শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৩

বিবি কুলসুমের মৃত্যুর ২ বছর পর ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মোশাররফ ইহলোক ত্যাগ করেন। দুটি মাজার পাশা-পাশি কালের স্বাক্ষী। স্মৃতি রক্ষার্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র। মনোরম পরিবেশে পল্লীর ছায়াঘেরা পদমদি বাংলার মানুষের এক শান্ত নিবাস।

ড. কাজী মোতাহার হোসেন

কাজী মোতাহার হোসেনকাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা সনজিদা খাতুন লিখিত ‘কাজী মোতাহার হোসেন’ পুস্তুকটির দুইপৃষ্ঠা উল্টাতেই বড় আকারের লেখা ------‘ডানা মেলে ওড়া’ পর্বে তিনি উল্লেখ করেছেন কাজী মোতাহার হোসেন স্বপ্নে হাত নেড়ে উড়ে কখনো আম গাছের উপরে কখনো বাঁশের ডগায় যেয়ে বসতেন। অনেকে বলে স্বপ্নে উড়া নাকি বদনসিবের লক্ষণ। কাজী মোতাহারের ক্ষেত্রে বদনসিবের কোনো লক্ষণ কখনো দেখা যায়নি। বরং যে স্বপ্ন তিনি লালন করতেন তাঁর সুদীর্ঘ জীবন প্রয়াসে সে স্বপ্নের সকল বাস্তবায়ন দেখতে পাই। তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আর্শীবাদপুষ্ট, জনমানুষের হৃদয়ের মণি, প্রাজ্ঞাজনের গুরু। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে আদর করে বলতেন-----‘আমার মোতিহার’।

কাজী মোতাহার হোসেনের জন্ম ৩০ জুলাই ১৮৯৭ সালে তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালি থানার লক্ষীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে। তাঁর পিতার বাড়ি বর্তমান রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার বাহাদুরপুর গ্রামে। এ গ্রামের পূর্বের নাম ছিল বাগমারা। কাজী গওহর উদ্দিন ও তসিরণ নেসার চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে মোতাহার হোসেন ছিলেন সবার বড়। বাবা গওহর উদ্দিন প্রথমে সেটেলমেন্ট আমিন, পরে হেড আমিন এবং শেষে আমিনদের ইনসপেক্টর হয়েছিলেন। জরিপের কাজ সারা বছরব্যাপী হত না। ছয়মাস কাজ হত আর বাকি ছয়মাস তিনি বাড়িতেই থাকতেন। এই অবসরে তিনি বাড়ির পাঠশালায় শিক্ষকতা ও গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি ছিলেন সৎ নিষ্ঠাবান। তবে সংসার স্বচ্ছল ছিল না। চিরকাল তাঁকে দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়-----তিনি যখন যশ, খ্যাতি আর স্বচ্ছতার মধ্যে এসেছেন তখনও তিনি অতীত দিনের দারিদ্রের কথা ভোলেননি। আমি গরিবের ছেলে এ কথা বলতে তাঁর মনে কখনো দ্বিধা সংকোচ জাগেনি। তবে অর্থের দারিদ্রা থাকলেও পরিবারটির বিদ্যার দারিদ্র ছিল না।

কাজী মোতাহার হোসেন অত্যান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। গ্রামের পাঠশালায় অধ্যায়নের পর তিনি সামান্য দূরের সেন গ্রামের উচ্চ প্রাইমারী বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সকল বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৭/১৮ বছর বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯১৬ সালে পূর্ববাংলা আর আসামের মিলিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ১৫ টাকা বৃত্তি পান। তিনি প্রাইমারী পরীক্ষার পর কুষ্টিয়ায় লেখাপড়া করেন এবং কুষ্টিয়া থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। কলেজের পরিবেশ ভালো না লাগায় দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় রাজশাহী কলেজে চলে আসেন। ১৯১৭ সালে বিজ্ঞান শাখা থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। এই বৃত্তিগুলোই তাঁর শিক্ষালাভকে নিশ্চিত করে। ১৯১৭ সালে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য ঢাকা আসেন। ঢাকা কলেজ তখন নামিদামী কলেজ। যার ঐতিহ্য আজও বিদ্যামান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী এখানে বিএ, বিএসসি, এমএ, এমএসসি পড়ানো হত। ১৯১৯ সালে বিএ অনার্স পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ আর আসাম অঞ্চলে প্রথম হয়ে তিনি ৩০টাকা বৃত্তি পান। তখনকার দিনের ৩০ টাকা  এখন প্রায় ১৫ হাজার টাকার সমান।

(তখনকার দিনে ১৫ টাকায় ১ ভরি সোনা পাওয়া যেত যার মূল্য বর্তমানে ২৪/২৫ হাজার টাকা) তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স আর সহযোগী বিষয়ে বিজ্ঞান পড়লেও আবশ্যিক বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলেন বলে ডিগ্রিটা বিএসসি না হয়ে বিএ হয়েছিল। তখন এরকম ব্যবস্থাই ছিল। বৃত্তির টাকাটা তিনি নিজে খরচ করতেন না। গ্রামে তখন তার বাবা অসুস্থ। তাই টাকাটা বাবাকে পাঠিয়ে দিতেন। ছুটির সময়ে বৃত্তি পাওয়া যেত না তখনকার দিনে। তাই বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য স্কুলে শিক্ষাকতার কাজ নিতে হত তাঁকে।

Additional information