শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৫

আপনি বিচিত্রভাবে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষার রুপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলো আপনার সঞ্চরণ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি। আপনার বলবার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা সাধুবাদের যোগ্য। সাহিত্য পথে আপনার অধ্যাবসায় জয়যুক্ত হোক এই কামনা করি।

কাজী মোতাহার হোসেন মূলত মৌলিক চিন্তাশ্রয়ী প্রাবন্ধিক হিসেবেই পরিচিত। চিন্তার মৌলিকত্ব, বক্তব্যের ঋজুতা ও প্রকাশভঙ্গীর প্রাঞ্জলতা তাঁকে এক ব্যতিক্রমী মননশীল সাহিত্য শিল্পীর মর্যাদা দান করেছে। তাঁর সমাজ ও সংস্কৃতিক বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বেশ কয়েকটি শিখা পত্রিকা ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর সাহিত্য বাসরের জন্য রচিত হয়েছিল।

নজরুল চর্চার সেই প্রথম পর্বেই প্রকাশিত হয় মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিত’ (১৯৬৫)। এর পূর্বে ১৯৫১ তে প্রকাশিত হয় ‘সেই পথ লক্ষ্য করে’। প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’ অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ তে।  কাজী আশরাফ মাহমুদের বেশ কয়েকটি হিন্দি কবিতার বই এবং হযরত দাতা গঞ্জাবক্সের জীবনী ১৯৬৮ তে প্রকাশিত হয়। এছাড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তক তিনি রচনা করেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য তথ্য-গণিত (১৯৬৯), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস (১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান (প্রথম ১৯৭৫)। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান পঠন পাঠনের তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সমর্থক। এ বিষয়ে প্রফেসর সত্যেন বসু ছিলেন তার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। মূলত প্রাবন্ধিক ও সমালোচক হলেও মোতাহার হোসেন কিছু কবিতা রচনা করেছেন। আব্দুল হক ও আবুল আহসান চৌধুরীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমী থেকে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচনাবলী। এর বাইরে ও তাঁর বেশ কিছু ইংরেজি বাংলা রচনা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। ধর্ম, সমাজ, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক বহু প্রবন্ধ রচনায় সুস্থ মনন ও পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের পরিচয় উৎপন্ন হয়েছে। ‘অসীমের সন্ধানে’এ প্রবন্ধটি আমাদের সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে ছিল। প্রবন্ধটি একাগ্রতার সাথে পাঠ করে মহাকাশকে নিয়ে আমার মধ্যে যে কৌতুহল জেগেছিল তারই ফলশ্রুতিতে হয়ত আমি আজ রচনা করতে পেরেছি ‘মহাবিশ্বের স্বরুপ শুরু ও শেষ’, ‘সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞান’ ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ।

মুসলমানদের উদারনৈতিক চেতনার অভাবে তারা শিল্প ও সাহিত্য চর্চায় পিছিয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে আধুনিক ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা চেতনায় আড়ষ্টতা দেখা দেয়। ১৯২৬ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন গড়ে ওঠে কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের প্রচেষ্টা ও প্রেরণায়। বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীনচর্চা ও বুদ্ধির মুক্তি ছিল তাদের কাম্য ও লক্ষ্য। শিখাগোষ্ঠী নামে এই দলের মূল বক্তব্য ছিল-----‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ আবদুল ওদুদকে বলা হত শিখা সমাজের মুস্তস্ক, আব্দুল হুসেনকে অঙ্গ-প্রতঙ্গ মোতাহার হোসেনকে এর হৃদয়। এই মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক মুখপত্র শিখার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের সম্পাদক ছিলেন মোতাহার হোসেন। এই আন্দোলনের প্রসঙ্গ ও পরিণতি নিয়ে মোতাহার হোসেন তার এক মূল্যায়নে বলেছেন-----

‘যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এক গোঁড়া শাস্ত্রাচারে আবদ্ধ প্রগতিবিমুখ সমাজের সঙ্গে লড়েছিলাম, তা যে অনেকখানি সার্থক হয়েছে আজকের প্রগতিশীল বাংলাদেশের সমাজ দেখে তা বোঝা যায়।’ সাহিত্য সংস্কৃতির সূত্র ধরে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। সখ্যতা ধীরে ধীরে সৌহার্দ এবং শেষে পরম আত্মীয়ের পর্যায়ে পৌঁছে। নজরুলের ঢাকাবাসের দিনগুলো কাটে মোতাহার হোসেনের বাসায়। কবি তাকে সম্মোধন করে ডাকতেন আমার মোতিহার (মূল্যবান মোতি দ্বারা কণ্ঠহার)। নজরুল ঢাকায় যে বিদুষী ফজিলাতুনন্নেসার সঙ্গে প্রণয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন তারও মাধ্যম ছিলেন মোতাহার হোসেন। তাঁকে লেখা নজরুলের চিঠিপত্রে এবং মোতাহার হোসেনের স্মৃতি কথায় উভয়ের গাঢ় সম্পর্কের পরিচয় মেলে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর ছিল বিশেষ ঘনিষ্ঠতা। দাবা খেলার সূত্রে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মালেও সাহিত্য আলোচনাতেও তা প্রসারিত হয়েছিল। আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়-----‘শরৎ সাহিত্যে মুসলিম চরিত্র চিত্রণ বিশেষ করে তাঁর মহেশ গল্পটি মোতাহার হোসেন এর সঙ্গে আলাপচারিতার ফসল।’ আজকের দিনে মুসলমান সমাজে নারী পুরুষের গান-বাজনা, খেলাধুলা, ভ্রমণ ইত্যাদিতে বাধা নেই। কিন্তু মোতাহার হোসেন এর কালে মুসলমান সমাজে এরুপ আনন্দ কোলাহল হাসি খুশীর অভাব ছিল। নন্দ ও মুসলমানগৃহ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-------

Additional information