শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১২

১৯১১ সালে কলকাতায় মুসলিম সমাজ গঠিত হলে তিনি তাঁর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক নিযুক্ত হন। সমিতির ‍উন্নতির জন্য প্রগাঢ় শ্রম দান করেন। কবি গোলাম মোস্তফা ও এয়াকুব আলী চৌ্ধুরীর যুগ্ন সম্পাদনায় ‘সাহিত্যিক’ নামে  একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল যা এক বছরকাল চালু ছিল। বাংলা সাহিত্যের অবদানে ইতিপূর্বে আলোচিত রাজবাড়ি জেলার সাহিত্যিকবৃন্দের অগ্রভূমিকা রয়েছে। সে সূত্রেই এয়াকুব আলী চৌধুরীর অগ্রজ রওশন আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় সচিত্র মাসিক ‘কোহিনূর’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এয়াকুব আলী চৌধুরী ছিলেন সহ-সম্পাদক। ১৯১১ সালে তিনি কোহিনুর পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯১৯ সালে ভারতে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন শুরু হলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি ও অগ্রজ রওশন আলী চৌ্ধুরী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে পাংশাতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেন। বৃটিশ সরকার এয়াকুব আলী চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা দমদম কারাগারে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে কয়েকমাস কারারুদ্ধ ছিলেন।

১৮৮৬ সালে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার পৌরসভাধীন মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে এয়াকুব আলী চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম এনায়েত আলী চৌধুরী এবং মাতা মুন্নতুন নেসা। পিতা ছিলেন পুলিশ অফিসার। অগ্রজ রওশন আলী চৌধুরী ছিলেন কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সমাজসেবক এবং ঐতিহ্যবাহী কোহিনূর পত্রিকার সম্পাদক। এয়াকুব আলী চৌধুরী পাংশা এমই স্কুল হতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন এবং এই বিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে জুনিয়র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। এরপর তিনি রাজবাড়ি রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে (RSK) ভর্তি হন। এ বিদ্যালয় থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিত্র পর্যন্ত অধ্যায়ন করেন এবং কোর্সও সমাপ্ত করেন কিন্তু চক্ষু রোগে আক্রান্ত হয়ে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারেন না। প্রথম জীবন তিনি চট্রগ্রামের জরওয়াগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউশনে এবং শেষজীবনের পাংশা জর্জ হাইস্কুলে শিক্ষাকতা করে শিক্ষক জীবনের অবসান ঘটান। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম মানস সৃষ্টিতে মীর মশাররফ হোসেনের উত্তরসূরী হিসেবে রাজবাড়ি জেলার সাহিত্য কর্মী আব্দুল ওদুদ, ড. কাজী মোতাহার হোসনে ও এয়াকুব আলী চৌধুরী। সাহিত্যিকের কোনো জগৎ নেই, মানবচেতনাই মুখ্য বিষয়। এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম মানব চেতনার স্পর্শকাতরতার অভাব নেই। তা সত্ত্বেও তাঁর সাহিত্যে একমূখী ধারাটিই মূখ্য হয়ে উঠেছে। কেবল ভাষাশৈলীর ব্যবহারেই নয় বিষয়বস্তুর দিকে থেকে তিনি আঁকড়ে ধরেছেন শাশ্বত মানবের চেতনা যার স্পর্শে ব্যক্তি ও সমাজ সতেজ ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠে। তাঁর রচিত ‘নূরনবী’ ‘ধর্মের কাহিনী’, ‘শান্তিধারা’, ‘মানব মুকুট’, তার প্রমাণ। ধর্মের কাহিনী ১৯১৪ সালে, নূরনবী ১৯১৭ সালে, শান্তিধারা ১৯২২ সালে এবং মানব মুকুট ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। এয়াকুব আলী চৌধুরীর কাল ঔপনিবেশিক শোষণের কাল। পশ্চাৎপদ বাংলার গণমানুষ শিক্ষা, অর্থনীতি আত্মসচেতনতায় বর্তমানের তুলনায় তখন এক অন্ধকার জগতের মানুষ। জাতিগতভাবে হিন্দু মুসলমান কারোরই তেমন অহঙ্কার বোধ নেই। নিস্পৃহতাই তাদের মূল্যবোধ। কেবল বেঁচে থাকাই জীবন। এ সময় এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্য ও সমাজচেতনা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার সাথে সাহিত্যকর্ম কৃষাণের হাতে যেন শক্ত হালের গুঁটি, যাতে নিরস ভূমি সরস হয়, অফলা ভূমি ফসলে ভরে ওঠে। তাঁর সাহিত্য, মানস মুকুরে সঞ্জীবনী সুধা, যা শক্তি ও সাহস যোগায়। মানুষের যা করা উচিত, মানুষ যেন তাই করে। তাঁর সাহিত্য এভাবে গণ্ডীবদ্ধ হলেও কাল বিচারে তাঁর সাহিত্য কর্মের মান অক্ষুণ্ন রয়েছে। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে কোনো সাহিত্যিক সাহিত্যের প্রয়োজন, পরিধি এবং পরিমিতি বোধ সম্পর্কে সজাগ থাকেন। অনেক সাহিত্যিক তাঁর লেখায় সাহিত্যের সরস সংজ্ঞাও প্রদান করে থাকেন। অনেক সাহিত্যিক তাঁর লেখায় সাহিত্যের সরস সংজ্ঞাও প্রদান করে থাকেন। সাহিত্য বিষয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরী বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। সাহিত্যসেবা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----সাহিত্যিক প্রকৃতির কুম্ভকার, তিনি কুম্ভ বিক্রয় করেন না, কুম্ভ নির্মাণ করেন। প্রকৃতির বুকে যে সুষমা আছে, মানব মনোভাবের যে রাগিনী আছে, মানব জীবনের সত্যের যে বিচিত্র বিকাশ আছে,

Additional information