চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-৩

বিশ্বখ্যাত শিল্পী রশিদ চৌধুরী

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রশীদ চৌধুরী জীবন বিকাশে প্রতিটি কর্মের সৌন্দর্যের পরিস্ফুটনকে সহজ অর্থে শিল্পকর্ম বলা হয়। জীবন ধারণ ব্যবস্থায় উৎপাদন, নির্মাণ, সম্ভোগ, আয়েশ ইত্যাদি ক্ষেত্রকে নানা কৌশলে দৃষ্টিনন্দন এবং তৃপ্তিদায়ক করে তুললেই আমরা বলি শিল্পগুণে মানুষ অগ্রগামী হচ্ছে। আখের রস থেকে চিনির সরবৎ শিল্পসম্মত স্বীকার্য। সে সরবৎ যদি ফুলপাখি আঁকা গ্লাস ও বর্তনীতে পরিবেশন করা হয় তা আরো বেশি শিল্পসম্মত। প্রতিটি মানুষ কমবেশি সৌন্দর্যপিয়াসী, শিল্পানুরাগী। জীবনের প্রয়োজনেই শিল্পচর্চা অত্যাবশ্যকীয় বলে মানুষ নিগুঢ় সৌন্দর্যবোধের অন্বেশণে কালান্তরে নানা মাত্রিক শিল্পচর্চায় ব্যাপৃত হয়েছে। শিল্পচর্চায় যেমন মানুষ দৈনিন্দন বিষয়ের উৎকর্ষতা সাধনে আত্মনিয়োগ করেছে তেমনি মানব চরিত্রের নানা সঙ্গতি, ইচ্ছা, আকাঙ্খার নানা প্রতিভাস পরিস্ফুটনে বিমূর্ততার বিষয়কে মূর্ততা দান করেছেন। শেষোক্ত শিল্পমাধ্যম চর্চায় যারা ব্রতচারী তারাই প্রকৃত অর্থে শিল্পী। কবি,  সাহিত্যিক, দার্শনিক, সঙ্গীতজ্ঞ নৃত্যকলা, অভিনেতা, চিত্রকর এই শিল্পীগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। শিল্পের এ মাধ্যমটিই ফাইন আর্ট বলে পরিচিত। শিল্পী রশিদ চৌধুরী ফাইন আর্টের শিল্পস্রষ্টা, এ দেশের অঙ্কন ও ট্যাপিস্ট্র শিল্প বিকাশের অনন্য প্রতিভা, দিকদিশারী, নতুন ঘরানার স্রষ্টা।

জীবনের ঘটনাবলীর অগ্রগামীতায় আমরা প্রতিনিয়ত বদলে যাই। উচ্চতর বোধ ও কৌশল অধিসংযোজনে আধুনিক হয়ে ওঠি। জীবন বিকাশের প্রতিটি ধারায় আধুনিকতার ছাপ। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি। প্রোজ্জ্বলার দাবিদার। প্রাচীন মিশরীয়, সুমেরীয় থেকে শুরু করে নিওনার্দ দ্যা ভিঞ্চি, পিকাসো, শাগাল, এজ্ঞোলো, লুরসা অত্যাধুনিকতায় শিল্পকে সভ্যতার স্মৃতি স্বাক্ষরে পরিণত করেছেন। কালের ধারায় শৈল্পিক বিশিষ্টতা, সভ্যতার মান মাপনের মাধ্যম হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে।

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী রশিদ চৌধুরী। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী সমসাময়িক ও আধুনিক শিল্পধারার প্রবর্তক। এক্ষেত্রে রশিদ চৌধুরী আন্দোলন ধারার পথ প্রদর্শক, শিল্পজ্ঞানে অনন্য। আপন বৈশিষ্ট্যে বিশ্বমানে আলোচিত। কেবল শৈলীর দিক থেকে নয় শিল্পসৃষ্টির মাধ্যম নির্বাচনে তার বিশিষ্টতা দেশে বিদেশে প্রশংসিত। তিনি এদেশে ফরাসিয় ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের দিশারীই কেবল নন, এখন পর্যন্ত এ মাধ্যমের বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম শিল্পী। সমগ্র উপমহাদেশেও কেবল ট্যাপিস্ট্রি নয় চিত্রাঙ্কনেও তিনি ছিলেন নতুনত্বের সন্ধানী। প্রচলিত তেল রং ছাড়াও চিত্র রচনা করেছেন গোয়াশ ও টেম্পারার মতো অপ্রচলিত মাধ্যমে। তিনি পশ্চিমাবিশ্বের শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্র মাদ্রিদ ও প্যারিসে শিল্পের উন্নত শিক্ষাগ্রহণ করলেও স্বদেশের ঐতিহ্য ও প্রেক্ষাপট থেকে কখনো সরে আসেননি। তাঁর ছবিতে পশ্চিমা আধুনিক অঙ্গন ও দেশজ ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে, যা দেশের অন্য কোন শিল্পীর মধ্যে দেখা যায় না। তিনি শিল্প সৃষ্টিতে এক ঘরানার প্রবর্তক যা পশ্চিমা বিশ্বের যে কোনো মৌলিক শিল্পস্রষ্টার সাথে তুলনীয়। বাংলাদেশে কর্মপরিধি, আঙ্গিকতা, বৈশিষ্ট্য জাতীয় চেতনার বিবেচনায় জয়নুল আবেদিনের পর যে নামটি প্রথমে উল্লেখ করা হয় তিনি রশিদ চৌধুরী। তিনি তাঁর ট্যাপিস্ট্রি শিল্পে বুননের মাধ্যম হিসাবে পশ্চিমা ট্যাপিস্ট্রি বুনন মাধ্যম পশ্চিমা তন্তুকে বেছে নেননি, বেছে নিয়েছিলেন দেশজ পাট ও রেশম। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ট্যাপিস্ট্র পল্লী। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সে স্বপ্নসাধ পূরণ হয়নি। রশীদ চৌধুরী ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আর জয়নুল আবেদীন ৬২ বছরে। শিল্পচার্যের প্রতি শ্রদ্ধেয় জীবনের অন্তিমকালে তিনি বলেছিলেন, আমি এখানেও জয়নুলের কাছে হেরে গেলাম। ঢাকায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত চারুকলা শিল্পশিক্ষালয়ে প্রাচ্যকলা বিষয়ে তিনিই প্রথম শিক্ষক। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে প্রথম শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। চট্রগ্রাম চারুকলা কলেজ ও শিল্প প্রর্দশনশালা কলাভবন স্থাপন করেন। শিল্পশিক্ষা ও শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় তিনি চিরস্মরণীয়। ব্যক্তিগত জীবনে বিনয়ী, ভদ্র, প্রকৃতি ও মানবপ্রেমিক। তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন যা পাঠ করলে হৃদয় ব্যথিত হয়। একজন শিল্পীর শিল্পসত্ত্বার পরিপূর্ণতা বুঝতে হলে তাঁর সমগ্র জীবনকালের দৈহিক ও বৈশ্বিক সমাজ সংসার, জীবনের গতি প্রকৃতি এবং লীলা বিবর্তন হিসাবের মধ্যে ধারণ করতে হবে।

Additional information