শিল্পসংস্কৃতি-২

 দশম অধ্যায়-২

মীর আলী আশরাফের পুত্র মীর মোহাম্মদ আলীর ডাকনাম মীর খয়রাতী। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ কেরন। নশরতশাহী ও নসিবশাহী পরগনা (পাংশা - বালিয়াকান্দি)জমিদারী ক্রয় করে প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী হন। তিনি পদমদি ও মৃগীর নীলকুঠি ক্রয় করে নীলের ব্যবসায় প্রচুর লাভবান হন। পদমদিতে সুদৃশ্য দালানসহ মানুষের পানির অভাব দূর করতে বিরাট আকারের দিঘি খনন করেন। পদমদিতে পাঠশালা এবং কুষ্টিয়ায় একটি ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেন। তিনি বেশিরভাগ সময় কলিকাতায় থাকতেন। কলিকাতায় মোহামেডান এ্যাসোসিয়েশনসহ মোহামেডান ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড আমোদ প্রমোদ স্বভাবের। তিনি বিবাহ করেননি। বংশ মর্যদায় ছিলেন অহঙ্কারী। বৃটিশ সরকার তাঁকে ‘নবাব’ উপাধি প্রদান করে। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে যখন তিনি নবাব উপাধিপ্রাপ্ত হন,

কলিকাতা থেকে পদমদি আসার পথে পাংশায় তাঁকে বিপুল মানুষের সমাবেশে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পানশি নৌকা সাজিয়ে চন্দনা দিয়ে পদমদির পথে যাত্রা করেন। মীর মশাররফ হোসেনের কথায়-----

চন্দনার আনন্দ অপার

যেন হাসছে বারবার

বুকে করি নবাব তরী

যাচ্ছে অনিবা।

দুকূলে আকুল সবে

দেখবে নবাব সাধ মনে

তুমি ধন্য জগৎ মান্য

কে-তব জানে।

মীর মোহাম্মদ আলীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা মীর আবদুস সামাদ। তিনিও জমিদারী ক্রয় করেন। তিনি নসিবশাহী পরগনা (রাজবাড়ি সদর উপজেলা) জমিদারী ক্রয় করে ধন-সম্পত্তির মালিক হন। সাথে নীলের ব্যবসা। বিবাহ করেন বরিশালের বামনার জমিদার কন্যা ককরন সেনাকে। চার কন্যা। জ্যেষ্ঠ কন্যা আশরাফন নেসার বিবাহ হয় শায়েস্তাবাদের জমিদার মোহাম্মদ হোসেনের সাথে। মধ্যম নাম অজ্ঞাত, বিবাহ সৈয়দ শামসুল হুদা এমএবিএল হাইকোর্টের উকিল। বিবাহের পর কন্যার মৃত্যু। তৎকনিষ্ঠ আসমাতন নেসার সাথে শামসুল হুদার দ্বিতীয় বিবাহ। তৎকনিষ্ঠ আবেদন নেসার বিবাহ চরমদ্দির (বরিশাল) জমিদার চৌধুরী মোহাম্মদ ইসমাইল। মোহাম্মদ আলী ও আবদুস সামাদের একমাত্র বোন হায়াতুন নেসার বিবাহ হয় পদমদির অদূরে কুর্শীর জমিদার গোলাম কাদেরের সঙ্গে। গোলাম কাদেরের ভাই মকবুল আহমেদের দুই কন্যা আক্কি বিবি ও ওয়াজেদন নেসা। ওয়াজেদন নেসা বিদূষী মহিলা ছিলেন। তিনি তৎকালীন মুসলমান ছাত্রদের পড়ালেখার উন্নতির জন্য বহু সম্পত্তি দান করে যান।

পদমদির কুতুবুল্লার সন্তান মীর ওমর দারাজের বংশেই জন্মগ্রহণ করেন মীর মশাররফ। ওমর দারাজের পুত্র মীর এবরাহিম। মীর ওমর দারাজ বহু সম্পত্তির মালিক ছিলেন। জমিদার না হলেও চালচলন, বেশভূষা ছিল জমিদারদের মত। পুত্র মীর এবরাহিম ছিলেন তেজস্বী ও ডানপিটে। লেখাপড়ায় তেমন মন ছিল না। সারাদিন বর্শা হাতে চন্দনা নদীর তীরবর্তী জঙ্গলে বরাহ ও নানা বন্য পশু শিকার করে বেড়াতেন। একদিন বরাহ শিকার করতে যেয়ে আহত বরাহের আক্রমণে মরণ থেকে রক্ষা পান।


এ কথা পিতার কর্ণগোচর হলে পিতা পুত্রের বধোদয়ে স্ত্রীকে এররাহিমের খাবার পাতে কিঞ্চিত ছাই রেখে দেওয়ার আদেশ দেন। স্মামীর আদেশ অমান্য করা মহাপাপ ভেবে স্নেহময়ী মা যথাজ্ঞা পালন করেন। মীর এবরাহিম পাতে ছাই দেখে অভিমানে গৃহত্যাগ করেন। তখনকার দিনে মুর্শিদাবাদ ছিল শিক্ষার কেন্দ্র। উদ্দেশ্য মুর্শিদবাদ যেয়ে লেখাপড়া শিখে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবেন। তখন হাঁটা পথেই ছিল একমাত্র অবলম্বন। মাঠ, ঘাট জঙ্গল পাড়ি দিয়ে গড়াই নদী পাড় হয়ে সাঁওতার ঘাটে যখন পৌঁছান তখন সন্ধায় হয় প্রায়। একতো রাত তারপর পথঘাট চেনেন না, পেটেও ক্ষুধা, নানা কথা ভাবতে থাকেন। ইতিমধ্যে জানতে পারেন সাঁওতায় আনার খাতুন নামে এক জমিদার আছেন যার বাড়িতে পথিক আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। তিনি আনার খাতুনের আশ্রয়ে রাত্রি যাপন করে সকালে বিদায় নেওয়ার সময় এলে আনার খাতুন তাকে ডেকে পাঠান। তিনি আনার খাতুনের নিকট সব বৃত্তান্ত বলেন। আনার খাতুন ওমর দারাজকে চিনলেন এবং বললেন সে তার জ্ঞাতি ভাই। যুবক ইবরাহিমকে যেতে দিলেন না। আনার খাতুনের স্বামী সন্তান ছিল না। তিনি পুত্রবৎ স্নেহে যুবক এবরাহিমকে পালন করেন এবং সময়ে সমুদয় জমিদারী লিখে দিয়ে পরলোকগমন করেন। সাত বছর পর মীর এবরাহিম পদমদি আসেন। হারানো পুত্রকে পেয়ে পিতা মাতার আনন্দের সীমা থাকে না। মীর এবরাহিম সাঁওতায় ফিরে যান। মীর এবরাহিমের পুত্র মীর জোলফেকার, মীর মোয়াজ্জেম হোসেন ও কন্যা হাফিজা খাতুন ও নাসিমা খাতুন। মীর এবরাহিম দ্বিতীয় বিবাহ করেন পদমদির অদূরে দক্ষিণবাড়ির মলঙ্গ ফকীরের বিধবা কন্যাকে। দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান মীর সাহেব আলী ও এক কন্যা। এবরাহিম দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য সাঁওতার অদূরে লাহিনীপাড়ায় ভিন্ন বসতবাটি নির্মাণ করে দেন। পরে সাঁওতা থেকে পুরো পরিবার লাহিনীপাড়ায় উঠে আসে। মীর জোলফেকার আলীর পুত্র সন্তান ছিল না। দুই কন্যা ভরণ নেসা ও থরণ নেসা। মীর মোয়াজ্জেমের বিবাহ জেন্নাতুল্লাহর কন্যা দৌলতন নেসার সঙ্গে (১২৫৫)। গ্রাম কাশিমপুর, পরগনা বিরাহিমপুর। বিরাহিমপুর পরগনার মালিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। (বিরাহিমপুর পরগনা থেকে ঠাকুর পরিবার বছরে ৩১/৩২ হাজার টাকা খাজনা পেতেন)। দৌলতন নেসার গর্ভে ১৮৪৭ সালে ১৩ নভেম্বর লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম। মীর জোলফেকার দ্বিতীয় বিবাহ করেন। দ্বিতীয় পক্ষের কন্যা শুকরণ নেসার সাথে ফরিদপুরের পার গেরদা গ্রামের গোলামাজমের বিবাহ। উল্লেখ্য তরফ সাঁওতার হিস্যা-অসিয়ত নামায় মীর জোলফেকার ও মীর মোয়াজ্জেমকে মীর এবরাহিম দান করেন। এছাড়া পদমদির বাটি, তালুক জমাজমি, পুস্করণী মীর মোয়াজ্জেমকে সমুদয় দানপত্র লিখে দেন। জামাই গোলামাজম মূল অসিয়তনামা জাতিয়াতী করে মোয়াজ্জেম হোসেনকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে ফেলেন এবং মীর মোয়াজ্জেম প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেন। চার বছর বয়সে মশাররফের হাতেখড়ি দেন লাহিনীপাড়ায় মুন্সী জমির উদ্দিন। এরপর জগমোহন নন্দির পাঠশালায় ভর্তি। ১২ বছর বয়েসে পদমদি নবাবের স্কুলে ভর্তি। মাস্টার বাবু নবীনচন্দ্র্র মহিন্থা। স্কুলঘর আটচালা, পাকা গাঁথুনীর দেয়াল, খড়ের ছাউনি। পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য কৃষ্ণনগরে গমন। কৃষ্ণনগরে আই এ পড়ার কালীন নাদীর হোসেনের কন্যা আজিজন নেসার সাথে বিবাহ (নাদীর হোসেন তার সুন্দরী কন্যাকে দেখিয়ে বিবাহ দেন কুৎসিত কন্যা আজিজন  নেসার সাথে)। মশাররফ প্রথমে পদমদি এস্টেটের ম্যানেজার। পরে টাঙ্গাইল দেলদুয়ারে করিমন নেসা এস্টেটের ম্যানেজার। দ্বিতীয় বিবাহ কুলসুম ডাকনাম কালী। শেষজীবনে মশাররফ পদমদিতে ফিরে আসেন। স্ত্রী বিবি কুলসুমের সাথে বসবাস করেন। পদমদিতে বিবি কুলসুম দেহত্যাগ করেন। মীরের কথায়------

তেরশত ষোল সাল ছাব্বিশে অঘ্রাণ

রবিবার প্রাতে প্রাণ করিল প্রয়াণ

পতিগত প্রাণধানি পতিসহ আসি

পদমদির মৃত্তিকায় রহিলেন মিশি।

ভাই ভগ্নি যেই হও ক্ষণিক দাঁড়াও

আত্মার কল্যাণে তার অশিষ দিয়ে যাও।


বিবি কুলসুমের মৃত্যুর ২ বছর পর ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর মোশাররফ ইহলোক ত্যাগ করেন। দুটি মাজার পাশা-পাশি কালের স্বাক্ষী। স্মৃতি রক্ষার্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতিকেন্দ্র। মনোরম পরিবেশে পল্লীর ছায়াঘেরা পদমদি বাংলার মানুষের এক শান্ত নিবাস।

ড. কাজী মোতাহার হোসেন

কাজী মোতাহার হোসেনকাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা সনজিদা খাতুন লিখিত ‘কাজী মোতাহার হোসেন’ পুস্তুকটির দুইপৃষ্ঠা উল্টাতেই বড় আকারের লেখা ------‘ডানা মেলে ওড়া’ পর্বে তিনি উল্লেখ করেছেন কাজী মোতাহার হোসেন স্বপ্নে হাত নেড়ে উড়ে কখনো আম গাছের উপরে কখনো বাঁশের ডগায় যেয়ে বসতেন। অনেকে বলে স্বপ্নে উড়া নাকি বদনসিবের লক্ষণ। কাজী মোতাহারের ক্ষেত্রে বদনসিবের কোনো লক্ষণ কখনো দেখা যায়নি। বরং যে স্বপ্ন তিনি লালন করতেন তাঁর সুদীর্ঘ জীবন প্রয়াসে সে স্বপ্নের সকল বাস্তবায়ন দেখতে পাই। তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের আর্শীবাদপুষ্ট, জনমানুষের হৃদয়ের মণি, প্রাজ্ঞাজনের গুরু। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে আদর করে বলতেন-----‘আমার মোতিহার’।

কাজী মোতাহার হোসেনের জন্ম ৩০ জুলাই ১৮৯৭ সালে তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালি থানার লক্ষীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে। তাঁর পিতার বাড়ি বর্তমান রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার বাহাদুরপুর গ্রামে। এ গ্রামের পূর্বের নাম ছিল বাগমারা। কাজী গওহর উদ্দিন ও তসিরণ নেসার চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে মোতাহার হোসেন ছিলেন সবার বড়। বাবা গওহর উদ্দিন প্রথমে সেটেলমেন্ট আমিন, পরে হেড আমিন এবং শেষে আমিনদের ইনসপেক্টর হয়েছিলেন। জরিপের কাজ সারা বছরব্যাপী হত না। ছয়মাস কাজ হত আর বাকি ছয়মাস তিনি বাড়িতেই থাকতেন। এই অবসরে তিনি বাড়ির পাঠশালায় শিক্ষকতা ও গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি ছিলেন সৎ নিষ্ঠাবান। তবে সংসার স্বচ্ছল ছিল না। চিরকাল তাঁকে দারিদ্রের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। মোতাহার হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়-----তিনি যখন যশ, খ্যাতি আর স্বচ্ছতার মধ্যে এসেছেন তখনও তিনি অতীত দিনের দারিদ্রের কথা ভোলেননি। আমি গরিবের ছেলে এ কথা বলতে তাঁর মনে কখনো দ্বিধা সংকোচ জাগেনি। তবে অর্থের দারিদ্রা থাকলেও পরিবারটির বিদ্যার দারিদ্র ছিল না।

