শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-২

এ কথা পিতার কর্ণগোচর হলে পিতা পুত্রের বধোদয়ে স্ত্রীকে এররাহিমের খাবার পাতে কিঞ্চিত ছাই রেখে দেওয়ার আদেশ দেন। স্মামীর আদেশ অমান্য করা মহাপাপ ভেবে স্নেহময়ী মা যথাজ্ঞা পালন করেন। মীর এবরাহিম পাতে ছাই দেখে অভিমানে গৃহত্যাগ করেন। তখনকার দিনে মুর্শিদাবাদ ছিল শিক্ষার কেন্দ্র। উদ্দেশ্য মুর্শিদবাদ যেয়ে লেখাপড়া শিখে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবেন। তখন হাঁটা পথেই ছিল একমাত্র অবলম্বন। মাঠ, ঘাট জঙ্গল পাড়ি দিয়ে গড়াই নদী পাড় হয়ে সাঁওতার ঘাটে যখন পৌঁছান তখন সন্ধায় হয় প্রায়। একতো রাত তারপর পথঘাট চেনেন না, পেটেও ক্ষুধা, নানা কথা ভাবতে থাকেন। ইতিমধ্যে জানতে পারেন সাঁওতায় আনার খাতুন নামে এক জমিদার আছেন যার বাড়িতে পথিক আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। তিনি আনার খাতুনের আশ্রয়ে রাত্রি যাপন করে সকালে বিদায় নেওয়ার সময় এলে আনার খাতুন তাকে ডেকে পাঠান। তিনি আনার খাতুনের নিকট সব বৃত্তান্ত বলেন। আনার খাতুন ওমর দারাজকে চিনলেন এবং বললেন সে তার জ্ঞাতি ভাই। যুবক ইবরাহিমকে যেতে দিলেন না। আনার খাতুনের স্বামী সন্তান ছিল না। তিনি পুত্রবৎ স্নেহে যুবক এবরাহিমকে পালন করেন এবং সময়ে সমুদয় জমিদারী লিখে দিয়ে পরলোকগমন করেন। সাত বছর পর মীর এবরাহিম পদমদি আসেন। হারানো পুত্রকে পেয়ে পিতা মাতার আনন্দের সীমা থাকে না। মীর এবরাহিম সাঁওতায় ফিরে যান। মীর এবরাহিমের পুত্র মীর জোলফেকার, মীর মোয়াজ্জেম হোসেন ও কন্যা হাফিজা খাতুন ও নাসিমা খাতুন। মীর এবরাহিম দ্বিতীয় বিবাহ করেন পদমদির অদূরে দক্ষিণবাড়ির মলঙ্গ ফকীরের বিধবা কন্যাকে। দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান মীর সাহেব আলী ও এক কন্যা। এবরাহিম দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য সাঁওতার অদূরে লাহিনীপাড়ায় ভিন্ন বসতবাটি নির্মাণ করে দেন। পরে সাঁওতা থেকে পুরো পরিবার লাহিনীপাড়ায় উঠে আসে। মীর জোলফেকার আলীর পুত্র সন্তান ছিল না। দুই কন্যা ভরণ নেসা ও থরণ নেসা। মীর মোয়াজ্জেমের বিবাহ জেন্নাতুল্লাহর কন্যা দৌলতন নেসার সঙ্গে (১২৫৫)। গ্রাম কাশিমপুর, পরগনা বিরাহিমপুর। বিরাহিমপুর পরগনার মালিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। (বিরাহিমপুর পরগনা থেকে ঠাকুর পরিবার বছরে ৩১/৩২ হাজার টাকা খাজনা পেতেন)। দৌলতন নেসার গর্ভে ১৮৪৭ সালে ১৩ নভেম্বর লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম। মীর জোলফেকার দ্বিতীয় বিবাহ করেন। দ্বিতীয় পক্ষের কন্যা শুকরণ নেসার সাথে ফরিদপুরের পার গেরদা গ্রামের গোলামাজমের বিবাহ। উল্লেখ্য তরফ সাঁওতার হিস্যা-অসিয়ত নামায় মীর জোলফেকার ও মীর মোয়াজ্জেমকে মীর এবরাহিম দান করেন। এছাড়া পদমদির বাটি, তালুক জমাজমি, পুস্করণী মীর মোয়াজ্জেমকে সমুদয় দানপত্র লিখে দেন। জামাই গোলামাজম মূল অসিয়তনামা জাতিয়াতী করে মোয়াজ্জেম হোসেনকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে ফেলেন এবং মীর মোয়াজ্জেম প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেন। চার বছর বয়সে মশাররফের হাতেখড়ি দেন লাহিনীপাড়ায় মুন্সী জমির উদ্দিন। এরপর জগমোহন নন্দির পাঠশালায় ভর্তি। ১২ বছর বয়েসে পদমদি নবাবের স্কুলে ভর্তি। মাস্টার বাবু নবীনচন্দ্র্র মহিন্থা। স্কুলঘর আটচালা, পাকা গাঁথুনীর দেয়াল, খড়ের ছাউনি। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য কৃষ্ণনগরে গমন। কৃষ্ণনগরে আই এ পড়ার কালীন নাদীর হোসেনের কন্যা আজিজন নেসার সাথে বিবাহ (নাদীর হোসেন তার সুন্দরী কন্যাকে দেখিয়ে বিবাহ দেন কুৎসিত কন্যা আজিজন  নেসার সাথে)। মশাররফ প্রথমে পদমদি এস্টেটের ম্যানেজার। পরে টাঙ্গাইল দেলদুয়ারে করিমন নেসা এস্টেটের ম্যানেজার। দ্বিতীয় বিবাহ কুলসুম ডাকনাম কালী। শেষজীবনে মশাররফ পদমদিতে ফিরে আসেন। স্ত্রী বিবি কুলসুমের সাথে বসবাস করেন। পদমদিতে বিবি কুলসুম দেহত্যাগ করেন। মীরের কথায়------

তেরশত ষোল সাল ছাব্বিশে অঘ্রাণ

রবিবার প্রাতে প্রাণ করিল প্রয়াণ

পতিগত প্রাণধানি পতিসহ আসি

পদমদির মৃত্তিকায় রহিলেন মিশি।

ভাই ভগ্নি যেই হও ক্ষণিক দাঁড়াও

আত্মার কল্যাণে তার অশিষ দিয়ে যাও।

Additional information