শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১১

গ্যেটের সাহিত্যের বড় পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছি যেমন তাহার জীবন ও সাহিত্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু আমার মুখ্য উদ্দেশ্য তাঁর সমৃদ্ধ জীবন স্বদেশীয়দের মাধ্যমে উন্মোচিত করা যে জীবন মনোহর রুপ ধারণ করেছে তাঁর সাহিত্যে। এ বিষয়ে মতভেদের অবকাশ নেই যে একালের মানুষের যে ব্যাপক জীবনবোধ ও বিশ্ববোধ তার এক মহাস্রষ্টা ও দৃষ্টান্ত ছিল এই গ্যেটে। গ্যেটের স্বচ্ছ ও সবল মুক্তবুদ্ধি হয়ত আমাদের দেশকেও সাহায্য করবে। জীবনের দায়িত্ব, প্রতিভা, ধর্ম, স্বদেশ প্রেম, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থ ও যোগাযোগ সব কথাই আরো ভালো করে বুঝতে যেমন আমেরিকার প্রকর্ষ তাঁর প্রভাবে লাভবান হয়েছে। বুদ্ধ, কবির, আকবর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ ভারতের এই পঞ্চ জাগ্রত স্থায়ী আসন লাভ করুন ইউরোপের জাগ্রত আত্ম গ্যেটের উপলব্ধিতে।’

আব্দুল ওদুদ তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরুতেই হযরত মুহম্মদ (সঃ), গেটে ও রবীন্দ্রনাথের জীবন ও আদর্শ নিয়ে তিনটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার সঙ্কল্প গ্রহণ করেছিলেন এবং তা বাস্তবে রুপ দিতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে কবিগুরু গ্যেটে, ১৯৬২ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং ১৯৬৬ সালে হযরত মুহম্মদ ও ইসলাম গ্রন্থসমূহ প্রকাশিত হয়।

কাজী আব্দুল ওদুদ নিজ সমাজ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে স্বজাতীয়দের অগ্রগামী চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাতে যারপরনাই চেষ্টা করে গেছেন। তিনি কেবল বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তকই নন তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবযুগের প্রত্যাশার সুত্রপাত করেছিলেন। বৃটিশ আমলে হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মেরই উগ্রপশ্চাৎমুখী মৌলবাদের সহিংস তৎপরতা মাথা তুলতে চেয়েছে। রাষ্ট্রশক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তিরিশের দশকে ঢাকায় বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলন চলার সময় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা কাজী আব্দুল ওদুদ এক সভায় রাজা রামমোহন রায়কে মহাপুরুষ বলে উল্লেখ করায় ঢাকার একদল মোল্লা তার দুই বুদ্ধিজীবী বন্ধুসহ ধরে ঢাকার নবাব বাড়িতে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় তারা মহানবী হযরত মুহম্মদের সম্মানের সমভাষায় রামমোহনকে সম্মোধন করেছেন। এতে মহানবীর অবমাননা করা হয়েছে। নবাব তাদের কাছ থেকে প্রকাশ্য ক্ষমা আদায় করে ছেড়ে দেন। কাজী আবদুল ওদুদ সেই যে ঢাকা ছাড়লেন আর ঢাকামুখী হয় নাই। অথচ তিনি মুসলমানদের চেতনার অগ্রগামিতার জন্য শেষ-জীবন পর্যন্ত বুদ্ধির সাধনা করে গেছেন। কাজী আব্দুল ওদুদ কলিকাতায় নজরুল সাহায্য সমিতি গঠন করেন। এ বিষয়ে পূর্বে  এ গ্রন্থে নজরুল প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।

মোঃ এয়াকুব আলী চৌধুরী

ঊনিশ শতকের শেষে বঙ্গীয় মুসলীম সাহিত্য বিকাশের ধারায় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে অগ্রপথিক বলা হয়। বাংলা সাহিত্য বিকাশে আধুনিকতা বলতে যা বোঝায় তার সমস্ত কৃতিত্বই হিন্দু লেখকদের এ কথা স্বীকার করে নিলেও ঊনিশ শতকের শেষ থেকে বেশ কিছু মুসলিম সাহিত্যিকের আর্বিভাব ঘটে। তাঁদের লেখায় মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার বিপরীতে উজ্জীবনের পরিস্ফুটন ঘটে। মীর মশাররফ হোসেন, মোজাম্মেল হক, কবি কায়কোবাদ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, শেখ ফজলুল করিম, মুন্সি মেহেরউল্লাহ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ডা. লুৎফর রহমান মুসলিম সমাজের চেতনার দিক নির্দেশনা দেন। তাঁদের মধ্যে এয়াকুব আলী চৌধুরীর অবদান অসামান্য। এয়াকুব আলী চৌধুরী গদ্য লেখক। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি এতটাই পারঙ্গম ছিলেন যে, তাঁর ভাষার শক্তিতে পাঠকের মনোজগৎ নবচেতনার দৃঢ়তা অর্জন করে। কেবল সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমেই তিনি নবচেতনার সৃষ্টি করেননি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠন, নিজ বাসস্থান পাংশা থেকে কোহিনূর পত্রিকা প্রকাশ করে তৎকালীন মুসলিম জাগরণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন।

Additional information