কাজী মোতাহার হোসেন অত্যান্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। গ্রামের পাঠশালায় অধ্যায়নের পর তিনি সামান্য দূরের সেন গ্রামের উচ্চ প্রাইমারী বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সকল বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৭/১৮ বছর বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯১৬ সালে পূর্ববাংলা আর আসামের মিলিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ১৫ টাকা বৃত্তি পান। তিনি প্রাইমারী পরীক্ষার পর কুষ্টিয়ায় লেখাপড়া করেন এবং কুষ্টিয়া থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। কলেজের পরিবেশ ভালো না লাগায় দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় রাজশাহী কলেজে চলে আসেন। ১৯১৭ সালে বিজ্ঞান শাখা থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। এই বৃত্তিগুলোই তাঁর শিক্ষালাভকে নিশ্চিত করে। ১৯১৭ সালে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য ঢাকা আসেন। ঢাকা কলেজ তখন নামিদামী কলেজ। যার ঐতিহ্য আজও বিদ্যামান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী এখানে বিএ, বিএসসি, এমএ, এমএসসি পড়ানো হত। ১৯১৯ সালে বিএ অনার্স পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ আর আসাম অঞ্চলে প্রথম হয়ে তিনি ৩০টাকা বৃত্তি পান। তখনকার দিনের ৩০ টাকা  এখন প্রায় ১৫ হাজার টাকার সমান।

(তখনকার দিনে ১৫ টাকায় ১ ভরি সোনা পাওয়া যেত যার মূল্য বর্তমানে ২৪/২৫ হাজার টাকা) তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স আর সহযোগী বিষয়ে বিজ্ঞান পড়লেও আবশ্যিক বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলেন বলে ডিগ্রিটা বিএসসি না হয়ে বিএ হয়েছিল। তখন এরকম ব্যবস্থাই ছিল। বৃত্তির টাকাটা তিনি নিজে খরচ করতেন না। গ্রামে তখন তার বাবা অসুস্থ। তাই টাকাটা বাবাকে পাঠিয়ে দিতেন। ছুটির সময়ে বৃত্তি পাওয়া যেত না তখনকার দিনে। তাই বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য স্কুলে শিক্ষাকতার কাজ নিতে হত তাঁকে।


১৯১৯ সালে একবার দৌলতপুর মোহসীন স্কুলে ৫০ টাকা বেতনের চাকরি নিয়েছিলেন। ১৯২১ ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মোতাহার হোসেনের পরীক্ষার ফল বের হয়নি। এ সময়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ডেমোনেস্টেটর হিসাবে যোগ দেন। ফল বের হলে তিনি প্রভাষক পদ লাভ করেন। ১৯২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে সহকারী প্রভাষকের পদ লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে এমএ পাশ করেন। পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান এই তিন বিভাগেই তিনি শিক্ষাকতা করেন। পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে সান্নিধ্য লাভ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের বোসন পার্টিক্যাল বা বোস তত্বের আবিস্কার কর্তা। পরিসংখ্যানবিদ্যা শিখতে গিয়ে তিনি প্রফেসর প্রশান্ত চন্দ্র মহলনিবিশের স্নেহ ও সান্নিধ্য লাভ করেন। পরিসংখ্যান আজ শিক্ষার প্রায় সকল স্তরে পঠন পাঠনের ব্যবহারের পৃথিকৃৎ কাজী মোতাহার হোসেন।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগ পুনর্বিন্যস্ত হয়ে গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ গঠিত হলে এর রিডার ও বিভাগীয় প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করেন। ১৯৫০ সালে ডিজাইন অব এক্রিপেরিমেন্টাল বিষয়ে গবেষণা করে তিনি পিএইচডি (১৯৫০) ডিগ্রি লাভ করেন। এই অভিসন্দর্ভের অন্যতম পরীক্ষক স্যার রোনান্ড ফিসার তাঁর গবেশণা কাজের বিশেষ প্রশংসা করেন। এই অভিসন্দর্ভতে  তৎকর্তৃক গবেষণা কর্মে এক নতুন পদ্ধতির নির্দেশনা আসে যা ‘হুসেনস চেইন রুল’ নামে অভিহিত। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। পূর্ববাংলায় তথ্যগণিতের বা সংখ্যা তত্ত্বের চর্চা শুরু হয়। তথ্য গণিত নামটি কাজী সাহেবের নিজের দেওয়া। এদেশের তথ্য গণিতের তিনিই পিতা। ১৯৫৬ সালে তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর পদে উন্নিত হন। ১৯৬১ তে নিয়মিত অধ্যাপনার কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এই বছর পরিসংখ্যান বিভাগের সুপার নিউমাবি অধ্যাপক পদে রত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অব স্টাটিসটিক্যাল রির্সাস এন্ড ট্রেনিং এর পরিচালক (১৯৬৪-১৯৬৬) নিযুক্ত হন। ১৯৬৯ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক এমেরিট্যাস প্রফেসর পদের সম্মান লাভ করেন। প্রবন্ধ সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমী পুরুস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সম্মান জানাবার জন্য তাঁকে ডক্টর অব সায়েন্স বা ডিএসসি ডিগ্রী দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক মর্যাদায় ভূষিত হন।

শিক্ষক, গণিতজ্ঞ, পথনির্দেশক, দাবাগুরু এতসবের পরেও তার বড় পরিচয় তিনি সাহিত্যিক ও সমাজের পথ নির্দেশক। ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যে তাঁর অনুরাগ ছিল। সাহিত্যে হাতেখড়ি কুষ্টিয়া হাইস্কুলের পড়ার সময়ে ‘দামোদরের কন্যা’ বিষয়ে একটি রচনা লেখেন। ‘গ্যালিলিও’ তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা। এটা সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র তখন তাঁর লেখা ‘সুন্দর’ নামে একটি প্রবন্ধ ঢাকা কলেজ বার্ষিকীতে ছাপা হয়। এরপর তিনি লিখতে থাকেন। লেখালেখির প্রাথমিক অবস্থায় গল্প ও কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল। সে পথে না যেয়ে তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন সামাজিক প্রবন্ধ রচনায়। এর উদ্দেশ্য ছিল আমরা কোথায় আছি তা বোঝাবার চেষ্টা এবং পাশাপাশি পথ নির্দেশের ইঙ্গিত। জাতি ধর্ম নির্বিশেষ সকলকে সমাজ বিকাশের নিত্য নতুন ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করতে হয়। তা না হলে জাতি ভ্রম ও বিচ্যুতির আবর্তে নিপতিত হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, চিন্তক পথ নির্দেশের ইঙ্গিত দেন। কেবল আত্মপ্রত্যয়ের আনন্দ নয় লেখকের যে একটা সামাজিক দায়িত্ব আছে যা থাকতে হয় প্রতিকূল সময় ও পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়েও লেখক জীবনের সূচনাপর্বে তিনি এই সত্যটিকে আত্মস্থ  করেই দৃঢ় প্রত্যয়ে কলম ধরেছিলেন। এক ভিন্ন উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বলেছেন-------

‘আমার চিন্তা, কর্ম এবং লেখা জীবনের একটা অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল। এতে সফলতা যতটা না হোক একটা আদর্শ অনুসরণের সহজ আনন্দ যেন পেতে লাগতাম। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা অল্প আশা রইল যে আজকের ক্ষীণ আলো ভবিষ্যতে শক্তি সঞ্চয় করে যখন প্রখর পূর্যে পরিণত হবে তখন আর তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো থাকবেন। (লেখক হওয়ার পথে-সঞ্চরণ)। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ সঙ্কলন সঞ্চরণ রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ প্রশংসা পায়। শরৎচন্দ্র, মোহিতলাল মজুমদার, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, কাজী আবদুল ওদুদ এঁরাও মোতাহার হোসেনের লেখার অনুরাগী ছিলেন। সঞ্চারণ প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ অভিমত ব্যক্ত করে লেখেন যে-------


আপনি বিচিত্রভাবে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষার রুপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলো আপনার সঞ্চরণ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি। আপনার বলবার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা সাধুবাদের যোগ্য। সাহিত্য পথে আপনার অধ্যাবসায় জয়যুক্ত হোক এই কামনা করি।

কাজী মোতাহার হোসেন মূলত মৌলিক চিন্তাশ্রয়ী প্রাবন্ধিক হিসেবেই পরিচিত। চিন্তার মৌলিকত্ব, বক্তব্যের ঋজুতা ও প্রকাশভঙ্গীর প্রাঞ্জলতা তাঁকে এক ব্যতিক্রমী মননশীল সাহিত্য শিল্পীর মর্যাদা দান করেছে। তাঁর সমাজ ও সংস্কৃতিক বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বেশ কয়েকটি শিখা পত্রিকা ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ এর সাহিত্য বাসরের জন্য রচিত হয়েছিল।

নজরুল চর্চার সেই প্রথম পর্বেই প্রকাশিত হয় মোতাহার হোসেনের লেখা ‘নজরুল কাব্য পরিচিত’ (১৯৬৫)। এর পূর্বে ১৯৫১ তে প্রকাশিত হয় ‘সেই পথ লক্ষ্য করে’। প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’ অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ তে।  কাজী আশরাফ মাহমুদের বেশ কয়েকটি হিন্দি কবিতার বই এবং হযরত দাতা গঞ্জাবক্সের জীবনী ১৯৬৮ তে প্রকাশিত হয়। এছাড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেশ কিছু পাঠ্যপুস্তক তিনি রচনা করেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য তথ্য-গণিত (১৯৬৯), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস (১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান (প্রথম ১৯৭৫)। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান পঠন পাঠনের তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সমর্থক। এ বিষয়ে প্রফেসর সত্যেন বসু ছিলেন তার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। মূলত প্রাবন্ধিক ও সমালোচক হলেও মোতাহার হোসেন কিছু কবিতা রচনা করেছেন। আব্দুল হক ও আবুল আহসান চৌধুরীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমী থেকে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর রচনাবলী। এর বাইরে ও তাঁর বেশ কিছু ইংরেজি বাংলা রচনা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। ধর্ম, সমাজ, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক বহু প্রবন্ধ রচনায় সুস্থ মনন ও পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের পরিচয় উৎপন্ন হয়েছে। ‘অসীমের সন্ধানে’এ প্রবন্ধটি আমাদের সময়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে ছিল। প্রবন্ধটি একাগ্রতার সাথে পাঠ করে মহাকাশকে নিয়ে আমার মধ্যে যে কৌতুহল জেগেছিল তারই ফলশ্রুতিতে হয়ত আমি আজ রচনা করতে পেরেছি ‘মহাবিশ্বের স্বরুপ শুরু ও শেষ’, ‘সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞান’ ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ।

মুসলমানদের উদারনৈতিক চেতনার অভাবে তারা শিল্প ও সাহিত্য চর্চায় পিছিয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে আধুনিক ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা চেতনায় আড়ষ্টতা দেখা দেয়। ১৯২৬ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন গড়ে ওঠে কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আব্দুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের প্রচেষ্টা ও প্রেরণায়। বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীনচর্চা ও বুদ্ধির মুক্তি ছিল তাদের কাম্য ও লক্ষ্য। শিখাগোষ্ঠী নামে এই দলের মূল বক্তব্য ছিল-----‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ আবদুল ওদুদকে বলা হত শিখা সমাজের মুস্তস্ক, আব্দুল হুসেনকে অঙ্গ-প্রতঙ্গ মোতাহার হোসেনকে এর হৃদয়। এই মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক মুখপত্র শিখার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের সম্পাদক ছিলেন মোতাহার হোসেন। এই আন্দোলনের প্রসঙ্গ ও পরিণতি নিয়ে মোতাহার হোসেন তার এক মূল্যায়নে বলেছেন-----

‘যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এক গোঁড়া শাস্ত্রাচারে আবদ্ধ প্রগতিবিমুখ সমাজের সঙ্গে লড়েছিলাম, তা যে অনেকখানি সার্থক হয়েছে আজকের প্রগতিশীল বাংলাদেশের সমাজ দেখে তা বোঝা যায়।’ সাহিত্য সংস্কৃতির সূত্র ধরে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। সখ্যতা ধীরে ধীরে সৌহার্দ এবং শেষে পরম আত্মীয়ের পর্যায়ে পৌঁছে। নজরুলের ঢাকাবাসের দিনগুলো কাটে মোতাহার হোসেনের বাসায়। কবি তাকে সম্মোধন করে ডাকতেন আমার মোতিহার (মূল্যবান মোতি দ্বারা কণ্ঠহার)। নজরুল ঢাকায় যে বিদুষী ফজিলাতুনন্নেসার সঙ্গে প্রণয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াসী হন তারও মাধ্যম ছিলেন মোতাহার হোসেন। তাঁকে লেখা নজরুলের চিঠিপত্রে এবং মোতাহার হোসেনের স্মৃতি কথায় উভয়ের গাঢ় সম্পর্কের পরিচয় মেলে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর ছিল বিশেষ ঘনিষ্ঠতা। দাবা খেলার সূত্রে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মালেও সাহিত্য আলোচনাতেও তা প্রসারিত হয়েছিল। আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়-----‘শরৎ সাহিত্যে মুসলিম চরিত্র চিত্রণ বিশেষ করে তাঁর মহেশ গল্পটি মোতাহার হোসেন এর সঙ্গে আলাপচারিতার ফসল।’ আজকের দিনে মুসলমান সমাজে নারী পুরুষের গান-বাজনা, খেলাধুলা, ভ্রমণ ইত্যাদিতে বাধা নেই। কিন্তু মোতাহার হোসেন এর কালে মুসলমান সমাজে এরুপ আনন্দ কোলাহল হাসি খুশীর অভাব ছিল। নন্দ ও মুসলমানগৃহ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-------


পাতার নিচে কী সুন্দর মর্মর শব্দ হয়। ভোরবেলা পাখির গানে আনন্দের সুর। আর আমরা পৃথিবীর সেরা জীব হয়ে জীবনের ভিতরে আনন্দের ছন্দ তৈরি করতে পারি না কেন? প্রাণ খুলে আনন্দ করতে পারলেই সমাজ প্রাণময় হয়, গৃহে আনন্দের ফোয়ারা ছোটে আর মন সবল ও সচেতন হয়। বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই মিলে খোলামেলা আলাপ করতে পারলে জীবন সহজ হয়। কিন্তু মুসলমান ঘরের হালচাল কী? বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই মিলে মুসলমান আনন্দ করবে না, ছবি আঁকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে মেয়রা কেবল রাঁধবে বাড়বে, মুসলমান বাপের সামনে হাসবেন না বড় ভাইয়ের সঙ্গে খেলবেন না, গুরুজনের অন্যায় কথার প্রতিবাদ করবেন না এমন কি কচি ছেলেরা মার খেলেও চেঁচিয়ে কাঁদবেন না।

