শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-১৯

আলস্য, কর্মহীনতা আর তথাকথিত মর্যাদাবোধ গ্রামীণ জীবনের আর এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা যথাক্রম উপন্যাসে দেখি-----‘মাইল পাঁচেক দূরে কামারখালি ব্যবসাক্ষেত্র , স্টিমারও নৌকায় যেখানে মাল ওঠানামা হচ্ছে প্রতিদিন। আর সেই দু’মণ আড়াই মণ ওজনের বস্তা বহন করে প্রচুর টাকা কামাই করছে। বেতডাঙ্গার লোক সেখানে কখনো যায় না। কারণ মুটে মজুর তাদের কাছে লজ্জার কাজ। ফলে যারা চার-পাঁচ ভাই তারাও কয়েক বিঘা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। সারা বছর অভাব অনটন ঘোচে না, পাওনা মেটাতে পারে না। তাই মহাজন খাতকে, ভাইয়ে ভাইয়ে, ক্রেতায় বিক্রেতায়, প্রজায় গোমস্তায় দিনরাত চলতে থাকে ঝগড়া বিবাদ।’

জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্য প্রথা বিরোধী শান্ত নিবিড় গ্রামীণ জীবনের বিপরীতে পল্লী প্রকৃতি ও পল্লীবাসীর অন্তর্নিহিত পরিচয় ফুটে উঠেছে যেখানে স্বার্থপরতা, দারিদ্রের কষাঘাত, কুৎসা রটবার আনন্দ আর পরশ্রীকাতরতা নির্মম সত্য। মেঘচামী, বেতডাঙ্গা গ্রাম থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব বড়জোর ৭/৮ মাইল। গ্রামের চিত্র স্বচক্ষে অবলোকন করেছি। আমাদের গ্রামের মানুষের মধ্যে অনেকেই বিলের মাছ ধরে তা বিক্রি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করত। এ গ্রামের একটি স্বচ্ছল কুলীন পরিবার ধীরে ধীরে নিঃস্ব হতে দেখেছি। জমি বিক্রি করে জীবন চালানোর চেয়ে বিলে মাছ ধরে বিক্রি করার পরামর্শ দিয়েছিলাম তাদের। এতে পরিবারটি আমাকে গালমন্দ করে। দু-এক বছর পর গ্রামে গিয়ে দেখলাম পরিবারটি সেই কাজটিই করছে কিন্তু ততদিনে তাদের জমি-জিরেৎ খোয়া গেছে।

জগদীশ গুপ্ত নিপুণ শিল্পীর মতো গ্রাম জীবনের মানুষের জীবনজীবিকা, লোভ, স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যে। এ মহান সাহিত্য শিল্পী আমাদের গর্ব, অহঙ্কার।

জগদীশ গুপ্তের রচনাবলী

উপন্যাস : বিনোদিনী, হরপের বাইরে, স্ত্রমতি, উদয় লেখা, রতি ও বিরতি, উপায়ন, পাইন স্ত্রী মিহির প্রামাণিক, শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী, তৃষিত সুখকবী, মেঘাবৃত আসন, কলঙ্কিত তীর্থ, আগুন শলাকা, ভুঙ্গার

কবিতা গ্রন্থ : লঘু-গুরু, অসাধু সিদ্ধার্থ, অতল সৈকত, দুলালের দোলা, রোমন্থন, সুতিনী, গতিধারার জাহ্নবী, যথাক্রমে, নন্দ আর কৃষ্ণ, মহিত, পটভূমিকায়, নিদ্রিত কুম্ভকর্ণ, রসচক্র, স্ত্রীযোগ, দয়াময় মল্লিক ও মল্লিকা, চৌধুরান, কষ্ট।

কবিতা গ্রন্থ : অন্তরা, তুলসী, অসাধু সিদ্ধার্থ, নিষেধের পটভূমিকায়।

জগদীশ গুপ্ত রচনাবলী ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত।

 জলধর সেন

রাজবাড়ি জেলার সাহিত্য ও রাজনীতির অঙ্গনে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জলধর সেন। পদ্মা গড়াইয়ের ‘শ্রীখণ্ড ভূমিতল’ (পাংশা, কুমারখালি) কুমারখালিতে তার জন্ম। কৈশোর ও শৈশবের একাংশ কেটেছে গোয়ালন্দ তথা রাজবাড়িতে। সাহিত্যসেবী, শিক্ষক, রাজনীতিক জলধর সেনের মানস গড়ে ওঠে রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের স্পর্শে। এ কারণে সাহিত্য সাংবাদিকতার ইতিহাস চর্চায় জলধর সেন আমাদের মানুষ। জলধর সেনের জন্ম ১৮৬০ সালে কুমারখালির এক কায়স্থ পরিবারে। বাবা হলধর সেন, মাতা কালীকুমারী। কুমারখালিতে কাঙাল হরিনাথ পরিচালিত বাঙ্গলা স্কুলে বিদ্যাশিক্ষার শুরু কাকাতো ভাই দ্বারকানাথ সেন গোয়ালন্দ ফৌজদারী আদালতে পেশকার থাকার সুবাদে ১৮৭১ সালে জলধর সেন গোয়ালন্দ মাইনর স্কুলে ভর্তি হন।

Additional information