শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৭

মোতাহার হোসেন অনেক সরল পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যের মধ্যে একটা মূল কথা ঘোষণা করে গেলেন। যেটা মনে থাকবে সকলের। তার বক্তব্যে হুঁশিয়ারী ছিল সাহিত্যে হিন্দুকরণ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন----‘জলকে পানি বলে উল্লেখ করলে সাহিত্যের জাত যাবে না। জাত যাবে যদি জলচৌকিকে পানিচৌকি, পানি পথকে জলপথ, জলযোগকে পানিযোগ, জলপানিকে পানিপানি বা পানিপানিকে জলপানি করা হয়।’ মোতহার হোসেন কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই নয় ১৯৬১ সালে প্রতিকূল পরিবেশের মধেও তিনি রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালের বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধন্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৭১ সালের মার্চে বিভিন্ন সভা সমিতিতে তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীকার সংগ্রামের স্বপক্ষে বক্তব্য পেশ করেন।

ধর্মের পরিচিতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটলেও পূর্বপাকিস্তানি মুসলমানদের মধ্যে আবহমানকাল ধরে বাঙালি সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান। কেবল ধর্মের গণ্ডীর মধ্যে তাদের আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় এ বিষয়টি মোতাহার হোসেন বিশেষভাবে অনুভব করতেন। প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাপতি হিসেবেও তিনি বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন। এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ১ লা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানিয়ে ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে বিবৃতি দেন। এই সংগঠনের উদ্যোগে ও মোতাহার হোসেন এর সভাপতিত্বে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির উপর যখনি কোনো হামলা এসেছে তিনি তখনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রগতি ও বাঙালি সংস্কৃতির স্বপক্ষে তিনি আজীবন ভূমিকা পালন করে গেছেন। এসব কারণে পাকিস্তান আমলে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁকে সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়।

পৃথিবীর জ্ঞানী মানুষের বিচিত্র আচরণ লক্ষ্য করা যায় নিউটন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথসহ অনেক দার্শনিক পণ্ডিতের অদ্ভুত আচরণের অনেক গল্প প্রচলিত আছে। মোতাহার হোসেনের কিছু অদ্ভুত ধরনের গল্প আছে, যেমন----মোতাহার হোসেন ইউনিভার্সিটিতে তার কন্যা সানজিদা খাতুনের সামনাসামনি পড়ে গেলে তাকে বিনীতভাবে সালাম দিতেন। কন্যা বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে নালিশ করল যে বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাথে দেখা হলে হাত তুলে সালাম দেয়। স্ত্রী স্বামীকে বকা দিয়ে বললেন নিজের মেয়েকে কি কেউ সালাম করে? উত্তরে মোতাহার হোসেন বলেছিলেন কী করবো চেনা-চেনা মনে হল তাই। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একটি লেখা থেকে জানা যায়। ড. মোতাহার হোসেন একবার চাকরি থেকে ফিরে এসে তিনি সেগুন বাগিচার তার নিজের বাসা হারিয়ে ফেলেন। তারপর পথচারিকে জিজ্ঞাসা করেন ভাই ড. মোতাহার হোসেন এর বাসা কোনোটা? ১৯২০ সালে ছাত্র অবস্থায় থাকাকালীন হুগলীর মেয়ে কলকাতাবাসী সাজেদার সঙ্গে মোতাহার হোসেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী সাজেদার বাসায় উর্দু চল ছিল বাংলার চেয়ে বেশি। খুলনার মেয়ে মোসলেমার প্রভাবে সাজেদা বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারানী ও যুগলঙ্গুরীয় এই দুই উপন্যাসে উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর সাত মেয়ে ও চার ছেলের মধ্যে দুই ছেলে স্কুলজীবনেই মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে যোবায়দা কর্মজীবনে ইংরেজির অধ্যাপিকা ছিলেন। মেঝ-কন্যা ওবায়েদা সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অন্য মেয়েদের মধ্যে সানজিদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর। তিনি রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও বরীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে পরিচিত। আর এক মেয়ে ফাহমিদা খাতুন ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং উঁচুমানের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। ছোট মেয়ে মাহমুদা চিত্রশিল্পী ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন মাসুদ রানা সিরিজের লেখক এবং রহস্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। ছোট ভাই কাজী মহাবুব হোসেনও ইংরেজি এ্যাডভেঞ্চারের অনুবাদক হিসেবে পরিচিত। কাজী আনোয়ারের সেবা প্রকাশনী থেকে তাঁদের বই প্রকাশিত হয়।

রাজবাড়ি জেলার মাটিতে জন্ম নেওয়া ড. কাজী মোতাহার হোসেন দেশ ও জাতির জন্য যে অবদান রেখে গেছে সে কারণে তিনি সকলের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়। নিরহঙ্কার, আপনভোলা, বিদ্বান ও গুণী এ মন্তব্য ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর। অন্নদাশঙ্কর রায়ের পর্যবেক্ষণে, ‘বরাবরই তিনি একজন উদারমনা মুসলমান ও সেই সঙ্গে দেশপ্রাণ বাঙালি এবং সকলের উপর একজন সৎ মানুষ।’

Additional information