সেকালের অবস্থা এমনই ছিল। মোতাহার হোসেন ব্যক্তিগত জীবনে এ অচলায়তন ভেঙ্গেছেন। তার পারিবারিক জীবনে উদার নৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল। তিনি এদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ। দাবা খেলায় তিনি অনেক প্রশসংসা পেয়েছেন। চিঠি লিখে ভারতবর্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে দাবা খেলতেন। একে বলে করেসপন্ডেস চেস। দক্ষিণ আফ্রিকান করেসপন্ডেস চেস চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯২৫ সালে কলিকাতা জাতীয় দাবা খেলাতেও তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। সমগ্র ভারতবর্ষে তিনি ৭ বার চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন গড়ে তোলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি দাবা ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের দাবার ক্ষেত্রে তিনি দাবা গুরু বলে পরিচিত হন। বাংলাদেশে প্রতিবছর কিউএম হোসেন দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এদেশে রানী হামিদ, গ্রান্ড মাস্টার নিয়াজ মোরশেদ খুব পরিচিত নাম। বাংলাদেশে দাবা আন্তর্জাতিক সুনাম বয়ে এনেছে। নিয়াজ মোরশেদের মেধা অনেক আগেই কাজী সাহেব সনাক্ত করেছিলেন। দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি বরাবরই যুক্ত ছিলেন। সকল প্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার, অন্যায়, অন্যায় বিচার, সাম্প্রদায়িকতা, রক্ষণশীলতা, প্রতিক্রীয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন তাঁকে নিবৃত করতে পারে নাই। রাষ্ট্রভাষা, ভাষা সংস্কার, হরফ পরিবর্তন, রবীন্দ্র বিরোধিতা, সংবাদপত্র সংকোচন এসকল বিষয়ে সঠিক বক্তব্য রাখতে কখনো তিনি দ্বিধান্বিত হন নাই। রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে তার মতামত ছিল সরল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একমাস পরেই তিনি রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা সমস্যা প্রবন্ধে লেখেন------

পূর্ব পাকিস্তানের রাজভাষা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়াতে স্বাভাবিক ও সমীচীন কোনো কোনো পরমুখাপেক্ষী বাঙালীর মুখে ইতিমধ্যেই উর্দুর ঝনাৎকার শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এদের বিচার বুদ্ধিকে প্রশংসা করা যায় না। এসকল উক্তি কলের মানুষের অপুষ্ট মনেরই অভিব্যক্তি। এতে বাঙালির জাতীয় মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে, তার ফলে এই দাঁড়াবে যে বাঙালি হিন্দু মুসলমান ইংরেজ রাজের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে অমনি পাঞ্জাব সিন্ধু বেলবী রাজের কবলে পড়বে।’ ঐ একই প্রবন্ধে উর্দুভাষীদের সতর্ক করে দেন এই বলে------বর্তমানে যদি গায়ের জোড়ে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষা রুপে চালাবার চেষ্টা করা হয় তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধুমায়িত অসসন্তোষ বেশিদিন চাপা থাকতে পারে না। শিঘ্রই তাহলে পূর্ব পশ্চিমের সীমান্তের অবসান আশঙ্কা আছে। মোতাহার হোসেনের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এসব মতামতই ইতিহাসের পথ বেয়ে বাস্তবে রুপ নেয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফলে পশ্চিম-পাকিস্তানিদের থেকে পূর্ববাংলার যে চির বিচ্ছেদ ঘটে তার মূলের দিকে লক্ষ্য করলে ভাষা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে সে সময় যে অধ্যাপক সমিতি গঠিত হয় তার সভাপতি থাকেন কাজী মোতাহার হোসেন। ভাষা সংস্কার প্রশ্নেও তাঁর ভূমিকা ছিল স্পষ্ট, দৃঢ় ও যুক্তিপূর্ণ। বাংলা ভাষা ও সমস্যা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----

পণ্ডিতদেরই হোক, সমাজ পতিদেরই হোক অথবা রাজনীতিবিদদেরই হোক কারো নির্দেশমত ভাষার কোনো স্থায়ী সংশোধন বা সমৃদ্ধি লাভ হয় না বা হবে না। এরুপ অবাঞ্চিত ও আত্মঘাতি হস্তক্ষেপের ফলে দেশবাসীর চিন্তাশক্তিতে বাধা পড়বে। ভাবে স্বাধীনতা ব্যবহৃত হবে। ভাষার স্বাচ্ছন্দ জনিত আনন্দের অভাব হবে। ১৯৫৩ সালের ২৭-২৮ ফেব্রয়ারি ও ফেব্রয়ারি ও ১ মার্চ শান্তি নিকেতনে অনুষ্ঠিত সাহিত্য মেলায় মোতাহার হোসেন পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। এই মেলায় তার উদার ও মুক্তমনের বক্তব্য পশ্চিমবেঙ্গর সুধী সমাজ ও পত্র পত্রিকায় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এ প্রসঙ্গে কলিকাতার প্রগতিশীল সাহিত্যপত্র নতুন সাহিত্য এর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল।


মোতাহার হোসেন অনেক সরল পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যের মধ্যে একটা মূল কথা ঘোষণা করে গেলেন। যেটা মনে থাকবে সকলের। তার বক্তব্যে হুঁশিয়ারী ছিল সাহিত্যে হিন্দুকরণ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন----‘জলকে পানি বলে উল্লেখ করলে সাহিত্যের জাত যাবে না। জাত যাবে যদি জলচৌকিকে পানিচৌকি, পানি পথকে জলপথ, জলযোগকে পানিযোগ, জলপানিকে পানিপানি বা পানিপানিকে জলপানি করা হয়।’ মোতহার হোসেন কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই নয় ১৯৬১ সালে প্রতিকূল পরিবেশের মধেও তিনি রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালের বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধন্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৭১ সালের মার্চে বিভিন্ন সভা সমিতিতে তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীকার সংগ্রামের স্বপক্ষে বক্তব্য পেশ করেন।

ধর্মের পরিচিতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটলেও পূর্বপাকিস্তানি মুসলমানদের মধ্যে আবহমানকাল ধরে বাঙালি সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান। কেবল ধর্মের গণ্ডীর মধ্যে তাদের আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় এ বিষয়টি মোতাহার হোসেন বিশেষভাবে অনুভব করতেন। প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাপতি হিসেবেও তিনি বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন। এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ১ লা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানিয়ে ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে বিবৃতি দেন। এই সংগঠনের উদ্যোগে ও মোতাহার হোসেন এর সভাপতিত্বে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির উপর যখনি কোনো হামলা এসেছে তিনি তখনি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রগতি ও বাঙালি সংস্কৃতির স্বপক্ষে তিনি আজীবন ভূমিকা পালন করে গেছেন। এসব কারণে পাকিস্তান আমলে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁকে সরকারের বিরাগভাজন হতে হয়।

পৃথিবীর জ্ঞানী মানুষের বিচিত্র আচরণ লক্ষ্য করা যায় নিউটন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথসহ অনেক দার্শনিক পণ্ডিতের অদ্ভুত আচরণের অনেক গল্প প্রচলিত আছে। মোতাহার হোসেনের কিছু অদ্ভুত ধরনের গল্প আছে, যেমন----মোতাহার হোসেন ইউনিভার্সিটিতে তার কন্যা সানজিদা খাতুনের সামনাসামনি পড়ে গেলে তাকে বিনীতভাবে সালাম দিতেন। কন্যা বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে নালিশ করল যে বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাথে দেখা হলে হাত তুলে সালাম দেয়। স্ত্রী স্বামীকে বকা দিয়ে বললেন নিজের মেয়েকে কি কেউ সালাম করে? উত্তরে মোতাহার হোসেন বলেছিলেন কী করবো চেনা-চেনা মনে হল তাই। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একটি লেখা থেকে জানা যায়। ড. মোতাহার হোসেন একবার চাকরি থেকে ফিরে এসে তিনি সেগুন বাগিচার তার নিজের বাসা হারিয়ে ফেলেন। তারপর পথচারিকে জিজ্ঞাসা করেন ভাই ড. মোতাহার হোসেন এর বাসা কোনোটা? ১৯২০ সালে ছাত্র অবস্থায় থাকাকালীন হুগলীর মেয়ে কলকাতাবাসী সাজেদার সঙ্গে মোতাহার হোসেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী সাজেদার বাসায় উর্দু চল ছিল বাংলার চেয়ে বেশি। খুলনার মেয়ে মোসলেমার প্রভাবে সাজেদা বঙ্কিমচন্দ্রের রাধারানী ও যুগলঙ্গুরীয় এই দুই উপন্যাসে উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর সাত মেয়ে ও চার ছেলের মধ্যে দুই ছেলে স্কুলজীবনেই মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে যোবায়দা কর্মজীবনে ইংরেজির অধ্যাপিকা ছিলেন। মেঝ-কন্যা ওবায়েদা সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অন্য মেয়েদের মধ্যে সানজিদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর। তিনি রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও বরীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে পরিচিত। আর এক মেয়ে ফাহমিদা খাতুন ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং উঁচুমানের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। ছোট মেয়ে মাহমুদা চিত্রশিল্পী ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন মাসুদ রানা সিরিজের লেখক এবং রহস্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। ছোট ভাই কাজী মহাবুব হোসেনও ইংরেজি এ্যাডভেঞ্চারের অনুবাদক হিসেবে পরিচিত। কাজী আনোয়ারের সেবা প্রকাশনী থেকে তাঁদের বই প্রকাশিত হয়।

রাজবাড়ি জেলার মাটিতে জন্ম নেওয়া ড. কাজী মোতাহার হোসেন দেশ ও জাতির জন্য যে অবদান রেখে গেছে সে কারণে তিনি সকলের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়। নিরহঙ্কার, আপনভোলা, বিদ্বান ও গুণী এ মন্তব্য ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর। অন্নদাশঙ্কর রায়ের পর্যবেক্ষণে, ‘বরাবরই তিনি একজন উদারমনা মুসলমান ও সেই সঙ্গে দেশপ্রাণ বাঙালি এবং সকলের উপর একজন সৎ মানুষ।’


শান্ত স্বভাব ও সৌম্যদর্শন এ মনীষী জ্ঞানচর্চাতেই জীবন কাটিয়েছেন। মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিপন্থায় নিবেদিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে নিষ্ঠাবান ধর্মচারী। রোজা, নামাজ, হজ্ব পালনে শৈথিল্য ছিল না। আবুল আহসান চৌধুরীর ভাষায়------‘মোতাহার হোসেন এর জীবন থেকে খুব প্রাসঙ্গিক খুব জরুরি একটা শিক্ষা পাই যে, প্রকৃত ধর্মচর্চার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ এই মনীষী ১৯৮১ সালে ৯ অক্টোবর পবিত্র ঈদুল আজাহার দিনে ৮৫ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন আজকের দিনে জাতি তমসা কাটিয়ে সুষ্ঠু জ্ঞানচর্চায় অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। শিল্প সাহিত্য অর্থনীতি, সমাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ উন্নতির স্বাক্ষর রেখে চলেছে। অনেক সাধকের ভিড়ে শান্তশিষ্ঠ শ্মশ্রুমণ্ডিত আমাদের মোতাহার হোসেন উজ্জ্বল মুখটির হাঁসির আভায় আমরা প্রতিনিয়ত স্নাত হব। কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা অমঙ্গল এবং সকল পশ্চাৎপদতা পিছনে রেখে তাঁর আদর্শে সদা অনুপ্রাণিত হয়ে উঠব।

কাজী আব্দুল ওদুদ

কাজী আব্দুল ওদুদসমাজ, সাহিত্য, চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে কাজী আব্দুল ওদুদের অসামান্য অবদানের পূর্বে তাঁর পরিচয়টুকু গ্রহণ করা যাক। ১৮৯৪ সালের ২৬ এপ্রিল রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার মাগমারা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী সগীরউদ্দিন। কাজী সগীরুদ্দিন ছিলেন রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার। ১৯১৩ সালে কাজী আব্দুল ওদুদ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯১৫ ও ১৯১৭ তে কলিকাতা প্রেসিডিন্সী কলেজ থেকে যথাক্রমে আইন ও বিত্র পাশ করেন। ১৯১৯ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন।

প্রেসিডেন্সী কলেজে ছাত্রকালীনে তিনি মাতুল কন্যা জমিলা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯২০ তে ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজে বাংলার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পর কলিকাতায় বদলি হন এবং সেখানে শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টরের অধীনে টেক্সট বুকস কমিটির সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। এই পদ থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে নবপর্যায়ে প্রকাশিত তরুণ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯২৬ খ্রি. ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। তিনি ছিলেন সমিতির অন্যতম স্তম্ভ ও নেতা। সাহিত্য সমাজের পত্রিকা ‘শিখায়’ (১৯২৭) মুক্তচিন্তা ও যুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন লেখার জন্য নওয়াব পরিবার কর্তৃক নিগৃহীত হয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং কলিকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন (১৯৪০’রপর)। ন্যায়নিষ্ঠা উদার ও দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য তিনি খ্যাত। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসা সমিতির প্রধান উদ্যোক্তা এবং কবির চিকিৎসার জন্য অর্থসংগ্রহসহ চিকিৎসার কাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯ মে ১৯৭০ কলিকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

