শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৪

ধর্মের কাহিনী গ্রন্থে এয়াকুব আলী চৌধুরী ‘পূর্বাভাষ প্রবন্ধে’ ধর্মের বিকৃতরুপ উপমা সহকারে রুপক ভাষায় বর্ণনা করেছেন। ‘বৈশাখ মাসের বাতাসে শুস্ক পাতা কেমন উড়িয়া যায়---- আজও জনসমাজ হইতে ধর্মও তেমনীভাবে উড়িয়া গিয়াছে।’ ‘শান্তি ধারা’ গ্রন্থে নামাজ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন----‘এই নামাজে পবিত্র হইতে পবিত্র ও মহান হইতে মহান আল্লাহর বন্দনা করিতেছি। তাহার প্রীতির জন্যে প্রাণের পুরে পুরে মঙ্গলের মধু ভরিয়া তাহার পানে প্রতিদিন প্রস্ফুট হইতেছি, তাহার আশা পিপাশা লইয়া অসীম রহস্য দ্বারে-দ্বারে বারেবারে আঘাত করিতেছি। একদিন এই রহস্য মুক্ত হইবে, আমার সকল হাহাকার শান্ত করিয়া আমার সার্বজনীন সফল করিয়া তাহার পরম শান্তি মহিমাজ্যোতি প্রকাশ হইবে।’

এ মহান সাহিত্য সাধক ছিলেন চিরকুমার। ১৯৩২ সালে তিনি যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি নিজ বাসভবন পাংশায় শয্যাশায়ী থাকেন। তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ফরিদপুরের আব্দুল ওয়াজেদ, রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য প্রমুখ। তাঁর সাহায্যের জন্য পরে আর্থিক সাহায্যের  একটি প্রচার পত্র বিলি করা হয়। শেরে বাংলা তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাসিক ২৫ টাকা হারে একটি সাহিত্যিক ভাতা মঞ্জুর করেন। দীর্ঘসময় রোগাক্রান্ত থাকা অবস্থায় অবশেষে ১৯৪০ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। এ সাহিত্য সাধকের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতিতে পাংশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এয়াকুব আলী বিদ্যা প্রতিষ্ঠান, এয়াকুব আলী স্মৃতি পাঠাগার।

জগদীশ গুপ্ত

রাজবাড়ি কামারখালি, কুষ্টিয়ার একই সমতলে সমসাময়িককালে যে সমস্ত মহৎ শিল্পী, সাহিত্যিক, সাধক, সমাজসেবকের জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায় জন্ম কুষ্টিয়ায় বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিন্তু কাল কাটিয়েছেন রাজবাড়ি। ঠিক ভিন্নভাবে জন্ম রাজবাড়ির মাটিতে কাল কাটিয়েছেন কুষ্টিয়ায়। মীর মশাররফ হোসেন এবং জগদীশ গুপ্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকাংশে সত্য। দুজনেরই পিতামহের বসতবাড়ি রাজবাড়ি কিন্তু উভয়েরই পিতা বাড়ি করেছেন কুষ্টিয়ায়। আবার এ দুই সাহিত্যকের জন্ম পিত্রালয় কুষ্টিয়া  হইলেও পরিণত বয়সে উভয়েই কুষ্টিয়া ছেড়ে গেছেন। মীর মশাররফ পিতামহের বসতবাটিতে কবরস্থ হয়েছেন। আর জগদীশ গুপ্ত কুষ্টিয়া ছেড়ে কলিকাতায় চলে যান।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পুরোধা পুরুষ বঙ্কিম চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের রুচি ও রোমান্টিকতার ধারার বিরুদ্ধে কল্লোল সাহিত্যের শক্তিমান ধারার স্রষ্টা বালিয়াকান্দি থানার খোর্দ মেঘচামী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারের সন্তান জগদীশ গুপ্ত। পিতা কৈলাশ চন্দ্র এবং মাতা সৌদামিনী। কার্যোপলক্ষে কৈলাশ চন্দ্র তৎকালীন নদীয়া জেলার মহকুমা কুষ্টিয়া শহরে গড়াই নদীর তীরবর্তী আমলা পাড়ায় বসবাস করতেন। সেখানেই ১৮৮৬ সালে ৫ জুলাই জগদীশ গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। পিতার বসতবাড়ি চন্দনা নদীর ধারে। গ্রামটির প্রকৃত নাম মেঘচুম্বী যা লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কালক্রমে মেঘচামীতে পরিণত হয়েছে। জগদীশ গুপ্তের পিতামহের নাম আনন্দমোহন সেনগুপ্ত। পিতামহের নামানুসারে তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘আনন্দ ভবন’। মেঘচামী গ্রামের গুপ্ত পরিবার বিদ্যা ও বিত্তে সম্মান ও মর্যাদায় অঞ্চলের বিশিষ্ট পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারটি ছিল অবস্থাসম্পন্ন বড় জোতদার। প্রচুর ধান, কলাই ও বিভিন্ন জাতের ফসল উঠত বাড়িতে। পিতামহ আনন্দমোহন গুপ্ত পেশায় ছিলেন কবিরাজ। মেঘচামী গ্রামের কবিরাজ বৃত্তির অলৌকিকত্বের কথা আজও এলাকায় লোকমুখে শোনা যায়। গুপ্ত পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন সূত্রে সম্পর্কিত ছিলেন কয়েকজন লোক। এদের মধ্যে দাক্ষায়ণী দেবী একজন। তিনি ছিলেন জগদীশ গুপ্তের কাকিমার মা, অর্থাৎ তাঁর দিদিমা। তিনি লেখাপড়া কম জানলেও ভালো কবিতা লিখতেন। চৈত্রমাসে গাজনের গান লিখে সুর দিতেন। অন্যজন ছিলেন বিজয় কবি রত্ন মজুমদার।

Additional information