ত তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। নজরুল এ পথে আসলে রুপিয়াট জমিদার বাড়ি না হয়ে যেতেন না। দেবুর পিতা ও মাতার সাথে পত্রালাপ হত। কিছু পত্র তার নিকট ছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় তা হারিয়ে যায়। দেবুর মায়ের নামে নজরুল একটি কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। রাজবাড়ির নজরুল বিশেষজ্ঞ গোলাপ ভাইয়ের নিকট থেকে জানা যায় নজরুল ১৯৩০ এর দশকের কোনো এক সময় প্রাক্তন চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান সাহেবের বাড়িতে আসেন। হাবিবুর রহমান তখন যুবক। তিনি নজরুলের সাথে একই খাটে শয়ন করেছিলেন। সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর (পাংশা) সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল। ১৯১৯ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের পর কবি ফিরে এসে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতিতে’ যোগ দেন। কর্মসূত্রে সেখানেই এয়াকুব  আলী চৌধুরী নজরুলকে আর্শিবাদ স্বরুপ বলেছিলেন -----‘আপনাকে বাংলার মুসলমান বারীন ঘোষ হতে হবে।’ (সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় রাজবাড়ি, অধ্যাপক আবুল  হোসেন মল্লিক, পৃষ্ঠা-৪৬। কবি ১৯৩৩ সালে কলিকাতা থেকে পাংশা সফরে আসেন। তিনি এখানে এক দিন এক রাত যাপন করেন। পাংশায় আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে। বিপুল আয়োজনে পাংশায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনা কমিটিতে থাকেন এয়াকুব আলী চৌধুরী, তাহের উদ্দিন আহমেদ (সহসম্পাদক, দি মুসলমান পত্রিকা, কলিকাতা), সৈয়দ মাহমুদ (ডিএসআর), সুবোধচন্দ্র সাহা (কংগ্রেস নেতা, পাংশা), শ্রী অতুলচন্দ্র দত্ত (সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা ‘জলসা’র সম্পাদক), খোন্দকার নাজির উদ্দিন আহমেদ সম্পাদক খাতক), শ্যামলাল কুণ্ডু প্রমুখ। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয় শ্যামলাল কুণ্ডুর দ্বিতল ভবনে। বৃটিশ রাজরোষে পতিত হওয়ার কারণে তাঁকে খোলা মাঠে সংবর্ধনা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মুচরাম সাহার গুদাম ঘরে তাঁকে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়। এ অনুষ্ঠানে কবি স্বকন্ঠে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘নারী’  কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। ‘টুনির মা’ নামে এক মহিলা নিজ হাতে সেলাই করা একখানি নকশী কাঁথা কবিকে উপহার দেন। পাংশার আড়ং বাজার রেলঘাট তাঁর আগমন উপলক্ষে যে মেলার আয়াজন করা হয় তা আজও বৈশাখী মেলা- (১ এপ্রিল) হিসেবে স্মৃতি বহন করছে। সেদিন এক ময়রা কবিকে কয়েক কেজি চমচম উপহার হিসেবে দেন। প্রচুর লোক সমাগমে কবি সবাইকে শুভেচ্ছা বাণী দেন।

পাংশার কবি বন্ধু দি মুসলমান পত্রিকার সম্পাদক তাহের উদ্দিন তাঁর বিবাহ বৌভাতে আমন্ত্রণ করেন। দাওয়াত রক্ষায় অপারগ হলে কবি তাঁকে আশীর্বাদ স্বরুপ লেখেন-----

রুপার সওদা সার্থক হল

রুপার শাহজাদী এসে

তব বাণিজ্য তরণী ভিড়িল

স্বপন পরীর দেশে।

অর্থের নীতি যাহার যাদুতে

হইল অর্থহীন

বেঁচে থাকে সেই ফুলের ডেরায়

ফুল হয়ে নিশিদিন।


কাজী নজরুল ইসলামের গভীর সখ্যতা ছিল পাংশার বাগমারা গ্রামের জাতীয় অধ্যাপক প্রখ্যাত সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, জাতীয় চেতনার দিশারী ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সঙ্গে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু। নজরুল বন্ধুত্বের গভীর আলিঙ্গনে মোতাহার হোসেনকে ডাকতেন, আমার মতিহার। তাদের বন্ধুত্ব আজীবন অটুট ছিল। মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তাঁর অমর প্রতিদান। মোতাহার হোসেনের কন্যা রবীন্দ্র গবেষক, শিল্পী সনজিদা খাতুন রচিত ‘মোতাহার হোসেন’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা এল তাদের বাড়িতেই থাকতেন। নজরুল যেমন ছিলেন জাতীয় চেতনায় বিদ্রোহী সত্ত্বার অধিকারী তেমনি দৈহিক শক্তি প্রয়োগে বিদ্রুপ নিরসনের নায়ক। একদিন ঢাকায় দুইদল যুবক পরস্পর ঝগড়ার পর্যায়ে হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে নজরুল তা নিষেধ করেন। কিন্তু নজরুলের কথা তারা শুনছিল না। এক পর্যায়ে নজরুল একটি লাঠি নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘোরাতে থাকেন এবং সকলকে তাড়িয়ে দেন। এই লাঠি নিয়েই মোতাহার হোসেনের বাসায় যান। এই লাঠিটি দীর্ঘদিন তাদের বাসায় ছিল আর লাঠির নামকরণ হয়েছিল নজরুল মারা লাঠি। বন্ধুত্বের সূত্রে নজরুল কয়েকবার মোতাহার হোসেনের গ্রামের বাড়ি বাগমারা এসেছেন বলে জানা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম সহসঙ্গী মোতাহার হোসেনের উদ্দেশ্যে ‘দাড়ি বিলাপ’ কবিতাটি রচনা করেন। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় কোনো প্রফেসর বন্ধুর দাড়ি কর্তন উপলক্ষে লেখা আছে।

হে আমার দাড়ি

একাদশ বর্ষ পরে গেলে আজি ছাড়ি

আমারে কাঙ্গাল করে শূন্য করি বুক

শূন্য এ চোয়াল আজি, শূন্য এ চিবুক।

কাজী মোতাহার হোসেন ছাত্রজীবন থেকেই দাড়ি কামাতেন না। দাড়ি ওঠার ১১ বছর পর তিনি একবার দাড়ি কর্তন করলে কবি এ কবিতাটি রচনা করেন। এ প্রসঙ্গে পাথেয় ১৩৩৫ সালে ঢাকার সাপ্তাহিক দরদীতে এবং দাড়ি বিলাপ মাসিক ‘শান্তি’তে প্রকাশিত হয়। দাড়ি বিলাপ কবিতার পাদটিকায় উল্লেখিত কোনো প্রফেসর বন্ধু হলেন অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (নজরুল রচনাবলী, প্রাগুপ্ত, পৃ-৬৫৫)। ঢাকার বিদূষী কন্যা ফজিলাতুননেসার সঙ্গে নজরুল প্রণয়ে প্রয়াসী হন। এর মাধ্যম ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। শিল্পী কাজী আবুল কাশেম (রাজবাড়ি) নজরুলের লেখা ‘দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ কার্টুন এঁকে নজরুলকে দেখান। নজরুল তা দেখে খুব হেসেছিলেন।

সাহিত্যিক কাজী আবদুল ওদুদ (বাগমারা নিবাসী) কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত গুণগ্রাহী ছিলেন। এদিকে কাজী মোতাহার ও আবদুল ওদুদ একই গ্রামবাসী ও হরিহর বন্ধু। কাজী নজরুল আবদুল ওদুদের সাথে ঘনিষ্ঠতা সূত্রে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনে উভয়কে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৯) রচনা করেন। চল্লিশের দশকের প্রথমে আব্দুল ওদুদ কলিকাতাবাসী হন। এ সময় কাজী নজরুল ও তার পরিবারের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। ১৯৫২ সাল। নজরুল পরিবারে তখন দুরাবস্থা। নানাভাবে নজরুলের চিকিৎসা করান হলেও উন্নতি নেই। আর্থিক অনটন লেগেই আছে। আব্দুল ওদুদ পরিবারে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন। কবির উন্নত ও শেষ চিকিৎসার জন্য কবিকে ইউরোপ পাঠান দরকার। অনেক টাকার প্রয়োজন। কাজী আবদুল ওদুদের উদ্যোগে কলিকাতায় ‘নজরুল সাহায্য সমিতি’ গঠন করা হল। তাঁর উদ্যোগেই নজরুলকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তারপর ভিয়েনা। নজরুল সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এভাবেই রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের সাথে কবির ঘনিষ্ঠতা।


রাসসুন্দরী দেবী

রাসসুন্দরী দেবীবাংলা গদ্য সাহিত্যে ১৭৮০ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত পণ্ডিতগণ বিপ্লবের কাল বলে চিহ্নিত করে থাকেন। কারণ এ সময়ের মধ্যে জোনাথান ডানকান, ফরস্টার, কেরী, ডিরোজিও, ঈশ্বর গুপ্ত, প্যারিচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে পরিপূর্ণ আধুনিকায়নের কাজটি সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, মীর মশাররফ, শরৎচন্দ্রসহ অনেকে সাহিত্যকে অতি উচ্চমানে অধিষ্ঠিত করেন। সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে পুরুষের সংখ্যা অনেক। সেক্ষেত্রে অবরোধবাসিনী মহিলাদের সংখ্যা অত্যল্প। মহিলাদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো নাম রাসসুন্দরী দেবী (প্রথম জীবনী লেখিকা), কেলাসবাসিনী দেবী (প্রথম গদ্যগ্রন্থের লেখিকা), জ্ঞানদান নন্দিনী দেবী (প্রথম আধুনিক সাহিত্য), বিবি তাহেরন নেসা (প্রথম মুসলমান গদ্য লেখিকা), কৃষ্ণ ভবানী দাস (প্রথম নারী প্রগতিবাদী), বেগম রোকেয়া (প্রথম নারীবাদী)। সাহিত্য বিকাশের এ বিপ্লবের কালে তো নয়ই এর পরবর্তীতেও আত্মজীবনীকার সামান্য। তারমধ্যে রাস সুন্দরী প্রথম জীবনী লেখক। রাজবাড়ির ভররামদিয়াতে প্রায় ৮০ বছর স্বামীগৃহে বসবাস করেছেন। পারিপার্শিকতায় তিনি সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য। ফলে তিনি সাহিত্য বিকাশে যেমন স্মরণীয় তেমনি রাজবাড়ির এক মহীয়সী নারী।

