চিত্র শিল্প - পৃষ্ঠা নং-৮

রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম তারপর দীর্ঘ প্রাচীর এবং পিছনে পদ্মা নদী। গোয়ালন্দ-কলিকাতা বিস্তৃত রেলপথ বাড়ির আঙিনা ঘেঁষে চলে গেছে। পাশেই রেলস্টেশন। নদীর কুল কুল ধ্বনি, রেলের ঝমাঝম, মানুষের কর্ম কোলাহল তাঁর মন ছুঁয়ে যায়। তিনি স্বর্ণকান্তি ছিলেন না। ছিলেন কালো, ছিপছিপে, রুগ্ন। এ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে তাঁর পারিবারিক চৌহদ্দীর মধ্যেও কৃষিসামন্ত-সংস্কৃতি বহমান ছিল। পহেলা বৈশাখে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নাচ-গান, মহররমের সময় লাঠিখেলা, পদ্মায় নৌকাবাইচ, যাত্রা, রাধাকৃষ্ণের পালা, কনক (বশির চৌধুরীর ডাক নাম) এসব দেখছেন। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ধারার সঙ্গে তাঁর চেতানার প্রথম সংযোগ ঘটেছিল। ছেলেবেলার পদ্মানদী তাঁর হৃদয়ের অনেকটা জুড়ে ছিল। বর্ষাকালে তরঙ্গমুখর পদ্মা প্রমত্তরুপ এবং শীতকালে দিগন্ত বিস্তৃত রুপালি বালুর মায়াবী বিছানা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। নদীর কোলে কুটির বাসিকে নদীর ভাঙ্গনে ভাঙ্গে কপাল। আবার যখন ঐ নদীর বুকে জাগে চর -----ফিরে পায় তাদের জমি, ভিটে, তখন মুখে তাদের হাসি ধরে না। পিতার কাছে তিনি লাঠিয়ালদের গল্প শুনেছেন, শুনেছেন চর দখলের রক্তাক্ত কাহিনী। রশিদ তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘এরা আমার মনোজগতের স্থায়ী সম্পদ।’

তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়। এরপর রজনীকান্ত হাইস্কুল, এরপর আলীমুজ্জামান হাইস্কুল বেলগাছি এবং কলিকাতায় পার্কসার্কাস হাইস্কুল। ভালো ছাত্র ছিলেন বলা যায় না। প্রবেশিকা পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। একদিন তাদের বাড়িতে আসেন এনামুল হক চৌধুরী। তাদের হেনা কাকা যার সাথে জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসানের পরিচয় ছিল। তিনি দেখেন কনক বাড়ির বাইরে গরুর গাড়ির ছবি আঁকায় মগ্ন। হেনা কাকাকে দেকে খুব ভালো লাগল। তিনি তাঁকে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। পিতা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন কিন্তু এ্র্যাডমিশন টেস্টে কৃতকার্য হতে পারলেন না। তবুও তিন মাসে ভালো করার শর্তে অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন তাঁকে ভর্তি করে নেন।

তখন জমিদারী প্রথার বিলুপ্তিতে (১৯৫০) পরিবারটি আর্থিক সঙ্কটে নিপতিত তার উপর পদ্মার ভাঙ্গনে পরিবারটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন। রাজনীতির খরচ মেটাতে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। গোটা পরিবারটি ঢাকায় আসে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যেও পুরোদমে ছবি আঁকার পাঠ চলে। সারাদিন খাটতেন। চেষ্টার পর চেষ্টা তারপর আবারও চেষ্টা, আরো ভালো করার জন্য। এরই মধ্যে আবারো বিপদ আসে। পিতা যক্ষায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসা ও পথ্য যোগার কঠিন হয়ে ওঠে। রশীদ ছোট কাজ করতেও দ্বিধান্বিত হন না। পথ্য কেনার জন্য নিজের সাইকেলটিও বিক্রি করে দেন। অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার ফলাফলস্বরুপ ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট স্কুল থেকে ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলেন। এরপর ভাস্কর্য শেখার জন্য ১৯৫৬ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তিতে মাদ্রিদে গমন করেন। স্পেনের মাদ্রিদে কেন্দ্রীয় চারুকলা বিদ্যালয়ে ‘ধ্রুপদী’ শৈলীর প্রতিকৃতি ও মাইকেল এ্যাঞ্জোলোর ভাস্কর্য শেখার জন্য এক বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ইউরোপে অবস্থানকালে মার্ক শাগালের প্রলঙ্করী প্রভাবে তিনি আকৃষ্ট হন। দেশে ফিরে এসে ১৯৫৮ সালে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে কিছুকাল শিক্ষাকতা করার পর আবার বিদেশ গমনের সুযোগ পান। ফরাসী সরকারের বৃত্তিতে চিত্রশিল্পীদের স্বপ্নপুরী প্যারিসের বিখ্যাত চারু বিদ্যালয়ে একাডেমীর অব জুলিয়াতে ভাস্কর্য, ফ্রেসকো ও ট্রাপেস্ট্রি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য গমন করেন। সেখানে তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি শিল্প মাধ্যম যা দ্বারা দেশমাতৃকার সেবা করা যায়। এ স্বপ্ন তাঁর সার্থক হয় ট্যাপেস্ট্রি শিল্প  এবং এটাই তিনি ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এই শিল্প মাধ্যমটিই তাঁকে অবশেষে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি প্যারীকন্যা এ্যানির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার নাম দেন সুচরিত এ্যানি। জমজ দুই কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে নাম রোজা ও রীতা। তিনি ১৯৬৫ সালে দেশে ফিরে এসে ঢাকা আর্ট কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর স্ত্রী ও কন্যাদের মমতায় আবারও প্যারি গমন করেন। দেশের প্রতি যার টান তিনি বিদেশ বিভুইয়ে থাকতে পারে? কিছুকাল পরে প্যারিস থেকে দেশে ফিরে এলেন এবং ১৯৬৯ সালে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ খোলার দায়িত্ব নিয়ে ঐ বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম অধ্যাপক ও সভাপতি। এ সময় পূর্ণ উদ্যম ও উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে শুরু হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ আর ধর্ষণ শিল্পীকে হতবাক করে তোলে।

Additional information