চিত্র শিল্প

চিত্রশিল্প

চিত্রশিল্পী আবুল কাশেম

ছবি আঁকা চিত্রকলার অঙ্গ। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে বঙ্গদেশে চিত্রকলার কতটা বিকাশ ঘটেছিল তা জানা যায় না। কারণ বাংলায় তখন জাগজের ব্যবহার শুরু হয় নাই। হয়ত সামন্য কিছু ব্যবহার হলেও বানভাসীর এদেশে তা নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে পুরান বলে যা রক্ষা পেয়েছে তাহল কাঠের ওপর আঁকা ছবি, বইয়ের মলাটের পাঠচিত্র। বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম যখন থেকে মনে করা হয় তার গোড়ার দিকে মুসলমান শাসক থাকায় চিত্রকলার বিশেষ বিকাশ ঘটেনি। কারণ মুসলমানরা যেমন গান করাকে শাস্ত্রবিরোধী মনে করতেন তেমনি মানুষ ও জীবজন্তর ছবি আঁকাকেও ধর্মবিরোধী কাজ বলে মনে করতেন। তবে হুসেন শাহের পুত্র নাসিরউদ্দিন নশরত শাহর (১৫১৯-১৫৩৯) সময়ে তাঁর জন্য ফরাসি কবি নিজামীর ‘ইস্কার নামা’র নামক একটি কপি তৈরি করা হয়েছিল। তার মধ্যে গাছপালা, জীবজন্তু এবং মানুষের ছবি আঁকার প্রচলন ছিল।

সে সময়ে অনেকে মোড়ান কাপড়ে ছবি এঁকে গ্রামে বা জমিদার বাড়িতে দেখিয়ে দু’পয়সা আয় করতেন। শ্রীচৈতন্যদেব ও তাঁদের অনুসারীদের অনেক ছবি আঁকা হয়। শ্রীচৈতন্যের (১৪৮৬-১৫৩৩) বৈষ্ণবধর্ম প্রসারকালে রাধাকৃষ্ণের কাহিনী নিয়ে পটুয়ারা ছবি আঁকতে আরম্ভ করেন। দীনেশ চন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গে এরুপ অনেক ছবি পাওয়া যায়। অবশ্য মোগলদের সময়ে চিত্রকলার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়। এ সময় এধরনের চিত্র আঁকার রীতি গড়ে উঠেছিল যা মিনিয়েচার, পেইন্টিং বলে পরিচিত। শায়েস্তা খাঁ, মীর জুমলা, মুর্শীদকুলি খাঁ, আলিবর্দী খাঁ, সিরাজউদদ্দৌলা প্রমুখের আঁকা ছবি রয়েছে।

চিত্রকলা বিকাশের ক্ষেত্রে এদেশে ইউরোপীয় নতুন ধারার সৃষ্টি হয় কলিকাতাকে কেন্দ্র করে। তা শুরু হয় আঠার শতকের শেষে যখন হিকি ও ড্যানিলের মতো ভালো শিল্পীরা এদেশে আসতে আরম্ভ করেন। নতুন স্টাইলে চিত্রকলা বিশিষ্টতা অর্জন করে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, সত্যজিত রায়, গগনেন্দ্র নাথ ঠাকুর বাঙালি ঘরানায় চিত্রকলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। আরো পরে যামিনী রায় (১৮৮৭-১৯৭২),  জয়নুল আবেদীন (১৯১৭-১৯৭৬) চিত্রকলার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আধুনিক চিত্রকলার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আবুল কাশেম (১৯১৩-২০০০) অন্যতম পথিকৃত বলা যায়। জয়নুল আবেদীন, এসএম সুলতান কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরীর মতো তাঁর বিশ্বজোড়া নাম নেই কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক অবস্থা ও কাল বিচারে তিনিই বাংলায় চিত্রকলা শিল্পের বিকাশে অবদান কাখেন। ‘সাকি’, ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ‘কুকুর ও মানুষের খাদ্য নিয়ে লড়াইয়ের ছবি’ আবুল কাশেমের অমর শিল্পকর্ম। দেশ বিভাগ পূর্বকালে ‘দোপেঁয়াজা’ নামে ছবি এঁকে তিনি হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। একারণে তিনি দেপেঁয়াজা (সম্রাট আকবরের নবরত্নের একজন ছিলেন মোল্লা দোপেঁয়াজা) নামেও পরিচিত ছিলেন। অঙ্কন শিল্পেও তিনি পথিকৃৎ। ছবি আঁকায় তিনি জলরং নিয়ে কাজ করতেন বেশি। শেষদিকে বেশি কাজ করেন তেলরং-এ। তাঁর আঁকা ‘কলসি কাঁখে জলপরি’, ‘মাটির পুতুল’, ও ‘কলমি শাক’ টাইটেলের ছবিগুলো খুবই সুনাম কুড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পুঁথির মালা’, ‘শান্তি সভা’, ‘জাম্বো ভাগে ডাম্বো বাংলা’ একাডেমী পুরস্কার পেয়েছে।

