চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-৭

কিছু ফুলদানী

এ্যাসট্রে কার্পেট ওঠানামা

সিঁড়িতে সময় পায়ে পায়ে ওঠা নামা

আমার সময় নেই

শব্দহীন সময়

[১৯৮৬ মৃত্যুশয্যায় লেখা]

রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম শেষ কবিতায় লাল সুতোগুলো গাঢ় করে রাখ এটাই তার শিল্প জীবনের পরিপূর্ণতার তৃতীয় স্তর। ট্যাপেস্ট্রি শিল্পের রঙিন সুতোর বুনন কুশলতায় তার শিল্প জীবনের সকল সার্থকতা। এখানে শিল্প কেবল শিল্পের জন্য (Art for Arts sake) প্রচলিত প্রবাদ সংজ্ঞার দুর্বোধ্যতাকে তিনি সরলীকরণ, গুণমুখী ও প্রত্যাহিক করে তুলেছেন। ফরমায়েশি কাজের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীন চিন্তামত অনেক সময়েই কাজ করতে পারেননি, তবুও চেষ্টা করেছেন রেখাচিত্রে, কাগজে, গোয়াস বা জলরঙ কিংবা ছবির মধ্যে, পোড়ামাটির ভাস্কর্যে। কখনো ছোট মাপের ট্রাপিস্ট্রিতে দেখা মেলে ভিন্ন জগতের কিছু প্রয়াস। লক্ষ্মীর সরা বরাবরই তাঁর পছন্দের বস্তু। এক সময় এঁকেছেন বেশ কিছু সরাচিত্র। যা বিভিন্ন মাত্রায় শিল্পচিন্তার পরিচায়ক। তবে তিনি বরাবরই শিল্পের জীবন বিমূখ আত্মমুখীতার বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস প্রতিষ্ঠিত ‘বাই হাউসের’ একনিষ্ঠ অনুরাগী। বাইহাউসে চারুশিল্পের সাথে স্থাপত্য ও প্রায়োগিক শিল্পের একটি সাফল্যজনক সম্মিলন সূচনা হয়েছিল। যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কান্দিনাস্কি, পল ক্লির মতো শিল্পীরা। তাঁর স্বপ্ন ছিল চট্রগ্রাম চারুকলা কলেজের সমন্বয়ে বাই হাউসের আদলে একটি স্বয়ংসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা শুধু চিত্র ভাস্করই তৈরি করবে না, বরং সারাদেশের শিল্পকারখানার জন্য সরবরাহ করবে প্রোডাক্ট ডিজাইনার, আলোকচিত্রী, বিজ্ঞাপন শিল্পী,  ইন্টেরিয়র ও ফ্যাশান ডিজাইনার। তাঁর স্বপ্ন ছিল চট্রগ্রামে একটি স্থায়ী কারুপল্লী গড়ে তোলা। যেখানে কারু ও বয়নশিল্পীরা সারাবছর কাজ করবে। থাকবে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং বিক্রয় কেন্দ্র। শিল্পপল্লী নামে ১৯৬৪ সালে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থাপন করেছিলেন উপমহাদেশের প্রথম ট্যাপেস্টি কারখানা। ট্যাপিস্ট্রির উপাদান হিসেবেও নানান দেশীয় উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। ব্যবহার করেছেন পাট, পশম, রেশম প্রভৃতি দেশীয় বস্তু। এসব তাঁর সমাজ ও স্বদেশীয় ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব থাকত অকল্পনীয়।

স্ট্রাককার বা সংগঠনের বাঁধুনিই রশিদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রি ও অন্যান্য শিল্পের জোরালো গুণ। এই সংগঠনের জোড়ালো সূত্রগুলো কী? সেগুলো নিতান্তই সরল পরিমিত এবং বেসিক ডিজাইন ও মৌলিক নকশায় নিয়ম মেনে গড়া। মূল গল্পটি তিনি নিয়েছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিগ্রহশৈলী থেকে। বিশেষ করে দেবী প্রতিমার রুপের আদল থেকে। সেখানেও দশভূজা দুর্গা, রাধাকৃষ্ণ ও কালীমূর্তির উত্তোলিত হাতের বিভিন্ন বিন্যাস তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। তবে এখানেই তিনি বসে থাকেননি। প্রাথমিক বর্ণ ব্যবহারের উদ্দীপনাটি তিনি লাভ করেছিলেন লোক চিত্রকলার ঐতিহ্য থেকে, বিশেষ করে পটচিত্র ও লক্ষীর সরার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল বেশি। অবশ্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফি উদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী সবাই এ মাধ্যমে কাজ করেছেন। কিন্তু রশিদ চৌধুরীর ধারাটি ভিন্ন। তাঁর গ্রহণের ধারণা অনেকটাই অপ্রতক্ষ্য, রুপকাশ্রিত ও রুপান্তরিত। অন্যরা যেখানে আকৃষ্ট হয়েছেন লোককলার সহজীয়া দৃশ্যগত উপাদানে সেখানে রশিদ চৌধুরী রেখে গিয়েছেন লোকজীবনের অপ্রতক্ষ্য পুরাণ পুঁথি, পাঁচালি, পূজা-পার্বন আর স্মৃতি ও স্বপ্নের জগৎ। তিনি সে সবকে এমনভাবে বিমূর্ততায় রুপান্তরিত করেছেন যে, তাঁর ক্যালিওগ্রাফীতে বাংলার সম্প্রদায়গত গোষ্ঠী মানুষের ধর্মীয় চেতনারও সকল প্রকাশ রয়েছে। ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন রাজবাড়ির একজন জাদরেল উকিল ও রাজনীতিবিদ। তিন পুরুষের জমিদারীর পিতামহ ফয়েজ বক্স। পিতামহের ভ্রাতা করিম বক্স। চাচা আলীমুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন উকিল, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। হাড়োয়ায় পুরাতন আটচালা বাড়ি। সাঁইত্রিশ একর জুড়ে ছিল তার সীমানা। ঘর থেকে বের হয়ে খানিকটা এগুলেই বড় বড় দুটো পুকুর।

Additional information