শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৪

১৯১৯ সালে একবার দৌলতপুর মোহসীন স্কুলে ৫০ টাকা বেতনের চাকরি নিয়েছিলেন। ১৯২১ ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মোতাহার হোসেনের পরীক্ষার ফল বের হয়নি। এ সময়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ডেমোনেস্টেটর হিসাবে যোগ দেন। ফল বের হলে তিনি প্রভাষক পদ লাভ করেন। ১৯২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে সহকারী প্রভাষকের পদ লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে এমএ পাশ করেন। পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান এই তিন বিভাগেই তিনি শিক্ষাকতা করেন। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে সান্নিধ্য লাভ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের বোসন পার্টিক্যাল বা বোস তত্বের আবিস্কার কর্তা। পরিসংখ্যানবিদ্যা শিখতে গিয়ে তিনি প্রফেসর প্রশান্ত চন্দ্র মহলনিবিশের স্নেহ ও সান্নিধ্য লাভ করেন। পরিসংখ্যান আজ শিক্ষার প্রায় সকল স্তরে পঠন পাঠনের ব্যবহারের পৃথিকৃৎ কাজী মোতাহার হোসেন।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগ পুনর্বিন্যস্ত হয়ে গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ গঠিত হলে এর রিডার ও বিভাগীয় প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯৫০ সালে ডিজাইন অব এক্রিপেরিমেন্টাল বিষয়ে গবেষণা করে তিনি পিএইচডি (১৯৫০) ডিগ্রি লাভ করেন। এই অভিসন্দর্ভের অন্যতম পরীক্ষক স্যার রোনান্ড ফিসার তাঁর গবেশণা কাজের বিশেষ প্রশংসা করেন। এই অভিসন্দর্ভতে  তৎকর্তৃক গবেষণা কর্মে এক নতুন পদ্ধতির নির্দেশনা আসে যা ‘হুসেনস চেইন রুল’ নামে অভিহিত। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। পূর্ববাংলায় তথ্যগণিতের বা সংখ্যা তত্ত্বের চর্চা শুরু হয়। তথ্য গণিত নামটি কাজী সাহেবের নিজের দেওয়া। এদেশের তথ্য গণিতের তিনিই পিতা। ১৯৫৬ সালে তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর পদে উন্নিত হন। ১৯৬১ তে নিয়মিত অধ্যাপনার কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এই বছর পরিসংখ্যান বিভাগের সুপার নিউমাবি অধ্যাপক পদে রত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অব স্টাটিসটিক্যাল রির্সাস এন্ড ট্রেনিং এর পরিচালক (১৯৬৪-১৯৬৬) নিযুক্ত হন। ১৯৬৯ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এমেরিট্যাস প্রফেসর পদের সম্মান লাভ করেন। প্রবন্ধ সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমী পুরুস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মান জানাবার জন্য তাঁকে ডক্টর অব সায়েন্স বা ডিএসসি ডিগ্রী দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক মর্যাদায় ভূষিত হন।

শিক্ষক, গণিতজ্ঞ, পথনির্দেশক, দাবাগুরু এতসবের পরেও তার বড় পরিচয় তিনি সাহিত্যিক ও সমাজের পথ নির্দেশক। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যে তাঁর অনুরাগ ছিল। সাহিত্যে হাতেখড়ি কুষ্টিয়া হাইস্কুলের পড়ার সময়ে ‘দামোদরের কন্যা’ বিষয়ে একটি রচনা লেখেন। ‘গ্যালিলিও’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। এটা সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র তখন তাঁর লেখা ‘সুন্দর’ নামে একটি প্রবন্ধ ঢাকা কলেজ বার্ষিকীতে ছাপা হয়। এরপর তিনি লিখতে থাকেন। লেখালেখির প্রাথমিক অবস্থায় গল্প ও কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল। সে পথে না যেয়ে তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন সামাজিক প্রবন্ধ রচনায়। এর উদ্দেশ্য ছিল আমরা কোথায় আছি তা বোঝাবার চেষ্টা এবং পাশাপাশি পথ নির্দেশের ইঙ্গিত। জাতি ধর্ম নির্বিশেষ সকলকে সমাজ বিকাশের নিত্য নতুন ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করতে হয়। তা না হলে জাতি ভ্রম ও বিচ্যুতির আবর্তে নিপতিত হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, চিন্তক পথ নির্দেশের ইঙ্গিত দেন। কেবল আত্মপ্রত্যয়ের আনন্দ নয় লেখকের যে একটা সামাজিক দায়িত্ব আছে যা থাকতে হয় প্রতিকূল সময় ও পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়েও লেখক জীবনের সূচনাপর্বে তিনি এই সত্যটিকে আত্মস্থ  করেই দৃঢ় প্রত্যয়ে কলম ধরেছিলেন। এক ভিন্ন উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বলেছেন-------

‘আমার চিন্তা, কর্ম এবং লেখা জীবনের একটা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল। এতে সফলতা যতটা না হোক একটা আদর্শ অনুসরণের সহজ আনন্দ যেন পেতে লাগতাম। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা অল্প আশা রইল যে আজকের ক্ষীণ আলো ভবিষ্যতে শক্তি সঞ্চয় করে যখন প্রখর পূর্যে পরিণত হবে তখন আর তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো থাকবেন। (লেখক হওয়ার পথে-সঞ্চরণ)। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সঙ্কলন সঞ্চরণ রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ প্রশংসা পায়। শরৎচন্দ্র, মোহিতলাল মজুমদার, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, কাজী আবদুল ওদুদ এঁরাও মোতাহার হোসেনের লেখার অনুরাগী ছিলেন। সঞ্চারণ প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ অভিমত ব্যক্ত করে লেখেন যে-------

Additional information