সাহিত্য মূলত গদ্য,পদ্য, গল্প, উপন্যাসের ধারা। এ ধারার আত্মজীবনী দালিলিক উপন্যাস। উপন্যাসে যেখানে জীবন বিবৃতিতে কল্পনার আশ্রয় থাকে আত্মজীবনী সেখানে একবারেই জীবন কাহিনীর সত্যভাষণ। ফলে উপন্যাসের চেয়েও আত্মজীবনী অধিক মাত্রায় হৃদয়মোথিত সৃষ্টিকর্ম। রাসসুন্দরীয় সাহিত্য কর্মের ভাণ্ডার বিপুল নয়। তবে যে কাজটি তিনি করে গেছেন কাল বিচারে তা অমূল্য সম্পদ। যেকালে নারী তো নয়ই, পুরুষদের মধ্যেও এ অঞ্চলের গ্রাম সমাজের দু-দশ মাইলের মধ্যে পুঁথি পাঠের লোক মিলত না সে সময় রাসসুন্দরী আত্মপ্রচেষ্টায় কেবল পুঁথিপাঠ, ধর্মপাঠই আয়ত্ত করেননি, লেখেন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ-----আমার জীবন। গ্রন্থটির ভাষা মাধুর্য এতটাই শৈল্পিক যে গ্রন্থটি পাঠ করলে মনে হবে আধুনিক লেখকের কোনো লেখা পাঠ করছি।

‘ছেলেদের জন্য বাংলা স্কুল আমাদের বাড়িতেই ছিল। একজন মেমসাহেব সেই স্কুলে গ্রামের সমস্ত ছেলেকে লেখা ও পড়া শিখাইতেন। আমার খুড়া আমাকে কালো রঙের একটা ঘাঘড়া পরাইয়া একখানি উড়ালী গায়ে দিয়া সেই স্কুলের মেম সাহেবের কাছে বসাইয়া রাখিতেন। আমি সকল দিবস সেই স্কুলেই থাকিতাম। তখন ছেলেরা ক-খ চৌত্রিশ অক্ষর মাটিতে লিখিত, যুক্ত অক্ষরও লিখিত, পরে এক নড়ি হাতে লইয়া ঐ সকল অক্ষর উচ্চস্বরে পড়িত। আমি মনে মনে ঐ সকল পড়াই শিখিতাম।’ এখানে পাঠক কেবল সাবলীল ভাষার সাহিত্যে মুগ্ধ হবেন না এরমধ্যে ব্যবহৃত ঘাঘড়া, উড়ালি, নড়ি ইত্যাদি ব্যবহৃত শব্দ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উপাদান। এছাড়া ঊনিশ শতকের শুরুতে শিক্ষা প্রণালীর চালচিত্র পাওয়া যায় এখানে। তাঁর মেধার পরিচয় আছে, কারণ তিনি সেসব বিষয় অন্য সকলের সাথে লিখতেন না কেবল মনে মনে আয়ত্ত করেছেন। তিনি প্রকৃত অক্ষর পরিচয় লাভ করেন যখন তার বয়স ২৫ বছর। পাবনার পোতাজিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া রাসসুন্দরীর ১২ বছর বয়সে বিবাহ হয় রামদিয়ার জমিদার বংশে সীতানাথের সঙ্গে। যখন তিনি অক্ষরজ্ঞানী হলেন তখন তাঁর প্রথম সন্তান বিপিন বিহারীর বয়স সাত বছর।

মানুষের মানসিক শক্তি আর ঐশ্বরিক আবেদন, চেতনা বিকাশের অন্যতম শর্ত। এ বিষয়টি রাসসুন্দরীর মধ্যে ছিল সহজাত। তাঁর জীবনীতে লিখেছেন ----‘যিনি স্বপ্ন দেখলেন তিনি যেন চৈতন্য ভাগবত পড়িতেছেন। সেই অবধি দিনরাত পরমেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি। আমাকে পড়তে শেখাও, আমি যেন চৈতন্য ভাগবত পড়িতে পারি। আহা কী আশ্চর্য ! দয়াময়ের কী দয়ার প্রভাব। আমি যেমন মনে মনে এই সকল চিন্তা করিতেছিলাম, অমনি তিনি আমার মনোবাঞ্চা পূর্ণ করিলেন।


আমি পাকের ঘরে পাক করিতে করিতে শুনিলাম কর্তা (স্বামী) বিপিনকে ডাকিয়া বলিতেছেন বিপিন, আমার চৈতন্য ভাগবত পুঁথি এখানে থাকিল। আমি যখন তোমাকে লইয়া যাইতে বলিব তখন তুমি লইয়া যাইও। বলিয়া তিনি বাহির বাটিতে গেলেন। আমি এই কথা শুনিলাম। তখন আমার মনে যে কি পর্যন্ত আনন্দ হইল তাহা বলা যায় না। আমি অতিশয় পুলকিত মনে তাড়াতাড়ি গিয়া দেখিলাম, সেই চৈতন্য ভাগবত খানি বিদ্যামান।’ সে সময়ে শিক্ষার সঙ্কট এবং বইপত্রের আকার আয়তন ইত্যাদির বিষয়ে রাসসুন্দরীর আমার জীবন গ্রন্থখানি ঐতিহাসিক দলিল। তিনি লিখেছেন-----‘এখনকার পুস্তক সকল যে প্রকার, সেকালে এ প্রকার পুস্তক ছিল না। সে সকল পুস্তকে কাঠের আড়িয়া লাগান থাকিত। ঐ আড়িয়ায় নানা প্রকার চিত্র বিচিত্র ছবি আঁকাইয়া রাখিত। এক এক পুস্তকে এক এক প্রকারের ছবি থাকিত। আমিত লিখতে পড়িতে জানি না। কী রুপে ঐ পুস্তক চিনিব। আমি কেবল ঐ চিত্র পুত্তলিকা দেখিয়া ঠিক করিয়া রাখিলাম। পরে পুস্তকখানি ঘরের মধ্যে রাখিলে ঐ পুস্তক হইতে একটি পাতা খুলিয়া রাখিলাম। (পুঁথির পাতা সুতা দিয়া গাঁথা থাকিত, তাই একটা পাতা খুলিয়া নেওয়া সম্ভব হইয়াছিল)। পুস্তকের পাতাটি লইয়া আমি ভারী মুসকিলে পড়িলাম। হাতে করিয়া ভাবিতে লাগিলাম, কী করিব? কোথায় রাখিব?  কোথায় থুইলে কে দেখিবে। মনে মনে স্থির করিলাম যেস্থানে রাখিলে আমি সত্তর দেখিব অথচ অন্য কেহ না দেখে এমন স্থানে রাখা উচিত। আর কোথা রাখিব রান্নাঘরে হেসেলের কাছে জ্বালানি খড়ির নিচে লুকাইয়া রাখিলাম।’

গ্রন্থটি বিষয়ে দীনেশ চন্দ্র সেনের উক্তি-----‘গৃহকর্তী মুখবন্ধে লিখিয়াছেন ১২১৬ সালে চৈত্রমাসে আমার জন্ম হয়। আর এই ১৩৩৩ সালে আমার বয়ক্রম ৮৮ হইল। এই জীবনখানি ব্যক্তিগত কথা বলিয়া উপেক্ষা করা চলে না। ইহা প্রাচীন হিন্দু রমণীর একটি খাঁটি নক্সা। যিনি নিজের কথা সরলভাবে কহিয়া থাকেন। তিনি অলক্ষিতভাবে সামাজিক চিত্র অঙ্কন করিয়া যান। অক্ষর জীবন পুস্তকখানি শুধু রাসসুন্দরীর কথা নহে, উহা সেকেলে হিন্দু রমণীদের সকলের কথা। এই চিত্রের মতো যথাযথ ও অকপট মহিলা চিত্র আমাদের বাঙ্গলা সাহিত্যে আর নাই। এমন মনে হয় এই পুস্তকখানি লিখিত না হইলে বাঙ্গলা সাহিত্যের একটি অধ্যায় অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইত।’ শ্রী জ্যেতিরিন্দ্র নাথ ঠাকুর গ্রন্থটির প্রস্তাবনায় লিখেছেন-----‘এই গ্রন্থখানি একজন রমণীর লেখা। তাই বিশেষ কৌতুহলী হইয়া আমি এই গ্রন্থপাঠে প্রবৃত্ত হই। মনে করিয়াছিলাম যেখানে কোনো ভালো কথা পাইব সেখানে পেনসিলের দাগ দিব। পড়িতে পড়িতে দেখি পেনসিলের দাগে গ্রন্থ কলেবর ভরিয়া গেল। বস্তুত ইহার জীবনের ঘটনাবলী এমন বিস্ময়জনক এবং ইহার লেখায় এমন একটি অকৃত্রিম সরল মাধুর্য আছে যে গ্রন্থখানি পড়িতে বসিয়া শেষ না করিয়া থাকা যায় না।’ রাসসুন্দরীর জীবনী কেবল সাহিত্যঘনিষ্ঠ নয় তাঁর লেখায় এ অঞ্চলের প্রায় পৌনে দু’শ বছরের সামাজিক অবস্থা, সামাজিক সংঘাত, মানুষের আশা নিরাশা, রক্ষণশীলতা, রমণীদের অবরুদ্ধতার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি ভর রামদিয়ার গৃহবধু। বহরপুর ইউনিয়নের বহরপুরের ৮/৯ কিলো পশ্চিমে বড় রামদিয়া কালুখালি ভাটিয়াপাড়ার রেল লাইনের স্টেশন। রামদিয়ার পাশে তেঁতুলিয়া, কুরশী, বহরপুর, আড়কান্দির সামনে ক্ষীণতোয়া চন্দনা নদী। বড় রামদিয়াই উচ্চারণ ভেদে ভররামদিয়া। সে সময়ের নানা সংঘাত তার লেখায় পাওয়া যায়। ‘রামদিয়ার চার পাশেই নমশুদ্র, জেলে এবং মুসলমান প্রজা। হঠাৎ তাহাদের মধ্যে মারামারি বাধিয়া গেল। মাছমারা কোঁচ, দা, কুড়াল, প্রভৃতি লইয়া উন্মত্তের মতো যখন তাহারা একদল আর একদলের উপর ঝাপাইয়া পড়িবার  উপক্রম করিতেছে, এমন সময় অবগুণ্ঠিতা হইয়া ঐ দলের মাঝে দাড়াইলাম অন্তপুর ছাড়িয়া একবারে বিলের ধারে-----ওরে কর্তামা আইছেন ফিসফিস ধ্বনি উঠিল এবং অল্পক্ষণের ভিতরেই সমস্ত বিবাদের মীমাংসা হইয়া গেল।’

সে সময় কুরশীর প্রতাপশালী জমিদার নবাব মীর মহাম্মদ আলী জ্ঞাতি ভাই মীর সামসুল হুদা জোরপূর্বক সীতানাথের জমিদারীর অংশত দখল করতে আসেন। স্বামী কার্যোপলক্ষে রংপুরে গিয়েছেন। রাসসুন্দরী নিজেই সেখানে উপস্থিত হয়ে পর্দার আড়াল থেকে সামসুল হুদাকে বললেন, ‘আপনি উচ্চবংশীয় ও মহাবিদ্বান। দরিদ্র প্রজার উপর অত্যাচার আপনার হুকুমে হইতেছে। আমি কি করিয়া ইহা বিশ্বাস করিব? সামসুল হুদা হিন্দু নারীর এ ভাষণে এত মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে সসম্মানে কুর্নীশ। করিয়া তখনি এক স্বীকৃতিপত্রে এই বলিয়া স্বাক্ষর করিলেন যে আজ হইতে এই পুরুষানুক্রমিক বিধান একেবারে শেষ হইয়া গেল।’ সে সময়ের নারী সমাজের শিক্ষা এবং প্রতিকুলতার দালিলিক নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁর লেখা থেকে।


