শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৩

সমূদয় পার্থিব ও চিন্তালেশ শূন্য নির্মল ক্রীড়ারত হাস্যময় বালকের নাচিয়া নাচিয়া বিচিত্র পক্ষ প্রজাপতি ধারার মতো সেই সমস্ত নানা বর্ণের ভাব চিন্তা ও সত্য ধরিয়া তাহার মূর্তি প্রদান করাই কাহার কাজ। এই কাজ করিয়াই তিনি সুখ, শান্তি ও তৃপ্তি লাভ কেরন। ইহাই তাহার নেশা, ইহা করিতে না পারিলে কিছুতেই তাহার শান্তি নাই।

বঙ্গ সাহিত্যের মুসলমান লেখক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----

সাহিত্যচর্চা বিলাস পরিতৃপ্তি নহে। সাহিত্য জীবনের সাধনা, সাহিত্য স্বাদ, আরাধনার ধন। এ যে প্রেমের যোগ, কল্যাণের সাধনা। হাওজে কাওসারের সলিলামৃত হইতে নৃত্য করে, আনন্দের মল্লার ইহাতে সর্বদা বাজে। কোটিপতির ঐশ্বর্যগর্ব সাহিত্য সাধনা সুখের সহিত তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। ওকালতি ও ডেপুটিগিরি মহিমা সাহিত্যিকের যশোরশ্মির নিকট পরিম্লান। ইহার অন্তর্নিহিত অমৃত সত্যের আস্বাদ লাভ করিয়া হাফেজ সাদি চির অমর। জামী, ফেরদৌসী অম্লান গৌরব রশ্মিতে চির জ্যোর্তিমান। মিল্টন, মাইকেল মানস মন্দিরে চির জাগরুক। এই ধনে ধনী হইয়াছিলেন বলিয়া কাউন্ট টলস্টয় সকল বিলাইয়া সন্নাসী সাজিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঋষি হইয়াছিলেন। সাহিত্য জীবনবোধের গভীরে টানে। এ টান যার যত বেশি তিনি তত বড় সাহিত্যিক।’

এ বিষয়টিই এয়াকুব আলী চৌধুরী সুললিত ভাষায় তা তুলে ধরেছেন। সাহিত্য সার্বজনীন ও বৈশ্বিক মানব চেতনার উন্মেষ  ঘটায়। এতদ্বসত্ত্বেও এ বিশ্ব বহুভাষিক ও বহুজাতিক চেতনায় খণ্ডিত। যিনি সাহিত্য রচনা করেন তিনি নিজেও কোনো না কোনো ভাষা বা জাতির অনুগত। এয়াকুব আলী চৌধুরীর বিশেষত্ব হল তিনি নিজ ভাষা ও জাতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বিশুদ্ধ খাঁটি বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁর লেখন শুদ্ধ সাধু ভাষার প্রয়োগ একশত ভাগ। তিনি আরবী ও ফারসী ভাষা ব্যবহার করেননি। এ সস্পর্কে তিনি লিখেছেন------

ভাষাকে মুসলমানী চেষ্টায় শক্তিক্ষয় না করিয়া বঙ্গ ভাষার ভাবের ঘরে মুসলমানী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা লক্ষগুণ প্রয়োজন। প্রকৃত পক্ষে ইহাই আসল কথা। বাংলা ভাষায় যে সমস্ত শব্দ আমাদের ধর্ম মতের বিরুদ্ধ ভাবসম্পন্ন তাহা আমরা কখনো ব্যবহার করিব না। পক্ষান্তরে যে সমস্ত কাজ আমাদের ভাব প্রকাশের পক্ষে পর্যাপ্ত নহে আমরা তৎপরিবর্তে আরবী বা ফারসী ভাষা অবশ্যই ব্যবহার করিব।

সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তিনি ইসলামী ভাবধারাটিই বিশেষভাবে গ্রহণ করেন। কারণ হিসেবে বলা যায় তুলনামূলক তৎকালীন পশ্চাৎপদ মুসলিম জাতির পুনর্জাগরণই ছিল তাঁর লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। মানুষ সততই সাধারণ। সহযোগিতা, সহমর্মিতা মানুষের অগ্রগামীতার সোপান। প্রেমের জয় প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----‘নবী আসিলেন মক্কায়। কোথায় তাঁর গজমতী হাতি? কোথায় তাঁর মানিক-উজ্জ্বল সিংহাসন? সত্য তাঁর সোনাদানা, প্রেম তাঁর মানিক ফল। তাই মানুষের মন তাঁর সিংহাসন। আসিলেন নবী মক্কায়। কত স্বাদের জন্মভূমি। সেখানে কতকাল পড়ে আসিলেন, দেশে ফিরিলেন আজ। মক্কার ঘর দুয়ার খোলা। মক্কায় তিনি রাজা। মক্কায় যতসব লোক তাঁর ভাই। মক্কায় যত লোক, নবী তাদের কী করিলেন? জানের শত্রু তারা; নবী তাদের মাফ করিলেন। তিনি কাঁদিয়া বলিলেন, মক্কার মানুষ এরা সবাই আমার ভাই। এদের কেউ কিছু বলিও না।’ সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারক-----ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান। কোনো বিষয়কেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। জীবন বিকাশের ধারায় বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। কিন্তু ধর্ম চর্চা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া সমাজ নীতি বির্বজিত ভোগবাদী সমাজে পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞানের নানা কৌশলের প্রয়োগে কেবল ধনী ও দারিদ্রের বৈষম্যই নয় হত্যা, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস হয়ে উঠেছে নৈমত্তিক বিষয়। কেবল আইন প্রয়োগ করলেই তার নিরসন হবে না। এর জন্য চাই আত্মশুদ্ধি ও আত্মতৃপ্তি। একজন ধার্মিক ধর্ম চর্চার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সরল ও সহজ পথ খুজে নিতে পারে। আর দর্শন চর্চায় ব্যক্তিতার জ্ঞান ভাণ্ডারের সমৃদ্ধিতে জীবন ও জগত বিষয়ে যে চেতনা লাভ করে তার ফলে মানবের কল্যাণমূলক কাজই হয়ে ওঠে তার তৃপ্তি। এয়াকুব আলী চৌধুরী মানসমুকুরে এ ভাবটিই জেগে উঠেছিল।

Additional information