মিল্পী আবুল কাশেম ১৯১৩ সালে ৭ মে মঙ্গলবারে উমেদপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃভূমি রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলায় পারকুল গ্রামে। তাঁর আর এক সহোদর কাজী আবুল হোসেন ছিলেন ঔপন্যাসিক। শিশুকালে পিতা ও মাতা মারা যাওয়ায় আর্থিক অনটনে দুই ভাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেননি। প্রতিকূল সমাজে জন্মগ্রহণ করে কোনো প্রেরণা ছাড়াই ছোটবেলায় একা একা ছবি আঁকতে চেষ্টা করতেন। তখন বৈরী পরিবেশ। ছবি আঁকা পাপের কাজ। তাও আবার মানুষের ছবি। তবে স্থানীয় হিন্দু পরিবার এবং রাজবাড়ি অঞ্চলে হাঁড়ি পাতিলে ছবি আঁকা, কাঁথায় নকশা তোলার প্রচলন ছিল। আবুল কাশেম তাদের নিকট থেকে কিছু কিছু তালিম গ্রহণ করেন। স্থানীয় লোকজন তাঁর আকাঁ ছবির প্রশংসা করত। ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ দেখে অগ্রজ আবুল হোসেন তাঁকে উৎসাহ দিতেন। ১৯২৬ সালে তিনি ফরিদপুর শহরের রেভারেন্ড বার্বার নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রীর দৃষ্টিতে আসেন। তিনি শিল্পীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আর্ট স্কুলে ভর্তি করার জন্য কলিকাতায় নিয়ে যান। কিন্তু বয়স কম বলে ভর্তি হতে পারেননি।


তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন এবং পুনরায় স্কুলজীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু লেখাপড়া তাঁর অদৃষ্টে ছিল না। সপ্তম শ্রেণিতে পাঠকালে একদিন বড় ভাইয়ের সঙ্গে আসাম ভ্রমণের জন্য পথে পা বাড়ান। আসাম থেকে ফিরে এসে কলিকাতা আর্ট স্কুলে আবার ভর্তির চেষ্টা করেন কিন্তু অর্থের অভাবে সম্ভব হয় নাই। ত্রিশের দশকে এন সিএ এ্যান্ড কোম্পানি নামক এক প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে একটি চাকরি পান। প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁর কাজে সন্তষ্ট হয়ে তাঁকে আর্ট ডিজাইনার পদে নিযুক্ত করেন। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তাঁকে সম্মন্ধে লিখেছেন-------

আমি যখন বাংলার মুসলমান সমাজে বেকার চিত্রশিল্পী আছে কিনা অনুসন্ধান করছিলাম। সে সময়ে ১৩৩৭ সালের কার্তিক মাসে (অক্টোবরের ১৯৩০) এক যুবক একখানি রেখাচিত্র নিয়ে সওগাত অফিসে উপস্থিত হন। নাম কাজী আবুল কাশেম। সওগাত প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ বার বছর পর এই প্রথম একজন তরুণ মুসলমান চিত্রশিল্পীর সাক্ষাৎ পেয়ে আমি যে কতটুকু আনন্দিত হয়েছিলাম তা বলে শেষ করা যায় না। শিল্পীকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পরবর্তী সংখ্যা সওগাতেই তাঁর অঙ্কিত ছবিখানি ছাপা হল। ছবিটির নাম ছিল সাকী

