চিত্র শিল্প

চিত্রশিল্প

চিত্রশিল্পী আবুল কাশেম

ছবি আঁকা চিত্রকলার অঙ্গ। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে বঙ্গদেশে চিত্রকলার কতটা বিকাশ ঘটেছিল তা জানা যায় না। কারণ বাংলায় তখন জাগজের ব্যবহার শুরু হয় নাই। হয়ত সামন্য কিছু ব্যবহার হলেও বানভাসীর এদেশে তা নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে পুরান বলে যা রক্ষা পেয়েছে তাহল কাঠের ওপর আঁকা ছবি, বইয়ের মলাটের পাঠচিত্র। বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম যখন থেকে মনে করা হয় তার গোড়ার দিকে মুসলমান শাসক থাকায় চিত্রকলার বিশেষ বিকাশ ঘটেনি। কারণ মুসলমানরা যেমন গান করাকে শাস্ত্রবিরোধী মনে করতেন তেমনি মানুষ ও জীবজন্তর ছবি আঁকাকেও ধর্মবিরোধী কাজ বলে মনে করতেন। তবে হুসেন শাহের পুত্র নাসিরউদ্দিন নশরত শাহর (১৫১৯-১৫৩৯) সময়ে তাঁর জন্য ফরাসি কবি নিজামীর ‘ইস্কার নামা’র নামক একটি কপি তৈরি করা হয়েছিল। তার মধ্যে গাছপালা, জীবজন্তু এবং মানুষের ছবি আঁকার প্রচলন ছিল।

সে সময়ে অনেকে মোড়ান কাপড়ে ছবি এঁকে গ্রামে বা জমিদার বাড়িতে দেখিয়ে দু’পয়সা আয় করতেন। শ্রীচৈতন্যদেব ও তাঁদের অনুসারীদের অনেক ছবি আঁকা হয়। শ্রীচৈতন্যের (১৪৮৬-১৫৩৩) বৈষ্ণবধর্ম প্রসারকালে রাধাকৃষ্ণের কাহিনী নিয়ে পটুয়ারা ছবি আঁকতে আরম্ভ করেন। দীনেশ চন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গে এরুপ অনেক ছবি পাওয়া যায়। অবশ্য মোগলদের সময়ে চিত্রকলার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। এ সময় এধরনের চিত্র আঁকার রীতি গড়ে উঠেছিল যা মিনিয়েচার, পেইন্টিং বলে পরিচিত। শায়েস্তা খাঁ, মীর জুমলা, মুর্শীদকুলি খাঁ, আলিবর্দী খাঁ, সিরাজউদদ্দৌলা প্রমুখের আঁকা ছবি রয়েছে।

চিত্রকলা বিকাশের ক্ষেত্রে এদেশে ইউরোপীয় নতুন ধারার সৃষ্টি হয় কলিকাতাকে কেন্দ্র করে। তা শুরু হয় আঠার শতকের শেষে যখন হিকি ও ড্যানিলের মতো ভালো শিল্পীরা এদেশে আসতে আরম্ভ করেন। নতুন স্টাইলে চিত্রকলা বিশিষ্টতা অর্জন করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, সত্যজিত রায়, গগনেন্দ্র নাথ ঠাকুর বাঙালি ঘরানায় চিত্রকলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। আরো পরে যামিনী রায় (১৮৮৭-১৯৭২),  জয়নুল আবেদীন (১৯১৭-১৯৭৬) চিত্রকলার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আধুনিক চিত্রকলার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আবুল কাশেম (১৯১৩-২০০০) অন্যতম পথিকৃত বলা যায়। জয়নুল আবেদীন, এসএম সুলতান কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরীর মতো তাঁর বিশ্বজোড়া নাম নেই কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থা ও কাল বিচারে তিনিই বাংলায় চিত্রকলা শিল্পের বিকাশে অবদান কাখেন। ‘সাকি’, ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ‘কুকুর ও মানুষের খাদ্য নিয়ে লড়াইয়ের ছবি’ আবুল কাশেমের অমর শিল্পকর্ম। দেশ বিভাগ পূর্বকালে ‘দোপেঁয়াজা’ নামে ছবি এঁকে তিনি হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। একারণে তিনি দেপেঁয়াজা (সম্রাট আকবরের নবরত্নের একজন ছিলেন মোল্লা দোপেঁয়াজা) নামেও পরিচিত ছিলেন। অঙ্কন শিল্পেও তিনি পথিকৃৎ। ছবি আঁকায় তিনি জলরং নিয়ে কাজ করতেন বেশি। শেষদিকে বেশি কাজ করেন তেলরং-এ। তাঁর আঁকা ‘কলসি কাঁখে জলপরি’, ‘মাটির পুতুল’, ও ‘কলমি শাক’ টাইটেলের ছবিগুলো খুবই সুনাম কুড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পুঁথির মালা’, ‘শান্তি সভা’, ‘জাম্বো ভাগে ডাম্বো বাংলা’ একাডেমী পুরস্কার পেয়েছে।

মিল্পী আবুল কাশেম ১৯১৩ সালে ৭ মে মঙ্গলবারে উমেদপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃভূমি রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলায় পারকুল গ্রামে। তাঁর আর এক সহোদর কাজী আবুল হোসেন ছিলেন ঔপন্যাসিক। শিশুকালে পিতা ও মাতা মারা যাওয়ায় আর্থিক অনটনে দুই ভাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেননি। প্রতিকূল সমাজে জন্মগ্রহণ করে কোনো প্রেরণা ছাড়াই ছোটবেলায় একা একা ছবি আঁকতে চেষ্টা করতেন। তখন বৈরী পরিবেশ। ছবি আঁকা পাপের কাজ। তাও আবার মানুষের ছবি। তবে স্থানীয় হিন্দু পরিবার এবং রাজবাড়ি অঞ্চলে হাঁড়ি পাতিলে ছবি আঁকা, কাঁথায় নকশা তোলার প্রচলন ছিল। আবুল কাশেম তাদের নিকট থেকে কিছু কিছু তালিম গ্রহণ করেন। স্থানীয় লোকজন তাঁর আকাঁ ছবির প্রশংসা করত। ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ দেখে অগ্রজ আবুল হোসেন তাঁকে উৎসাহ দিতেন। ১৯২৬ সালে তিনি ফরিদপুর শহরের রেভারেন্ড বার্বার নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রীর দৃষ্টিতে আসেন। তিনি শিল্পীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আর্ট স্কুলে ভর্তি করার জন্য কলিকাতায় নিয়ে যান। কিন্তু বয়স কম বলে ভর্তি হতে পারেননি।

Additional information