শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৮

শান্ত স্বভাব ও সৌম্যদর্শন এ মনীষী জ্ঞানচর্চাতেই জীবন কাটিয়েছেন। মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিপন্থায় নিবেদিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে নিষ্ঠাবান ধর্মচারী। রোজা, নামাজ, হজ্ব পালনে শৈথিল্য ছিল না। আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়------‘মোতাহার হোসেন এর জীবন থেকে খুব প্রাসঙ্গিক খুব জরুরি একটা শিক্ষা পাই যে, প্রকৃত ধর্মচর্চার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ এই মনীষী ১৯৮১ সালে ৯ অক্টোবর পবিত্র ঈদুল আজাহার দিনে ৮৫ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন আজকের দিনে জাতি তমসা কাটিয়ে সুষ্ঠু জ্ঞানচর্চায় অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। শিল্প সাহিত্য অর্থনীতি, সমাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ উন্নতির স্বাক্ষর রেখে চলেছে। অনেক সাধকের ভিড়ে শান্তশিষ্ঠ শ্মশ্রুমণ্ডিত আমাদের মোতাহার হোসেন উজ্জ্বল মুখটির হাঁসির আভায় আমরা প্রতিনিয়ত স্নাত হব। কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা অমঙ্গল এবং সকল পশ্চাৎপদতা পিছনে রেখে তাঁর আদর্শে সদা অনুপ্রাণিত হয়ে উঠব।

কাজী আব্দুল ওদুদ

কাজী আব্দুল ওদুদসমাজ, সাহিত্য, চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে কাজী আব্দুল ওদুদের অসামান্য অবদানের পূর্বে তাঁর পরিচয়টুকু গ্রহণ করা যাক। ১৮৯৪ সালের ২৬ এপ্রিল রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার মাগমারা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী সগীরউদ্দিন। কাজী সগীরুদ্দিন ছিলেন রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার। ১৯১৩ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯১৫ ও ১৯১৭ তে কলিকাতা প্রেসিডিন্সী কলেজ থেকে যথাক্রমে আইন ও বিত্র পাশ করেন। ১৯১৯ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন।

প্রেসিডেন্সী কলেজে ছাত্রকালীনে তিনি মাতুল কন্যা জমিলা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯২০ তে ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজে বাংলার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পর কলিকাতায় বদলি হন এবং সেখানে শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টরের অধীনে টেক্সট বুকস কমিটির সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। এই পদ থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে নবপর্যায়ে প্রকাশিত তরুণ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯২৬ খ্রি. ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। তিনি ছিলেন সমিতির অন্যতম স্তম্ভ ও নেতা। সাহিত্য সমাজের পত্রিকা ‘শিখায়’ (১৯২৭) মুক্তচিন্তা ও যুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন লেখার জন্য নওয়াব পরিবার কর্তৃক নিগৃহীত হয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং কলিকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন (১৯৪০’রপর)। ন্যায়নিষ্ঠা উদার ও দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য তিনি খ্যাত। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসা সমিতির প্রধান উদ্যোক্তা এবং কবির চিকিৎসার জন্য অর্থসংগ্রহসহ চিকিৎসার কাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯ মে ১৯৭০ কলিকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

কাজী আব্দুল ওদুদ শিক্ষক, সাহিত্যিক, সমাজসচেতক, সাংবাদিক এবং সর্বোপরি মুসলীম সমাজের নবচেতনার উম্মোচনকারী বলা যায়। মুসলমান সাহিত্যিক হিসেবে মীর মশাররফ হোসেনের অনেক পরে তাঁর আবির্ভাব তবে কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজী ইমদাদুল হক, এস ওয়াজেদ আলীর উত্তরসূরী কাজী আব্দুল ওদুদ। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৮), ‘মীর পরিবার’(গল্প) (১৯১৮), ‘রবীন্দ্রকাব্যপাঠ’ (১৩৩৪), ‘হিন্দু মুসলমানের বিরোধ’ (১৯৩৬, ‘কবিগুরু গ্যাটে’ দুইখণ্ডে সমাপ্তি (১ম খণ্ড ১৩৬৯ ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৩৭৬), ‘সমাজ ও সাহিত্য’ (১৯৩৪) ‘শাশ্বত বঙ্গ’ (১৯১৫), ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ’ (প্রথম খণ্ড ১৩৬৯, ২য় খণ্ড-১৩৭৬), ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৮), ‘পথ ও বিপথ’ ১৩৪৬), ‘মানব বন্ধন’ (১৩৪৮), ‘আজাদ’ (উপন্যাস ১৯৪৮) ‘তরুণ ভুল ও মা’ (ছোট গল্প ১৩৫৫), ১৯৫৬ তে বিশ্বভারতীতে প্রদত্ত বক্তৃতাবলী ‘বাংলার জাগরণ’ নামে গ্রন্থিত হয়ে  ঐ বছরেই প্রকাশ, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় উপর ১৯৫৭ তে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতা শরৎচন্দ্র ও তারপর ১৯৬১ তে পুস্তকাকারে প্রকাশিত।

Additional information