সওগাত প্রকাশিত এটাই তাঁর প্রথম ছবি। এরপর সওগাতে ও সাপ্তাহিক সওগাতে বিভিন্ন সংখ্যায় তার আঁকা নানা ধরনের রেখাচিত্র ছাপা হয়। কথাচিত্র নিয়েই তার ছবি আঁকার সূচনা। অনেকে ছবি আঁকেন সৌখিনতায় আবার অনেক ছবি আঁকেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে। জীবন ও জীবিকার তাগিদ নিয়েই তিনি ছবি এঁকে গেছেন অর্ধ-শতাব্দী কালেরও বেশি সময়। একারণে তাঁর ছবির বিষয়ে বিমূর্ত সমাজচেতন চিত্রশিল্পী। সমাজের অন্যায়, অবিচার, অসাম্য, শোষণ নিপীড়ন প্রভৃতি তাঁকে ছবি আঁকতে প্রেরণা যুগিয়েছে। বাংলার ১৯৩০ ও ১৯৪০ এর দশকে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা ভয়াবহ রুপ ধারণ করে। শিল্পীর নিজ জেলা রাজবাড়িতেও হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে অনেক দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এসব দাঙ্গায় মানবতার মূল্যবোধ, লাভ লোকসান তিনি খুঁজে পাননি। তিনি কেবল দাঙ্গার ভয়াবহ রুপটির নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন। বাংলায় ১৩৫৯ সালে (১৯৪৩) দুর্ভিক্ষ ইতিহাসখ্যাত। দেশব্যাপী অনাহার আর মৃত্যুর বিভৎসতা। এ দুর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যায়। মানুষ ক্ষুধার তাগিদে গাছের পাতা জাল দিয়ে খেতে শুরু করে। চারদিকে রব ওঠে ফ্যান দাও আমাদের জীবন বাঁচাও। ডাস্টবিনের খাদ্য নিয়ে কাড়াকাড়ি করে মানুষ ও কুকুর। কেবল ইতিহাসের পাতায় নয় আবুল কাশেমের আঁকা সে ছবি ইতিহাসের সাক্ষী। (সংযোজিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে ডাস্টবিনের এক পাশে এক ক্ষুধার্ত পুরুষ এবং আর এক পাশে ক্ষুধার্ত মহিলা তারা ক্ষুধার্ত কুকুরটিকে হাত তুলে তাড়াচ্ছে কিন্তু ক্ষুধার্ত কুকুরটি প্রতিবাদ করছে)। তিনি অনেক বাস্তব চিত্র এঁকেছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি বিভিন্নরুপে কার্টুন এঁকেছেন যার বেশির ভাগ সওগাতে প্রকাশ করা হত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৪) সময় কালোবাজারীদের বিরুদ্ধে তিনি কার্টুন এঁকে প্রতিবাদ করেছেন। এছাড়া মুসলমান দের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই ছিলেন মুর্তিমান প্রতিবাদ। তাঁর বিষয়ে নাসিরুদ্দীন লিখেছেন-----‘যে যুগে মানুষের বা জীবজন্তুর ছবি আঁকা মুসলমান সমাজে সম্পূর্ণ রুপে নিষিদ্ধ ছিল, সেই অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের যুগেও তিনি যে সাহস করে শিল্প সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তা ছিল একান্তই অচিন্তনীয় ব্যাপার।’ শিল্পী কাজী আবুল কাশেম সওগাতে যে সব ব্যাঙ্গচিত্র দিয়েছিলেন তা সর্বত্র পাঠক সমাজে প্রশংসিত হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলামের দাদা মেখে দেয় দাড়িতে খেজাব’ এই ব্যাঙ্গ কবিতাটি অবলম্বনে শিল্পী আবুল কাশেম সুন্দর কটি কার্টুন এঁকেছিলেন। ছবিটি দেখে নজরুল হাসি সংবরণ করতে পারেননি। তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন। হরফ খেদাও’ শিরোনামে ছবি এঁকে তিনি ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেন। এ অর্থে তিনি রাজবাড়ির আর এক ভাষা সৈনিক। পৃথিবীর সকল দেশের সকল জাতিই নবচেতনার নবযুগে প্রবেশ করে। যে জাতি যত দ্রুত নবচেতনায় উদ্ভাসিত হতে পারে সে জাতির ভাগ্য তত দ্রুত বদলে যায়। কুসংস্কার, রক্ষনশীলতা, কুপমণ্ডুকতা মানুষের পশ্চাতে টানে। যা একসময় জাতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাতির বিনাশ অবশ্যম্ভাবীও হয়ে ওঠে। সঙ্কট নিরসনে জাতির মধ্য থেকে এমন কিছু মহান মানুষের আবির্ভাব ঘটে যারা বুদ্ধি, বিবেক, কর্মসাধানার সংগ্রাম দ্বারা জাতির সঠিক পথনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। এমনি একজন মানুষ ছিলেন কাজী আবুল কাশেম। তিনি বাংলা একাডেমী পদক, বাংলা চৌদ্দশত জাতীয় উদযাপন পরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, কাজী মাহবুবুল্লা ও কাজী জেবুন্নেসা পদকে ভূষিত হন। তিনি ২০০৪ সালে মত্যুবরণ করেন।


