শিল্পসংস্কৃতি-৩

 মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মস্থান রাজবাড়ি জেলা নয়। তবে তাঁর লেখা বহুল আলোচিত ও পঠিত উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝিতে পদ্মার তট সংলগ্ন মাঝিদের বিশ্বস্ত জীবন চিত্রন হয়েছে। উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণ পটভুমি রাজবাড়ি জেলার ঐতিহ্যবাহী গোয়ালন্দ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পিতার কর্মস্থল সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে ১৯০৮ সালে মে মাসের ১৯ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতিক নিবাস বিক্রমপুর-মুন্সিগঞ্জের মানিকদিয়া গ্রাম। পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় (বিএ) ছিলেন সেটেলমেন্ট বিভাগের অফিসার এবং চাকরি জীবনের শেষে ডেপুটি ম্যাজিট্রেট পদে উন্নীত হন। মাতা নিরদাসুন্দরী দেবী পিতৃদত্ত নাম প্রবোধ কুমার। মানিক তাঁর ডাক নাম। তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেক লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক

(১৯২৬) এবং বাঁকুড়া ওমেলীয় কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে প্রথম বিভাগে আএসসি পাস করেন। অতঃপর গণিতে অনার্স নিয়ে কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। সমাজ চেতনা ও সাহিত্য রচনাই হয় জীবনের ব্রত। তার লেখা প্রথম গল্প ‘অতসী মামা’। ১৯৪৪ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতৃভূমি বিক্রমপুর-মুন্সিগঞ্জ এবং গোয়ালন্দ একই পদ্মার তটরেখায়। পদ্মার তটভূমির পীড়িত মাঝিদের আটপৌরে জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন।

তিরিশোত্তর বাংলা কথা-সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর গল্প ও উপন্যাসগুলো স্বতন্ত্র ও স্বীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। শরৎচন্দ্র ও কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের পর বাংলা সাহিত্যে বস্তুতান্ত্রিকতা ও মনোবিশ্লেষণের ধারা সর্বাধিক উজ্জ্বলভাবে অঙ্কনের কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর পর্যায়ের রচনায় মানুষের অবচেতন মনে যে নিগূঢ় রহস্যলীলা প্রচ্ছন্ন, (ফ্রেয়েডীয় সুত্র) তার নিপুণ বিশ্লেষণ উপস্থাপিত। যৌন আকাঙ্খায় জন্ম আর জীবন ধারণে উদর পূর্তির উপাদান খাদ্য। যৌনাকাঙ্খার সঙ্গে উদরপূর্তির সমস্যার ভিত্তিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। তিনি বাংলা সাহিত্যের সার্থক রিয়ালিস্টিক শিল্পী। তিনি সমসাময়িক কালের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাঙালি জীবনের ট্রাজেডি এত নির্মম, সত্যনিষ্ঠ ও শিল্পকুশলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন যে, তাঁর পূর্বে আর কেউ তা ফুটিয়ে তুলতে পারেননি বলে সমালোচকদের অভিমত।

১৯৩৬ সালে পদ্মা নদীর মাঝি প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতীয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুবাদ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ভারতের একাধিক ভাষাসহ ইংরেজি, চেক, হাঙ্গোরিয়ান, রুশ, লিথুনিয়ান, নরওয়েজিয়ান, সুইডিশ ভাষায় অনুদিত হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝি তাঁর চতুর্থ উপন্যাস। ১৯৪৮ সালে ইংরেজি অনুবাদ ‘Between on of the Padma'  প্রকাশিত হয়। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটি চলচ্চিত্র রুপায়নে চলচ্চিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী অনুযায়ী, ১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির বাংলা আবশ্যিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত সহপাঠ উপন্যাস গ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত। প্রায় ষাটখান গ্রন্থও অসংখ্য অগ্রন্থিত রচনার প্রণেতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি সার্থক আঞ্চলিক গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত। অঞ্চলটি পদ্মানদীর তীর সংলগ্ন বাংলার ঐতিহ্যবাহী দ্বারপথ পরিচিত গোয়ালন্দ তথা রাজবাড়ি। উপন্যাসটিতে অঞ্চলভিত্তিক রাজবাড়ির নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনালেখ্যসহ তৎকালীন গোয়ালন্দের রেল, স্টিমার, ব্যবসা বাণিজ্যসহ জমজমাট শহর জীবনেরও কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।  সে সাথে অত্র অঞ্চলের কৃত্রিমতা বর্জিত গ্রামীণ জীবন সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক ভাষার পরিস্ফুটন ঘটেছে। ঔপিনিবেশিক বৃটিশ শাসন ও শোষণে নির্জীব মানুষের পার্শে বামপন্থী লেখক, সাহিত্যিক রাজনীতিবিদগণ গণমানুষের চেতনায় নাড়া দেন। তৎকালীন গোয়ালন্দ গ্রামীণ পরিবেশে ব্যস্ত শহর। এখানে অনেক কারণেই লেখক সাহিত্যিক রাজনীতিবিদদেরও সমাগম ঘটে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পিতৃভুমির টানে গোয়ালন্দ হয়ে স্টিমারযোগে চলাচল করেছেন, সময় কাটিয়েছেন গোয়ালন্দ বা পার্শ্ববর্তী সাধারণ মানুষের সাথে। তাঁর উপন্যাস পদ্মানদীর মাঝিতে নিপুণভাবে অঙ্কিত তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাটের জনচলাচল, প্রতিবেশ, ভাষা জীবনছারণ তা স্মরণে আনে। উপন্যাসের শুরুতেই গোয়ালন্দের উজান ও ভাটির ঐতিহ্যবাহী ইলিশ ধরা, সে সময়ের গোয়ালন্দ ঘাটের বিভিন্নমুখী যাতায়াতের নিমিত্তে নোঙর করা জাহাজের ভিড়, পদ্মার তীর পর্যন্ত রেলস্টেশন তথ্য সন্নিবেশ দেখা যায়।

Additional information