শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৭

লঘু-গুরু উপন্যাসের টুকির এক বন্ধু জানল উত্তমের দেওয়া টুকির হাতের চুড়ি জোড়া পিতলের নয়-সোনার। মেয়েটি জানতে চায় মানুষের ঘার ভেঙ্গে কত টাকা এসেছেরে? তোর মা’ই ঠিক সেই সময় একটি নিদারুণ কথা, সাপের বিষদাঁতে যেমন বিষ জমে তেমনি মোক্ষর মায়ের জিহবাগ্রে আসিয়া জমিল, মোক্ষর মা অনুভব করতে লাগল একটি স্থানে সেই লাঞ্ছিত বিষ ঢালিয়া বিষের ভাণ্ড উজার করিতে না পারিলে সে নিজেই যেন বাঁচিবে না। সুতরাং সে টুকির কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই আপাপবিদ্ধ বালিকাকে জানাল, তোর মা বেশ্যা ছিল, গয়না দিয়েছে হাজার লোকে। তোর এ বাবা দেয়নি।’ আসলে মোক্ষর এই ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতার পিছনে না আছে আর্থিক সম্পর্ক, না আছে যৌনতার সম্পর্ক কিন্তু তবুও মানুষ তা করে। মানব চরিত্রের এমন অনেক দিক আছে যা অবলীলায় মানুষ করে থাকে। এই জটিল স্বরুপের অনেক পরিচয় আছে জগদীশ গুপ্তের লেখায়। এ প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক যথার্থই বলেছেন-----

‘আমরা মানুষের বাৎসল্য, নিরুপদ্রব সংসার যাত্রা, প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, দয়া, সহানুভুতি ইত্যাদিকে মানুষের বিবৎসা, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, লোভ ও লালসা ইত্যাদি বৃত্তি থেকে একটু উপরের আসনে বসাতে অভ্যস্থ। কেন তা করি তার হাজার রকম যুক্তি থাকতে পারে কিন্তু মানুষ নামক জীবটিকে যিনি একটা প্রাকৃতিক জীব হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিল তাঁর কাছে এ দুরকম বৃত্তির মধ্যে আত্যন্তিক কারাক নেই। মানুষের প্রবৃত্তি জগতের হিসেব নিলে বাৎসল্য যেমন সত্য নিষ্ঠুরতাও তেমনি সত্য। সাহিত্যিক গীর্জার ফাদার নন, স্কুলের হেডমাস্টার নন, কাজেই নীতিবুলি কপচানোর চাইতে মানুষ যা, তাকে সেভাবেই বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। মনে হয় মানুষ এবং মানুষের সমাজ সম্পর্কে জগদীশ গুপ্তের মনোভাবটা এরকমই ছিল। মানুষকে তিনি প্রথাগত আদর্শের মানদণ্ডে বিচার করেননি। মানুষ হিসেবেই তাদের স্বরুপের অনুদঘাটিত দিক টাকে তুলে ধরেছেন। মানুষের অসচিতাকে তিনি তিন দিক থেকে ধরতে চেয়েছেন। এক আর্থিক স্বার্থ ও লোলুপতার দিক থেকে, কিছু যৌনতার দিক থেকে, কিছু যৌনতার দিক থেকে, তিন সহজাত অকারণ বিকৃত আনন্দের দিক থেকে।’

তিনি স্বগ্রাম মেঘচামীতে বেড়াতে আসেন। একটানা ছয়মাস অবস্থান করেন। গ্রামের অপরিসীম দারিদ্র ও নিচতার মুখোমুখী হয়ে লেখেন রোমস্থন উপন্যাসখানা। তিনি এ উপন্যাসে তুলে ধরেন কুচক্রী, মিথ্যার বেসাতি। তাঁর গল্পে লক্ষ্য করা যায় ছেলে রোজগার করতে না পেরে বাড়িতে বসে আছে বলে বাপ তাকে অন্ন দেবে না। সুতরাং বাপ ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। স্বার্থের টানাপোড়ানে বাৎসল্য এখানে সম্পূর্ণ পরাভূত। পুত্রও তেমনি দূরদেশে গিয়ে পিতার মৃত্যু হয়েছে বলে সে পিতৃশ্রাদ্ধের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে নিজেই আত্মসাৎ করে। ‘রতি ও বিরতিৎ উপন্যাসের রামহরি প্রমাণ করে যে, পয়সায় পাপ নেই।

এসব কাহিনীর মধ্যে জগদীশ গুপ্ত স্বার্থান্ধ মানুষের নিষ্ঠুরতম দিকেই শুধু অঙ্গুলী নির্দেশ করেন না, বরং তিনি মানুষের এই স্বার্থ চিন্তাকে স্বভাবজাত ও চিরকালীন স্বরুপ বলেই চিহ্নিত করতে চান তিনি আমাদের বলে দেন স্বার্থ সিদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষ কম করে হলেও মনে মনে অশুচি।

 মানুষের এই অশুচিতা সবচেয়ে বেশি তাদের যৌনজীবনে। তাই জগদীশ গুপ্তের কথা সাহিত্যের নর নারীরা বিশেষ করে পুরেুষেরা মনুষত্বহীনতা, ইতরতা ও নীচতার সর্বদিক বিস্তৃতির প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে যৌনতা চরিতার্থতার জন্য। এ বিষয়ে হাসান আজিজুল হক বলেছেন-------দেহবাদিতা ও দেহসর্বস্বতার যে কথাটি সাহিত্যে কল্লোলীয় প্রবর্তনা বলে খ্যাতি পেয়েছে শুধুমাত্র সেটাকে যদি যাচাই বাছাই হিসেবে দেখি তাহলে নরেশ সেনগুপ্ত ও জগদীশ গুপ্তের মধ্যে পার্থক্যটা আর গোপন থাকে না। নরেশ সেনগুপ্তের ক্ষেত্রে যেটা আমদানী করা জিনিষ, জগদীশ গুপ্তের ক্ষেত্রে সেটাই তাঁর সাহিত্যের অন্তর্জাত প্রবণতা। একটি উপর থেকে আরোপিত, আর একটা একজন লেখকের মনের ধাঁচ থেকে উৎসারিত।

Additional information