বিশ্বখ্যাত শিল্পী রশিদ চৌধুরী

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী রশীদ চৌধুরী জীবন বিকাশে প্রতিটি কর্মের সৌন্দর্যের পরিস্ফুটনকে সহজ অর্থে শিল্পকর্ম বলা হয়। জীবন ধারণ ব্যবস্থায় উৎপাদন, নির্মাণ, সম্ভোগ, আয়েশ ইত্যাদি ক্ষেত্রকে নানা কৌশলে দৃষ্টিনন্দন এবং তৃপ্তিদায়ক করে তুললেই আমরা বলি শিল্পগুণে মানুষ অগ্রগামী হচ্ছে। আখের রস থেকে চিনির সরবৎ শিল্পসম্মত স্বীকার্য। সে সরবৎ যদি ফুলপাখি আঁকা গ্লাস ও বর্তনীতে পরিবেশন করা হয় তা আরো বেশি শিল্পসম্মত। প্রতিটি মানুষ কমবেশি সৌন্দর্যপিয়াসী, শিল্পানুরাগী। জীবনের প্রয়োজনেই শিল্পচর্চা অত্যাবশ্যকীয় বলে মানুষ নিগুঢ় সৌন্দর্যবোধের অন্বেশণে কালান্তরে নানা মাত্রিক শিল্পচর্চায় ব্যাপৃত হয়েছে। শিল্পচর্চায় যেমন মানুষ দৈনিন্দন বিষয়ের উৎকর্ষতা সাধনে আত্মনিয়োগ করেছে তেমনি মানব চরিত্রের নানা সঙ্গতি, ইচ্ছা, আকাঙ্খার নানা প্রতিভাস পরিস্ফুটনে বিমূর্ততার বিষয়কে মূর্ততা দান করেছেন। শেষোক্ত শিল্পমাধ্যম চর্চায় যারা ব্রতচারী তারাই প্রকৃত অর্থে শিল্পী। কবি,  সাহিত্যিক, দার্শনিক, সঙ্গীতজ্ঞ নৃত্যকলা, অভিনেতা, চিত্রকর এই শিল্পীগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। শিল্পের এ মাধ্যমটিই ফাইন আর্ট বলে পরিচিত। শিল্পী রশিদ চৌধুরী ফাইন আর্টের শিল্পস্রষ্টা, এ দেশের অঙ্কন ও ট্যাপিস্ট্র শিল্প বিকাশের অনন্য প্রতিভা, দিকদিশারী, নতুন ঘরানার স্রষ্টা।

জীবনের ঘটনাবলীর অগ্রগামীতায় আমরা প্রতিনিয়ত বদলে যাই। উচ্চতর বোধ ও কৌশল অধিসংযোজনে আধুনিক হয়ে ওঠি। জীবন বিকাশের প্রতিটি ধারায় আধুনিকতার ছাপ। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি। প্রোজ্জ্বলার দাবিদার। প্রাচীন মিশরীয়, সুমেরীয় থেকে শুরু করে নিওনার্দ দ্যা ভিঞ্চি, পিকাসো, শাগাল, এজ্ঞোলো, লুরসা অত্যাধুনিকতায় শিল্পকে সভ্যতার স্মৃতি স্বাক্ষরে পরিণত করেছেন। কালের ধারায় শৈল্পিক বিশিষ্টতা, সভ্যতার মান মাপনের মাধ্যম হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে।