কাজী আব্দুল ওদুদ শিক্ষক, সাহিত্যিক, সমাজসচেতক, সাংবাদিক এবং সর্বোপরি মুসলীম সমাজের নবচেতনার উম্মোচনকারী বলা যায়। মুসলমান সাহিত্যিক হিসেবে মীর মশাররফ হোসেনের অনেক পরে তাঁর আবির্ভাব তবে কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজী ইমদাদুল হক, এস ওয়াজেদ আলীর উত্তরসূরী কাজী আব্দুল ওদুদ। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৮), ‘মীর পরিবার’(গল্প) (১৯১৮), ‘রবীন্দ্রকাব্যপাঠ’ (১৩৩৪), ‘হিন্দু মুসলমানের বিরোধ’ (১৯৩৬, ‘কবিগুরু গ্যাটে’ দুইখণ্ডে সমাপ্তি (১ম খণ্ড ১৩৬৯ ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৩৭৬), ‘সমাজ ও সাহিত্য’ (১৯৩৪) ‘শাশ্বত বঙ্গ’ (১৯১৫), ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ’ (প্রথম খণ্ড ১৩৬৯, ২য় খণ্ড-১৩৭৬), ‘নজরুল প্রতিভা’ (১৯৪৮), ‘পথ ও বিপথ’ ১৩৪৬), ‘মানব বন্ধন’ (১৩৪৮), ‘আজাদ’ (উপন্যাস ১৯৪৮) ‘তরুণ ভুল ও মা’ (ছোট গল্প ১৩৫৫), ১৯৫৬ তে বিশ্বভারতীতে প্রদত্ত বক্তৃতাবলী ‘বাংলার জাগরণ’ নামে গ্রন্থিত হয়ে  ঐ বছরেই প্রকাশ, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় উপর ১৯৫৭ তে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতা শরৎচন্দ্র ও তারপর ১৯৬১ তে পুস্তকাকারে প্রকাশিত।


হযরত মুহম্মদ ও ইসলাম (১৩৭৩) এবং জীবনের শেষ পর্বে কোরানের সুললতি ও প্রাঞ্জল বঙ্গানুবাদ। তাঁর সম্পাদিত ব্যবহারিক শব্দকোষ একখানি জনপ্রিয় বাংলা অভিধান। সাহিত্যচর্চায় কাজী আব্দুল ওদুদের আবির্ভাব তখন, যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরিপূর্ণ আধুনিক হয়ে উঠেছে। ভাষা ব্যবহারে কেতাবী ভাষার পরিবর্তন  এসেছে। অফিসের ভাষা, লেখার ভাষা-মুখের ভাষার মতো সহজ হয়ে উঠেছে। এমন কি সাবেকি সাধু ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যবহার হচ্ছে চলিত ভাষা। সাহিত্যের ক্ষেত্রে দেবদেবী তো নয়ই এবং চরিত্রগুলো চারপাশের দৈনিন্দিন যাপনকারী মানুষের জীবনচরিত্র। এছাড়াও সাহিত্য এসেছে মানবমানবীর প্রেম, এসেছে প্রকৃতি, সমাজ, রাজনীতি। তাই বিশ শতকের সাহিত্য আধুনিকতায় উদ্ভাসিত সাহিত্য বলে পণ্ডিতগণ মনে করেন। বিশ শতকের সাহিত্যের অন্য আর একটি বিশেষত্ব হল এখানে কল্পনার সাথে বাস্তবায়নের প্রয়াস আছে। সহজ কথায় সাহিত্যে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে। ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিকতায় রবীন্দ্রনাথের অবদান অসামন্য। কস্তুত তিনি বাংলা সাহিত্যের ভাবমূর্তি বদলে দেন। তার সাহিত্য জীবনের অর্ধেক কাজ উনিশ শতকে আর অর্ধেক কাজ বিশ শতকে। এ সময়ের মধ্যে সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকেই তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁর কবিতা অনন্য সাধারণ। প্রকৃতি আর আধ্যাত্বিকতার সমন্বয়ে কবিতা মানবচেতনার বিচিত্র মাত্রা সংযোজিত করে। যে কথাসাহিত্য দিযে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনা বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে এসেছিলেন চোখের বালির মতো উপন্যাস লিখে। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ে আরো সূক্ষ্ণভাবে মানবাচরণ অঙ্কন করতে পেরেছিলেন। তবে তিনি একাই নন আরো বহু সাহিত্যিক এগিয়ে এসেছিলেন সাহিত্যকে নানা ডালপালা; ফুলে ফলে সাজাতে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আত্মপ্রত্যয়ী করেছিল। নানা ঢঙ্গে ও ভঙ্গিতে অজস্র সাহিত্য চর্চা হতে থাকল। শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়, বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, কাজী আব্দুল ওদুদ সাহিত্যক গ্রামজীবন ও সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এলেন। সাহিত্য বিষয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরীর বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। সাহিত্যসেবা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন------

সাহিত্যিক প্রকৃতির কুম্ভকার, তিনি কুম্ভ বিক্রয় করেন না, কুম্ভ নির্মাণ করেন। প্রকৃতির বুকে যে সুষমা আছে, মনোভাবের যে রাগিনী আছে, মানব জীবনের সত্যের যে বিচিত্র বিকাশ আছে, সমুদয় পার্থিব ও চিন্তালেশ শূন্য নির্মল নির্দোষ ক্রীড়ারত হাস্যময় বালকের নাচিয়া বিচিত্র পক্ষ প্রজাপতি ধারার মতো সেই সমস্ত নানা বর্ণের ভাব চিন্তা ও সত্য ধরিয়া তাহার মূর্তি প্রদান করাই তা

কাজী  আব্দুল ওদুদের প্রথম উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’ ১৯১৯ সালে তাঁর ছাত্রজীবনে প্রকাশিত হয়। অপর উপন্যাস ‘আজাদ’ লেখা হয় ১৯৩০ এর দিকে। উপন্যাসই তাঁর যৌবনকালের রচনা। বাঙালি মুসলমান সমাজকে অবলম্বন করে উপন্যাস দুটি গড়ে উঠেছে। ‘নদীবক্ষে’ বাঙালি মুসলমান কৃষক জীবনের কাহিনী এবং ‘আজাদ’ শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সমাজের জীবন চিত্রের রুপায়ন। নদীবক্ষের পটভূমি রাজবাড়ি জেলার কয়েকটি গ্রাম গোয়ালন্দ, ইলিশমারীর চর, পাংশার গ্রাম। সে সময় এ অঞ্চলের দুর্ভিক্ষতাড়িত মানুষ বাদামূল্লুকে (দক্ষিণে বরিশাল অঞ্চল) ধান কাটতে যেত সেসব কথা তার নদীবক্ষে উপন্যাসে এসেছে। নদীবক্ষে মোট তিরিশটি পরিচ্ছেদে সমাপ্ত উপন্যাস। গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজ পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসের মূল চরিত্র রচনা করেছে লালু ও মতির সম্পর্ক। কৃষক লালুর সাথে তার চাচাতো বোন জমির শেখের কন্যা মতির আশৈশব সম্পর্ক। বয়সের সাথে সম্পর্ক প্রেমে রুপ নেয় এবং মিলন সঙ্কেতও পাওয়া যায়। এসব অবস্থায় কৃষিজীবী লালু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফসল ও হালের গুরু হারায়। বাদায় শোরগঞ্জে ধান কাটতে যায়। ফিরে এসে দেখে ইলিশমারীর চরের অবস্থানরত ফটিকের সাথে মতির বিয়ে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে অসুখে ফটিকের মৃত্যু হলে অকালে বিধবা মতিকে পিতার সংসারে ফিরে আসতে হয়। এবার অত্যাধিক পরিশ্রমে লালু অসুস্থ হলে মতি তাকে সেবা শুশ্রুষা করে। লালুর মা অসুখে ভুগে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মরণকালে মা উভয়ের মিলন কামনা করে যান। এরপর মতি তার মামার বাড়িতে গেলে ফিরিয়ে আনার ভার পড়ে লালুর উপর। নৌকায় ফিরতে ফিরতে এক রোমান্টিক অবস্থায় উভয়ের মিলন ঘন্টা বেজে ওঠে। এই হল নদীবক্ষের কাহিনী।  কৃষিভিত্তিক সমাজের পরিবারের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে সহজ সরল বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে নওয়া হয়েছে এ কাহিনী।


এটা বাস্তব জীবনচিত্রের বর্ণনা। নদীবক্ষে উপন্যাসটিতে রবীন্দ্রনাথ আশীর্বাদস্বরুপ লিখেছেন------‘উপন্যাসখানিতে মুসলমান চাষীগৃহস্থের যে সরল জীবনের ছবিখানি নিপুণভাবে পাঠকের কাছে খুলিয়া দিয়াছেন তাহার স্বাভাবিকত্ব, সরলতা ও নতুনত্বে আমি আনন্দলাভ করিয়াছি।’ আজাদ ঘটনাপ্রধান উপন্যাস নয়, সংলাপ প্রধান উপন্যাস। সংলাপে রয়েছে ব্যক্তি ও সমাজের রুচির পরিচয়। মুসলমান সমাজের আরবী ফার্সি সমৃদ্ধ ভাষার ব্যবহার এতে রয়েছে। এছাড়াও এ অঞ্চলের কথাভঙ্গীর পরিচয় পাওয়া যায় যেমন পান্তা ও পেয়াজের নাস্তা, কর্জ করা ইত্যাদি। উপন্যাসের কোনো কোনো বাক্য চমৎকার। যেমন ‘পুরাতন স্মৃতির কি দীর্ঘায়ু, পরমায়ু মোলায়েম অবিশ্বাস, তার হাসিতে। তার অসীম ব্যথার কালো আকাশে এ যেমন ঝকঝকে কটি তারা’ ইত্যাদি। উপন্যাসটি উদীয়মান বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের কাহিনী। কাজী আব্দুল ওদুদের নাট্যপ্রয়াস দুটো যথা ‘পথ ও বিপথ’ এবং “মানব বন্ধু’ পথ ও বিপথ তিন দৃশ্যের নাটক যেখানে আব্দুল ওদুদের সাহস ফুটে উঠেছে। এ নাটকে বিশ্বাস, ধর্ম, পরকাল, শ্রেণি সংগ্রাম মানবতা, প্রগতি, হিন্দু মুসলমানের বিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তি তর্কের অবতারণা করা হয়েছে।

মানব বন্ধু নাটকখানি দুই অঙ্কের বা দুই দৃশ্যের নাটক। প্রথম দৃশ্য মন্নুজানের শয়নকক্ষ এবং দ্বিতীয় দৃশ্যে মোহসীনের বৈঠকখানা। পাত্র পাত্রিরা হলেন মোহসীন অর্থাৎ দানবীর হাজী মুহম্মদ মোহসীন তাঁর বোন মন্নুজান, বাঁদী মেহের নিগার ও কোতায়ালী রজব আলী, মাধব আলী খাঁ, এ নাটকের মাধ্যমে কাজী আব্দুল ওদুদ মহৎ আদর্শ তথা মহৎ জীবনের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। বিশেষত হাজী মুহম্মদ মোহসীনের উদার জীবনাদর্শের প্রেরণাই উদ্দেশ্য।

মীর পরিবার কাজী আব্দুল ওদুদের ছাত্রজীবনের রচনা। এতে পাঁচটি গল্প সংম্বলিত হয়েছে। বাঙালি মুসলমান সমাজের বিষয়বস্তুই এর উপজীব্য। গল্পের নাম দেখেই তা স্মরণ করা যায্। গল্পগুলো হল  ‘মীর পরিবার’ ‘আশরাফ হোসেন’, ‘করিম পাগলা’, ‘হামিদ ও আবদুর রহিম’। মীর পরিবারে দেখা যায় বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষাদীক্ষায় মনোযোগী হয়েছে কিন্তু আশরাফ আতরাফ পার্থক্য দূর হয়নি। দ্বিতীয় গল্পটি আশরাফ হোসেন নবশিক্ষিত মুসলমানদের সমাজ পরিবর্তনের একটা ধারাকে স্পর্শ করে।

কাজী আব্দুল ওদুদের রচনাবলীর ৪র্থ খণ্ড পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। ওদুদ রচনাবলীর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড সম্পাদনা করেছিলেন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক আব্দুল হক। প্রথম খণ্ডে আছে রবীন্দ্র কাব্যপাঠ, হিন্দু মুসলমান বিরোধ এবং নজরুল প্রতিভা। দ্বিতীয় খণ্ডে বাংলার জাগরণ, কয়েকটি গ্রন্থ সমালোচনাসহ চিঠিপত্র, অভিভাষণ, দিনলিপি ও কয়েকটি ছোট প্রবন্ধ সঙ্কলিত হয়েছে। তৃতীয় খণ্ডে গল্প উপন্যাস, ও নাটক এবং কথাসাহিত্য বিষয়ক আলোচনা, ‘শরৎচন্দ্র ও তারপর’ সন্নিবেশিত হয়েছে। চতুর্থ খণ্ডে কবিগুরু, গেটের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড সন্নিবেশিত হয়েছে। এছাড়া কাজী আব্দুল ওদুদের অপ্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধ, আলোচনা, চিঠিপত্র ও গ্রন্থ সমালোচনা সন্নিবেশ করা হয়েছে। এগুলো বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশ করা হয়।

 বিশ শতকে ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক উৎকর্ষতায় কাজী আব্দুল ওদুদের ভূমিকা অসামান্য। বাংলা সাহিত্য আধুনিক ও বিশ্বমানে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদানের চেয়ে তাঁর অবদান কম নয়। তাঁর সাহিত্যের বিশেষত্ব হল তৎকালীন মুসলিম সমাজের গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতার বিপরীতে সে সমাজে তিনি বাস করেন সে সমাজের মধ্যে জ্ঞানের শিক্ষা প্রজ্জ্বলন করা। ইতিপূর্বে বুদ্ধির মুক্তি তথা মুসলিম সাহিত্য সমাজের কথা বলা হয়েছে। সাহিত্যে আধুনিকতার অর্থ হল সমাজ যেন সমকালীন বিশ্ব ধ্যানধারণার সাথে স্বজাতীয় সাহিত্যের বিলিন ঘটে। এ উদ্দেশ্যে তিনি কবিগুরু গেটের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের পরেই গেটের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ও বিস্তৃত আলোচানা কাজী আবদুল ওদুদই করেন। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে চৈত্র মাসে অনুষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্যসমাজের চতুর্থবার্ষিক অধিবেশনে গেটে শিরোনামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রবন্ধটি আংশিক উদ্ধৃত হল------বলা বাহুল্য গেটের বিরাজ জীবন সাহিত্য সম্বন্ধে এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধটিতে আদৌ সন্তষ্ট হতে পারিনি। গেটে সম্বন্ধে কোনো গ্রন্থ নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলার একালের জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে গেঁটের সম্পর্ক নিবিড়।