তাঁর ভাষায় তখনকার মেয়েছেলেগুলো নিতান্ত হতভাগা, প্রকৃত পশুর মধ্যে গণনা করিতে হইবে। বাস্তবিক মেয়েছেলেগুলোর হাতে কাগজ দেখিলে সেটি ভারি বিরুদ্ধ কর্ম জ্ঞান করিয়া বৃদ্ধা ঠাকুরানীরা অতিশয় অসন্তোষ প্রকাশ করিতেন। সে সময়ে সামাজিক অবস্থা ছিল এমন যে মেয়েরা লেখাপড় শিখলে বিধবা হয়। সংসারে অকল্যাণ হয়। মেয়েরা আয় করবে না। লেখাপড়া শেখা মেয়েদের জন্য প্রয়োজনহীন। খ্যাতনামা গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া’ গ্রন্থের ৪৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন----‘রাসসুন্দরীর ‘আমার জীবন’ বাংলায় প্রকাশিত প্রথম আত্মজীবনী। ১৮৭৫ সালে এ গ্রন্থ যখন প্রকাশিত হয় তখন তাঁর সামনে আত্মজীবনীর কোনো আদর্শ ছিল না। তাছাড়া পরবর্তীতে যারা আত্মজীবনী রচনা করেন, তিনি তাঁদের মতো আনুষ্ঠানিক লেখাপড়াও শেখেননি। অথবা তাদের মতো তাঁর সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি ছিল না। কিন্ত সরলতা এবং আন্তরিকতার গুণেই তাঁর আত্মজীবনীটি কেবল উল্লেখযোগ্য নয় কাঠামো এবং রচনাশৈলীর জন্যও এ গ্রন্থটি বাংলা আত্মজীবনীর ইতিহাসে একটি স্থায়ী আসন দাবি করতে পারে।’

‘আমার জীবন’ এর সূচীপত্র

প্রথম

মঙ্গলাচরণ-পৃ-এ

প্রথম রচনা-পৃ-৫

কবিতা স্তর : বালিকাকাল, ছেলেধরার ভয়, গঙ্গাস্নানে গমন স্কুলের কথা।

দ্বিতীয় রচনা

কবিতা, আমার ভয় ও দয়া মাধব ঠাকুর, আমি মায়ের মেয়ে, বাড়িতে আগুন ধরা, আমরা তিন ভাইবোন নিরাশ্রয়, দয়ামাধবকে ডাক, পোড়া ভিটায় পরমান্ন। মানুষ না ঠাকুর?

তৃতীয় রচনা

কবিতা, ঠাকুর কে? মহামন্ত্র পরেমেশ্বরের নাম, আমার ছেলে, খুড়ীমার কথা, আমার প্রথম শোক, বিবাহের কথা, মা তুমি কি আমার পর করে দিবে? বিবাহের আয়োজন, আমি মায়ের কোলছাড়া হইলাম।

চতুর্থ রচনা

কবিতা, নৌকার মধ্যে, আমার ক্রন্দন ও লোকের সান্তনা, আমার আর এক মা, নতুন বধু, শ্বশুর বাটী, মাটির সাপের গল্প, আমার সংসারে কাজ, সেকালের বৌদের নিয়ম।

পঞ্চম রচনা

কবিতা, আমার লেখাপড়া শিখিবার সাধ, সেকালের লোকের আলোচনা, পরমেশ্বর তুমি আমাকে লেখাপড়া শিখাও, রামদিয়া গ্রামের কথা, আমার পুত্র ও কন্যা, সংসারের বিবরণ।

ষষ্ঠ রচনা

কবিতা, আমার লেখাপড়া শিখিবার প্রথম বাসনা, স্বপ্নে চৈতন্য ভাগবত, চৈতন্য ভাগবতের একখানি পাতা, লেখা পড়ায় লোক নিন্দায় ভয়, সেকালের লোকচার।

সপ্তম রচনা

কবিতা, গৃহিনী কর্মের ভার, আমার তিনটি ননদ, জয়হরি খোরার কথা, আমার সন্তান ও সংসার সুখ।

রামসুন্দরী নিঃসন্দেহে রাজবাড়ি তথা বাঙালির গর্ব। অথচ আমরা রাজবাড়ির মানুষ এত নিকটে থেকেও আজ পর্যন্ত তাকে চিনতে পারিনি। তিনি হয়ত আমাদের অচেনাই থেকে যেতেন যদি না আমার স্নেহধন্য ছাত্রী দেবাহুতি চক্রবর্তী এক পিঞ্জরে বাঁধা বিহঙ্গীর ‘আমার জীবন’ শিরোনামে পত্রিকার পাতায় না লিখতেন। (দৈনিক সংবাদ পত্রের সংবাদ সাময়িকীতে ২৯/১০/০৯ এ প্রকাশিত) এবং ০৮/০১/০৯ তারিখে রাজবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরিতে রাসসুন্দরীর দ্বিশত জন্ম বার্ষিকী পালনের আয়োজন না করতেন। দেবাহুতি চক্রবর্তী পেশায় আইনজীবী। ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী, সাহিত্যসেবী, প্রগতিবাদী ঐতিহ্য সন্ধানী এবং নারী নেত্রী। বর্তমানে মহিলা পরিষদের সভানেত্রী। নিজেকে নিয়োজিত রাখেন নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। নারী অধিকারের প্রবক্তা। এ বছর কলিকাতায় রাসসুন্দরীর আমার জীবন গ্রন্থটি হাতে পান। বলাবাহুল্য তিনি গ্রন্থটির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং রাজবাড়ির ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় পেয়ে তিনি অহঙ্কা বোধ করেন। নানাভাবে তিনি দূর অতিতের অচেনা রাস সুন্দরীকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে সচেষ্ট হন।


তিনি লিখেছেন----‘সম্পূর্ণ অবগুণ্ঠিতা এক ঘরোয়া নারী হিসেবে নিজের যুগ, নিজের কাল, নিজের পরিবেশের সমস্ত চিহ্ন তিনি শরীরে ও মনে ধারণ করেছেন। অন্যদিকে তার প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ও নারীর মানবাধিকার অর্জনের সংগ্রামে তিনি যুগোত্তীর্ণ তো বটেই। তাঁর সমস্ত উপলব্ধি, কর্মতৎপরতা একদিকে তাঁর নিজের আত্মবিকাশ ও ‍মুক্তির জন অন্যদিকে তাঁর দীর্ঘ জীবন এক পচাগলা সমাজের বিরুদ্ধে সবল প্রতিবাদ। তাঁকে চেনা ও জানাটা আমাদের দায়িত্ব।’ এক নারীর প্রতি এক নারীর কর্তব্যনিষ্ঠায় কেবল অভিভূত হলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। ভেদরেখা মোচন করে যুগলবন্ধী নারী ও পুরুষের কর্তব্য হবে জ্ঞানালোকে নিয়ত প্রজ্জ্বলিত হওয়া। রাসসুন্দরী দেবীর জন্ম ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে পাবনার পোতাজিয়া গ্রামে। ১২ বছর বয়সে বিবাহ রাজবাড়ির রামদিয়ার জমিদার বংশে সীতানাথের সঙ্গে। মৃত্যু ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে।

মীর মশাররফ হোসেন

মীর মশাররফ হোসেন অমর গ্রন্থ ‘বিষাদ সিন্ধু’র লেখক মীর মশাররফ হোসেন এক কালজয়ী নাম। ঊনবিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক নতুন কালপর্বের স্রষ্টা। কাব্য, উপন্যাস, হেঁয়ালী, নাকটক, আত্মজীবনী, অনুবাদ, প্রবন্ধ, ধর্মীয় নানা আঙ্গীকের আশ্রয়ে তিনি সাহিত্য সাধনা করেছেন। মানব চেতনা, মানবকল্যাণ, জীবন সংগ্রাম ও আর্থিক মুক্তির চেতনায় তাঁর পঁচিশটি গ্রন্থ আজও পাঠক মহলে সমাদৃত। তাঁর লেখা ‘জমিদার দর্পন’ নাটকটি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাংলা বিষয়ের পাঠ্য। ভাষা ব্যবহার ও বর্ণশৈলীর মাধুর্যে তাঁর রচনা একটি বিশেষ ধারায় পরিণতি লাভ করে যা বাংলা ভাষায় ‘মশাররফি চলন’ বলে বিদ্যমান। কাহিনী বর্ণনায়, ভাষার ওজস্বীতায় ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থখানা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ট্রাজেডি। সাহিত্যসেবীদের মন্তব্য মীর মশাররফ হোসেন যদি কেবল বিষাদ সিন্ধুই লিখে থাকতেন এবং আর কোনো গ্রন্থ না লিখতেন তাহলেও তিনি সাহিত্যের ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে বেঁচে থাকতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশ এবং অপ্রকাশিত দশ। শ্রেণিভিত্তিক সমাজকাঠামোয় শ্রেণিদ্বন্দ্বের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারায় তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। প্রথিযশা এই সাহিত্যিক চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদিতে তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটায়। বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে তিন কোটিরও বেশি টাকায় ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র’ নির্মাণ করেছেন যা দেশবাসীর ‘সাহিত্য তীর্থস্থান’ বলা যায়। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে মীর মশাররফ হোসেন পরিষদ। পদমদির অদূরে সোনাপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘মীর মশাররফ হোসেন কলেজ’। রাজবাড়ি সরকারি কলেজের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীর মশাররফ হোসেন হল’। রাজবাড়ি জেলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি সংসদ মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে থাকে দেশের বরেণ্য সাহিত্যসেবীকে।