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী রশিদ চৌধুরী। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, রশিদ চৌধুরী সমসাময়িক ও আধুনিক শিল্পধারার প্রবর্তক। এক্ষেত্রে রশিদ চৌধুরী আন্দোলন ধারার পথ প্রদর্শক, শিল্পজ্ঞানে অনন্য। আপন বৈশিষ্ট্যে বিশ্বমানে আলোচিত। কেবল শৈলীর দিক থেকে নয় শিল্পসৃষ্টির মাধ্যম নির্বাচনে তার বিশিষ্টতা দেশে বিদেশে প্রশংসিত। তিনি এদেশে ফরাসিয় ট্যাপিস্ট্রি শিল্পের দিশারীই কেবল নন, এখন পর্যন্ত এ মাধ্যমের বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম শিল্পী। সমগ্র উপমহাদেশেও কেবল ট্যাপিস্ট্রি নয় চিত্রাঙ্কনেও তিনি ছিলেন নতুনত্বের সন্ধানী। প্রচলিত তেল রং ছাড়াও চিত্র রচনা করেছেন গোয়াশ ও টেম্পারার মতো অপ্রচলিত মাধ্যমে। তিনি পশ্চিমাবিশ্বের শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্র মাদ্রিদ ও প্যারিসে শিল্পের উন্নত শিক্ষাগ্রহণ করলেও স্বদেশের ঐতিহ্য ও প্রেক্ষাপট থেকে কখনো সরে আসেননি। তাঁর ছবিতে পশ্চিমা আধুনিক অঙ্গন ও দেশজ ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে, যা দেশের অন্য কোন শিল্পীর মধ্যে দেখা যায় না। তিনি শিল্প সৃষ্টিতে এক ঘরানার প্রবর্তক যা পশ্চিমা বিশ্বের যে কোনো মৌলিক শিল্পস্রষ্টার সাথে তুলনীয়। বাংলাদেশে কর্মপরিধি, আঙ্গিকতা, বৈশিষ্ট্য জাতীয় চেতনার বিবেচনায় জয়নুল আবেদিনের পর যে নামটি প্রথমে উল্লেখ করা হয় তিনি রশিদ চৌধুরী। তিনি তাঁর ট্যাপিস্ট্রি শিল্পে বুননের মাধ্যম হিসাবে পশ্চিমা ট্যাপিস্ট্রি বুনন মাধ্যম পশ্চিমা তন্তুকে বেছে নেননি, বেছে নিয়েছিলেন দেশজ পাট ও রেশম। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ট্যাপিস্ট্র পল্লী। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সে স্বপ্নসাধ পূরণ হয়নি। রশীদ চৌধুরী ৫৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আর জয়নুল আবেদীন ৬২ বছরে। শিল্পচার্যের প্রতি শ্রদ্ধেয় জীবনের অন্তিমকালে তিনি বলেছিলেন, আমি এখানেও জয়নুলের কাছে হেরে গেলাম। ঢাকায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত চারুকলা শিল্পশিক্ষালয়ে প্রাচ্যকলা বিষয়ে তিনিই প্রথম শিক্ষক। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে প্রথম শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। চট্রগ্রাম চারুকলা কলেজ ও শিল্প প্রর্দশনশালা কলাভবন স্থাপন করেন। শিল্পশিক্ষা ও শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় তিনি চিরস্মরণীয়। ব্যক্তিগত জীবনে বিনয়ী, ভদ্র, প্রকৃতি ও মানবপ্রেমিক। তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন যা পাঠ করলে হৃদয় ব্যথিত হয়। একজন শিল্পীর শিল্পসত্ত্বার পরিপূর্ণতা বুঝতে হলে তাঁর সমগ্র জীবনকালের দৈহিক ও বৈশ্বিক সমাজ সংসার, জীবনের গতি প্রকৃতি এবং লীলা বিবর্তন হিসাবের মধ্যে ধারণ করতে হবে।


রশিদ চৌধুরী স্ত্রী

রশিদ চৌধুরী উপনিবেশিক বৃটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা উত্তর তিনটি পর্বের কালদ্রষ্টা। নানা সঙ্গতি, চিন্তা চেতনার পরিবর্তনের ধারায় তিনি সিক্ত হয়েছেন। এ ধারায় শিল্পকর্মও প্রভাব সৃষ্টিকারী তিন পর্বের চেতনার বিকাশ ঘটেছে। বৃটিশ শাসনকাল তার মনোজগতে নানা প্রতিভাস স্ফুরণের কাল। যে পরিবেশে তিনি লালিত-পালিত হয়েছেন সে পরিবেশ পরিলক্ষণে তার মানস গঠন অসমাপ্ত হলেও তিনি মুক্ত নন। তার পরিণত বয়সের চিত্রের মধ্যে সে সব চিত্রকর্ম দেখা যায়। শৈশব-কৈশোরে নিসর্গ ও লোকসংস্কৃতির মধ্যে একটি মুক্ত হৃদয়ের স্বাভাবিক অবগাহন ও নিমজ্জন পরবর্তীকালে তাঁর শৈল্পিক প্রকৃতির ভিত্তি নির্মাণ করেছে। এর অন্তরমূলে রয়েছে মানবতা। এই মানবিক বোধ এমনি এক বিস্তৃত-পরিমণ্ডল যে, সেখানে কোনোরুপ সঙ্কীর্ণতার স্থান ছিল না। অভিজাত মুসলিম পরিবারের সন্তান। সুরা নূর কিংবা অন্যান্য ইসলামিক অনুসঙ্গ নিয়ে চিত্রগঠন তার পক্ষে যেমন স্বাভাবিক ছিল, তেমনি ছিল প্রাচ্য প্রতিচ্যের সংমিশ্রণ। এমন কি ভারতীয় ধর্মীয় রুপগল্পের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগ। এরকম ব্যবহারে তাঁর যে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সূক্ষ্ণরস চেতনা লক্ষ্য করা যায় তা রীতিমত অতুলনীয় অথচ এই বিষয়টাকেও আমাদের সমাজের কেউ কেউ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারতেন না। এ বিষয় শিল্পীর এক বন্ধুর বক্তব্য------