গ্যেটের সাহিত্যের বড় পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছি যেমন তাহার জীবন ও সাহিত্য অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু আমার মুখ্য উদ্দেশ্য তাঁর সমৃদ্ধ জীবন স্বদেশীয়দের মাধ্যমে উন্মোচিত করা যে জীবন মনোহর রুপ ধারণ করেছে তাঁর সাহিত্যে। এ বিষয়ে মতভেদের অবকাশ নেই যে একালের মানুষের যে ব্যাপক জীবনবোধ ও বিশ্ববোধ তার এক মহাস্রষ্টা ও দৃষ্টান্ত ছিল এই গ্যেটে। গ্যেটের স্বচ্ছ ও সবল মুক্তবুদ্ধি হয়ত আমাদের দেশকেও সাহায্য করবে। জীবনের দায়িত্ব, প্রতিভা, ধর্ম, স্বদেশ প্রেম, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থ ও যোগাযোগ সব কথাই আরো ভালো করে বুঝতে যেমন আমেরিকার প্রকর্ষ তাঁর প্রভাবে লাভবান হয়েছে। বুদ্ধ, কবির, আকবর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ ভারতের এই পঞ্চ জাগ্রত স্থায়ী আসন লাভ করুন ইউরোপের জাগ্রত আত্ম গ্যেটের উপলব্ধিতে।’

আব্দুল ওদুদ তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরুতেই হযরত মুহম্মদ (সঃ), গেটে ও রবীন্দ্রনাথের জীবন ও আদর্শ নিয়ে তিনটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার সঙ্কল্প গ্রহণ করেছিলেন এবং তা বাস্তবে রুপ দিতেও সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে কবিগুরু গ্যেটে, ১৯৬২ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং ১৯৬৬ সালে হযরত মুহম্মদ ও ইসলাম গ্রন্থসমূহ প্রকাশিত হয়।

কাজী আব্দুল ওদুদ নিজ সমাজ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে স্বজাতীয়দের অগ্রগামী চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাতে যারপরনাই চেষ্টা করে গেছেন। তিনি কেবল বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তকই নন তিনি বাঙালি মুসলমানদের নবযুগের প্রত্যাশার সুত্রপাত করেছিলেন। বৃটিশ আমলে হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মেরই উগ্রপশ্চাৎমুখী মৌলবাদের সহিংস তৎপরতা মাথা তুলতে চেয়েছে। রাষ্ট্রশক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তিরিশের দশকে ঢাকায় বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলন চলার সময় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা কাজী আব্দুল ওদুদ এক সভায় রাজা রামমোহন রায়কে মহাপুরুষ বলে উল্লেখ করায় ঢাকার একদল মোল্লা তার দুই বুদ্ধিজীবী বন্ধুসহ ধরে ঢাকার নবাব বাড়িতে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় তারা মহানবী হযরত মুহম্মদের সম্মানের সমভাষায় রামমোহনকে সম্মোধন করেছেন। এতে মহানবীর অবমাননা করা হয়েছে। নবাব তাদের কাছ থেকে প্রকাশ্য ক্ষমা আদায় করে ছেড়ে দেন। কাজী আবদুল ওদুদ সেই যে ঢাকা ছাড়লেন আর ঢাকামুখী হয় নাই। অথচ তিনি মুসলমানদের চেতনার অগ্রগামিতার জন্য শেষ-জীবন পর্যন্ত বুদ্ধির সাধনা করে গেছেন। কাজী আব্দুল ওদুদ কলিকাতায় নজরুল সাহায্য সমিতি গঠন করেন। এ বিষয়ে পূর্বে  এ গ্রন্থে নজরুল প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।

মোঃ এয়াকুব আলী চৌধুরী

ঊনিশ শতকের শেষে বঙ্গীয় মুসলীম সাহিত্য বিকাশের ধারায় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে অগ্রপথিক বলা হয়। বাংলা সাহিত্য বিকাশে আধুনিকতা বলতে যা বোঝায় তার সমস্ত কৃতিত্বই হিন্দু লেখকদের এ কথা স্বীকার করে নিলেও ঊনিশ শতকের শেষ থেকে বেশ কিছু মুসলিম সাহিত্যিকের আর্বিভাব ঘটে। তাঁদের লেখায় মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার বিপরীতে উজ্জীবনের পরিস্ফুটন ঘটে। মীর মশাররফ হোসেন, মোজাম্মেল হক, কবি কায়কোবাদ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, শেখ ফজলুল করিম, মুন্সি মেহেরউল্লাহ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ডা. লুৎফর রহমান মুসলিম সমাজের চেতনার দিক নির্দেশনা দেন। তাঁদের মধ্যে এয়াকুব আলী চৌধুরীর অবদান অসামান্য। এয়াকুব আলী চৌধুরী গদ্য লেখক। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি এতটাই পারঙ্গম ছিলেন যে, তাঁর ভাষার শক্তিতে পাঠকের মনোজগৎ নবচেতনার দৃঢ়তা অর্জন করে। কেবল সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমেই তিনি নবচেতনার সৃষ্টি করেননি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠন, নিজ বাসস্থান পাংশা থেকে কোহিনূর পত্রিকা প্রকাশ করে তৎকালীন মুসলিম জাগরণে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন।


১৯১১ সালে কলকাতায় মুসলিম সমাজ গঠিত হলে তিনি তাঁর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক নিযুক্ত হন। সমিতির ‍উন্নতির জন্য প্রগাঢ় শ্রম দান করেন। কবি গোলাম মোস্তফা ও এয়াকুব আলী চৌ্ধুরীর যুগ্ন সম্পাদনায় ‘সাহিত্যিক’ নামে  একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল যা এক বছরকাল চালু ছিল। বাংলা সাহিত্যের অবদানে ইতিপূর্বে আলোচিত রাজবাড়ি জেলার সাহিত্যিকবৃন্দের অগ্রভূমিকা রয়েছে। সে সূত্রেই এয়াকুব আলী চৌধুরীর অগ্রজ রওশন আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় সচিত্র মাসিক ‘কোহিনূর’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এয়াকুব আলী চৌধুরী ছিলেন সহ-সম্পাদক। ১৯১১ সালে তিনি কোহিনুর পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯১৯ সালে ভারতে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন শুরু হলে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি ও অগ্রজ রওশন আলী চৌ্ধুরী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে পাংশাতে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেন। বৃটিশ সরকার এয়াকুব আলী চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা দমদম কারাগারে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে কয়েকমাস কারারুদ্ধ ছিলেন।

১৮৮৬ সালে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার পৌরসভাধীন মাগুরাডাঙ্গী গ্রামে এয়াকুব আলী চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম এনায়েত আলী চৌধুরী এবং মাতা মুন্নতুন নেসা। পিতা ছিলেন পুলিশ অফিসার। অগ্রজ রওশন আলী চৌধুরী ছিলেন কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, সমাজসেবক এবং ঐতিহ্যবাহী কোহিনূর পত্রিকার সম্পাদক। এয়াকুব আলী চৌধুরী পাংশা এমই স্কুল হতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি লাভ করেন এবং এই বিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে জুনিয়র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। এরপর তিনি রাজবাড়ি রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে (RSK) ভর্তি হন। এ বিদ্যালয় থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিত্র পর্যন্ত অধ্যায়ন করেন এবং কোর্সও সমাপ্ত করেন কিন্তু চক্ষু রোগে আক্রান্ত হয়ে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারেন না। প্রথম জীবন তিনি চট্রগ্রামের জরওয়াগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউশনে এবং শেষজীবনের পাংশা জর্জ হাইস্কুলে শিক্ষাকতা করে শিক্ষক জীবনের অবসান ঘটান। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম মানস সৃষ্টিতে মীর মশাররফ হোসেনের উত্তরসূরী হিসেবে রাজবাড়ি জেলার সাহিত্য কর্মী আব্দুল ওদুদ, ড. কাজী মোতাহার হোসনে ও এয়াকুব আলী চৌধুরী। সাহিত্যিকের কোনো জগৎ নেই, মানবচেতনাই মুখ্য বিষয়। এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম মানব চেতনার স্পর্শকাতরতার অভাব নেই। তা সত্ত্বেও তাঁর সাহিত্যে একমূখী ধারাটিই মূখ্য হয়ে উঠেছে। কেবল ভাষাশৈলীর ব্যবহারেই নয় বিষয়বস্তুর দিকে থেকে তিনি আঁকড়ে ধরেছেন শাশ্বত মানবের চেতনা যার স্পর্শে ব্যক্তি ও সমাজ সতেজ ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠে। তাঁর রচিত ‘নূরনবী’ ‘ধর্মের কাহিনী’, ‘শান্তিধারা’, ‘মানব মুকুট’, তার প্রমাণ। ধর্মের কাহিনী ১৯১৪ সালে, নূরনবী ১৯১৭ সালে, শান্তিধারা ১৯২২ সালে এবং মানব মুকুট ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। এয়াকুব আলী চৌধুরীর কাল ঔপনিবেশিক শোষণের কাল। পশ্চাৎপদ বাংলার গণমানুষ শিক্ষা, অর্থনীতি আত্মসচেতনতায় বর্তমানের তুলনায় তখন এক অন্ধকার জগতের মানুষ। জাতিগতভাবে হিন্দু মুসলমান কারোরই তেমন অহঙ্কার বোধ নেই। নিস্পৃহতাই তাদের মূল্যবোধ। কেবল বেঁচে থাকাই জীবন। এ সময় এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্য ও সমাজচেতনা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার সাথে সাহিত্যকর্ম কৃষাণের হাতে যেন শক্ত হালের গুঁটি, যাতে নিরস ভূমি সরস হয়, অফলা ভূমি ফসলে ভরে ওঠে। তাঁর সাহিত্য, মানস মুকুরে সঞ্জীবনী সুধা, যা শক্তি ও সাহস যোগায়। মানুষের যা করা উচিত, মানুষ যেন তাই করে। তাঁর সাহিত্য এভাবে গণ্ডীবদ্ধ হলেও কাল বিচারে তাঁর সাহিত্য কর্মের মান অক্ষুণ্ন রয়েছে। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে কোনো সাহিত্যিক সাহিত্যের প্রয়োজন, পরিধি এবং পরিমিতি বোধ সম্পর্কে সজাগ থাকেন। অনেক সাহিত্যিক তাঁর লেখায় সাহিত্যের সরস সংজ্ঞাও প্রদান করে থাকেন। অনেক সাহিত্যিক তাঁর লেখায় সাহিত্যের সরস সংজ্ঞাও প্রদান করে থাকেন। সাহিত্য বিষয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরী বর্ণনা ও ব্যাখ্যা প্রনিধানযোগ্য। সাহিত্যসেবা প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----সাহিত্যিক প্রকৃতির কুম্ভকার, তিনি কুম্ভ বিক্রয় করেন না, কুম্ভ নির্মাণ করেন। প্রকৃতির বুকে যে সুষমা আছে, মানব মনোভাবের যে রাগিনী আছে, মানব জীবনের সত্যের যে বিচিত্র বিকাশ আছে,


সমূদয় পার্থিব ও চিন্তালেশ শূন্য নির্মল ক্রীড়ারত হাস্যময় বালকের নাচিয়া নাচিয়া বিচিত্র পক্ষ প্রজাপতি ধারার মতো সেই সমস্ত নানা বর্ণের ভাব চিন্তা ও সত্য ধরিয়া তাহার মূর্তি প্রদান করাই কাহার কাজ। এই কাজ করিয়াই তিনি সুখ, শান্তি ও তৃপ্তি লাভ কেরন। ইহাই তাহার নেশা, ইহা করিতে না পারিলে কিছুতেই তাহার শান্তি নাই।

বঙ্গ সাহিত্যের মুসলমান লেখক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----

সাহিত্যচর্চা বিলাস পরিতৃপ্তি নহে। সাহিত্য জীবনের সাধনা, সাহিত্য স্বাদ, আরাধনার ধন। এ যে প্রেমের যোগ, কল্যাণের সাধনা। হাওজে কাওসারের সলিলামৃত হইতে নৃত্য করে, আনন্দের মল্লার ইহাতে সর্বদা বাজে। কোটিপতির ঐশ্বর্যগর্ব সাহিত্য সাধনা সুখের সহিত তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। ওকালতি ও ডেপুটিগিরি মহিমা সাহিত্যিকের যশোরশ্মির নিকট পরিম্লান। ইহার অন্তর্নিহিত অমৃত সত্যের আস্বাদ লাভ করিয়া হাফেজ সাদি চির অমর। জামী, ফেরদৌসী অম্লান গৌরব রশ্মিতে চির জ্যোর্তিমান। মিল্টন, মাইকেল মানস মন্দিরে চির জাগরুক। এই ধনে ধনী হইয়াছিলেন বলিয়া কাউন্ট টলস্টয় সকল বিলাইয়া সন্নাসী সাজিয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঋষি হইয়াছিলেন। সাহিত্য জীবনবোধের গভীরে টানে। এ টান যার যত বেশি তিনি তত বড় সাহিত্যিক।’

এ বিষয়টিই এয়াকুব আলী চৌধুরী সুললিত ভাষায় তা তুলে ধরেছেন। সাহিত্য সার্বজনীন ও বৈশ্বিক মানব চেতনার উন্মেষ  ঘটায়। এতদ্বসত্ত্বেও এ বিশ্ব বহুভাষিক ও বহুজাতিক চেতনায় খণ্ডিত। যিনি সাহিত্য রচনা করেন তিনি নিজেও কোনো না কোনো ভাষা বা জাতির অনুগত। এয়াকুব আলী চৌধুরীর বিশেষত্ব হল তিনি নিজ ভাষা ও জাতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি বিশুদ্ধ খাঁটি বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁর লেখন শুদ্ধ সাধু ভাষার প্রয়োগ একশত ভাগ। তিনি আরবী ও ফারসী ভাষা ব্যবহার করেননি। এ সস্পর্কে তিনি লিখেছেন------

