চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-২

তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন এবং পুনরায় স্কুলজীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু লেখাপড়া তাঁর অদৃষ্টে ছিল না। সপ্তম শ্রেণিতে পাঠকালে একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে আসাম ভ্রমণের জন্য পথে পা বাড়ান। আসাম থেকে ফিরে এসে কলিকাতা আর্ট স্কুলে আবার ভর্তির চেষ্টা করেন কিন্তু অর্থের অভাবে সম্ভব হয় নাই। ত্রিশের দশকে এন সিএ এ্যান্ড কোম্পানি নামক এক প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে একটি চাকরি পান। প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁর কাজে সন্তষ্ট হয়ে তাঁকে আর্ট ডিজাইনার পদে নিযুক্ত করেন। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তাঁকে সম্মন্ধে লিখেছেন-------

আমি যখন বাংলার মুসলমান সমাজে বেকার চিত্রশিল্পী আছে কিনা অনুসন্ধান করছিলাম। সে সময়ে ১৩৩৭ সালের কার্তিক মাসে (অক্টোবরের ১৯৩০) এক যুবক একখানি রেখাচিত্র নিয়ে সওগাত অফিসে উপস্থিত হন। নাম কাজী আবুল কাশেম। সওগাত প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ বার বছর পর এই প্রথম একজন তরুণ মুসলমান চিত্রশিল্পীর সাক্ষাৎ পেয়ে আমি যে কতটুকু আনন্দিত হয়েছিলাম তা বলে শেষ করা যায় না। শিল্পীকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পরবর্তী সংখ্যা সওগাতেই তাঁর অঙ্কিত ছবিখানি ছাপা হল। ছবিটির নাম ছিল সাকী

সওগাত প্রকাশিত এটাই তাঁর প্রথম ছবি। এরপর সওগাতে ও সাপ্তাহিক সওগাতে বিভিন্ন সংখ্যায় তার আঁকা নানা ধরনের রেখাচিত্র ছাপা হয়। কথাচিত্র নিয়েই তার ছবি আঁকার সূচনা। অনেকে ছবি আঁকেন সৌখিনতায় আবার অনেক ছবি আঁকেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে। জীবন ও জীবিকার তাগিদ নিয়েই তিনি ছবি এঁকে গেছেন অর্ধ-শতাব্দী কালেরও বেশি সময়। একারণে তাঁর ছবির বিষয়ে বিমূর্ত সমাজচেতন চিত্রশিল্পী। সমাজের অন্যায়, অবিচার, অসাম্য, শোষণ নিপীড়ন প্রভৃতি তাঁকে ছবি আঁকতে প্রেরণা যুগিয়েছে। বাংলার ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা ভয়াবহ রুপ ধারণ করে। শিল্পীর নিজ জেলা রাজবাড়িতেও হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে অনেক দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এসব দাঙ্গায় মানবতার মূল্যবোধ, লাভ লোকসান তিনি খুঁজে পাননি। তিনি কেবল দাঙ্গার ভয়াবহ রুপটির নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন। বাংলায় ১৩৫৯ সালে (১৯৪৩) দুর্ভিক্ষ ইতিহাসখ্যাত। দেশব্যাপী অনাহার আর মৃত্যুর বিভৎসতা। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়। মানুষ ক্ষুধার তাগিদে গাছের পাতা জাল দিয়ে খেতে শুরু করে। চারদিকে রব ওঠে ফ্যান দাও আমাদের জীবন বাঁচাও। ডাস্টবিনের খাদ্য নিয়ে কাড়াকাড়ি করে মানুষ ও কুকুর। কেবল ইতিহাসের পাতায় নয় আবুল কাশেমের আঁকা সে ছবি ইতিহাসের সাক্ষী। (সংযোজিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে ডাস্টবিনের এক পাশে এক ক্ষুধার্ত পুরুষ এবং আর এক পাশে ক্ষুধার্ত মহিলা তারা ক্ষুধার্ত কুকুরটিকে হাত তুলে তাড়াচ্ছে কিন্তু ক্ষুধার্ত কুকুরটি প্রতিবাদ করছে)। তিনি অনেক বাস্তব চিত্র এঁকেছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি বিভিন্নরুপে কার্টুন এঁকেছেন যার বেশির ভাগ সওগাতে প্রকাশ করা হত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৪) সময় কালোবাজারীদের বিরুদ্ধে তিনি কার্টুন এঁকে প্রতিবাদ করেছেন। এছাড়া মুসলমান দের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই ছিলেন মুর্তিমান প্রতিবাদ। তাঁর বিষয়ে নাসিরুদ্দীন লিখেছেন-----‘যে যুগে মানুষের বা জীবজন্তুর ছবি আঁকা মুসলমান সমাজে সম্পূর্ণ রুপে নিষিদ্ধ ছিল, সেই অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের যুগেও তিনি যে সাহস করে শিল্প সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তা ছিল একান্তই অচিন্তনীয় ব্যাপার।’ শিল্পী কাজী আবুল কাশেম সওগাতে যে সব ব্যাঙ্গচিত্র দিয়েছিলেন তা সর্বত্র পাঠক সমাজে প্রশংসিত হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলামের দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ এই ব্যাঙ্গ কবিতাটি অবলম্বনে শিল্পী আবুল কাশেম সুন্দর কটি কার্টুন এঁকেছিলেন। ছবিটি দেখে নজরুল হাসি সংবরণ করতে পারেননি। তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। হরফ খেদাও’ শিরোনামে ছবি এঁকে তিনি ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেন। এ অর্থে তিনি রাজবাড়ির আর এক ভাষা সৈনিক। পৃথিবীর সকল দেশের সকল জাতিই নবচেতনার নবযুগে প্রবেশ করে। যে জাতি যত দ্রুত নবচেতনায় উদ্ভাসিত হতে পারে সে জাতির ভাগ্য তত দ্রুত বদলে যায়। কুসংস্কার, রক্ষনশীলতা, কুপমণ্ডুকতা মানুষের পশ্চাতে টানে। যা একসময় জাতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতির বিনাশ অবশ্যম্ভাবীও হয়ে ওঠে। সঙ্কট নিরসনে জাতির মধ্য থেকে এমন কিছু মহান মানুষের আবির্ভাব ঘটে যারা বুদ্ধি, বিবেক, কর্মসাধানার সংগ্রাম দ্বারা জাতির সঠিক পথনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এমনি একজন মানুষ ছিলেন কাজী আবুল কাশেম। তিনি বাংলা একাডেমী পদক, বাংলা চৌদ্দশত জাতীয় উদযাপন পরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, কাজী মাহবুবুল্লা ও কাজী জেবুন্নেসা পদকে ভূষিত হন। তিনি ২০০৪ সালে মত্যুবরণ করেন।

Additional information