রশিদের শিল্পে একটি বিশেষ ধর্মের চর্চা হত বিধায় ও ভাগ্যে নিন্দা জুটেছিল। শিল্পীত সুন্দরের পূজারী। যদি নিরীহ ঐ দেবদেবীর ভাস্কর্যের মধ্যে সে সৌন্দর্যকে খুঁজে পায় এবং ভাস্কর্যের অন্তর্লীন কোনো বাণীকে যদি ধারণ করতে চায় নির্দোষ রঙে ও রেখায়, কি অধর্ম তাতে? ধর্মত সংস্কৃতিরই অঙ্গ। তার শিল্পকর্ম বিষয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন-----আমরা লক্ষ্য করবো তার মানবিক চেতনা সমাজের উচ্চবিত্ত যাদের সঙ্গে প্রস্তুত সামগ্রীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক। মধ্যবিত্ত যাদের মধ্যে তিনি একজন। আবার পরিধি ছাড়িয়ে ব্যাপক এক গণমুখী পর্যায়ে পরিণতি লাভ করেছিল। তাঁর উদার ব্যক্তি চরিত্রের কারণেই সহজেই তিনি তার নিজস্ব শিল্প মাধ্যমে কাজ করার প্রযুক্তি হিসেবে তাঁতীদের সঙ্গে মিশতে, তাদের কাছ থেকে তাঁত বোনা ও ঢালাইকরদের কাছ থেকে ঢালাইয়ের কলাকৌশল এবং কুমোরদের কাছ থেকে মাটির সামগ্রী তৈরি কায়দা কানুন শিখে নিতে পেরেছিলেন। আসলে তার গণমুখীতা ছিল তাঁর গভীর জাতীয়তা বোধেরই নামান্তর। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত কিংবা সদস্য হতে চাননি।’ শিল্প বিষয়ে রশিদ চৌধুরীর কথা বলেছেন---‘আমি এ ধরনের কোনো বিশেষ গল্পে বিশেষায়িত করতে চাই না। আগেই বলেছি শিল্প হবে সকলের জন্য, সমাজ ও জীবনকে সুন্দর করবার জন্য। সে জন্য সরকারকে, সমাজকেই হতে হবে গণমুখী।’ দেশের প্রখ্যাত একজন বুদ্ধিজীবী তার সম্মন্ধে লিখেছেন-----

শিল্পী হিসাবে তাঁর যে একটা বিশিষ্টতা ছিল, সেটা দেশের নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি এবং সমাজের এক ধরনের ভাঙন লক্ষ্য করে খুবই পিড়ীতবোধ করেছেন। এ অবস্থায় আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্য নিয়ে আলাপ হতো। রাজনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর সীমাবদ্ধতা আছে এ কথা সত্য, কিন্তু তা সত্ত্বেও শিল্পী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সমাজের প্রতি শিল্পী হিসাবে যে দায়িত্ব আছে একথা রশিদ চৌধুরীকে বোঝাবার বিষয় ছিল না। এতটা হতাশা ব্যাপক পরিস্থিতে আশান্বিত হওয়ার জন্য একটা কিছুকে অবলম্বন করার একটা তাগিদ তাঁর মধ্যে ছিল।

আসলে শ্রেষ্ঠ শিল্পত শ্রেষ্ঠ রাজনীতি। এরকম অনুভূতির তারমধ্যে কাজ করতো। সে জন্যই তিনি তার শিল্পকর্মের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন ট্যাপিস্ট্রি শিল্প মাধ্যম। দেশ ও জাতির সুনাম বৃদ্ধি পাবে ব্যবসায়িক উন্নতি হবে, দেশ তার হারান মুসলিনের গৌরব ফিরে পাবে। এ ছিল তাঁর দৃঢ় আশা। তার শিল্প সভ্যতার বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত রশীদ চৌধুরী গ্রন্থে আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা---

