চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-৪

রশিদ চৌধুরী স্ত্রী

রশিদ চৌধুরী উপনিবেশিক বৃটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা উত্তর তিনটি পর্বের কালদ্রষ্টা। নানা সঙ্গতি, চিন্তা চেতনার পরিবর্তনের ধারায় তিনি সিক্ত হয়েছেন। এ ধারায় শিল্পকর্মও প্রভাব সৃষ্টিকারী তিন পর্বের চেতনার বিকাশ ঘটেছে। বৃটিশ শাসনকাল তার মনোজগতে নানা প্রতিভাস স্ফুরণের কাল। যে পরিবেশে তিনি লালিত-পালিত হয়েছেন সে পরিবেশ পরিলক্ষণে তার মানস গঠন অসমাপ্ত হলেও তিনি মুক্ত নন। তার পরিণত বয়সের চিত্রের মধ্যে সে সব চিত্রকর্ম দেখা যায়। শৈশব-কৈশোরে নিসর্গ ও লোকসংস্কৃতির মধ্যে একটি মুক্ত হৃদয়ের স্বাভাবিক অবগাহন ও নিমজ্জন পরবর্তীকালে তাঁর শৈল্পিক প্রকৃতির ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এর অন্তরমূলে রয়েছে মানবতা। এই মানবিক বোধ এমনি এক বিস্তৃত-পরিমণ্ডল যে, সেখানে কোনোরুপ সঙ্কীর্ণতার স্থান ছিল না। অভিজাত মুসলিম পরিবারের সন্তান। সুরা নূর কিংবা অন্যান্য ইসলামিক অনুসঙ্গ নিয়ে চিত্রগঠন তার পক্ষে যেমন স্বাভাবিক ছিল, তেমনি ছিল প্রাচ্য প্রতিচ্যের সংমিশ্রণ। এমন কি ভারতীয় ধর্মীয় রুপগল্পের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগ। এরকম ব্যবহারে তাঁর যে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সূক্ষ্ণরস চেতনা লক্ষ্য করা যায় তা রীতিমত অতুলনীয় অথচ এই বিষয়টাকেও আমাদের সমাজের কেউ কেউ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারতেন না। এ বিষয় শিল্পীর এক বন্ধুর বক্তব্য------

রশিদের শিল্পে একটি বিশেষ ধর্মের চর্চা হত বিধায় ও ভাগ্যে নিন্দা জুটেছিল। শিল্পীত সুন্দরের পূজারী। যদি নিরীহ ঐ দেবদেবীর ভাস্কর্যের মধ্যে সে সৌন্দর্যকে খুঁজে পায় এবং ভাস্কর্যের অন্তর্লীন কোনো বাণীকে যদি ধারণ করতে চায় নির্দোষ রঙে ও রেখায়, কি অধর্ম তাতে? ধর্মত সংস্কৃতিরই অঙ্গ। তার শিল্পকর্ম বিষয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন-----আমরা লক্ষ্য করবো তার মানবিক চেতনা সমাজের উচ্চবিত্ত যাদের সঙ্গে প্রস্তুত সামগ্রীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক। মধ্যবিত্ত যাদের মধ্যে তিনি একজন। আবার পরিধি ছাড়িয়ে ব্যাপক এক গণমুখী পর্যায়ে পরিণতি লাভ করেছিল। তাঁর উদার ব্যক্তি চরিত্রের কারণেই সহজেই তিনি তার নিজস্ব শিল্প মাধ্যমে কাজ করার প্রযুক্তি হিসেবে তাঁতীদের সঙ্গে মিশতে, তাদের কাছ থেকে তাঁত বোনা ও ঢালাইকরদের কাছ থেকে ঢালাইয়ের কলাকৌশল এবং কুমোরদের কাছ থেকে মাটির সামগ্রী তৈরি কায়দা কানুন শিখে নিতে পেরেছিলেন। আসলে তার গণমুখীতা ছিল তাঁর গভীর জাতীয়তা বোধেরই নামান্তর। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত কিংবা সদস্য হতে চাননি।’ শিল্প বিষয়ে রশিদ চৌধুরীর কথা বলেছেন---‘আমি এ ধরনের কোনো বিশেষ গল্পে বিশেষায়িত করতে চাই না। আগেই বলেছি শিল্প হবে সকলের জন্য, সমাজ ও জীবনকে সুন্দর করবার জন্য। সে জন্য সরকারকে, সমাজকেই হতে হবে গণমুখী।’ দেশের প্রখ্যাত একজন বুদ্ধিজীবী তার সম্মন্ধে লিখেছেন-----

শিল্পী হিসাবে তাঁর যে একটা বিশিষ্টতা ছিল, সেটা দেশের নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি এবং সমাজের এক ধরনের ভাঙন লক্ষ্য করে খুবই পিড়ীতবোধ করেছেন। এ অবস্থায় আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্য নিয়ে আলাপ হতো। রাজনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর সীমাবদ্ধতা আছে এ কথা সত্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও শিল্পী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সমাজের প্রতি শিল্পী হিসাবে যে দায়িত্ব আছে একথা রশিদ চৌধুরীকে বোঝাবার বিষয় ছিল না। এতটা হতাশা ব্যাপক পরিস্থিতে আশান্বিত হওয়ার জন্য একটা কিছুকে অবলম্বন করার একটা তাগিদ তাঁর মধ্যে ছিল।

আসলে শ্রেষ্ঠ শিল্পত শ্রেষ্ঠ রাজনীতি। এরকম অনুভূতির তারমধ্যে কাজ করতো। সে জন্যই তিনি তার শিল্পকর্মের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন ট্যাপিস্ট্রি শিল্প মাধ্যম। দেশ ও জাতির সুনাম বৃদ্ধি পাবে ব্যবসায়িক উন্নতি হবে, দেশ তার হারান মুসলিনের গৌরব ফিরে পাবে। এ ছিল তাঁর দৃঢ় আশা। তার শিল্প সভ্যতার বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত রশীদ চৌধুরী গ্রন্থে আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা---

তাঁর দ্বিতীয় পর্বের চিত্রমালা ক্রান্তির লক্ষণাক্রান্তি। এখানে বিষয় সম্পর্কে তিনি অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু আঙ্গিক নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষা তেলরঙে, জলরঙে গোয়াশে, টেম্পারায়। এখানে গ্রামীণ জীবন বিবৃত হয়েছে তার প্রকৃতি পশুপাখি ও পরিমণ্ডল সমেত। বাস্তবানুগ আলোছায়াময় উপস্থাপনের বদলে কিছুটা জ্যামিতিক সরলিকরণ ও উচ্চকৃত সমমাত্রিক বর্ণপ্রয়োগে দ্বিমাত্রিক তল নির্মাণের দ্বারা এ সূচনা।

Additional information