সাহিত্য কেবল সমাজ দর্পণ নয়, সাহিত্য সমাজকে কলুষমুক্ত করে। সাহিত্যের শিল্পবোধের চেতনায় সমাজ সংসার অগ্রগামী হয়। ‘সত্যভাষণ ও সত্যকথন’ বলে পরিচিত মীরের সাহিত্যকর্ম তৎকালীন সমাজ চিত্রের দলিল। তাঁর ভাষা ব্যবহার রীতি প্রাঞ্জল,  সাবলীল, আকর্ষণীয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে উপাদান সৃষ্টিতে তিনি একটি কালপর্বের স্রষ্টা। তাঁর সাহিত্যকর্মের দ্বারা সিক্ত হয়েছিল সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষ। তাঁর সাহিত্যে যেমন তৎকালীন মুসলমান সমাজের রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে তেমনি ‘গো জীবন’, ‘টালা অভিনয়’, ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকের বক্তব্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমাজ সঙ্কট ও ‍বৃটিশ সামন্ত শ্রেণির শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তব্য। তৎকালীন সময়ে কৃষি উৎপাদন অত্যাবশ্যকীয় হালের গুরু মহামারীতে হ্রাস পেলে গো রক্ষায় তিনি রচনা করেন ‘গোজীবন’। এতে রক্ষণশীল মুসলমান মীরের প্রতি প্রতিবাদমুখর হয়। মশাররফ হোসেন তখন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে করিমন্নেসা স্টেটের ম্যানেজার। রক্ষণশীল মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখে নানা অপ্রীতিকর ঘটনায় তিনি জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁকে কয়েকদিনের জন্য জেলে যেতে হয়।


তবে স্বজাতীয়দের পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, রক্ষণশীলতায় কাতর মীর মশারফরফ হোসেন তাদের ভ্রান্তির মোহ থেকে মুক্ত করার মানসে সাহিত্যে নানা আঙ্গিকতার আশ্রয় নিয়েছেন কিন্ত সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে তিনি আটকে থাকেননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশের ধারায় ঊনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। আর তখন থেকেই বাংলা সাহিত্য সঠিক অর্থেই আধুনিক হয়ে ওঠেন ইংরেজি সাহিত্যের হিন্দু কলেজের অনুরাগী পাঠকদের দ্বারা। ডিরোজিও নতুন কথা শনিয়েছিলেন। কালীপ্রসাদ ঘোষ নতুন দৃষ্টি লাভ করেছিলেন। ইয়ংবেঙ্গলেরা নতুন বক্তব্য রেখেছিল। বিদ্যাসাগর পৌরণিক চরিত্রগুলোকে মানবিক চেহারা দিয়েছিলেন। ঈশ্বর গুপ্ত সমকালীন জীবনচিত্র সাহিত্যে আমদানী করেছিলেন। দেব দেবীর বদলে তিনি কবিতা লিখেছিলেন আনারস, আলু, ক্ষীর, নারকেল, ইংরেজি নববর্ষ, এমন কি তপসে মাছ নিয়ে। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, বিহারীলাল চক্রবর্তীর হাতে তা পাকাপোক্ত হয়। এ সময়কালের সাহিত্যে সমাজ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ নবচেতনা লাভ করে।

ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতায় মুসলমানদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন প্রথম সারির প্রথম সাহিত্যিক। মশাররফ হোসেনের জীবনকাল ১৮৪৭ থেকে ১৯১১। এ সময়টি বিচিত্র ও গতিশীল পরিবর্তনের কাল। এ সময় বাংলার সমাজ সংস্কৃতি, সাহিত্য, ধর্ম রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বহুবিধ পরিবর্তন, সংঘাত সংঘটিত হয়েছে। তাঁর জীবনকালে এ দেশে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বহুবিধ বিদ্রোহ হয়েছে। সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৮-৫৯) প্রভৃতি সংগ্রামে মানুষ ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে। তাঁর সময়কালে জারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫) এবং মুসলীম লীগ (১৯০৬) গঠিত হয়। বঙ্গভঙ্গ, স্বরাজ, স্বদেশী আন্দোলন দানা বাঁধে। এ সময় হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়েছে। মুসলমানেরা নিজস্ব সংগঠন হিসেবে মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৫), মোহামেডান সোসাইটি (১৮৬৩), সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান (১৮৭৮) গঠিত হয়। কালের এ বিচিত্র ধারাতেই তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। বিচিত্র অভিজ্ঞাতার আলোকে সমাজচিত্রকে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখা উপন্যাস, গল্প, হেঁয়ালী, আত্মজীবনী, নাটক, কবিতা সবই সমাজচিত্রের সত্যভাষণ।

তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ রত্নবতী প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। এর পূর্বে বিদ্যাসাগর ও মাইকেলের সবগুলো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্কিমেরও একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের কল্যাণে বাংলা সাহিত্য আধুনিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত বাঙ্গালী মুসলমানরা তখনও পয়ার ছন্দে ত্রিপদীতে বটতলার দোভাষী পুঁথি রচনায় ব্যস্ত ছিলেন। মশাররফ হোসেনের পূর্ব পর্যন্ত পদ্যে লেখা মুসলমানদের একমাত্র রচনা তাহেরুন্নেসার একটি প্রবন্ধ যা বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সময়ের দিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যায় প্যারিচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৭)’ বঙ্কিম চন্দ্রের দূর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৫) ও কপাল কুণ্ডলা (১৮৬৬) প্রকাশের অব্যবহিত পরেই মীর মশাররফ হোসেনের রত্নাবতী প্রকাশিত হয়। রত্নবতী সাহিত্য প্রকাশের ভাষায় শক্তিশালী গদ্য রচনায় দক্ষতা প্রকাশ পায়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের মধ্যে একমাত্র মীর মশাররফ হোসেনেই সাহিত্য সৃষ্টির অগ্রপুরুষ। অবশ্য তা অর্জনের জন্য লেখককে দীর্ঘদিন গদ্য রচনায় অনুশীলন করতে হয়েছে। বার/তের বছর বয়স থেকেই তিনি বাংলায় হেঁয়ালী লিখতে শুরু করেন যা অল্প সময়ে ‘মশার হেঁয়ালী’ বলে পরিচিত হয়ে ওঠে। তাঁর লেখা প্রথম হেঁয়ালী----

কামারের মার ফেলে

পাঁঠার ফেলে পা

লবঙ্গের বঙ্গ ফেলে

বেছে বেছে খা

-----উত্তর : কাঁঠাল


মশাররফ হোসেন জমিদার পুত্র। পিতা বাংলা চিঠিপত্র এবং জমিদারী সংক্রান্ত কাজ দশ বছরের বালক মশাররফকে দিয়ে করাতেন। তাঁর গদ্য সাহিত্যের সূচনা ঘটে পনের বছর বয়সের মধ্যে। তিনি প্রথম গদ্য বই পড়েন সংস্কৃতি সাহিত্যিক বানভট্রের কাদম্বরী গ্রন্থের বাংলা ভাবানুবাদের ভাবানুবাদ। এর উপলদ্ধি তাঁর কাছে কষ্টকর ছিল। সাহিত্য পাঠের প্রতি বাল্যকাল থেকেই তিনি নিষ্ঠাবান ছিলেন। ১৮৬৫ সালে তিনি যশোর জেলার মক্তারপুরে বাস করতেন। মুক্তারপুর থাকাকালে তিনি কলিকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ এবং কাঙ্গাল হরিনাথ কর্তৃক সম্পাদিত কুমারখালি থেকে প্রকাশিত ‘গ্রাম বার্তা’ পত্রিকায় লিখতেন। তিনি নিজেও কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতৈষী’ প্রত্রিকার সম্পাদনা করতেন। পরে পাংশা থেকে প্রকাশিত রওশন আলী সম্পাদিত ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেখা প্রকাশিত হত। মুসলমান লেখকদের ‘সোনাভান’ ‘আমীর হামজা’ সাহিত্য থেকে মশাররফ সুললিত, শক্তিশালী গদ্য সাহিত্যের জন্ম দেন।

বঙ্কিম চন্দ্র ও মীর মশাররফ হোসেন স্বীয় ক্ষেত্রে মৌলিকত্বের দাবিদার। রত্নবতী প্রকাশের আগে বঙ্কিমের যে ‍দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল তা মশাররফ হোসেন পড়েননি। বিষয়টি তাঁর লেখা আমার জীবনী থেকে জানা যায়। বঙ্কিম ও মশাররফ সমসাময়িক, তবে তাঁরা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নিজেদের জগতে বাস করতেন। তবে তাদের গদ্যের উৎস ছিল অভিন্ন। রামনাথ বসু, উইলিয়াম কেরী, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রাজা রামমোহন রায়, অক্ষয় কুমার দত্ত এবং সর্বোপরি ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক পরিশীলিত ও উন্নত সাহিত্য বঙ্কিমচন্দ্র ও মশাররফ হোসেনের গদ্যের মূল অবলম্বন। এখানে মীর নিজস্ব স্টাইল অবলম্বন করেছেন যার সকল চরিত্র মানুষ। বিশেষ করে সাধারণ, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। সে সময়ের একমাত্র নগরী কলিকাতায় সময় কাটিয়েছেন, সপরিবারে বসবাস করেছেন কিন্ত তাঁর জীবনের প্রধান অংশ কাটিয়েছেন বাংলার অতি বিস্তৃত অঞ্চলে। বহু বিচিত্র মানুষের সাথে তাঁর পরিচয় ছিল। ছিল ব্যাপক ঘনিষ্ঠতা। কুষ্টিয়া, পদমদী, টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার, বগুড়া, কৃষ্ণনগর তাঁর জীবনের ঘনিষ্ঠ অংশ। তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থক্লিষ্টতা, জীবন সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব কলহ, শ্রেণি বিশেষের লাম্পট্য, বিলাসিতার সকল বৈচিত্রের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। সকল বিষয়কে তিনি সততার সাথে সত্যনিষ্ঠ করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে। এ কারণেই তিনি ‘সত্যকথন ও সত্য ভাষণের’  সাহিত্যশিল্পী বলে মূল্যায়িত। তিনি একাধারে গল্প, নাটক, প্রহসন, নক্সা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, আত্মজীবনী, কবিতা, ধর্মীয় গ্রন্থ, ট্রাজেডি রচনা করেছেন। সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর দীপ্ত পদচারণা রয়েছে। তাঁর রচনায় তদানীন্তন অভিজাত ও দরিদ্র মুসলমান, বৃটিশদের নিপীড়ন, শোষণ, জমিদারদের লাম্পট্য, রক্ষণশীলতা, পশ্চাৎপদতায় সমাজ অগ্রায়নের চিত্র পাওয়া যায়।

তাঁর সাহিত্য সাধনার চল্লিশ বছরকে ৪টি পর্বে ভাগ করে তাঁর সাহিত্য কর্মের চেতনা, সমৃদ্ধি, বন্ধ্যাত্ব, শিল্পবোধের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।

প্রথম পর্ব : ১৮৬৯-১৮৭৩

এ সময় তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির শুরুর কাল। কিন্তু পারিবারিক নানা সংঘাতে তিনি সাহিত্যের প্রতি অতিমনোযোগী হয়েছেন তা বলা যাবে না। এ সময় বিষয়াদীর বিবাদসহ দাম্পত্য সঙ্কট সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বড় বাধা। এ পর্বে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ রত্নবতী (১৮১৯), ‘গৌড়ি সেতু’ বা গড়াই ব্রিজ (১৮৭৩), ‘বসন্ত কুমারী’ নাটক (১৮৭৩) এবং জমিদার দর্পণ (১৮৭৩)।