তাঁর দ্বিতীয় পর্বের চিত্রমালা ক্রান্তির লক্ষণাক্রান্তি। এখানে বিষয় সম্পর্কে তিনি অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে উঠেছেন। কিন্তু আঙ্গিক নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। চলছে পরীক্ষা নিরীক্ষা তেলরঙে, জলরঙে গোয়াশে, টেম্পারায়। এখানে গ্রামীণ জীবন বিবৃত হয়েছে তার প্রকৃতি পশুপাখি ও পরিমণ্ডল সমেত। বাস্তবানুগ আলোছায়াময় উপস্থাপনের বদলে কিছুটা জ্যামিতিক সরলিকরণ ও উচ্চকৃত সমমাত্রিক বর্ণপ্রয়োগে দ্বিমাত্রিক তল নির্মাণের দ্বারা এ সূচনা।


রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম অবয়বে একই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে শিশুসাদৃশ্য সারল্য। রুপের তারতম্য ও ফ্যান্টাসীর আনাগোনা ক্রমশ এটি রুপ নিচ্ছে মধ্যাকর্ষণবিহীন বস্তুপুঞ্জের দিকচিহ্নহীন বিচরণশীলতায়, শাগালিয় প্রভাবের পরিপুষ্ট উপস্থিতি। তার এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে ট্যাপিস্ট্রিকে নিজের প্রধান মাধ্যম হিসাবে গ্রহনের তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়ার পর তার প্রকাশাবলীতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই ক্রান্তিলগ্নের উদাহরণও দুষ্প্রাপ্য। যা পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, পাখি, মাছ মানুষ অবয়ব ইত্যাদির কিছুটা রুপান্তিরিত ভাসমান বিন্যাস। মাঝে মাঝে রেখার সর্পিল ও ছন্দিত ব্যবহারে কান্দিনিস্কি থাকেন অবচেতনে। চিত্রতলের বিন্যাসে ও দীপ্রর্বতনের নৃত্যশীল বিচরণে এই শিল্পীর প্রভাব পরবর্তী পর্যায়ে হয়ত আরো বিশেষভাবে অনুভূত হবে।

কান্দিনিস্কির মতোই রশীদ চৌধুরী আজীবন ছিলেন সঙ্গীতের বিশেষ অনুরাগী এবং চিত্রের পটে সাঙ্গীতিক সিস্ফনির আবেগ উভয়েরশিল্পের অন্যতম চরিত্র। তার শিল্পীমনের সাঙ্গীতিক সিস্ফনির শিল্পকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থকেনি যখন তাঁকে দেখা যায় কবিতার আয়তনীর মধ্যে। কবিতার আয়তন সীমানায় অবরুদ্ধ নয়। কিন্ত রশিদ চৌধুরীর কবিতার বিচরণ ক্ষেত্র জীবন বাস্তবতার অতি সন্নিকট। পারিবারিক মমত্ববোধ বা মুক্তিযুদ্ধের অতিবাস্তবতায় তিনি ছন্দলোকের পরাবাস্তবতার চেয়ে জীবন ঘনিষ্ঠতার উষ্ণ আবেগে সুনীল বা বুদ্ধদেব। কবিতার প্রতি তাঁর কথা----‘আমি নকশাই করি, যাকে ছবি আঁকা বলি। শব্দ সাজান কবি যাকে কবিতা বলি। আমার রক্তে আছে মায়ের আদরের নকশী করা কাঁথা। তাই আদরের কাঁথাকে যদি নকশী করি, নিশ্চয়ই নকশী কবিতা বলে ডাকলে দোষ হবে না। হলে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।’ রশিদ চৌধুরী------

তনয়াদের প্রতি

তোমরা চলে গেছ।

প্রতিদিন তাই ভাবি

যখন অজস্র বৃষ্টি নামে

আবার কিছু গুলির শব্দে

আতঙ্কিত হই

আশপাশে আগুন

লেগেছে দেখে।

ভাবি তোমরা চলে গেছ

আমাদের ঘরগুলো এলোমেলো

বেড়ালকে দেখে খুব মায়া হয়।

তোমরা ফিরবে কি

হঠাৎ এ আলো নিভে যাক


এ পর্দা দুলে উঠুক

অশরীরি অন্ধকার বাতাস

বলে উঠুক চল এখনি চল

আমি যেন উঠে বসি

বিবেক কাফনে মোড়া

লাশের মতো কবরের মাঝে

দু’পা বাড়ালে যেন

অনন্ত বাতাস অজস্র

[ স্ত্রী ও মেয়েদের ফ্রান্সে পাঠানোর পর তনয়াদের প্রতি তার আবেগের মূর্ততা]

