শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৬

পাতার নিচে কী সুন্দর মর্মর শব্দ হয়। ভোরবেলা পাখির গানে আনন্দের সুর। আর আমরা পৃথিবীর সেরা জীব হয়ে জীবনের ভিতরে আনন্দের ছন্দ তৈরি করতে পারি না কেন? প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারলেই সমাজ প্রাণময় হয়, গৃহে আনন্দের ফোয়ারা ছোটে আর মন সবল ও সচেতন হয়। বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই মিলে খোলামেলা আলাপ করতে পারলে জীবন সহজ হয়। কিন্তু মুসলমান ঘরের হালচাল কী? বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই মিলে মুসলমান আনন্দ করবে না, ছবি আঁকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে মেয়রা কেবল রাঁধবে বাড়বে, মুসলমান বাপের সামনে হাসবেন না বড় ভাইয়ের সঙ্গে খেলবেন না, গুরুজনের অন্যায় কথার প্রতিবাদ করবেন না এমন কি কচি ছেলেরা মার খেলেও চেঁচিয়ে কাঁদবেন না।

সেকালের অবস্থা এমনই ছিল। মোতাহার হোসেন ব্যক্তিগত জীবনে এ অচলায়তন ভেঙ্গেছেন। তার পারিবারিক জীবনে উদার নৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল। তিনি এদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ। দাবা খেলায় তিনি অনেক প্রশসংসা পেয়েছেন। চিঠি লিখে ভারতবর্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দাবা খেলতেন। একে বলে করেসপন্ডেস চেস। দক্ষিণ আফ্রিকান করেসপন্ডেস চেস চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯২৫ সালে কলিকাতা জাতীয় দাবা খেলাতেও তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। সমগ্র ভারতবর্ষে তিনি ৭ বার চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন গড়ে তোলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি দাবা ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের দাবার ক্ষেত্রে তিনি দাবা গুরু বলে পরিচিত হন। বাংলাদেশে প্রতিবছর কিউএম হোসেন দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এদেশে রানী হামিদ, গ্রান্ড মাস্টার নিয়াজ মোরশেদ খুব পরিচিত নাম। বাংলাদেশে দাবা আন্তর্জাতিক সুনাম বয়ে এনেছে। নিয়াজ মোরশেদের মেধা অনেক আগেই কাজী সাহেব সনাক্ত করেছিলেন। দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি বরাবরই যুক্ত ছিলেন। সকল প্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার, অন্যায়, অন্যায় বিচার, সাম্প্রদায়িকতা, রক্ষণশীলতা, প্রতিক্রীয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন তাঁকে নিবৃত করতে পারে নাই। রাষ্ট্রভাষা, ভাষা সংস্কার, হরফ পরিবর্তন, রবীন্দ্র বিরোধিতা, সংবাদপত্র সংকোচন এসকল বিষয়ে সঠিক বক্তব্য রাখতে কখনো তিনি দ্বিধান্বিত হন নাই। রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে তার মতামত ছিল সরল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একমাস পরেই তিনি রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা সমস্যা প্রবন্ধে লেখেন------

পূর্ব পাকিস্তানের রাজভাষা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়াতে স্বাভাবিক ও সমীচীন কোনো কোনো পরমুখাপেক্ষী বাঙালীর মুখে ইতিমধ্যেই উর্দুর ঝনাৎকার শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এদের বিচার বুদ্ধিকে প্রশংসা করা যায় না। এসকল উক্তি কলের মানুষের অপুষ্ট মনেরই অভিব্যক্তি। এতে বাঙালির জাতীয় মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে, তার ফলে এই দাঁড়াবে যে বাঙালি হিন্দু মুসলমান ইংরেজ রাজের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে অমনি পাঞ্জাব সিন্ধু বেলবী রাজের কবলে পড়বে।’ ঐ একই প্রবন্ধে উর্দুভাষীদের সতর্ক করে দেন এই বলে------বর্তমানে যদি গায়ের জোড়ে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষা রুপে চালাবার চেষ্টা করা হয় তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধুমায়িত অসসন্তোষ বেশিদিন চাপা থাকতে পারে না। শিঘ্রই তাহলে পূর্ব পশ্চিমের সীমান্তের অবসান আশঙ্কা আছে। মোতাহার হোসেনের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এসব মতামতই ইতিহাসের পথ বেয়ে বাস্তবে রুপ নেয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফলে পশ্চিম-পাকিস্তানিদের থেকে পূর্ববাংলার যে চির বিচ্ছেদ ঘটে তার মূলের দিকে লক্ষ্য করলে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে সে সময় যে অধ্যাপক সমিতি গঠিত হয় তার সভাপতি থাকেন কাজী মোতাহার হোসেন। ভাষা সংস্কার প্রশ্নেও তাঁর ভূমিকা ছিল স্পষ্ট, দৃঢ় ও যুক্তিপূর্ণ। বাংলা ভাষা ও সমস্যা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----

পণ্ডিতদেরই হোক, সমাজ পতিদেরই হোক অথবা রাজনীতিবিদদেরই হোক কারো নির্দেশমত ভাষার কোনো স্থায়ী সংশোধন বা সমৃদ্ধি লাভ হয় না বা হবে না। এরুপ অবাঞ্চিত ও আত্মঘাতি হস্তক্ষেপের ফলে দেশবাসীর চিন্তাশক্তিতে বাধা পড়বে। ভাবে স্বাধীনতা ব্যবহৃত হবে। ভাষার স্বাচ্ছন্দ জনিত আনন্দের অভাব হবে। ১৯৫৩ সালের ২৭-২৮ ফেব্রয়ারি ও ফেব্রয়ারি ও ১ মার্চ শান্তি নিকেতনে অনুষ্ঠিত সাহিত্য মেলায় মোতাহার হোসেন পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। এই মেলায় তার উদার ও মুক্তমনের বক্তব্য পশ্চিমবেঙ্গর সুধী সমাজ ও পত্র পত্রিকায় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এ প্রসঙ্গে কলিকাতার প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র নতুন সাহিত্য এর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল।

Additional information