দ্বিতীয় পর্ব : ১৮৭৪-১৮৮৪

মীর মশাররফ হোসেন এ সময় বিবি কুলসুমকে বিবাহ করেন। এ সময়ে তাঁর জীবনে দাম্পত্য সঙ্কটকাল এবং সৃষ্টির ক্ষেত্রে শূন্যকাল বলা হয়। স্বপত্নীদের যন্ত্রণায় বিদীর্ণ মশাররফেএ সময় কিছুই লেখেননি। কেবল একটি ক্ষুদ্র প্রহসন ‘এর উপায় কী’  ১৮৭৫ এ তিনি রচনা করেন।


তৃতীয় পর্ব : ১৮৮৫-১৮৯১

এ সময়টি মীরের উজ্জ্বল সময়। এ পর্বে তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্ম ‘বিষাদ-সিন্ধু’, তিনি রচনা করেন। এ সময়ের রচনা ‘বিষাদ-সিন্ধু’, ‘সঙ্গীত লহরী’, ‘গোজীবন’, ‘বেহুলা গীতাভিনয়’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ প্রভৃতি।

চতুর্থ পর্ব : ১৮৯২-১৯১১

এ সময়কালে মীর মশাররফ হোসেন স্বজাত্ববোধে রচনা করেছেন নানা ইসলামী গ্রন্থ। ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’, মৌলুদ শরীফ’, ‘মুসলমানদের বাংলা শিক্ষা প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ’, ‘বিবি খোদেজার বিবাহ’, ‘হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ’, ‘মদিনার গৌরব’, ‘মোস্লেম বীরত্ব’, ‘আমার জীবনী’ ‘বিবি কুলসুম প্রভৃতি। এ সময়ের লেখায় শিল্পগুণ নানা ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে ‘আমার জীবনী’ ও ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ ‘বিবি কুলসুম’ গ্রন্থে শিল্পগুণ ব্যবহৃত হয়নি। এ সময়ের লেখাকে অনেক সমোলোচক তাঁকে যুক্তিহীন ধর্মীয় আচছন্নে বিপন্ন মানসিকতার দায়ভার চাপিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর ওপর এক তরফা দায়ভার চাপানো ন্যায়সঙ্গত নয়। তিনি এ সময়ে কেবল স্বজাতীয় মুসলমানদের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, শিক্ষার বিমুখতা, পশ্চাৎপদতা দেখে ব্যথিত হয়েছেন। তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মের মধ্যে সে বিষয়গুলো তুলে ধরে তার প্রতিকারকল্পে সাহিত্য রচনা করেছেন। এখানে তাঁর ভাষা ব্যবহাররীতি যেমন প্রশসাংসার দাবিদার তেমনি তা সমকালীন সমাজের ঐতিহাসিক দলিল। মুসলমান সমাজের গ্লানির চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন আন্তরিকতার সাথে। এ প্রসঙ্গে তাঁর লেখা----‘৬০ বৎসর পূর্বে (বর্তমান থেকে প্রায় ২০০ বছর পূর্বে) বঙ্গে মুসলমান কী রুপ শোচনীয় দশা ছিল তা ভাবিলে অঙ্গ শিহরিয়া ওঠে। আমি সেই দুর্ঘটনা যাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি তাহাই জীবনীতে সন্নিবেশিত কবির। জাতীয় বিদ্যা শিক্ষায় শৈথিল্য, জাতীয় ভাব রক্ষায় শৈথিল্য, শাসন, বিচার, রাজ্য বিভাগ, সমগ্র বিভাগেই মোসলমান শূন্য। বিজাতীয় ভাষার কল্যাণে রাজপুরুষদিগের সহিত মাখামাখি ভাব। কাজেই নির্জীব নিরক্ষর বঙ্গীয় মুসলমান কার্যে তাহাদেরই আদর্শ গ্রহণ করিয়াছিলেন। অনেক বড় বড় জমিদার ধনী মুসলমান জোড়া জোড়া প্রতিমা তুলিয়া আশ্বিন মাসে প্রতিমা কল্যাণে হাজার হাজার বাহবা গ্রহণ করিয়াছিলেন।’ (আমার জীবনী পৃষ্ঠা-৮৪)। অন্যত্র----‘আমি সেই সময়ের কথা বলিতেছি। পঠন পরিচ্ছেদ হিন্দুয়ানী, চালচলন হিন্দুয়ানী, রাগ ক্রোধ হিন্দুয়ানী, কান্নাকাটি হিন্দুয়ানী, মুসলমানদের নামও হিন্দুয়ানী। যথা- সামসুদ্দিন - সতীশ, নাজমুল হক-নাজু, বোরহান-বীরু, লতিফ-লতু, মশাররফ-মশা, দায়েম-ডাশ, মেহেদি-মাছি, ফজলুল করিম-ফড়িং এই প্রকার নামে ডাকা হয়।’ (মশাররফ রচনা সম্ভার পৃষ্ঠা-২৫০)।

শিক্ষার ক্ষেত্রে তৎকালীন মুসলমানদের অনীহা ও অবজ্ঞার প্রসঙ্গে তাঁর মাতামহীর মনোভাব এভাবে ব্যক্ত করেছেন। -------

‘কুমার খালিতে ইংরেজি স্কুল হইয়াছে, বাটি হইতে ছয় মাইল ব্যবধান, তারপর ইংরেজি পড়িলে পাপ তো আছই। আর মরিবার সময় গিডিমিডি করিয়া মরিতে হইবে। আল্লাহ রাসূলের নাম মুখে আসিবে না। তার পরেও আত্মিয় স্বজন, গুরুজনদের ধারণা যে, ইংরেজি পড়িলে একরুপ ছোটখাটো শয়তান হয়। দাঁড়াইয়া প্রস্রাব করে, সরাব খায়। হালাল হারাম প্রভেদ নাই। পাক নাপাকে জ্ঞান থাকে না। মাথার চুল খাট করিয়া নানা ভাবে ছাঁটে সাহেবী পোষাক পরে।’ (আমার জীবনী) মশাররফ হোসেন কেবল মুসলমান সামাজের দুর্দশা, সংস্কার, রক্ষণশীলতা ও সঙ্কীর্ণতার বিষয়কে তুলে ধরেননি এর প্রতিকারকল্পে তাঁর সযত্ন সাহিত্য প্রয়াস লক্ষণীয়। বিষাদসিন্ধু সাহিত্যের শিল্পগুণে প্রশংসিত। তা সত্বেও মুসলমান সমাজে ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত। মশাররফ হোসেনের পরচিয় তিনি সাহিত্য শিল্পী। মানবিক মূল্যবোধই সাহিত্যের আসল উপাদান।


এ উপাদানকে অক্ষুন্ন রেখে তিনি বিষাদসিন্ধুর বিষয়বস্তুকে এমনভাবে দাঁড় করিয়েছেন যেখানে গ্রন্থটির পাঠক প্রবল মানসিক বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ভাবাবেগেরে এ বেদনা সাহিত্য গণ্ডিতে কেবল ট্রাজেডি হিসেবে পাঠকের অশ্রুপাত ঘটায় না, গ্রন্থের পাঠক অবচ্ছন্ন চেতনায় আড়ষ্ট হয়। এখানে শিল্পের সাথে জীবন, জীবিকা এবং সমাজতত্ত্বের সমন্বয় ঘটেছে। এ বিষয়ে মুনীর চৌধুরীর অভিমত -----‘বিপরীত ধর্মী সরলতা ও জটিলতা, গতানুগতিতা, মৌলিকতা সাম্প্রদায়িকতা, ধার্মীকতা, গ্রাম্যতা ও নাগরীকতা, মধ্যযুগীয়তা ও আধুনিকতা, সকলই মীরের স্বভাবজাত। বিগত কালের  রসবোধ ও জীবন চেতনার যে প্রকাশ পুঁথি সাহিত্যে লক্ষ্য করি, মীর-মানস তার সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারেনি।’  এ কথা সত্য যে, বিষাদ সিন্ধুর চেতনা মুসলমান সমাজকে নবচেতনার উন্মেষ ঘটায়। ফলে মুসলমান সমাজ গ্রন্থটিকে ধর্মীয় পুস্তক হিসেবে ভেবে নেয়। গ্রন্থটি মুসলমান সমাজের রেনেসাঁর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। এরপর মীর রেনেসাঁর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। এরপর মীর রেনেসাঁভিত্তিক হযরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ, হযরত বেলালের জীবনী, এসলামের জয়, মদিনার গৌরব, মোসলেম বীরত্ব হযরত মুহম্মদ (সঃ) নেতৃত্বে বদর থেকে খায়বর যুদ্ধ পর্যন্ত ঐতিহাসিক কাহিনী কাব্য রচনা করেন।

তিনি এখানেই শেষ করেননি। মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও মানবিক চেতনার বাস্তবমূখীতায় দাঁড় করিয়েছেন। মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা গ্রন্থে তিনি যেমন মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনায় প্রবিষ্ট করেছেন তেমনি ধর্মকে ইহজাগতিক কল্যাণকামীতার কথা বলেছেন।

আল্লাহ এক।

আল্লাহ সকলের বড়।

আল্লার কোন দোষ নাই। কোন বদনাম নাই। আল্লাহর মতো কেহ নাই। তাহার মা বাপ নাই। তিনি সকলের খোরাক দেন। তিনি সকলকে বাঁচান। তিনি সকল সময় আছেন। সকল সময় থাকিবেন-----(মশাররফ রচনা সমগ্র পৃ-৪৯১) ‘২য় পাঠ পয়গম্বরের কথা’ খোদাতালার নেক বান্দা, বেগুনা অর্থাৎ পাপবিহীন। মানুষই পয়গম্বর হইয়াছেন। যিনি পয়গম্বর হন তিনি ভালো কাম করেন। খোদাতালার ইচ্ছা মানুষের যিনি প্রকাশ করেন তাঁকে পয়গম্বর বলে। তিনি ভালো কথা বলেন। মানুষ দিগকে মন্দ কাম হইতে ফিরাইয়া দেন অর্থাৎ মন্দকাম করিতে দেন না। আল্লাহুর কালাম সকলকে শুনান’---- ৪৯৩। মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা তৃতীয় পাঠে তিনি খোদাতালার কোদরত, পানি (জল), হাওয়া (বায়ু বাতাস), আগুন (অগ্নি), গাছপালা গাছগাছারা, ইত্যাদি।’ নিবন্ধকারের প্রতিটি পঙক্তিতে ধর্মীয় আশ্রয়ে সংস্কার মুক্ত মানস সৃষ্টির তাগিদ লক্ষ্য করার মত।