ভাষাকে মুসলমানী চেষ্টায় শক্তিক্ষয় না করিয়া বঙ্গ ভাষার ভাবের ঘরে মুসলমানী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা লক্ষগুণ প্রয়োজন। প্রকৃত পক্ষে ইহাই আসল কথা। বাংলা ভাষায় যে সমস্ত শব্দ আমাদের ধর্ম মতের বিরুদ্ধ ভাবসম্পন্ন তাহা আমরা কখনো ব্যবহার করিব না। পক্ষান্তরে যে সমস্ত কাজ আমাদের ভাব প্রকাশের পক্ষে পর্যাপ্ত নহে আমরা তৎপরিবর্তে আরবী বা ফারসী ভাষা অবশ্যই ব্যবহার করিব।

সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তিনি ইসলামী ভাবধারাটিই বিশেষভাবে গ্রহণ করেন। কারণ হিসেবে বলা যায় তুলনামূলক তৎকালীন পশ্চাৎপদ মুসলিম জাতির পুনর্জাগরণই ছিল তাঁর লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। মানুষ সততই সাধারণ। সহযোগিতা, সহমর্মিতা মানুষের অগ্রগামীতার সোপান। প্রেমের জয় প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন-----‘নবী আসিলেন মক্কায়। কোথায় তাঁর গজমতী হাতি? কোথায় তাঁর মানিক-উজ্জ্বল সিংহাসন? সত্য তাঁর সোনাদানা, প্রেম তাঁর মানিক ফল। তাই মানুষের মন তাঁর সিংহাসন। আসিলেন নবী মক্কায়। কত স্বাদের জন্মভূমি। সেখানে কতকাল পড়ে আসিলেন, দেশে ফিরিলেন আজ। মক্কার ঘর দুয়ার খোলা। মক্কায় তিনি রাজা। মক্কায় যতসব লোক তাঁর ভাই। মক্কায় যত লোক, নবী তাদের কী করিলেন? জানের শত্রু তারা; নবী তাদের মাফ করিলেন। তিনি কাঁদিয়া বলিলেন, মক্কার মানুষ এরা সবাই আমার ভাই। এদের কেউ কিছু বলিও না।’ সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের ধারক-----ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান। কোনো বিষয়কেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। জীবন বিকাশের ধারায় বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। কিন্তু ধর্ম চর্চা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া সমাজ নীতি বির্বজিত ভোগবাদী সমাজে পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞানের নানা কৌশলের প্রয়োগে কেবল ধনী ও দারিদ্রের বৈষম্যই নয় হত্যা, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস হয়ে উঠেছে নৈমত্তিক বিষয়। কেবল আইন প্রয়োগ করলেই তার নিরসন হবে না। এর জন্য চাই আত্মশুদ্ধি ও আত্মতৃপ্তি। একজন ধার্মিক ধর্ম চর্চার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সরল ও সহজ পথ খুজে নিতে পারে। আর দর্শন চর্চায় ব্যক্তিতার জ্ঞান ভাণ্ডারের সমৃদ্ধিতে জীবন ও জগত বিষয়ে যে চেতনা লাভ করে তার ফলে মানবের কল্যাণমূলক কাজই হয়ে ওঠে তার তৃপ্তি। এয়াকুব আলী চৌধুরী মানসমুকুরে এ ভাবটিই জেগে উঠেছিল।


ধর্মের কাহিনী গ্রন্থে এয়াকুব আলী চৌধুরী ‘পূর্বাভাষ প্রবন্ধে’ ধর্মের বিকৃতরুপ উপমা সহকারে রুপক ভাষায় বর্ণনা করেছেন। ‘বৈশাখ মাসের বাতাসে শুস্ক পাতা কেমন উড়িয়া যায়---- আজও জনসমাজ হইতে ধর্মও তেমনীভাবে উড়িয়া গিয়াছে।’ ‘শান্তি ধারা’ গ্রন্থে নামাজ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন----‘এই নামাজে পবিত্র হইতে পবিত্র ও মহান হইতে মহান আল্লাহর বন্দনা করিতেছি। তাহার প্রীতির জন্যে প্রাণের পুরে পুরে মঙ্গলের মধু ভরিয়া তাহার পানে প্রতিদিন প্রস্ফুট হইতেছি, তাহার আশা পিপাশা লইয়া অসীম রহস্য দ্বারে-দ্বারে বারেবারে আঘাত করিতেছি। একদিন এই রহস্য মুক্ত হইবে, আমার সকল হাহাকার শান্ত করিয়া আমার সার্বজনীন সফল করিয়া তাহার পরম শান্তি মহিমাজ্যোতি প্রকাশ হইবে।’

এ মহান সাহিত্য সাধক ছিলেন চিরকুমার। ১৯৩২ সালে তিনি যক্ষা রোগে আক্রান্ত হন। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি নিজ বাসভবন পাংশায় শয্যাশায়ী থাকেন। তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ফরিদপুরের আব্দুল ওয়াজেদ, রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য প্রমুখ। তাঁর সাহায্যের জন্য পরে আর্থিক সাহায্যের  একটি প্রচার পত্র বিলি করা হয়। শেরে বাংলা তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাসিক ২৫ টাকা হারে একটি সাহিত্যিক ভাতা মঞ্জুর করেন। দীর্ঘসময় রোগাক্রান্ত থাকা অবস্থায় অবশেষে ১৯৪০ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। এ সাহিত্য সাধকের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতিতে পাংশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এয়াকুব আলী বিদ্যা প্রতিষ্ঠান, এয়াকুব আলী স্মৃতি পাঠাগার।

জগদীশ গুপ্ত

রাজবাড়ি কামারখালি, কুষ্টিয়ার একই সমতলে সমসাময়িককালে যে সমস্ত মহৎ শিল্পী, সাহিত্যিক, সাধক, সমাজসেবকের জন্ম হয়েছে তাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায় জন্ম কুষ্টিয়ায় বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিন্তু কাল কাটিয়েছেন রাজবাড়ি। ঠিক ভিন্নভাবে জন্ম রাজবাড়ির মাটিতে কাল কাটিয়েছেন কুষ্টিয়ায়। মীর মশাররফ হোসেন এবং জগদীশ গুপ্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকাংশে সত্য। দুজনেরই পিতামহের বসতবাড়ি রাজবাড়ি কিন্তু উভয়েরই পিতা বাড়ি করেছেন কুষ্টিয়ায়। আবার এ দুই সাহিত্যকের জন্ম পিত্রালয় কুষ্টিয়া  হইলেও পরিণত বয়সে উভয়েই কুষ্টিয়া ছেড়ে গেছেন। মীর মশাররফ পিতামহের বসতবাটিতে কবরস্থ হয়েছেন। আর জগদীশ গুপ্ত কুষ্টিয়া ছেড়ে কলিকাতায় চলে যান।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পুরোধা পুরুষ বঙ্কিম চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের রুচি ও রোমান্টিকতার ধারার বিরুদ্ধে কল্লোল সাহিত্যের শক্তিমান ধারার স্রষ্টা বালিয়াকান্দি থানার খোর্দ মেঘচামী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারের সন্তান জগদীশ গুপ্ত। পিতা কৈলাশ চন্দ্র এবং মাতা সৌদামিনী। কার্যোপলক্ষে কৈলাশ চন্দ্র তৎকালীন নদীয়া জেলার মহকুমা কুষ্টিয়া শহরে গড়াই নদীর তীরবর্তী আমলা পাড়ায় বসবাস করতেন। সেখানেই ১৮৮৬ সালে ৫ জুলাই জগদীশ গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন। পিতার বসতবাড়ি চন্দনা নদীর ধারে। গ্রামটির প্রকৃত নাম মেঘচুম্বী যা লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে কালক্রমে মেঘচামীতে পরিণত হয়েছে। জগদীশ গুপ্তের পিতামহের নাম আনন্দমোহন সেনগুপ্ত। পিতামহের নামানুসারে তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘আনন্দ ভবন’। মেঘচামী গ্রামের গুপ্ত পরিবার বিদ্যা ও বিত্তে সম্মান ও মর্যাদায় অঞ্চলের বিশিষ্ট পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারটি ছিল অবস্থাসম্পন্ন বড় জোতদার। প্রচুর ধান, কলাই ও বিভিন্ন জাতের ফসল উঠত বাড়িতে। পিতামহ আনন্দমোহন গুপ্ত পেশায় ছিলেন কবিরাজ। মেঘচামী গ্রামের কবিরাজ বৃত্তির অলৌকিকত্বের কথা আজও এলাকায় লোকমুখে শোনা যায়। গুপ্ত পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন সূত্রে সম্পর্কিত ছিলেন কয়েকজন লোক। এদের মধ্যে দাক্ষায়ণী দেবী একজন। তিনি ছিলেন জগদীশ গুপ্তের কাকিমার মা, অর্থাৎ তাঁর দিদিমা। তিনি লেখাপড়া কম জানলেও ভালো কবিতা লিখতেন। চৈত্রমাসে গাজনের গান লিখে সুর দিতেন। অন্যজন ছিলেন বিজয় কবি রত্ন মজুমদার।


তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি ছিলেন জগদীশ গুপ্তের পিতার বন্ধু। আনন্দ ভবনের সোজা চন্দনা নদীর ওপর পাড়ে খালকুলা গ্রামে বিজয় রত্ন মজুমদারের বাড়ি। এছাড়া মা সৌদামিনী দেবীরও সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল। মায়ের সেসব উপন্যাস জগদীশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন।

জগদীশ গুপ্তের পিতা কৈলাশ চন্দ্র কুষ্টিয়ার আদালতের বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম দীক্ষিত। জগদীশ গুপ্তের বিদ্যাশিক্ষার শুরু হয় কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পণ্ডিত রামলাল সাহার পাঠশালায়। এরপর তিনি কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্বল্প বয়সে ভাওয়ালের কবি গোবিন্দ রায়ের অনুকরণে নারী তৃষ্ণার বিলাপ জনিত বেশ কিছু কবিতা লেখার জন্য তাঁকে বিদ্যালয় ছাড়তে হয়। ১৯০৪ সালে কলিকাতা সিটি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর রিপন কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু পড়ালেখা আর অগ্রগামী হয়নি। কেবল পিতৃসূত্রেই রাজবাড়ির সাথে তাঁর নাড়ীর যোগ ছিল না, বৈবাহিক সূত্রেও তিনি রাজবাড়ির বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯১৩ সালে ২৫ বছর বয়সে ছাত্রকালীন অবস্থায় রাজবাড়ির মেয়ে চারুবালা গুপ্তের সাথে তার বিবাহ হয়। চারুবালা গুপ্তের বয়স ছিল ১২ বছর। চারুবালা গুপ্তের পিতা যদুনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন রাজবাড়ির উকিল। তাঁর পিতার বাড়ি ছিল খোকসার ওসমানপুরে। চারুবালার পিতা রাজবাড়িতে নিজে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতেন। রাজবাড়িতেই চারুবালা জন্মগ্রহণ করেন এবং বড় হন। চারুবালার বর্ণনায় যতদূর জানা যায় তাতে বর্তমান বিনোদপুরের কোনো এক স্থানে তাদের বাড়ি ছিল। চারুবালা অল্প-স্বল্প পড়ালেখা জানিতেন; এ বিষয়ে তিনি বলেছেন----‘তখন রাজবাড়িতে মেয়েদের পড়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে তার পড়ার সুযোগ হয়নি। যা কিছু স্কুল ছিল অল্প কিছু বাংলা পড়া হইত। তাতেই যা হয়েছে-----দশ এগার বৎসর বয়স হইতেই স্কুল ছাড়িয়ে নিত। বার বছর পড়তেই বিবাহ।’ (১ জগদীশ গুপ্তের রচনা ও জগৎ, সরকার আবদুল মান্নান)।

রাজবাড়িতে শ্বশুরবাড়ির সূত্রে বটেই তিনি ভালো ফুটবল খেলতে পাড়ার রাজবাড়ির রেলের মাঠে হায়ারে ফুটবল খেলতে আসতেন। তখন স্টেডিয়াম মাঠ ছিল না। রেলের মাঠই ছিল খেলার ময়দান। পিতামহের বাড়ি মেঘচামীতে তিনি প্রায়শই যাতায়াত করতেন। মাঝে মাঝে দীর্ঘদিন অবস্থানও করতেন। তিনি ‘দুলালের দোলা’ ও ‘রোমন্থন’ উপন্যাস দু’খানি মেঘচামীতে বসে লেখেন। এ বিষয়ে তাঁর স্ত্রী চারুবালার সূত্রে জানা যায়-----‘বোধ হয় ১৩০১ সাল হইবে সেই সময়ে বোলপুর হইতে ছয় মাসের অফিস ছুটি লইয়া দেশের বাড়ি খোর্দমেঘচামী গ্রামে ছয়মাস থাকেন, সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেই সময়ে ‘দুলালের দোলা’ আর ‘রোমন্থন’ বই দু’খানি লেখেন।’ (চারুবালা গুপ্ত, জগদীশ গুপ্তের জীবন কথা)। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র, নজরুল সাহিত্যকে আধুনিকতার জগতে নিয়ে আসেন। তবে রবীন্দ্রনাথ, শরৎ সাহিত্য যে অর্থে আধুনিক, জগদী গুপ্তের সাহিত্যে আধুনিকতার স্বাদ ভিন্ন। আর এখানেই তাঁর মূল্যায়ন এবং সাহিত্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সাহিত্যিকর্মে চেতনার জগতে নিপুণ শিল্পীর মতো কাজ করেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র শুদ্ধতম মানব চরিত্র চিত্রনে মানুষের বাহ্যিক ও পরিবেশগত বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মানুষের জীবন ও জগৎ ভাবনার সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। আর শরৎচন্দ্র আবেগপ্রবণ গ্রামীণ মানুষ যে জীবন ব্যবস্থার মধ্যে আছে বস্তুনিষ্ঠ ভাবে তাকে উম্মোচন না করে মানুষ যা হতে চায় তার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ফলে বাঈজীরা কখনো বাঈজী নয় দিদিমারা কখনো দিদিমা নয়, ঝিয়েরা কখনো ঝি নয়, কিন্তু সকলই একটা অন্যকিছু হয়ে সার্থক হতে চায়। সাহিত্যের আধুনিকতার এ ধারায় বাস্তবতার চেয়ে রোমান্স বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গল্পে মানুষের কষ্টের, যন্ত্রণার, দীনতার পরিচয়ের চেয়ে বিশ্ব সংসারের পরিপ্রেক্ষিতে তার অবস্থানটাই নির্ণীত হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর সঙ্কীর্ণতা, পাশবিক নির্মমতা, স্বার্থপরতা এবং সর্বোপরি ইন্দ্রতাড়িত মানুষের ভেতরের পশুত্বতা যথাযথ স্বরুপে প্রকাশ পায়নি। রবীন্দ্রনাথ, শরৎ সাহিত্য ধুপছায়া, আবেগ, অধরা জগতের চরিত্র যাদের ছুঁই ছুঁই করলেও ছোঁয়া গেলেও নাগাল পাওয়া যায় না। শরৎচন্দ্র অধিকাংশ সময়েই মানুষের আবেগের তালে তালে পা ফেলে এগিয়েছেন। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর কথা সাহিত্যে সাধারণ মানুষের মনের গড়ন স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।


সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাব অমোঘ ভূমিকা পালন করে। বিশ শতকের গোড়া থেকেই শিল্পবিপ্লোবত্তর শ্রেণি বিন্যাস, ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নানা সংঘাতের ফলে জীবন সংগ্রামের ভিন্ন দিক উন্মোচিত হতে থাকে। কঠোর বাস্তবতায় জীবন ধারণ, জীবন বিকাশে বহুমাত্রিক ধারায় রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণ নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল। এই যাত্রা পথের একদিকে প্রমথ চৌধুরীর সবুজ পত্রে প্রকাশ আর অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা। এ সময়ই কল্লোল (১৯২৩), কালিকলম (১৯২৬), কালিকলম (১৯২৬), প্রগতি (১৯২৩), পরিচয় (১৯৩১) পত্রিকা কয়টিতে একদল নবীন সাহিত্যিকের আর্বিভাব ঘটেছিল। সাধারণ ভাবে তাঁরা কল্লোল যুগের সাহিত্যিক বলে পরিচিত। তারা ছিলেন গোকুল নাগ (১৮৯৪, ১৯২৫), মনিন্দ্রলাল বসু (১৮৯৭-১৯৫৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬) জগদীশ চন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), প্রবাধকুমার সান্যাল (১৯০৭-১৯৮৪)। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

তারা কল্লোল গোষ্ঠী বলে পরিচিত হন। উল্লেখ করার বিষয় কল্লোলগোষ্ঠীভুক্ত জগদীশ গুপ্ত পিতামহ ও পিতৃসূত্রে রাজবাড়ির সন্তান আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটি রচিত হয় গোয়ালন্দের কেতবপুর মাঝিদের জীবন কাহিনী নিয়ে। সমসাময়িককালে মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে কল্লোলগোষ্ঠীর মতই মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠে। তার পুরোধা ব্যক্তিদের তিনজনের মধ্যে কাজী আব্দুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন রাজবাড়ির সন্তান। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভিন্নধর্মী এ সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে ১৯৩০ এর কিছু পূর্ব থেকে এবং শেষ হয়েছে তিরিশের দশকের শেষে ১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরম্ভে। যদিও তারা কলম চালনা করেছেন ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তবে কল্লোলগোষ্ঠী যেখানে সাহিত্যের মার্গ চিহ্নিত করেছেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কেবল সাহিত্যের ধারাটিই ঠিক করতে ব্যস্ত আছেন।

বিশ্বযুদ্ধের করাল বিভৎসতার মধ্যে নতুন প্রত্যাশার বীজ রোপিত হতে থাকে ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবে মেহনতী মানুষের আর্থিক মুক্তি দেখে। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দৃষ্টি, যান্ত্রিক জড়বাদের অবশ্যম্ভবী পরিণাম, পৃথিবীর অস্থির রঙ্গমঞ্চে নিপীড়িত মানুষের ক্লিষ্ট আর্তনাদ এ দেশের মানুষদেরও আলোড়িত করেছিল। এসব আলোড়ন বিলোড়ন কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকদের অনুপ্রাণিত না করে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটেই কল্লোলের লেখকগণ সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যে এসে উপস্থিত হন। ফলে কুলি, মুটে, মজুর প্রভৃতি মানুষের অস্তিত্বের নানা সঙ্কট তারা কাহিনীতে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। নারী পুরুষের সম্পর্কে তারা আনতে চেয়েছেন ভিন্নতর মাত্রা। এভাবে সাহিত্যের বিষয় ক্রমেই ‘সর্বত্রগামী’ হয়ে উঠল। কল্লোলগোষ্ঠীর লেখকবৃন্দ রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে এসে ‘অপজাত ও অজ্ঞাত মনুষ্যত্বের’ ভিড়ের মধ্যে এসে দাড়িয়েছিলেন। শিল্পীগণ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে তাদের অসহায় অবস্থান, কর্ম ও ঘটনার মধ্যে আবিস্কার করতে চেয়েছেন। 

কল্লেলগোষ্ঠীর মধ্যে থেকেও জগদীশ গুপ্তের ধারা সাহিত্যে নবতর ও ভিন্ন ধারার। সমাজের পঙ্কিলতা, দীনতা, নির্মমতা, হতাশা, নিয়তিবাদের পস্ফুটনই তাঁর সাহিত্যের অপূর্ব শিল্পকৌশল। এ কারণেই তাঁর উপন্যাসের অনেক নায়কই খল প্রতিনায়ক। ফ্রয়োডীয় চেতনা অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য উপাদান। মানুষ তাড়িত হয় তার অমানবীয় সহজাত প্রবৃত্তিতে। নির্লোভ, নিস্কলুশ, নিঃস্বার্থ হওয়া যেমন কাম্য তেমনি লোভ, কলুষ, স্বার্থ এসব থেকে মানুষ মুক্ত নয়। কোনো-না-কোনোভাবে মানুষ তার স্বাদ গ্রহণ করে। আর যদি তাই হয় তাহলে মুক্তি কীভাবে? বুদ্ধির কাছে এখানে বিবেক আড়ষ্ট, মুক্তির ক্ষেত্র অবরুদ্ধ। কিন্তু জগদীশ গুপ্ত ফ্রয়োডীয় তত্ত্বের দ্বারা পরিচালিত হয়েও মানব চরিত্রের বাইরে এক অমানবীয় স্বত্ত্বার আবিস্কার করেন যেখানে মানুষ লোভ, স্বার্থ, মমতা দ্বারা পরিচালিত নন। মানুষকে তা করতে হয় তাই সে তা করে। কোনো কারণ সেখানে ব্যাখ্যার স্থান দান করে না।


লঘু-গুরু উপন্যাসের টুকির এক বন্ধু জানল উত্তমের দেওয়া টুকির হাতের চুড়ি জোড়া পিতলের নয়-সোনার। মেয়েটি জানতে চায় মানুষের ঘার ভেঙ্গে কত টাকা এসেছেরে? তোর মা’ই ঠিক সেই সময় একটি নিদারুণ কথা, সাপের বিষদাঁতে যেমন বিষ জমে তেমনি মোক্ষর মায়ের জিহবাগ্রে আসিয়া জমিল, মোক্ষর মা অনুভব করতে লাগল একটি স্থানে সেই লাঞ্ছিত বিষ ঢালিয়া বিষের ভাণ্ড উজার করিতে না পারিলে সে নিজেই যেন বাঁচিবে না। সুতরাং সে টুকির কানের কাছে মুখ নিয়ে সেই আপাপবিদ্ধ বালিকাকে জানাল, তোর মা বেশ্যা ছিল, গয়না দিয়েছে হাজার লোকে। তোর এ বাবা দেয়নি।’ আসলে মোক্ষর এই ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতার পিছনে না আছে আর্থিক সম্পর্ক, না আছে যৌনতার সম্পর্ক কিন্তু তবুও মানুষ তা করে। মানব চরিত্রের এমন অনেক দিক আছে যা অবলীলায় মানুষ করে থাকে। এই জটিল স্বরুপের অনেক পরিচয় আছে জগদীশ গুপ্তের লেখায়। এ প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক যথার্থই বলেছেন-----

‘আমরা মানুষের বাৎসল্য, নিরুপদ্রব সংসার যাত্রা, প্রেম, ভালোবাসা, মায়া, দয়া, সহানুভুতি ইত্যাদিকে মানুষের বিবৎসা, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, লোভ ও লালসা ইত্যাদি বৃত্তি থেকে একটু উপরের আসনে বসাতে অভ্যস্থ। কেন তা করি তার হাজার রকম যুক্তি থাকতে পারে কিন্তু মানুষ নামক জীবটিকে যিনি একটা প্রাকৃতিক জীব হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিল তাঁর কাছে এ দুরকম বৃত্তির মধ্যে আত্যন্তিক কারাক নেই। মানুষের প্রবৃত্তি জগতের হিসেব নিলে বাৎসল্য যেমন সত্য নিষ্ঠুরতাও তেমনি সত্য। সাহিত্যিক গীর্জার ফাদার নন, স্কুলের হেডমাস্টার নন, কাজেই নীতিবুলি কপচানোর চাইতে মানুষ যা, তাকে সেভাবেই বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। মনে হয় মানুষ এবং মানুষের সমাজ সম্পর্কে জগদীশ গুপ্তের মনোভাবটা এরকমই ছিল। মানুষকে তিনি প্রথাগত আদর্শের মানদণ্ডে বিচার করেননি। মানুষ হিসেবেই তাদের স্বরুপের অনুদঘাটিত দিক টাকে তুলে ধরেছেন। মানুষের অসচিতাকে তিনি তিন দিক থেকে ধরতে চেয়েছেন। এক আর্থিক স্বার্থ ও লোলুপতার দিক থেকে, কিছু যৌনতার দিক থেকে, কিছু যৌনতার দিক থেকে, তিন সহজাত অকারণ বিকৃত আনন্দের দিক থেকে।’

তিনি স্বগ্রাম মেঘচামীতে বেড়াতে আসেন। একটানা ছয়মাস অবস্থান করেন। গ্রামের অপরিসীম দারিদ্র ও নিচতার মুখোমুখী হয়ে লেখেন রোমস্থন উপন্যাসখানা। তিনি এ উপন্যাসে তুলে ধরেন কুচক্রী, মিথ্যার বেসাতি। তাঁর গল্পে লক্ষ্য করা যায় ছেলে রোজগার করতে না পেরে বাড়িতে বসে আছে বলে বাপ তাকে অন্ন দেবে না। সুতরাং বাপ ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। স্বার্থের টানাপোড়ানে বাৎসল্য এখানে সম্পূর্ণ পরাভূত। পুত্রও তেমনি দূরদেশে গিয়ে পিতার মৃত্যু হয়েছে বলে সে পিতৃশ্রাদ্ধের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে নিজেই আত্মসাৎ করে। ‘রতি ও বিরতিৎ উপন্যাসের রামহরি প্রমাণ করে যে, পয়সায় পাপ নেই।

এসব কাহিনীর মধ্যে জগদীশ গুপ্ত স্বার্থান্ধ মানুষের নিষ্ঠুরতম দিকেই শুধু অঙ্গুলী নির্দেশ করেন না, বরং তিনি মানুষের এই স্বার্থ চিন্তাকে স্বভাবজাত ও চিরকালীন স্বরুপ বলেই চিহ্নিত করতে চান তিনি আমাদের বলে দেন স্বার্থ সিদ্ধির ক্ষেত্রে মানুষ কম করে হলেও মনে মনে অশুচি।

 মানুষের এই অশুচিতা সবচেয়ে বেশি তাদের যৌনজীবনে। তাই জগদীশ গুপ্তের কথা সাহিত্যের নর নারীরা বিশেষ করে পুরেুষেরা মনুষত্বহীনতা, ইতরতা ও নীচতার সর্বদিক বিস্তৃতির প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে যৌনতা চরিতার্থতার জন্য। এ বিষয়ে হাসান আজিজুল হক বলেছেন-------দেহবাদিতা ও দেহসর্বস্বতার যে কথাটি সাহিত্যে কল্লোলীয় প্রবর্তনা বলে খ্যাতি পেয়েছে শুধুমাত্র সেটাকে যদি যাচাই বাছাই হিসেবে দেখি তাহলে নরেশ সেনগুপ্ত ও জগদীশ গুপ্তের মধ্যে পার্থক্যটা আর গোপন থাকে না। নরেশ সেনগুপ্তের ক্ষেত্রে যেটা আমদানী করা জিনিষ, জগদীশ গুপ্তের ক্ষেত্রে সেটাই তাঁর সাহিত্যের অন্তর্জাত প্রবণতা। একটি উপর থেকে আরোপিত, আর একটা একজন লেখকের মনের ধাঁচ থেকে উৎসারিত।


এ বিষয়ে সরকার আব্দুল মান্নান (সরকার আব্দুল মান্নান জগদিশ গুপ্তের উপর এমফিল ডিগ্রি করেছেন) বলেন-----‘হাসান আজিজুল হকের এই উক্তি যথার্থ। দুলালের দোলা, লঘু গুরু, গতিহারা, জাহ্নবী, নন্দ আর কৃষ্ণা, দয়াদন্দ মল্লিক ও মল্লিকা, তাতল সৈকতে, সুতিনী প্রভৃতি উপন্যাস এবং চন্দ্র সূর্য যতদিন, কলঙ্কিত সম্পর্ক, রক্তাভাস, আদি কথা একটি প্রভৃতি তার প্রমাণ।’ জগদীশ গুপ্তের এসব রচনায় বিবংসাতাড়িত মানুষের বিভৎস পরিচয় ফুটে উঠেছে-----বাংলার কথা সাহিত্যের ইতিহাসে তা মানব চরিত্রের এক ভিন্নতর প্রদেশের পরিবারে একান্তই নতুন।

সাহিত্যের ধারা বিকাশে লক্ষ্য করা গেছে ধর্ম, দেবতার অলৌকিক চরিত্রের পরবর্তী ধারায় মানুষ ও মানুষের জীবন সাহিত্যের উপাদান হিসেবে  এসেছে। এরমধ্যে গ্রাম জীবনের নিবিড়তম সম্পর্ক, নিবিড়তম সম্পর্ক, সংঘাত, জীবনতৃষ্ণা, জীবনযন্ত্রণা নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি হয়নি। এক্ষেত্রে জগদীশ গুপ্তকে পথিকৃত বলা যায়। ইতিপূর্বে গ্রামীণ জীবনের যে ছবি আঁকা হয়েছে তার অন্তর্নিহীত সুদর প্রসারী ক্ষতকে উপেক্ষা করে রোমান্টিক সৌন্দর্যের প্রলেপেই তা করা হয়েছে। কিন্ত জগদীশ গুপ্তের লেখায় গ্রাম জীবনের যে মূর্ত চিত্র আমরা দেখতে পাই-----

