শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৮

এ বিষয়ে সরকার আব্দুল মান্নান (সরকার আব্দুল মান্নান জগদিশ গুপ্তের উপর এমফিল ডিগ্রি করেছেন) বলেন-----‘হাসান আজিজুল হকের এই উক্তি যথার্থ। দুলালের দোলা, লঘু গুরু, গতিহারা, জাহ্নবী, নন্দ আর কৃষ্ণা, দয়াদন্দ মল্লিক ও মল্লিকা, তাতল সৈকতে, সুতিনী প্রভৃতি উপন্যাস এবং চন্দ্র সূর্য যতদিন, কলঙ্কিত সম্পর্ক, রক্তাভাস, আদি কথা একটি প্রভৃতি তার প্রমাণ।’ জগদীশ গুপ্তের এসব রচনায় বিবংসাতাড়িত মানুষের বিভৎস পরিচয় ফুটে উঠেছে-----বাংলার কথা সাহিত্যের ইতিহাসে তা মানব চরিত্রের এক ভিন্নতর প্রদেশের পরিবারে একান্তই নতুন।

সাহিত্যের ধারা বিকাশে লক্ষ্য করা গেছে ধর্ম, দেবতার অলৌকিক চরিত্রের পরবর্তী ধারায় মানুষ ও মানুষের জীবন সাহিত্যের উপাদান হিসেবে  এসেছে। এরমধ্যে গ্রাম জীবনের নিবিড়তম সম্পর্ক, নিবিড়তম সম্পর্ক, সংঘাত, জীবনতৃষ্ণা, জীবনযন্ত্রণা নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি। এক্ষেত্রে জগদীশ গুপ্তকে পথিকৃত বলা যায়। ইতিপূর্বে গ্রামীণ জীবনের যে ছবি আঁকা হয়েছে তার অন্তর্নিহীত সুদর প্রসারী ক্ষতকে উপেক্ষা করে রোমান্টিক সৌন্দর্যের প্রলেপেই তা করা হয়েছে। কিন্ত জগদীশ গুপ্তের লেখায় গ্রাম জীবনের যে মূর্ত চিত্র আমরা দেখতে পাই-----

রোমস্থন উপন্যাসের অভয়ের দৃষ্টিতে সেই সর্বস্ব হারানো গ্রামীণ জীবনেরই চিত্র ফুটে উঠেছে, ‘দক্ষিণে বামে দুই দিকে আর সম্মুখে যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর ব্যাপিয়া ব্যর্থ ‍কৃষিকার্যের অখণ্ড শূন্যতা ধু-ধ করিতেছে। যে ফসল জন্মিয়াছিল তাহা পণ্ডশ্রম করিয়া কাটিবার প্রয়োজন হয় নাই, গুরু লাগাইয়া দিয়া তাহা কাঁচাই খাওয়াইয়া দিয়াছে। ভোজন বিশিষ্ট শুষ্ক ডাটা আর লতা ক্ষেত্রের লটাইয়া আছে। অভয়ের চোখ ছল ছল করিতে লাগিল-----পাশে আশাহত সন্তানের সঙ্গে চোখাচোখি হইয়া যায় এই ভয়ে যেন ভূমিলক্ষ্মী সর্বাঙ্গের উপর আবরণ টানিয়া দিয়াছে। কিন্তু আগে এমন ছিল না। ভূমিলক্ষ্মীর মুখ লুকাইবার হেতু না, সর্ব সম্পদের পুরোভাগে আর সর্বসুখের সমষ্টির কেন্দ্রে তিনি প্রধানতম স্থানটিতে অধিগ্রহণ করিয়া বিরাজ করিতেছে। ভূমিলক্ষ্মীর বিরুপে প্রকৃতি আসলে একটি প্রতীকী উপস্থাপন মাত্র। সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী শাসনের প্রতিযোগিতামূলক যে যৌথ কালোহাত গ্রামীণ জীবনের পুঁজিকে শুষে নিয়ে চুপসে যাওয়া রসহীন পক্ক ফলের মতো আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল উপরোক্ত বর্ণনা তারই প্রমাণ বহন করে। আমাদের দেশের মানুষ চিরকালই প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত হত। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই প্রকৃতি রাহুগ্রাসে নিপতিত হয় এবং মানুষের সঙ্গে তার নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে রোমন্থন উপন্যাসের ছিন্নমূলে মানুষ নায়ক অভয় গভীরভাবে উপলদ্ধি করে মানুষের হাহাকার।

বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে জগদীশ গুপ্তের সাহিত্য। তাঁর সাহিত্যের বিশেষ আর একটি রুপ দেখতে পাই যখন দেখি তার অনেক উপন্যাস ছোট গল্পের প্রেক্ষাপট এই রাজবাড়ি জেলা ও রাজবাড়ির মানুষ। তার ‘যথাক্রমে’ উপন্যাসটিতে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের দৃশ্যপট।

‘যথাক্রমে’ উপন্যাসটি দুটি কাহিনীর সমন্বয়ে রচিত। কাহিনী দুটির মূলে আছে গ্রাম সম্পর্কে সনাতন ধারণাগুলোকে ভেঙ্গে দিয়ে একটি বাস্তব ও নির্মম অভিজ্ঞতার ‘আর্কেটাইপ তৈরি করা’ (সরকার আব্দুল মান্নান, জগদীশ গুপ্তের রচনা ও জগৎ, পৃ-১৮০)। ‘যথাক্রমে’র কাহিনী আবর্তিত হয়েছে গ্রাম বেতডাঙ্গা, নদী চন্দনা, রাজবাড়ির অদূরে তৎকালীন বন্দর গড়াই নদীর উপকূলে কামারখালিকে কেন্দ্র করে। যথাক্রমে’ উপন্যাসে পল্লী সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তা যেমন অত্র এলাকার চিত্র তেমনি তা বাঙালির সমাজচিত্র----‘গ্রামের নাম বেতডাঙ্গা, নদীর নাম চন্দনা, হাটের নাম চন্দনার হাট। নদী ছোট, গ্রাম ছোট, হাট ছোট, যারা হাটে আসে তারাও বৃহৎ নয়।’যথাক্রমে উপন্যাসে বেতডাঙ্গার ছোট একটি মুদি দোকানের রামপ্রসাদের সংসারকে ঘিরে। রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর তার ছেলে দীনবন্ধু মানুষের যে নতুন স্বরুপের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বিয়ের পর সাবিত্রী পীড়ন ও যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকার যে কৌশল স্বাভাবিকভাবেই রপ্ত করে, তারই মধ্যে গ্রামীণ জীবনের নিশ্চয়তা, সঙ্কীর্ণতা ও কূটকৌশলের পরিচয় মূর্ত হয়ে উঠেছে। গ্রামজীবনের বেঁচে থাকার কাঠামোটির মধ্যেই রয়েছে অবিশ্বাস্য স্বার্থপরতা।

Additional information