শিল্পসংস্কৃতি-৩ - পৃষ্ঠা নং-২

বর্ষার মাঝামাঝি পদ্মার ইলিশ মাছ ধরার মরশুম চলিয়াছে। দিবারাত্রী কোনো সময় মাছ ধরার কামাই নেই। সন্ধ্যার সময় জাহাজ ঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বান জোনাকির মতো ঘুড়িয়া বেড়াইতেছে। জেলে নৌকার আলো ওগুলি। সমস্ত রাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে রহস্যময়ের ম্লান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সঙ্কেতের মতো সঞ্চালিত হয়। এক সময় সারারাত্র পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজ ঘাটে শ্রান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষ রাত্রে ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি ওঠে। জেলে নৌকার আলোগুলি তখনও নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে। মাছের নিস্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়।

উপন্যাসের আরম্ভেতেই তৎকালীন মহকুমা শহর পদ্মার তীর সংলগ্ন গোয়ালন্দ ঘাট, জাহাজ, রেল, গোয়ালন্দের ঐতিহ্যবাহী ইলিশ মাছের ব্যবসা বাণিজ্যের সঠিক চিত্র দেখতে পাই। ‘কুবের আজ মাছ ধরিতে ছিল দেবীগঞ্জের মাইল দেড়েক উজানে। নৌকায় আরো দু’জন লোক আছে ধনঞ্জয় এবং গণেশ। তিনজনের বাড়িই কেতুপুর গ্রামে। বর্তমান গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া সে সময় ছিল নদীগর্ভে। গোয়ালন্দ ঘাট ছিল বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার থেকে ৪/৫ মাইল উজানে। বলা হত গ্যাঙ্গেজ বন্দর। আরিচা ঘাটকে সামনে করে তার অবস্থান ছিল। প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গা গড়ায় কেতুপুর হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে। দেবীগঞ্জ এখন দেবগ্রাম ইউনিয়ন হিসেবে দেবীগঞ্জের স্মৃতি বহন করছে।

উপন্যাসটিতে কুবের মাঝিকে কেন্দ্র কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা টানাপোড়নে তাদের জীবন চিত্রের কাহিনী অগ্রগামী হয়েছে। এ কাহিনীর মধ্যে অঞ্চলভিত্তিক মানুষের ভাষা, দৈনন্দিন জীবন, আশা নিরাশার চিত্র দেখতে পাই-----‘পাশেই কাঠের প্যাকিং কেসে এক সারি মাছ ও এক পরত করিয়া বরফ বিছাইয়া চালানের ব্যবস্থা হইতেছে। খানিক দূরে মেইন লাইন হইতে গায়ের জোরে টানিয়া আনা একজোড়া ‍উঁচু নিচু ও প্রায় অকেজো লাইনের উপর চার পাঁচটা ওয়াগন দাঁড়াইয়া আছে। মাছের বোঝা লইয়া যথাসময়ে ওয়াগনগুলি কলিকাতায় পৌছাইবে। সকালে বিকালে বাজারে বাজারে ইলিশ কিনিয়া কলিকাতার মানুষ ফিরবে বাড়ি। কলিকাতার বাতাসে পাওয়া যাইবে পদ্মার ইলিশ মাছ ভাজার গন্ধ।’ এখানে কৎকালীন বরফ ব্যবসা, মাছের ব্যবসা, গোয়ালন্দের পদ্মার ইলিশের স্বাদ, কলিকাতার সাথে গোয়ালন্দের যাতায়াত, ব্যবসা বাণিজ্যের সম্পর্কসহ মানুষের জীবনচিত্র দেখতে পাই।

গনেশ বলিল-----হীরা জ্যাঠা ছন দিব? জ্যাঠারে তুই চিনিস না কুবির, কাইলের কাণ্ড জানস? বিহানে ঘরে ফিরা শুমু, বড় কয় চাল বাড়ন্ত। খাও আইঠা কলা, ভর রাইত জাইগা ঘুমের লাইগা দুই চক্ষু আধার দ্যাহে----চাল বাড়ন্ত। বৌরে কইলাম হীরা জ্যাঠার ঠাঁই, দুগা কর্জ আনগা। দুপুরে গাঁয়ে গিয়া কিনা আনুম। বৌরে জ্যাঠা কী কইয়া দিল। কয় কী, বিষ্যুদবার কর্জ দেওয়া মানা। এই ভাষাটিই এ অঞ্চলের ভাষা। ‘কাইলে’ ‘বিহানে’ ‘শুমু’ ‘কয়’ ‘জাইয়া’ ‘লাইগা’ ‘কহে’ ‘দ্যাহে’ ‘আনুম’ ‘বিষ্যুদবার’ এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা। একদিন গোয়ালন্দে অধরের সঙ্গে কুবেরের দেখা হইয়া গেল। অধর বলিল, কয়দিন আগে কপিলা চরডাঙ্গায় আসিয়াছে। কিছুদিন থাকিবে।

উপন্যাসের শে ১৩ পৃষ্ঠার আগে এভাবে গোয়ালন্দের উল্লেখে উপন্যাসটি শেষ হতে চলেছে। এর সাথে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝিদের তথা রাজবাড়ি গোয়ালন্দের অনেক স্মৃতিখণ্ড, ইতিহাস, ঐতিহ্য হিসেবে আমাদের গর্ব হয়ে থাকবে।

অবধূত

অবধূতের জন্মস্থান রাজবাড়িতে না হলেও রাজবাড়ির মাটি ও মানুষ অমর কথাসাহিত্যিক দিয়েছে তার অমর গ্রন্থ ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ও ‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’  লেখার উপাদান উদ্যোগ। যে কারণে অবধূত তাঁর মরুতীর্থ হিংলাজ রাজবাড়ির সূর্যনগরের হরিণধারার বিশিষ্ট ব্যক্তি বাবু বৃন্দাবন দাশের নামে উৎসর্গ করেন। দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত গোয়ালন্দ তখন সাহিত্য, রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্র বিন্দু হয়ে ওঠে। এর সূত্র আগমন ঘটে ছন্নছাড়া জীবনের এক অমর সাহিত্যিক অবধূত এর। যিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কালে আস্তানা গেড়ে বসেন গোয়ালন্দে। বৃন্দাবন দাস ও স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রে গোয়ালন্দ থাকতেন।

Additional information