শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৫

তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি ছিলেন জগদীশ গুপ্তের পিতার বন্ধু। আনন্দ ভবনের সোজা চন্দনা নদীর ওপর পাড়ে খালকুলা গ্রামে বিজয় রত্ন মজুমদারের বাড়ি। এছাড়া মা সৌদামিনী দেবীরও সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল। মায়ের সেসব উপন্যাস জগদীশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন।

জগদীশ গুপ্তের পিতা কৈলাশ চন্দ্র কুষ্টিয়ার আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম দীক্ষিত। জগদীশ গুপ্তের বিদ্যাশিক্ষার শুরু হয় কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পণ্ডিত রামলাল সাহার পাঠশালায়। এরপর তিনি কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্বল্প বয়সে ভাওয়ালের কবি গোবিন্দ রায়ের অনুকরণে নারী তৃষ্ণার বিলাপ জনিত বেশ কিছু কবিতা লেখার জন্য তাঁকে বিদ্যালয় ছাড়তে হয়। ১৯০৪ সালে কলিকাতা সিটি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর রিপন কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পড়ালেখা আর অগ্রগামী হয়নি। কেবল পিতৃসূত্রেই রাজবাড়ির সাথে তাঁর নাড়ীর যোগ ছিল না, বৈবাহিক সূত্রেও তিনি রাজবাড়ির বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯১৩ সালে ২৫ বছর বয়সে ছাত্রকালীন অবস্থায় রাজবাড়ির মেয়ে চারুবালা গুপ্তের সাথে তার বিবাহ হয়। চারুবালা গুপ্তের বয়স ছিল ১২ বছর। চারুবালা গুপ্তের পিতা যদুনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন রাজবাড়ির উকিল। তাঁর পিতার বাড়ি ছিল খোকসার ওসমানপুরে। চারুবালার পিতা রাজবাড়িতে নিজে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতেন। রাজবাড়িতেই চারুবালা জন্মগ্রহণ করেন এবং বড় হন। চারুবালার বর্ণনায় যতদূর জানা যায় তাতে বর্তমান বিনোদপুরের কোনো এক স্থানে তাদের বাড়ি ছিল। চারুবালা অল্প-স্বল্প পড়ালেখা জানিতেন; এ বিষয়ে তিনি বলেছেন----‘তখন রাজবাড়িতে মেয়েদের পড়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে তার পড়ার সুযোগ হয়নি। যা কিছু স্কুল ছিল অল্প কিছু বাংলা পড়া হইত। তাতেই যা হয়েছে-----দশ এগার বৎসর বয়স হইতেই স্কুল ছাড়িয়ে নিত। বার বছর পড়তেই বিবাহ।’ (১ জগদীশ গুপ্তের রচনা ও জগৎ, সরকার আবদুল মান্নান)।

রাজবাড়িতে শ্বশুরবাড়ির সূত্রে বটেই তিনি ভালো ফুটবল খেলতে পাড়ার রাজবাড়ির রেলের মাঠে হায়ারে ফুটবল খেলতে আসতেন। তখন স্টেডিয়াম মাঠ ছিল না। রেলের মাঠই ছিল খেলার ময়দান। পিতামহের বাড়ি মেঘচামীতে তিনি প্রায়শই যাতায়াত করতেন। মাঝে মাঝে দীর্ঘদিন অবস্থানও করতেন। তিনি ‘দুলালের দোলা’ ও ‘রোমন্থন’ উপন্যাস দু’খানি মেঘচামীতে বসে লেখেন। এ বিষয়ে তাঁর স্ত্রী চারুবালার সূত্রে জানা যায়-----‘বোধ হয় ১৩০১ সাল হইবে সেই সময়ে বোলপুর হইতে ছয় মাসের অফিস ছুটি লইয়া দেশের বাড়ি খোর্দমেঘচামী গ্রামে ছয়মাস থাকেন, সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেই সময়ে ‘দুলালের দোলা’ আর ‘রোমন্থন’ বই দু’খানি লেখেন।’ (চারুবালা গুপ্ত, জগদীশ গুপ্তের জীবন কথা)। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র, নজরুল সাহিত্যকে আধুনিকতার জগতে নিয়ে আসেন। তবে রবীন্দ্রনাথ, শরৎ সাহিত্য যে অর্থে আধুনিক, জগদী গুপ্তের সাহিত্যে আধুনিকতার স্বাদ ভিন্ন। আর এখানেই তাঁর মূল্যায়ন এবং সাহিত্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সাহিত্যিকর্মে চেতনার জগতে নিপুণ শিল্পীর মতো কাজ করেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র শুদ্ধতম মানব চরিত্র চিত্রনে মানুষের বাহ্যিক ও পরিবেশগত বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মানুষের জীবন ও জগৎ ভাবনার সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। আর শরৎচন্দ্র আবেগপ্রবণ গ্রামীণ মানুষ যে জীবন ব্যবস্থার মধ্যে আছে বস্তুনিষ্ঠ ভাবে তাকে উম্মোচন না করে মানুষ যা হতে চায় তার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ফলে বাঈজীরা কখনো বাঈজী নয় দিদিমারা কখনো দিদিমা নয়, ঝিয়েরা কখনো ঝি নয়, কিন্তু সকলই একটা অন্যকিছু হয়ে সার্থক হতে চায়। সাহিত্যের আধুনিকতার এ ধারায় বাস্তবতার চেয়ে রোমান্স বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গল্পে মানুষের কষ্টের, যন্ত্রণার, দীনতার পরিচয়ের চেয়ে বিশ্ব সংসারের পরিপ্রেক্ষিতে তার অবস্থানটাই নির্ণীত হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর সঙ্কীর্ণতা, পাশবিক নির্মমতা, স্বার্থপরতা এবং সর্বোপরি ইন্দ্রতাড়িত মানুষের ভেতরের পশুত্বতা যথাযথ স্বরুপে প্রকাশ পায়নি। রবীন্দ্রনাথ, শরৎ সাহিত্য ধুপছায়া, আবেগ, অধরা জগতের চরিত্র যাদের ছুঁই ছুঁই করলেও ছোঁয়া গেলেও নাগাল পাওয়া যায় না। শরৎচন্দ্র অধিকাংশ সময়েই মানুষের আবেগের তালে তালে পা ফেলে এগিয়েছেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর কথা সাহিত্যে সাধারণ মানুষের মনের গড়ন স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

Additional information