চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-১৪

আমার স্নেহময়ী কন্যার আঁকা ছবি ফিরে এসেছে এই শহরে। এই মাটির সোঁদা গন্ধে। আমি তো দীর্ঘপথ যাত্রী আর আমার কন্যা সাদিয়া শামীম মনসুর সবে যাত্রা শুরু করেছে তার গন্তব্যের পথে। সেও আলোর প্রত্যাশী। ছবি আঁকার হাতেখড়ি পড়েছে মাত্র। জীবনকে কেবল চিনতে শুরু করেছে। চিনতে সাহস করেছে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি ছবির প্রদর্শনী করতে। চট্রগ্রামে বেড়ে ওঠা শৈশব কৈশোর অতিক্রম করে পদ্মা নদীর এপাড়েই তার জীবন। সে কথা শুধু মনের নয়, শুধু প্রাণেরও নয়, স্বপ্নে আকাশে কুসুমে।’

মাটির প্রতি তাঁর ও কন্যার এ ভালোবাসার কথা তিনি জানালেন। তাঁর অনেক ছবিরই ভাব অনুকরণ রাজবাড়ির মাটি, গ্রাম, নদী, মানুষ যেখানে তাঁর মানসলোকের উৎপাদন সম্ভার মনোজগতে লুকিয়ে আছে। প্রদর্শনীতে অনুপম ছবির মধ্যে সাদীয়া শামীমের আঁকা ‘মাছধরা’, ‘বানভাসী’, ‘অরণ্য’, ‘লাল মাছ’ ‘সবুজ জাল’ যা রাজবাড়ির নৈমত্তিক জীবন। পেইটিংএ রঙের বাহারে অতুলনীয়। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে কৌশলী ও নিপুণতার ছাপ। মূর্ত আর বিমূর্তের সংমিশ্রণ ঘটেছে। মূর্ততা ছাড়িয়ে তিনি বাবার বিমূর্ততাকে হয়ত একদিন ছাড়িয়ে যাবেন। রাজবাড়ির তথা দেশের সম্মান বৃদ্ধি করবেন।

শিল্পী মনসুর উল করিমের মৃত্তিকার নানা কথা সিরিজের সকল ছবিই বিমূর্তের প্রকাশ। মূর্ত মাটি মানুষ, জীব, বৃক্ষ, লতা, সাগর, পাহাড়, ফুল, ফল একে অপরের গ্রন্থীযোগে আবদ্ধ। তারপরেও মাটিই আদি, অকৃত্রিম। কৃত্রিমতার সাথে আদি অকৃত্রিম মাটি কত ভাগে, কত ঘাতে, কত ভাঙ্গনে, কত সংহারে, কত ভালোবাসায়, কত রুপে রুপ বদলায়। তারই বিমূর্ত রুপ দেখি তাঁর প্রদর্শনীর মৃত্তিকার নানা কথা ছবির সিরিজে। বিমূর্ততা সাধারণ্যে অগম্য, অবোদ্ধ। অথচ আমাদের মনের টান ঐ দিকেই। শিল্পী ছবি আঁকেন ক্যানভাসে। এই ক্যানভাসের আসল কোনো পরিচিতি নেই। কাগজের তৈরি ক্যানভাস, কাঠের তৈরি ক্যানভাস, কাপড়ের তৈরি ক্যানভাস সবই ক্যানভাস। অনুরুপ পাহাড়ের গা, পাথরের গা, মাটির গা এমনি আমাদের গা ক্যানভাস। আদিমকাল থেকেই গায়ে ছবি আঁকার অভ্যাস মানুষের সহজাত। দুই মাত্রার তলে যে ছবিই আঁকা হোক না কেন তার প্রকাশ ঘটে বিমূর্ততায়। দুই মাত্রার ক্যানভাসে শিল্পী যে ছবি আঁকেন তারও গ্রামাটিক্যাল পরিমাপ দুই মাত্রার যদিও শিল্পীর দৃষ্টি থাকে বহুমাত্রিক। মাত্রা বিশ্লেষণে দুইমাত্রায় তল (মূলগত ভূতল), তিন মাত্রায় ঘনবস্তু যেমন মানুষ, পাহাড়, জীব জন্তু, বই, খাতা, কলম, তুলি, প্রান্তর শ্যামল শস্য, বৃক্ষ, পাহাড়, সাগর। তিন মাত্রায় আমরা পার্থিব যত ঘটনা অবলোকন করি। আলবার্ট আইনস্টাইন আর এক ধাপ এগিয়ে স্থান-কালের মাত্রা যোগ করে চার মাত্রায় সঠিক অর্থে সঠিক ঘটনার মূর্ততা ব্যক্ত করলেন। শিল্পীর মন থাকে ঐ চার মাত্রারও পরের মাত্রা সংযোজন। ব্রহ্মাণ্ড বিমূর্ততার মূর্ত প্রকাশ। এর অর্ধেক বুঝি আর অর্ধেক বুঝি না। শিল্পীর মন থাকে ঐ না বোঝা অংশের দিকে যেখানে বহুমাত্রা ব্যবহারে ঐ বিমূর্ত অংশকে মূর্ত করে তুলতে চান। জাত শিল্পীর বিমূর্ত প্রতীক তাই আমাদের কাছে হয়ে ওঠে আবোদ্ধ। সেখানে আমাদের গমনাগমন হয় দুরুহ। অথচ গভীর দৃষ্টিতে দেখলে বুঝতে পারি বা যারা প্রকৃত বোদ্ধা তারা বোঝেন এ এক অনন্য সৃষ্টি। যার মধ্যে বহুমাত্রার সকাশে বিমূর্ততা মূর্ততায় ধরা দিয়েছে। জাত শিল্পীর সার্থকতা এখানে। শিল্পী মনসুর উল করিম জাত শিল্পীর দলে। আধুনিকতা ছাড়িয়ে উত্তরাধুনিকতার দিকে তাঁর বিচরণ। ক্যানভাসে বিমূর্ত ভাব প্রকাশ তাঁর শিল্পী স্বত্বার নির্দেশনা। তিনি অধ্যাপনার পাশাপাশি ছবি এঁকে চলেছেন। রং ও কৌশলের ব্যবহার নিপুণ। তাঁর শিল্প মান বিচারে তিনি জয়নুল আবেদীন, রশীদ চৌধুরী, এসএম সুলতান, কামরুল ইসলাম দেশ ও বিদেশ খ্যাত শিল্পীদের দলে। লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসোর ব্যকরণিক সূত্র দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তাঁর দৃষ্টি শৈল্পিক কোনো অবদানের দিকে। ‘উৎস’, মৃত্তিকার নানা কথা’ ইত্যাদি ছবির সম্ভার সে ইঙ্গিত দেয়। জীবনানন্দ দাস এ দেশের প্রকৃতির কবি। বাস্তবতার উর্ধেব পরাবাস্তবতার স্বাদ পাই তাঁর কবিতায়। তিনি অঙ্কিত ছবিতে কবিতা লিখেছেন, যদিও তা তিনি করেননি। তাঁর কবিতা আর ছবিতে ভেদ নেই। শিল্পী মনসুর উল করিম এ কাজটি করেছেন। ‘লাবণ্য বাংলাদেশ’ এ সিরিজে আমরা রুপসী বাংলার রুপ দেখব তাঁর শিল্পকর্মে এ মহান শিল্পী ০১ মার্চ ১৯৫০ সালে রাজবাড়ি জেলার কালুখালির অনতিদূরে কালিকাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি জেলা স্কুলের পাঠ শেষ করে রাজবাড়ি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৯৬৫ সালে।

Additional information