আমাদের সুখের জন্য, আমাদের ভালোর জন্য, আমাদের উপকারের জন্য আল্লাতায়ালা কত পদার্থ (জিনিষ দ্রব্য) প্রস্তত করিয়াছেন-----সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহার দয়া অনুগ্রহ বিষয়ে কত কহিব। দেখ এই জমিন, (মৃত্তিকা মাটি) জমিনের উপর কত লাখে লাখে জানদার এবং বেজান পদার্থ সচল রহিয়াছে। কেমন খোলা জায়গায় তাহারা রহিয়াছে। আমরা জমিনের উপর চলাফেরা করি। ঘরবাড়ি বানাইয়া তাহাতে থাকিয়া - থাকি। ফল মূল তরকারি কত রকম খাইবার জিনিস জমিনে পয়দা হয়। ঐ ফল মূল তরকারি কতক আমরা খাইয়া থাকি, কতক গরু, ভেড়া, ছাগ, উট, চারপায়া জানোয়াররা খাইয়া থাকে। আমরা মরিয়া গেলেও জমিন আমাদের কাজে লাগে। ঐ জমিতেই আমাদের মরা মানুষের কবর দেই। (৪৪৫ পৃষ্ঠা)

ছোট ছোট গাছ যাহা চাষ করা জমিতে হয়, প্রথম ঐ সকল গাছ দুর্বা ঘাসের মতো দেখায়। ক্রমে উলট পালট হইয়া ভারি হয়, ফুল হয়, ছ-মাসে ফল ধরে, অল্প দিনেই পাকে। যেমন ধান, গম, ছোলা, মটর, মুগ, অরহর, মশুরী, কলাই ইত্যাদি। ঐ সকল ফসলে আমাদের খাদ্যের কত সাহায্য হইতেছে (পৃষ্ঠা-৪৯৭)। মুসলমানের বাঙ্গালা শিক্ষা প্রথম ভাগের প্রথম অংশই একটি পাঠ্য পুস্তক। মশাররফ হোসেন এ বইয়ে বাংলা বর্ণমালাসহ বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, দুই অক্ষরে শব্দ, তিন অক্ষরে শব্দ, আকার, একার, সহজ কবিতা, পড়া শেখার নিয়ম, বাংলা বার মাসের নাম, বার চাঁদের নাম, গণনাসহ পরিপূর্ণ পাঠ্য বই রচনা করেন। আরবী ফার্সির অনুশীলনের যুগে প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষা শেখার বিষয়ে এটা তাঁর আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে।


মীরের বিশেষত্ব হল বৈচিত্রময় সাহিত্য রচনা। তিনি সাহিত্যকে গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে উদার চেতনা বিকাশের তাগিদে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিস্তৃত অঙ্গনে। চরিত্র চিত্রণে তার অন্যতম বিশেষত্ব হল বিক্ষেপ। ‘হায়রে পাতকী অর্থ, তুমিই সকল অনর্থের মূল’ মীরের এ উক্তি সঞ্চারিত হয়েছে সে কাল থেকে একালে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব সংঘাতই সমাজ উন্নয়নের দর্শন। এখানে প্রেম ভালোবাসার চেয়ে বৈষয়িকতার দ্বন্দ্ব বিক্ষেপের স্পষ্টতার ছাপ গভীর। অর্থনীতির অন্তদর্শনে টাকার এমন সংজ্ঞা কেউ দিয়েছেন বলে আমার জানা নাই।

‘হায়রে টাকা। কাটামুণ্ড ছাপযু্ক্ত রুপার ক্ষুদ্র একটি চাকতি তুমিই টাকা ! ও টাকা ! তোমার মহিমা অপার, ক্ষমতা অনন্ত। তোমাকে হাতে পাইলে মানুষ আত্মহারা, আত্মবিস্মৃত, আত্মজ্ঞানশূন্য, তত্ত্বজ্ঞানশূন্য, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া অনেকে অনেক কার্য করিয়া থাকে। তোমার অসাধ্য নাই। টাকা, আবার তুমিই ধর্ম, তুমিই কর্ম, তুমিই স্বর্গ, তোমাতেই নরক তুমিই পালক, তুমিই সংহারক,----হায় তুমিই চালক, তুমিই বন্ধু, তুমিই মান তুমিই অপমান, তোমাতেই দয়া মায়া, শত্রুতা, মিত্রতা, প্রণয় বিচ্ছেদ ভালোবাসা। অন্যপক্ষে তুমিই শয়তান। তুমি সত তুমিই সত তুমিই অসত। তুমিই পণ্ডিত, তুমিই বিদ্যান, রায় সাহেব, বাহাদুর, রাজা মহারাজা। আরো বলিব। তুমিই সুন্দর, অতি সুন্দর, তুমিই জীবন, তুমিই যৌবন। তোমাতেই গৌরব, তোমাতেই অন্ধাকার, তোমাতেই মিষ্টি তোমাতেই সৃষ্টি। তুমিই প্রকাশ্য, তুমিই গোপন। তোমাতেই পিরীত প্রণয় বিবাহ, তোমাতেই ঝগড়া, বিবাদ, বিবাহবিচ্ছেদ। তুমিই বল, তুমিই বৃদ্ধি। জনমে তুমি, জীয়ন্তে তুমি, জীবনান্তেও তুমি। ----- গাজী মিয়ার বস্তানী।

জৈবিক ও ভাব চেতনার মধ্য দিয়েই ব্যক্তি মানুষের সামগ্রিক বিকাশ। মীরের সাহিত্যে উভয়ের সম্মিলন দেখতে পাই। বিষাদ সিন্ধু, বিবি কুলসুম, রত্নবতী (রুপকথামূলক গল্প), বসন্তকুমারী নাটক, সঙ্গীত লহরী, তহমিনা, টালা অভিনয় ইত্যাদিতে ভাবজগতের বিষয় অন্যদিকে------আমার জীবনী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গো-জীবন, গৌড়ি সেতু, জমিদার দর্পণ, গাজী মিয়ার বস্তানী জৈবিক তথা জীবন চেতনার বিষয় বিধৃত হয়েছে। শেষোক্ত গ্রন্থগলি মূলত জীবনের অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক বিষয়ের সত্যনিষ্ঠ বিবৃতি।

মীর মশাররফ হোসেনের সুদীর্ঘ বছরের সাহিত্য সাধনার সবচেয়ে বড় অবদান জমিদার দর্পণ নাটক। প্রায় সোয়াশত বছর পূর্বে প্রকাশিত এ নাটকে তিনি জমিদারী ব্যবস্থার অভিশাপ, অপক্রিয়াই নয় তৎকালীন জীবন ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। নাটকটি মঞ্চস্থ হলে বিভিন্ন স্থানে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে পাবনায় সাধারণ মানুষের তুমুল লড়াই বেঁধে যায়। কেবল সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র বা শৈল্পিক গুণেই নয় সমাজচিত্রে বস্তুনিষ্ঠ রুপায়নের কারণেই সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও জমিদার দর্পণ আজাও বাঙালি পাঠকের নিকট পাঠনীয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল টেক্সট বুক বোর্ড উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির বাধ্যতামুলক বাংলা বিষয়ের সহপাঠ্য হিসেবে নির্বাচিন করেছে। মানব জাতির আর্থ সামাজিক বিকাশের ধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে সামন্তবাদ ও সামন্ত শাসন এক অমোঘ ধারা। এ ধারায় ইংরেজ শাসনকালের প্রত্যক্ষদর্শী মশাররফ হোসেন জমিদারী ব্যবস্থার কুফল, শাসক-শোষিত সম্পর্কের হৃদয়হীনতা, সাধারণ প্রজার উপর জমিদার শ্রেণির নির্মম নিস্পেষণ, জমিদার রাক্ষসের কাছে নারীর চরম লাঞ্ছনা এসব বিষয় উঠে এসেছে জমিদার দর্পণ নাটকে। সত্য কথনের নায়ক সাহিত্যিক অকপটে জমিদারদের লাম্পট্যের কথা বলতে যে শুরু করেছেন স্বপরিবারের চিত্র অবলম্বনে-----

‘নিরপেক্ষভাবে আপন মুখ দর্পণে দেখিলে যেমন ভালোমন্দ বিচার করা যায়, পরের মুখ তত ভালো হয় না। জমিদার বংশে আমার জন্ম, আত্মস্বজন সকলেই জমিদার, সুতরাং জমিদারের ছবি অঙ্কিত করিতে বিশেষ আয়াশ আবশ্যক করে না। আপন মুখ, আপনি দেখিলেই হইতে পারে। সেই বিবেচনায় জমিদার দর্পণ সম্মুখে ধারণ করিতেছি।’ এ থেকেই বোঝা যায় জমিদারী ব্যবস্থার বহুমাত্রিক রুপ অঙ্কনই ছিল মশাররফের মূল উদ্দেশ্য। নট-নটীর সঙ্গীতে জমিদার ব্যবস্থার অনাচার উপস্থাপনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এভাবে-------


হা ধর্ম। তোমার ধর্ম লুকালো ভারতে, জমিদার অত্যাচারের ডুবিল কলঙ্কে।

সোমপ্রকাশ পত্রিকা নাট্যকাহিনীর সত্যতার প্রতি এভাবেই মতামত প্রকাশ করেছিলেন-----

যাহারা কলিকাতায় বা তাহার সন্নিকট বাস করেন তাহারা মনে করিতে পারেন গল্পটি অত্যুক্তি দোষে দূষিত। আমরা মনে করি না। আমরা দূর মফস্বলস্থ কোনো কোনো জমিদারের চরিত বৃত্তান্ত বিশেষরুপে অবগত আছি। তাহাতে কোনোরুপেই আমাদের এরুপ বোধ হইতেছে না যে গল্পটাতে অতুক্তি দোষের গল্প আছে। গ্রন্থকার দূর মফস্বলে বাস করিয়া থাকেন, অতএব মফস্বলের জমিদারেরা যে সকল কাণ্ড করেন তাহা তাহারা অবহিত নয়। হয়তো এরুপ ঘটনা হইয়াছে, তাহার অন্যতম জ্ঞাতি যে অত্যাচার করিয়াছেন, তিনি স্বচক্ষে দেখিয়া তাহার বর্ণনা করিয়াছেন। গল্পটির সামান্যভাবই তাহার রুঢ় বর্ণনায় যথার্থ সপ্রমাণ করিয়া দিতেছে। আমাদিগের স্পষ্ট বোধ হইতেছে, গ্রন্তকারের যদি কিছু মিথ্যা যোগ করিবার ইচ্ছা থাকিত তিনি নানা প্রকার অলঙ্কার দিয়া গল্পটিকে সুশোভিত করিয়া তুলিতেন।

