চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-১৩

আমাদের নিজস্ব ডিজাইন ও পাট রেশম দিয়ে তৈরি করলে বিদেশে উৎপাদিত তাপিশ্র্রীর চেয়ে এর নিজস্বতা ও বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে সেই সাথে দামও পড়বে আনুপাতিক হারে কম। ‘বাংলার রুপ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রুপ আমি খুঁজিতে চাই না’ জীবনানন্দের এই উক্তি শিল্পী রশীদের কাছে মায়া মমতার এক মূর্তরুপ। তাঁর শিল্পকর্ম বাংলার গণমানুষের ভাগ্যোন্নোয়নে নিবেদিত। বাংলার সূচিশিল্প, মসলিন, জামদানী, হস্তশিল্প আবহমানকালের ঐতিহ্য যা তাঁর মানসলোকের প্রতিভাসরুপে ট্যাপিস্ট্রিতে প্রকাশ লাভ করে। ট্যাপিস্ট্রির মাধ্যমে তিনি বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন, দারিদ্রপিড়ীত বাংলার গণমানুষের সুখ ও স্বাচ্ছন্দের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আজকের দিনে পোশাক শিল্প যেভাবে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার খুলে দিয়েছে এর পিছনে রশীদের ট্যাপিস্ট্রি উৎপাদন প্রয়াস ক্ষুদ্র করে দেখার অবকাশ নেই। এ মহান শিল্পী ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

শিল্পী মনসুর উল করিম

চিত্রশিল্পী মনসুরুল করিম ২৪ অক্টোবর ২০০৭। রাজবাড়ি পৌর মিলনায়তনে শিল্পী মনসুর উল করিম ও তাঁর কন্যা সাদিয়া শামীম মনসুর এর যৌথ চিত্র প্রদর্শনী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আয়োজক অরণি সংঘ। প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক বেগম তৌহিদা বুলবুল। বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার, ড. ফকীর আব্দুর রশীদ, প্রফেসর শংকর চন্দ্র সিনহা, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর, অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল আলম দুলাল। সভাপতি ড. সুলতানা আলম। উপস্থাপনা করছেন সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান। না গরম না শীতের বিকেলে পৌর মিলনায়তানের বারান্দায় মঞ্চে অতিথিবৃন্দ। সামনে খোলা আকাশের নিচে শ্রোতা দর্শক। পড়ন্ত বিকেলের আলো আঁধারীর সম্মোহনে বক্তা ও শ্রোতা আনন্দ বিহবল। রাজবাড়িতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর আঁকা ছবির আড়ম্বরপূর্ণ এমন প্রদর্শনী পূর্বের ইতিহাস খোঁজ করে পাইনি। বিশ্বখ্যাত মহান শিল্পী রশীদ চৌধুরীর জন্ম ও জীবনের একাংশ রাজবাড়িতে কেটেছে। তাঁর চিত্র কর্মের প্রদর্শনী করা সম্ভব হয়নি। তাঁরই যোগ্য ছাত্র শিল্পী মনসুর উল করিম ও তাঁর যোগ্য সন্তান সাদিয়া শামীম মনসুরের আঁকা ছবির প্রদর্শনী নিঃ সন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা। শুরুতেই এ মহান শিল্পী নিজ জন্মস্থান কালিকাপুর ও শৈশবের স্মৃতিমাখা পথ, ঘাট মাঠ, বন, বৃক্ষ, লতা, ফুল, রং জীবনের নানা চড়াই উৎড়াই নিয়ে কথা শুরু করলেন এভাবে ‘মনে পড়ে, মনে পড়ে না’------সঠিক অর্থেই শিল্পী মনের অভিব্যক্তি। একে একে রাজবাড়ি জেলা স্কুলের স্মৃতিমাখা দিনের কথা, শিক্ষাগুরু গুফুর স্যার এর উৎসাহের কথা, আবেগভরে কলেজে অধ্যয়নকালে (১৯৬৫-১৯৬৭) ছবি আঁকার কথা, তাঁর প্রতিভা বিকাশে ড. ফকীর আব্দুর রশীদ স্যার এর আন্তরিক উৎসাহ ও পথ নির্দেশের কথা, প্রফেসর শঙ্কর স্যারের প্রতি শ্রদ্ধার কথা ব্যক্ত করলেন। শিল্পী তাঁর বক্তব্যে সংক্ষিপ্ত বিবরণে শিল্পী জীবনের শুরু, সংগ্রাম আর প্রাপ্তির কথা তুলে ধরলেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছবি আঁকতেন। পদ্মার উত্থিত দ্বীপের কোলের রাজবাড়ি শস্য শ্যামল। পলল মাটির উর্বরতায় সবুজের মধ্যে সাদা শাপলা, লাল সাদায় পদ্ম, লাল গোলাপ, টকটকে লাল জবা। রাজবাড়ির সবুজ ‍বৃক্ষ, শস্য শ্যামল ক্ষেত, রক্তলাল জবা শৈশবে তাঁর চেতনায় মায়াবী প্রতিভাসের ছায়া ফেলেছিল। এর প্রতিচ্ছবি মনসুর উল করিমের শিল্পের বিশেষ অঙ্গসৌষ্ঠব। ফলে তাঁর সকল ছবিতেই প্রাধান্য পায় সবুজ আর লাল রং। রাজবাড়ি জেলার মাটির স্পর্শ নিয়ে তাঁর কেটেছে শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের একাংশ। জীবনের পরবর্তী অংশ কাটে পাহাড় আর সমতলের চট্রগ্রামে। বসতির সমীকরণে মূল বসতির মাটি তাঁকে ফিরে ফিরে টানে। শিল্পীর অবচেতন মনে মূল বসতির মাটির অনুভব ফিরে আসে বারবার। ‘মৃত্তিকার নানা কথা’ নামক এ প্রদর্শনীতে মাটির প্রতি সে মায়া মমতার কথা এসেছে। চিত্রপ্রদর্শনী পরিচিতিপত্রে তিনি লিখেছেন------

‘শৈশবের কথা মনে পড়ে কত বছর হবে। কয়েক দশক আগে। কত উচ্ছলতা ছিল প্রাণে। স্কুল, খেলাদুলা, আড্ডা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি ছবি আাঁকা। সবই ছিল প্রাণের আলোয়। সেই মাটিতেই এতদিন পর আঁকা ছবির প্রদর্শনী। শুধু আমার একার নয়।

Additional information