শিল্পসংস্কৃতি-২ - পৃষ্ঠা নং-৯

হযরত মুহম্মদ ও ইসলাম (১৩৭৩) এবং জীবনের শেষ পর্বে কোরানের সুললতি ও প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ। তাঁর সম্পাদিত ব্যবহারিক শব্দকোষ একখানি জনপ্রিয় বাংলা অভিধান। সাহিত্যচর্চায় কাজী আব্দুল ওদুদের আবির্ভাব তখন, যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরিপূর্ণ আধুনিক হয়ে উঠেছে। ভাষা ব্যবহারে কেতাবী ভাষার পরিবর্তন  এসেছে। অফিসের ভাষা, লেখার ভাষা-মুখের ভাষার মতো সহজ হয়ে উঠেছে। এমন কি সাবেকি সাধু ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যবহার হচ্ছে চলিত ভাষা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে দেবদেবী তো নয়ই এবং চরিত্রগুলো চারপাশের দৈনিন্দিন যাপনকারী মানুষের জীবনচরিত্র। এছাড়াও সাহিত্য এসেছে মানবমানবীর প্রেম, এসেছে প্রকৃতি, সমাজ, রাজনীতি। তাই বিশ শতকের সাহিত্য আধুনিকতায় উদ্ভাসিত সাহিত্য বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন। বিশ শতকের সাহিত্যের অন্য আর একটি বিশেষত্ব হল এখানে কল্পনার সাথে বাস্তবায়নের প্রয়াস আছে। সহজ কথায় সাহিত্যে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে। ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিকতায় রবীন্দ্রনাথের অবদান অসামন্য। কস্তুত তিনি বাংলা সাহিত্যের ভাবমূর্তি বদলে দেন। তার সাহিত্য জীবনের অর্ধেক কাজ উনিশ শতকে আর অর্ধেক কাজ বিশ শতকে। এ সময়ের মধ্যে সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকেই তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কবিতা অনন্য সাধারণ। প্রকৃতি আর আধ্যাত্বিকতার সমন্বয়ে কবিতা মানবচেতনার বিচিত্র মাত্রা সংযোজিত করে। যে কথাসাহিত্য দিযে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনা বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে এসেছিলেন চোখের বালির মতো উপন্যাস লিখে। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ে আরো সূক্ষ্ণভাবে মানবাচরণ অঙ্কন করতে পেরেছিলেন। তবে তিনি একাই নন আরো বহু সাহিত্যিক এগিয়ে এসেছিলেন সাহিত্যকে নানা ডালপালা; ফুলে ফলে সাজাতে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আত্মপ্রত্যয়ী করেছিল। নানা ঢঙ্গে ও ভঙ্গিতে অজস্র সাহিত্য চর্চা হতে থাকল। শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, কাজী আব্দুল ওদুদ সাহিত্যক গ্রামজীবন ও সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এলেন। সাহিত্য বিষয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরীর বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। সাহিত্যসেবা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন------

সাহিত্যিক প্রকৃতির কুম্ভকার, তিনি কুম্ভ বিক্রয় করেন না, কুম্ভ নির্মাণ করেন। প্রকৃতির বুকে যে সুষমা আছে, মনোভাবের যে রাগিনী আছে, মানব জীবনের সত্যের যে বিচিত্র বিকাশ আছে, সমুদয় পার্থিব ও চিন্তালেশ শূন্য নির্মল নির্দোষ ক্রীড়ারত হাস্যময় বালকের নাচিয়া বিচিত্র পক্ষ প্রজাপতি ধারার মতো সেই সমস্ত নানা বর্ণের ভাব চিন্তা ও সত্য ধরিয়া তাহার মূর্তি প্রদান করাই তা

কাজী  আব্দুল ওদুদের প্রথম উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’ ১৯১৯ সালে তাঁর ছাত্রজীবনে প্রকাশিত হয়। অপর উপন্যাস ‘আজাদ’ লেখা হয় ১৯৩০ এর দিকে। উপন্যাসই তাঁর যৌবনকালের রচনা। বাঙালি মুসলমান সমাজকে অবলম্বন করে উপন্যাস দুটি গড়ে উঠেছে। ‘নদীবক্ষে’ বাঙালি মুসলমান কৃষক জীবনের কাহিনী এবং ‘আজাদ’ শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সমাজের জীবন চিত্রের রুপায়ন। নদীবক্ষের পটভূমি রাজবাড়ি জেলার কয়েকটি গ্রাম গোয়ালন্দ, ইলিশমারীর চর, পাংশার গ্রাম। সে সময় এ অঞ্চলের দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষ বাদামূল্লুকে (দক্ষিণে বরিশাল অঞ্চল) ধান কাটতে যেত সেসব কথা তার নদীবক্ষে উপন্যাসে এসেছে। নদীবক্ষে মোট তিরিশটি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত উপন্যাস। গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজ পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসের মূল চরিত্র রচনা করেছে লালু ও মতির সম্পর্ক। কৃষক লালুর সাথে তার চাচাতো বোন জমির শেখের কন্যা মতির আশৈশব সম্পর্ক। বয়সের সাথে সম্পর্ক প্রেমে রুপ নেয় এবং মিলন সঙ্কেতও পাওয়া যায়। এসব অবস্থায় কৃষিজীবী লালু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফসল ও হালের গুরু হারায়। বাদায় শোরগঞ্জে ধান কাটতে যায়। ফিরে এসে দেখে ইলিশমারীর চরের অবস্থানরত ফটিকের সাথে মতির বিয়ে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে অসুখে ফটিকের মৃত্যু হলে অকালে বিধবা মতিকে পিতার সংসারে ফিরে আসতে হয়। এবার অত্যাধিক পরিশ্রমে লালু অসুস্থ হলে মতি তাকে সেবা শুশ্রুষা করে। লালুর মা অসুখে ভুগে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মরণকালে মা উভয়ের মিলন কামনা করে যান। এরপর মতি তার মামার বাড়িতে গেলে ফিরিয়ে আনার ভার পড়ে লালুর উপর। নৌকায় ফিরতে ফিরতে এক রোমান্টিক অবস্থায় উভয়ের মিলন ঘন্টা বেজে ওঠে। এই হল নদীবক্ষের কাহিনী।  কৃষিভিত্তিক সমাজের পরিবারের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে সহজ সরল বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে নওয়া হয়েছে এ কাহিনী।

Additional information