রোমস্থন উপন্যাসের অভয়ের দৃষ্টিতে সেই সর্বস্ব হারানো গ্রামীণ জীবনেরই চিত্র ফুটে উঠেছে, ‘দক্ষিণে বামে দুই দিকে আর সম্মুখে যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর ব্যাপিয়া ব্যর্থ ‍কৃষিকার্যের অখণ্ড শূন্যতা ধু-ধ করিতেছে। যে ফসল জন্মিয়াছিল তাহা পণ্ডশ্রম করিয়া কাটিবার প্রয়োজন হয় নাই, গুরু লাগাইয়া দিয়া তাহা কাঁচাই খাওয়াইয়া দিয়াছে। ভোজন বিশিষ্ট শুষ্ক ডাটা আর লতা ক্ষেত্রের লটাইয়া আছে। অভয়ের চোখ ছল ছল করিতে লাগিল-----পাশে আশাহত সন্তানের সঙ্গে চোখাচোখি হইয়া যায় এই ভয়ে যেন ভূমিলক্ষ্মী সর্বাঙ্গের উপর আবরণ টানিয়া দিয়াছে। কিন্তু আগে এমন ছিল না। ভূমিলক্ষ্মীর মুখ লুকাইবার হেতু না, সর্ব সম্পদের পুরোভাগে আর সর্বসুখের সমষ্টির কেন্দ্রে তিনি প্রধানতম স্থানটিতে অধিগ্রহণ করিয়া বিরাজ করিতেছে। ভূমিলক্ষ্মীর বিরুপে প্রকৃতি আসলে একটি প্রতীকী উপস্থাপন মাত্র। সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী শাসনের প্রতিযোগিতামূলক যে যৌথ কালোহাত গ্রামীণ জীবনের পুঁজিকে শুষে নিয়ে চুপসে যাওয়া রসহীন পক্ক ফলের মতো আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল উপরোক্ত বর্ণনা তারই প্রমাণ বহন করে। আমাদের দেশের মানুষ চিরকালই প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত হত। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই প্রকৃতি রাহুগ্রাসে নিপতিত হয় এবং মানুষের সঙ্গে তার নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে রোমন্থন উপন্যাসের ছিন্নমূলে মানুষ নায়ক অভয় গভীরভাবে উপলদ্ধি করে মানুষের হাহাকার।

বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে জগদীশ গুপ্তের সাহিত্য। তাঁর সাহিত্যের বিশেষ আর একটি রুপ দেখতে পাই যখন দেখি তার অনেক উপন্যাস ছোট গল্পের প্রেক্ষাপট এই রাজবাড়ি জেলা ও রাজবাড়ির মানুষ। তার ‘যথাক্রমে’ উপন্যাসটিতে এ অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের দৃশ্যপট।

‘যথাক্রমে’ উপন্যাসটি দুটি কাহিনীর সমন্বয়ে রচিত। কাহিনী দুটির মূলে আছে গ্রাম সম্পর্কে সনাতন ধারণাগুলোকে ভেঙ্গে দিয়ে একটি বাস্তব ও নির্মম অভিজ্ঞতার ‘আর্কেটাইপ তৈরি করা’ (সরকার আব্দুল মান্নান, জগদীশ গুপ্তের রচনা ও জগৎ, পৃ-১৮০)। ‘যথাক্রমে’র কাহিনী আবর্তিত হয়েছে গ্রাম বেতডাঙ্গা, নদী চন্দনা, রাজবাড়ির অদূরে তৎকালীন বন্দর গড়াই নদীর উপকূলে কামারখালিকে কেন্দ্র করে। যথাক্রমে’ উপন্যাসে পল্লী সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তা যেমন অত্র এলাকার চিত্র তেমনি তা বাঙালির সমাজচিত্র----‘গ্রামের নাম বেতডাঙ্গা, নদীর নাম চন্দনা, হাটের নাম চন্দনার হাট। নদী ছোট, গ্রাম ছোট, হাট ছোট, যারা হাটে আসে তারাও বৃহৎ নয়।’যথাক্রমে উপন্যাসে বেতডাঙ্গার ছোট একটি মুদি দোকানের রামপ্রসাদের সংসারকে ঘিরে। রামপ্রসাদের মৃত্যুর পর তার ছেলে দীনবন্ধু মানুষের যে নতুন স্বরুপের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বিয়ের পর সাবিত্রী পীড়ন ও যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকার যে কৌশল স্বাভাবিকভাবেই রপ্ত করে, তারই মধ্যে গ্রামীণ জীবনের নিশ্চয়তা, সঙ্কীর্ণতা ও কূটকৌশলের পরিচয় মূর্ত হয়ে উঠেছে। গ্রামজীবনের বেঁচে থাকার কাঠামোটির মধ্যেই রয়েছে অবিশ্বাস্য স্বার্থপরতা।


আলস্য, কর্মহীনতা আর তথাকথিত মর্যাদাবোধ গ্রামীণ জীবনের আর এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা যথাক্রম উপন্যাসে দেখি-----‘মাইল পাঁচেক দূরে কামারখালি ব্যবসাক্ষেত্র , স্টিমারও নৌকায় যেখানে মাল ওঠানামা হচ্ছে প্রতিদিন। আর সেই দু’মণ আড়াই মণ ওজনের বস্তা বহন করে প্রচুর টাকা কামাই করছে। বেতডাঙ্গার লোক সেখানে কখনো যায় না। কারণ মুটে মজুর তাদের কাছে লজ্জার কাজ। ফলে যারা চার-পাঁচ ভাই তারাও কয়েক বিঘা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। সারা বছর অভাব অনটন ঘোচে না, পাওনা মেটাতে পারে না। তাই মহাজন খাতকে, ভাইয়ে ভাইয়ে, ক্রেতায় বিক্রেতায়, প্রজায় গোমস্তায় দিনরাত চলতে থাকে ঝগড়া বিবাদ।’

জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্য প্রথা বিরোধী শান্ত নিবিড় গ্রামীণ জীবনের বিপরীতে পল্লী প্রকৃতি ও পল্লীবাসীর অন্তর্নিহিত পরিচয় ফুটে উঠেছে যেখানে স্বার্থপরতা, দারিদ্রের কষাঘাত, কুৎসা রটবার আনন্দ আর পরশ্রীকাতরতা নির্মম সত্য। মেঘচামী, বেতডাঙ্গা গ্রাম থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব বড়জোর ৭/৮ মাইল। গ্রামের চিত্র স্বচক্ষে অবলোকন করেছি। আমাদের গ্রামের মানুষের মধ্যে অনেকেই বিলের মাছ ধরে তা বিক্রি করে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করত। এ গ্রামের একটি স্বচ্ছল কুলীন পরিবার ধীরে ধীরে নিঃস্ব হতে দেখেছি। জমি বিক্রি করে জীবন চালানোর চেয়ে বিলে মাছ ধরে বিক্রি করার পরামর্শ দিয়েছিলাম তাদের। এতে পরিবারটি আমাকে গালমন্দ করে। দু-এক বছর পর গ্রামে গিয়ে দেখলাম পরিবারটি সেই কাজটিই করছে কিন্তু ততদিনে তাদের জমি-জিরেৎ খোয়া গেছে।

জগদীশ গুপ্ত নিপুণ শিল্পীর মতো গ্রাম জীবনের মানুষের জীবনজীবিকা, লোভ, স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যে। এ মহান সাহিত্য শিল্পী আমাদের গর্ব, অহঙ্কার।

জগদীশ গুপ্তের রচনাবলী

উপন্যাস : বিনোদিনী, হরপের বাইরে, স্ত্রমতি, উদয় লেখা, রতি ও বিরতি, উপায়ন, পাইন স্ত্রী মিহির প্রামাণিক, শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী, তৃষিত সুখকবী, মেঘাবৃত আসন, কলঙ্কিত তীর্থ, আগুন শলাকা, ভুঙ্গার

কবিতা গ্রন্থ : লঘু-গুরু, অসাধু সিদ্ধার্থ, অতল সৈকত, দুলালের দোলা, রোমন্থন, সুতিনী, গতিধারার জাহ্নবী, যথাক্রমে, নন্দ আর কৃষ্ণ, মহিত, পটভূমিকায়, নিদ্রিত কুম্ভকর্ণ, রসচক্র, স্ত্রীযোগ, দয়াময় মল্লিক ও মল্লিকা, চৌধুরান, কষ্ট।

কবিতা গ্রন্থ : অন্তরা, তুলসী, অসাধু সিদ্ধার্থ, নিষেধের পটভূমিকায়।

জগদীশ গুপ্ত রচনাবলী ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত।

 জলধর সেন

রাজবাড়ি জেলার সাহিত্য ও রাজনীতির অঙ্গনে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জলধর সেন। পদ্মা গড়াইয়ের ‘শ্রীখণ্ড ভূমিতল’ (পাংশা, কুমারখালি) কুমারখালিতে তার জন্ম। কৈশোর ও শৈশবের একাংশ কেটেছে গোয়ালন্দ তথা রাজবাড়িতে। সাহিত্যসেবী, শিক্ষক, রাজনীতিক জলধর সেনের মানস গড়ে ওঠে রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের স্পর্শে। এ কারণে সাহিত্য সাংবাদিকতার ইতিহাস চর্চায় জলধর সেন আমাদের মানুষ। জলধর সেনের জন্ম ১৮৬০ সালে কুমারখালির এক কায়স্থ পরিবারে। বাবা হলধর সেন, মাতা কালীকুমারী। কুমারখালিতে কাঙাল হরিনাথ পরিচালিত বাঙ্গলা স্কুলে বিদ্যাশিক্ষার শুরু কাকাতো ভাই দ্বারকানাথ সেন গোয়ালন্দ ফৌজদারী আদালতে পেশকার থাকার সুবাদে ১৮৭১ সালে জলধর সেন গোয়ালন্দ মাইনর স্কুলে ভর্তি হন।


এখান থেকে মাইনর বৃত্তি পরীক্ষায় তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে মাসিক পাঁচ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ঢাকা বিভাগে ইতিহাসে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় রাজা সূর্যকুমার তাঁকে রৌপ্যপদক প্রদান করেন। ১৮৭৮ সালে কুমারখালি স্কুল থেকে এনট্রান্স পাস করে বিদ্যাসাগরের সহায়তায় এসেমব্লীজ ইনস্টিটিউশনে এলএ পরিক্ষায় অকৃতকার্য হলে শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৮৮১ সালে তিনি গোয়ালন্দ স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এ সময় গোয়ালন্দ ঘাটের মাইনর স্কুলটি নদী ভাঙ্গনের কারণে রাজবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। তখন এ পরিচালনার ভার ছিল রাজা সূর্যকুমারের উপর। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন তিনি স্বদেশীকতা এবং সাংবাদিকতার প্রতি অনুরক্ত হয়ে ওঠেন। তখন বৃটিশ ও সামন্ত শাসনকাল। ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী পুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের সাথে গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় কাজ করেন। অস্থায়ী নিবাস রাজবাড়িতে। তিনি অত্র অঞ্চলের কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেন। তিনি কলিকাতায় কংগ্রেসের ‘দ্বিতীয় নিখিল ভারত কংগ্রেস অধিবেশনে গোয়ালন্দের প্রতিনিধিত্ব করেন (ডিসেম্বর ১৮৮৬)। এ ছাড়াও গোয়ালন্দে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে তিনি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের দ্বারা নানা বাধার সম্মুখীন হন। ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। ১৮৮৭ সালে কলেরায় তার একমাত্র কন্যাশিশু মারা যায়। কন্যার মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন পর স্ত্রী সুকুমারী দেবীও কলেরায় মারা যান। কন্যা ও স্ত্রী বিয়োগের তিন মাস জলধর সেনের মাতা মারা যাওয়ায় তিনি সংসার বিবাগী হয়ে হিমালয় যাত্রা করেন। অবশ্য মনের প্রশান্তি ফিরে এলে দেরাদুনে শিক্ষকতা শুরু করেন। হিমালয় থেকে ফিরে এসে ১৮৯১ তে মহিষাদল রাজ স্কুলে শিক্ষকতার কার্যে যোগ দেন। ১৮৯১ তে দ্বিতীয় দ্বার পরিগ্রহ করেন। ১৮৯৯ তে শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় আসেন। কিছুদিন সাপ্তাহিক বঙ্গবাণী পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯০৭ সালে ‘হিতবাদী’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯০৯ পত্রিকায় ইস্তফা দিয়ে সন্তোষে রাজের গৃহশিক্ষকতা করেন। এখানে দু’বছর কাটানোর পর ১৯১১ সালে ‘সুলভ সমাচা’ সম্পাদনা করেন। এরপর কলকাতায় প্রত্যবর্তন এবং ‘মাসিক ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর এ পত্রিকার সম্পদনা করেন। তিনি ভ্রমণ কাহিনীর লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ‘প্রবাহচিত্র’ ও ‘হিমালয়’ সুললিত ভাষায় রচিত গ্রন্থ দু’খানি পাঠক মহলে সাড়া জাগায়। গল্প ও উপন্যাস রচয়িতা হিসেবেও তিনি সমাধিক প্রসিদ্ধ। ‘নৈবেদ্য’(১৯০০), ‘কাঙ্গালের ঠাকুর’ (১৯২০), ‘বড় মানুষ’ (১৯২৯) তার প্রসিদ্ধ গল্প গ্রন্থ। ‘দুঃখিনী’ (১৯০৯), ‘অভাগী’ (১ম খণ্ড ১৯১৫, ২য় খণ্ড ১৯২২, ৩য় খণ্ড ১৯৩২), তাঁর উপন্যাস। জলধর সেন রচিত জীবনীগ্রন্থ ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’। তিনি ১৩১৯-১৩২০ এবং ১৩৪৩-১৩৪৫ ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে’র সহ সভাপতি ছিলেন। বৃটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৫ মার্চ১৯৩৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

Additional information