মীর মশাররফ হোসনে তাঁর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, জমিদার দর্পণ হাতে লিখিয়া আমার বাটিতে কুমারখালিতে কয়েকবার অভিনয় করা হয়। শেষ অভিনয় দিনে আনার মোল্লাকে (এই মোল্লার স্ত্রীই জমিদারের অত্যাচারে প্রাণ হারাইয়াছিল) উপস্থিত করিয়া দেখান হইয়াছিল। সত্য ঘটনামূলক অভিনয় করার সময় নাট্যেল্লিখিত ব্যক্তিগণ সকলেই জীবিত। (আবুল আহসান চৌধুরী মীর মশাররফ হোসেন, িসাহিত্যকর্ম ও সমাজচিন্তা বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা-১৮৬)। বাস্তম ঘটনা অবলম্বনে রচিত বলে জমিদার ও তাদের সহযোগী অনুগত গোষ্ঠী মীরের প্রতি প্রবল রুষ্ট হল। নাটকটি মীরের জ্ঞাতিভাই পদমদীর নবাব মীর মোহাম্মদ আলীকে উৎসর্গ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন-----‘সামান্য উপহার স্বরুপ, অবজ্ঞাসহ কীঙ্করের ন্যায় জমিদার দর্পণ সম্মুখে ধারণ করিতেছি। একবার কটাক্ষপাত করিয়া যত্নে রক্ষা করিবেন। এই আমার প্রার্থনা। অনেক শত্রু দর্পণখানি ভগ্ন করিতে প্রস্তুত হইতেছে।’

সত্য ঘটনা অনুসরণে রচিত জমিদার দর্পণ ঊনিশ শতকের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মই নয় এটা দলিল বিশেষ। মীরের এ সাহসী কর্ম কেবল সাহিত্য কর্মে নয় আজও শোষক, লম্পট, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শিল্পকর্ম। দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ (১৮৬০) নাটক প্রকাশের তের বছর পর জমিদার দর্পণ নাটক প্রকাশিত হয়। এ সময় দর্পণ নাটক লেখার একটা প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। তারমধ্যে কালের দলিল হিসেবে নীল দর্পণের মতো জমিদার দর্পণ নাটকের ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জমিদারি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন প্রচণ্ড আঘাত ইতিপূর্বে অন্য কোনো সাহিত্যিকের রচনায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ চেতনার বিস্ময়কর পরিচয়। তাঁর রচনাসমূহ শৈল্পিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কালোত্তীর্ণ শিল্পের মর্যাদায় অভিষিক্ত।

সভা সমিতিতে মশাররফ হোসেনের সংশ্লিষ্টতা

মশাররফ কিছু কিছু সভা সমিতির সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের পরিচালনা ও নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। টাঙ্গাইলের অবস্থাকালে তিনি বেশ কয়েকটি সংগঠনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। কুষ্টিয়ার ‘স্টুডেন্টস মাজকারাতুল ইসলমা - ই - কুষ্টিয়া’র সঙ্গে তার যোগ ছিল। তাই এই সংগঠনের এক অনুষ্ঠানপত্র (১১ মে, ১৯০২-সভাপতি) ও শান্তিপুরের কবি মোজাম্মেল হকের (১৮৬০-১৯৩৩) দিনলিপি থেকে জানা যায়।


কুষ্টিয়ার অন্তর্গত খোকসার সৈয়দ আব্দুল কুদ্দুস রুমি (১৮৬৭-১৯২৩) প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে ইত্তেফাক ইসলাম’ (১৩১১) এর তিনি ছিলেন উপদেষ্টা এবং এই সংগঠনের সাহায্যার্থে কয়েকবার তাঁর কিছু গ্রন্থও দান করেন। ধর্মীয় সভা সমিতিতে তাঁর যোগদানের আরো কিছু খবর পাওয়া যায়। ১৩০৭ সালের ২৬ বৈশাখ বাউল সম্রাট লালন সাঁইয়ের (১৭৭৪-১৮৯০) সমাধি ক্ষেত্রে যে গ্রাম অবস্থিত কুষ্টিয়া শহরের সে ছেউড়িয়া গ্রামের এক ধর্ম সভায় যোগ দিয়ে বাংলা মৌলুদ শরীফ পাঠ করেন। সেই সভায় যশোরের মুনশী শেখ মেহেরুল্লা ও মুনশী শেখ জমির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। পাংশার রওশন আলী চৌধুরী (১৮৭৪-১৯৩৩) কোহিনুর (১৩০৫) পত্রিকার পরিচালক সমিতির অন্যতম সদস্য এবং মিহির ও সুধাকর পত্রিকার বিশিষ্ট লেখক হিসেবে তাঁর নাম বিজ্ঞপিত হয়। মশাররফ মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তাঁর বসন্তকুমারী নাটক (১৮৭৩) উৎসর্গ করেন সোসাইটির কর্ণধার নবাব আব্দুল লতিফকে। মশাররফের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে জানা যায় পদমদিতে নবাব সাহেবের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় এবং তিনি মশাররফের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে জানা যায় পদমদিতে নবাব সাহেবের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় এবং তিনি মশাররফকে প্রীতির চোখে দেখতেন। ‘মোহামেডান লিটারেরী সোসাইটি’ ১৯০০ সালের ৯ জুন এক জরুরি সভায় সৈয়দ আমীর আলীর মাদ্রাসা শিক্ষা সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রতিবাদ জানানো হয়। সোসাইটির কার্যবিবরণীতে মাদ্রাসা শিক্ষার স্বপক্ষে মশাররফ হোসেনের লিখিত বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব সহকারে মুদ্রিত হয়। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্যও ছিলেন দীর্ঘকাল। তবে সে সব সভা সমিতিতে বৃটিশ রাজের যে আলোচনা বা বিরুদ্ধচারণ করা হত তার সঙ্গে তিনি কোনো যোগ রাখতেন না। শেষজীবনে তাই তিনি কোনো সভা-সমিতির সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী ছিলেন না। উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ তাঁকে উপদেষ্টা মনোনীত; সদস্যপদ প্রদান, সভাপতি কিম্বা আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত করতেন। বৃটিশ সরকারও তাঁকে অনারারী ম্যাজিস্টেট নিযুক্ত করে তাঁর যোগ্যতা ও কর্মের স্বীকৃতি দেন। (মীর মশাররফ হোসেন, আবুল আহসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা-৪৮,৪৯, বাংলা একাডেমি)।

মীর মশাররফ হোসেন রচনাবলী

১। রত্নবতী-গদ্যে রচিত রুপকথামূলক গল্প, প্রকাশ কলিকাতা, ১৮৬৯

২। গড়াই ব্রিজ অথবা গৌরী সেতু, কবিতা পুস্তক, ১৮৭৩

৩। বসন্তকুমারী, গদ্যে রচিত নাটক, মাঝে মাঝে গান ও কবিতা, ১৮৭৩

৪। জমিদার দর্পণ, গদ্যে রচিত নাটক, (উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্য), ১৮৭৩

৫। এর উপায় কি?, প্রহসন, ১৮৭৫

দ্বিতীয় প্রকাশ - টাঙ্গাইল-১৮৯২

৬। গোজীবন, টাঙ্গাইল, ১৮৮৯

৭। বেহুলা গীতাভিনয়, বাং ১২৯৬


৮। উদসীন পথিকের মনের কথা, ১৮৯০

নীলকরদের অত্যাচার নীলবিদ্রোহ ইত্যাদি।

৯। সঙ্গীত লহরী, ১৮৮৭

১০। বিষাদ সিন্ধু, মহররম পর্ব

বিষাদ সিন্ধু, উদ্ধার পর্ব

বিষাদ সিন্ধু, এজিদ বধ পর্ব

বিষাদ সিন্ধু, উপসংহার

১৮৮৫ থেকে ১৮৯১ এর মধ্যে সকল পর্ব রচিত

১১। তহমিনা, গদ্যে রচিত গল্প (প্রথমে পাংশার রওশন আলী সম্পাদিত কোহিনুর পত্রিকায় প্রকাশিত, ১৮৯৭)

১২। টালা অভিনয়, গদ্যে রচিত প্রহসন, কোহিনুর ও হাফেজ পত্রিকায় প্রকাশিত ১৮৯৭ পরে সম্পূর্ণ আকারে প্রকাশিত সত্য ঘটনা

১৩। নিয়মিত কি অবনতি, গদ্যে রচিত প্রহসন, কোহিনূর পত্রিকায় প্রকাশিত, ১৮৯৮

১৪। সৎ প্রসঙ্গ, হিন্দু মুসলমান বিরোধের সমস্যা নিয়ে রচিত, ১৩০৫ বাংলা সালের ভাদ্র সংখ্যা কোহিনূর পত্রিকায় প্রকাশিত

১৫। বিবি খোদেজার বিবাহ, ধর্মীয় কাহিনী কাব্য, রচনার সূচনা, বাংলা, ১৩১২

১৬। হজরত ওমরের ধর্ম জীবন লাভ, ধর্মীয় কাহিনী কাব্য, ১৯০৫

১৭। উপদেশ-হযরত লোকমানের উপদেশাবলী অবলম্বনে রচিত ক্ষুদ্র কাব্য, ১৯০২

১৮। হজরত বেলালের জীবনী, ধর্মীয় কাহিনী কাব্য, ১৯০৫

১৯। গাজী মিয়ার বস্তানী, গদ্যে রচিত নক্সা, ১৮৯৯

২০। মৌলুদ শরীফ, গদ্যে রচিত ধর্মমূলক রচনা, ১৯০৩

২১। আমীর হামজার ধর্মজীবন লাভ, কাব্যগ্রন্থ, ১৯০৫

২২। মদিনার গৌরব, কাব্যগন্থ, ১৯০৬

২৩। মোস্লেম বীরত্ব, কাব্যগ্রন্থ, ১৯০৭

২৪। এসলামের জয়, প্রবন্ধ গ্রন্থ, ১৯০৮


২৫। বাজিমাত, পয়ারে লিখিত বস্তু রচনা, ১৯০৮

২৬। মুসলমানদের বাঙ্গলা শিক্ষা, প্রথম ভাগ, ১৩১০

২৭। মুসলমানদের বাঙ্গলা শিক্ষা, প্রথম ভাগের প্রথম অংশ বাংলা স্বরবর্ণ, ব্যাঞ্জনবর্ণ-১৩১৩। স্বরবর্ণ অক্ষরের রুপান্তর দুই অক্ষরে শব্দ, তিন অক্ষরে শব্দ আকার, উকার ইত্যাদি

২৮। আত্মজীবনীমলক গ্রন্থ আমার জীবনী প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ খণ্ড, ১৯০৮

২৯। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আমার জীবনীর পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম, দশম খণ্ড, ১৯০৯

৩০। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ-আমার জীবনীর একাদশ ও দ্বাদশ খণ্ড, ১৯১০

