শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৬

সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাব অমোঘ ভূমিকা পালন করে। বিশ শতকের গোড়া থেকেই শিল্পবিপ্লোবত্তর শ্রেণি বিন্যাস, ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নানা সংঘাতের ফলে জীবন সংগ্রামের ভিন্ন দিক উন্মোচিত হতে থাকে। কঠোর বাস্তবতায় জীবন ধারণ, জীবন বিকাশে বহুমাত্রিক ধারায় রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল। এই যাত্রা পথের একদিকে প্রমথ চৌধুরীর সবুজ পত্রে প্রকাশ আর অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা। এ সময়ই কল্লোল (১৯২৩), কালিকলম (১৯২৬), কালিকলম (১৯২৬), প্রগতি (১৯২৩), পরিচয় (১৯৩১) পত্রিকা কয়টিতে একদল নবীন সাহিত্যিকের আর্বিভাব ঘটেছিল। সাধারণ ভাবে তাঁরা কল্লোল যুগের সাহিত্যিক বলে পরিচিত। তারা ছিলেন গোকুল নাগ (১৮৯৪, ১৯২৫), মনিন্দ্রলাল বসু (১৮৯৭-১৯৫৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬) জগদীশ চন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), প্রবাধকুমার সান্যাল (১৯০৭-১৯৮৪)। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

তারা কল্লোল গোষ্ঠী বলে পরিচিত হন। উল্লেখ করার বিষয় কল্লোলগোষ্ঠীভুক্ত জগদীশ গুপ্ত পিতামহ ও পিতৃসূত্রে রাজবাড়ির সন্তান আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটি রচিত হয় গোয়ালন্দের কেতবপুর মাঝিদের জীবন কাহিনী নিয়ে। সমসাময়িককালে মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে কল্লোলগোষ্ঠীর মতই মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠে। তার পুরোধা ব্যক্তিদের তিনজনের মধ্যে কাজী আব্দুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন রাজবাড়ির সন্তান। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভিন্নধর্মী এ সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে ১৯৩০ এর কিছু পূর্ব থেকে এবং শেষ হয়েছে তিরিশের দশকের শেষে ১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরম্ভে। যদিও তারা কলম চালনা করেছেন ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তবে কল্লোলগোষ্ঠী যেখানে সাহিত্যের মার্গ চিহ্নিত করেছেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কেবল সাহিত্যের ধারাটিই ঠিক করতে ব্যস্ত আছেন।

বিশ্বযুদ্ধের করাল বিভৎসতার মধ্যে নতুন প্রত্যাশার বীজ রোপিত হতে থাকে ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবে মেহনতী মানুষের আর্থিক মুক্তি দেখে। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দৃষ্টি, যান্ত্রিক জড়বাদের অবশ্যম্ভবী পরিণাম, পৃথিবীর অস্থির রঙ্গমঞ্চে নিপীড়িত মানুষের ক্লিষ্ট আর্তনাদ এ দেশের মানুষদেরও আলোড়িত করেছিল। এসব আলোড়ন বিলোড়ন কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকদের অনুপ্রাণিত না করে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটেই কল্লোলের লেখকগণ সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে এসে উপস্থিত হন। ফলে কুলি, মুটে, মজুর প্রভৃতি মানুষের অস্তিত্বের নানা সঙ্কট তারা কাহিনীতে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। নারী পুরুষের সম্পর্কে তারা আনতে চেয়েছেন ভিন্নতর মাত্রা। এভাবে সাহিত্যের বিষয় ক্রমেই ‘সর্বত্রগামী’ হয়ে উঠল। কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকবৃন্দ রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসে ‘অপজাত ও অজ্ঞাত মনুষ্যত্বের’ ভিড়ের মধ্যে এসে দাড়িয়েছিলেন। শিল্পীগণ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে তাদের অসহায় অবস্থান, কর্ম ও ঘটনার মধ্যে আবিস্কার করতে চেয়েছেন। 

কল্লেলগোষ্ঠীর মধ্যে থেকেও জগদীশ গুপ্তের ধারা সাহিত্যে নবতর ও ভিন্ন ধারার। সমাজের পঙ্কিলতা, দীনতা, নির্মমতা, হতাশা, নিয়তিবাদের পস্ফুটনই তাঁর সাহিত্যের অপূর্ব শিল্পকৌশল। এ কারণেই তাঁর উপন্যাসের অনেক নায়কই খল প্রতিনায়ক। ফ্রয়োডীয় চেতনা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য উপাদান। মানুষ তাড়িত হয় তার অমানবীয় সহজাত প্রবৃত্তিতে। নির্লোভ, নিস্কলুশ, নিঃস্বার্থ হওয়া যেমন কাম্য তেমনি লোভ, কলুষ, স্বার্থ এসব থেকে মানুষ মুক্ত নয়। কোনো-না-কোনোভাবে মানুষ তার স্বাদ গ্রহণ করে। আর যদি তাই হয় তাহলে মুক্তি কীভাবে? বুদ্ধির কাছে এখানে বিবেক আড়ষ্ট, মুক্তির ক্ষেত্র অবরুদ্ধ। কিন্তু জগদীশ গুপ্ত ফ্রয়োডীয় তত্ত্বের দ্বারা পরিচালিত হয়েও মানব চরিত্রের বাইরে এক অমানবীয় স্বত্ত্বার আবিস্কার করেন যেখানে মানুষ লোভ, স্বার্থ, মমতা দ্বারা পরিচালিত নন। মানুষকে তা করতে হয় তাই সে তা করে। কোনো কারণ সেখানে ব্যাখ্যার স্থান দান করে না।

Additional information