৩১। আরবী খুতবার বাংলা ও উর্দু ভাষার পদ্যানুবাদ-ঈদের খোতবা, ১৯০৯

৩২। বিবি কুলসুম, ১৯১০।

পদমদিতে মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র পরিচিতি

মীর মশাররফ হোসেন তাঁর শেষজীবনে স্ত্রী বিবি কুলসুমের সাথে পিতৃপুরুষের ভূমি পদমদিতে কালাতিপাত করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর তিনি পরলোকগমন করেন। প্রায় শত বছর ধরে এই কালজয়ী সাহিত্যিক ও তাঁর স্ত্রীর পাশাপাশি দুটি কবর জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকে। একসময় তাঁর কবর সাঁওতা বা লাহিনীপাড় নাকি পদমদি তা নিয়ে নানা বিতর্ক চলে। ষাট দশকের প্রথমে বিশিষ্ট গবেষক ড. ফকির আব্দুর রশীদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। তাঁর বাড়ি পদমদি জেনে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী মীরের কবরের সন্ধান করতে বলেন। ড. ফকির আবদুর রশীদ ও তার স্ত্রী ফিরোজা সুলতানা রশীদসহ আরো কয়েকজন জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থানে সন্ধান কাজ চালিয়ে পাশাপাশি দুইটি কবরের সন্ধান পান। অবশ্য এ বিষয়ে গবেষক ও প্রাবন্ধিক মনিরুজ্জামান (কুষ্টিয়া) দ্বিমত পোষণ করেন। হীরকের দ্যুতি ম্লান হবার নয়। শত বছর পার হলেও তোমার কীর্তির জন্য তুমি যে মহান এ সূত্রতায় মীর মশাররফ হোসনে হীরকোজ্জ্বল। তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে পদমদিতে মশাররফ হোসেন স্মৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্মৃতি কেন্দ্রটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে প্রায় তিন কোট টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়।

তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্র কেবল নান্দনিক স্থাপনার বৃত্তে আবদ্ধ থাকলে চলবে না, বাংলাদেশের সাহিত্য গবেষণা, সংস্কৃতি গবেষণা, মীরের সাহিত্য ও তাঁর জীবন গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এখানে নানা ধরণের প্রশিক্ষণ কর্মশালার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন মানের উন্নতিতে নানা প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। একে কেন্দ্র করে সবুজ শ্যামলে আচ্ছাদিত পদমদি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে, এ বিশ্বাস আমাদের আছে। রাজবাড়িবাসী আশা করে স্মৃতি কেন্দ্রটি দৈশিক গণ্ডী ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করবে।

প্রকল্প পরিচিতি

পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মৌলিক উদ্দেশ্যাবলী যথা দারিদ্র বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মহিলাদের অংশ গ্রহণ পরিবেশের ওপর অনুকুল প্রভাব সম্পন্ন এবং পল্লী অঞ্চলের কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প। এরই আলোকে গ্রহণ করা হয়। ‍উপযুক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি


উপজেলাধীন পদমদি গ্রামে অবস্থিত মীর মশাররফ হোসেনের কবরকে কেন্দ্র করে তাঁর স্মৃতি সংগ্রহশালা, একটি গ্রন্থাগার, সেমিনার কক্ষ, অতিথিশালা এবং স্মৃতিকেন্দ্র পরিচালনার জন্য অফিস কক্ষ নির্মাণ ও তাঁর কবরটিকে একাটি নান্দনিক পরিকাঠামোতে সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প ছাড়পত্র প্রস্তুত করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩০ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রি-একনেক সভায় প্রকল্প ছাড়পত্র অনুমোদিত হয়। ১৯ এপ্রিল ২০০১ সালে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের জন্য (দুই) পর্যায়ে সর্বমোট ১.৮৪ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তর এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে ২০০৪ সালের ৩০ জুন। প্রকল্পের প্রথম পরিচালক ছিলেন প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন মইনুল হোসেন, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম এবং প্রফেসর আবুল মনসুর মোহাম্মদ আবু মুসা। নির্মাণকারী ও বাস্তবায়নকাল -------গণপূর্ত অধিদপ্তর এই প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ করে। প্রকল্পটি ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে আরম্ভ হয়ে ২০০৪ সালের জুন মাসে সমাপ্ত হয়। প্রকল্পের ব্যয় হয় ২ কোটি ৮৪ লক্ষ ৩ হাজার টাকা। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত।

পদমদি এস্টেট ও মীরের বংশ পরিচয়

                      ↓

                বংশ পরিচয়

                     ↓

    সাহ পাহলোয়ান (১৫০০ শতক)

                    ↓

    সাহ সাদুল্লাহ (জামাতা ১৫০০ শতক)

                    ↓

           পুত্র- নাম অজ্ঞাত

                    ↓

    মীর কুতুবল্লাহ (১৬০০ শতক)

                     ↓

 --------------------------------------------------------------------------

   ↓                                                                     ↓

মীর ওমর দাজরাজ (পুত্র ১৭০০ শতক)              মীর আলী আকবর (পুত্র ১৭০০ শতক)

                     ↓                                                   ↓


মীর এবরাহিম হোসেন (পুত্র ১৮০০ শতক)           মীর আলী আহম্মদ (পুত্র ১৮০০ শতক)

                          ↓                                             ↓

 ------------------------------------                    মীল আলী আশরাফ (পুত্র ১৮০০ শতক)

        ↓                   ↓             ↓                                              ↓

মীর জোলফেকার   হাফিজা খাতুন  নাসিমা খাতুন              ---------------------------------------------

          ↓                                                      ↓                    ↓                      ↓

 মীর মোয়াজ্জেম হোসেন পুত্র ১৮০০ জমিদার)          মীর মোহাম্মদ আলী     সৈয়দ           হায়াতুন নেসা

                           ↓                              (খেতাব প্রাপ্ত নবাব    আবদাস          (স্বামী গোলাম

     -----------------------------------------------     ১৮০০ শতক           সামাদ           কাদের)

           ↓                   ↓                       ↓   বিবাহ করেননি)           ↓        কুরর্শীর জমিদার

মীর মশাররফ হোসেন  মীর মহতেশাম হোসেন   আজগর আলী            করিমন নেছা      মকবুল আহমেদ

 (পুত্র ১৮০০ শতক সাহিত্যিক) (ব্যারিস্টার এট ল)  (কনিষ্ঠ)               (স্ত্রী বরিশালের    (গোলাম কাদেরের ভাই)

                       ↓                                                         বামন জমিদার)            ↓

       --------------------------------------------------------------------------             -----------------------

      ↓        ↓          ↓               ↓                   ↓               ↓         ↓                        ↓

রওশআরা  কন্যা  ইব্রাহিম হোসেন  আমিনা খাতুন  মোফাজ্জেল হোসেন  কন্যা      আক্কি বিবি    ওয়াজেদন নেছা

কন্যা     অকাল মৃত্যু                  (প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত)                                       (বিদুষী নারী)

বিদূষী রমণী ওয়াজেদন নেসা মুসলমান ছাত্রদের শিক্ষার প্রসারে রাজবাড়িতে ট্রাস্ট গঠন করেন। উক্ত ট্রাস্ট থেকে ১৯১৫ সালে মুসলমান ছাত্রদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। সে জমিতেই বর্তমান আদর্শ মহিলা কলেজ স্থাপিত। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ স্থাপিত হলে ওয়াজেদন নেসা ট্রাস্টের অর্থে ছাত্র হোস্টেল নির্মাণ করা হয়। কলেজ মসজিদের উত্তরে, উত্তর দক্ষিণ লম্বালম্বি ৫০ সিট বিশিষ্ট টিনের ছাউনীর ছাত্রাবাস ছিল। ছাত্রাবাসটির নাম ছিল ‘ওয়াজেদন নেছা হোস্টেল’। লেখক সেই হোস্টেলের ছাত্র ছিল। পদ্মার ক্ষীণতোয়া কিন্তু খরস্রোতা চন্দনা নদীর তীরের দক্ষিণে সোনাপুর, পদমদি। পদদির দক্ষিণে দক্ষিণবাড়ি পাশে কুরশী। চন্দনার উত্তরে রামাদিয়া, সেকাড়া, বহরপুর। নিকটবর্তী এসব স্থান নানা কারণে ইতিহাসের অঙ্গ।


বিল, বাওর, নদী, খাল, বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন অঞ্চলটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অতি আকর্ষণীয়। বিলের পদ্ম, শাপলা, শালুক এবং বহমান চন্দনার নৌকা, লঞ্চ, পানসি, নদী তীরের বনরাজি, ফুল, পাখির কুজন, গুঞ্জন অঞ্চলটিকে অপরুপ শোভায় শোভিত করেছিল। জানা যায় দ্রাবিড় ব্যবহৃত দি, দিয়া থেকে ‘দি’ এবং পদ্মা থেকে ‘পদ’ মিলে ‘পদমদি’ নামকরণ। প্রদমদি, সোনাপুর, বহরপুর অঞ্চলের চন্দনার তীরবর্তী ঘন জঙ্গলে ছিল বন্য শুয়োর ও বাঘের বাস। ঘটনার স্রোতবাহী ধারায় সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে পদমদি আজ দেশের অতি পরিচিত একটি নাম। পদমদি নামের সাথে জড়িয়ে আছে জেলার একমাত্র নবাব উপাধিতে ভূষিত মীর মোহাম্মদ আলীল স্মৃতি চিহ্ন। মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক, বিষাদ সিন্ধুর লেখক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিকেন্দ্র। নবাব মীর মোহাম্মদ আলী এবং সাহিত্য শ্রেষ্ঠ মীর মশাররফ হোসেন একই বংশে জন্মগ্রহণ করেন। সাহ সাদুল্লার নাতি মীর কুতুবুল্লা। কুতুবুল্লার জ্যেষ্ঠ সন্তান মীর ওমর দারাজ এবং কনিষ্ঠ সন্তান মীর আলী আকবর। ওমর দারাজের বংশধর কুষ্টিয়ার সাঁওতা ও লাহিনীপাড়ায় বসতি স্থাপন করে কিন্তু পদমদির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলীর পূর্ব পুরুষ স্থানীয়ভাবে পদমদিতে জমিদারী ও নবাবী এস্টেট গড়ে তোলেন। মীর কুতুবুল্লার ছেলে মীর আলী আকবর। আলী আকবরের ছেলে মীর আলী আহম্মদ ঢাকা থেকে চাকরিসূত্রে উন্নতি শুরু হয়। তিনি ছিলেন দারোগা। বিভিন্ন থানায় চাকরিসূত্রে লোকে তাঁকে বাইশ থানার দারোগা বলত। প্রতাপশালী দারোগা ও ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। মীর আলী আহমদের পুত্র মীর আলী আশরাফ। মীর আলী আশরাফ ভালোমত লেখাপড়া শিখে ডেপুটি কালেক্টর হলেন। চাকরির সাথে সাথে তিনি ‘পরগনা’ গঙ্গা পথের অংশ’ এবং ঢাকায় ‘নোয়ারের চর’ দুটি জমিদারী ক্রয় করেন। চাকরি ও জমিদারী সূত্রে তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। চাকরি ও জমিদারীর বিপুল অর্থ থেকে বাড়িঘর, দালানকোঠা নির্মাণ করেন।

Additional information