সান্ধ্য আইন

সুনয়নী, তোমার চোখের তাক করা ঐ মেশিনগানে। শ্যামল দেহের শহর জুড়ে অলিগলির মোড়ে মোড়ে। সদরঘাটের উষ্ণ ঠোঁটে ভাববো আমি সান্ধ্য আইন। নিজেই আমি মারমুখো আজ সেই জনতা। থোরাই তোমার নিষিদ্ধতা।

যুদ্ধ প্রেম

যুদ্ধ মানে ভালবাসার নীল নকশার রণাঙ্গন

যুদ্ধ মানে মারমুখী এ্যাম্বুশ আর তল্লাসী

যুদ্ধ মানে বন্ধ করে গ্রেনেড ছোড়া

তুমি আমি অনেকক্ষণ

যুদ্ধ মানে মান অভিমান গরম ঠোঁটে সারেন্ডার

যুদ্ধ মানে চিরকালের সুখ দুঃখের কারাগার

সময় নেই

বন্ধুবর্গ উৎসর্গিত তোমাদের সবুজ

ময়দানে ছড়ানো সাদা গোলাপ

বিধবা সুন্দর সমাজের সমাদর

কিছু অপ্রসঙ্গিক সংলাপের

নিচে লাল সুতোগুলো অন্ধকারে

গাঢ় করে রাখো।


কিছু ফুলদানী

এ্যাসট্রে কার্পেট ওঠানামা

সিঁড়িতে সময় পায়ে পায়ে ওঠা নামা

আমার সময় নেই

শব্দহীন সময়

[১৯৮৬ মৃত্যুশয্যায় লেখা]

রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম শেষ কবিতায় লাল সুতোগুলো গাঢ় করে রাখ এটাই তার শিল্প জীবনের পরিপূর্ণতার তৃতীয় স্তর। ট্যাপেস্ট্রি শিল্পের রঙিন সুতোর বুনন কুশলতায় তার শিল্প জীবনের সকল সার্থকতা। এখানে শিল্প কেবল শিল্পের জন্য (Art for Arts sake) প্রচলিত প্রবাদ সংজ্ঞার দুর্বোধ্যতাকে তিনি সরলীকরণ, গুণমুখী ও প্রত্যাহিক করে তুলেছেন। ফরমায়েশি কাজের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীন চিন্তামত অনেক সময়েই কাজ করতে পারেননি, তবুও চেষ্টা করেছেন রেখাচিত্রে, কাগজে, গোয়াস বা জলরঙ কিংবা ছবির মধ্যে, পোড়ামাটির ভাস্কর্যে। কখনো ছোট মাপের ট্রাপিস্ট্রিতে দেখা মেলে ভিন্ন জগতের কিছু প্রয়াস। লক্ষ্মীর সরা বরাবরই তাঁর পছন্দের বস্তু। এক সময় এঁকেছেন বেশ কিছু সরাচিত্র। যা বিভিন্ন মাত্রায় শিল্পচিন্তার পরিচায়ক। তবে তিনি বরাবরই শিল্পের জীবন বিমূখ আত্মমুখীতার বিরোধী ছিলেন। তিনি ছিলেন ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস প্রতিষ্ঠিত ‘বাই হাউসের’ একনিষ্ঠ অনুরাগী। বাইহাউসে চারুশিল্পের সাথে স্থাপত্য ও প্রায়োগিক শিল্পের একটি সাফল্যজনক সম্মিলন সূচনা হয়েছিল। যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কান্দিনাস্কি, পল ক্লির মতো শিল্পীরা। তাঁর স্বপ্ন ছিল চট্রগ্রাম চারুকলা কলেজের সমন্বয়ে বাই হাউসের আদলে একটি স্বয়ংসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা শুধু চিত্র ভাস্করই তৈরি করবে না, বরং সারাদেশের শিল্পকারখানার জন্য সরবরাহ করবে প্রোডাক্ট ডিজাইনার, আলোকচিত্রী, বিজ্ঞাপন শিল্পী,  ইন্টেরিয়র ও ফ্যাশান ডিজাইনার। তাঁর স্বপ্ন ছিল চট্রগ্রামে একটি স্থায়ী কারুপল্লী গড়ে তোলা। যেখানে কারু ও বয়নশিল্পীরা সারাবছর কাজ করবে। থাকবে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং বিক্রয় কেন্দ্র। শিল্পপল্লী নামে ১৯৬৪ সালে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থাপন করেছিলেন উপমহাদেশের প্রথম ট্যাপেস্টি কারখানা। ট্যাপিস্ট্রির উপাদান হিসেবেও নানান দেশীয় উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। ব্যবহার করেছেন পাট, পশম, রেশম প্রভৃতি দেশীয় বস্তু। এসব তাঁর সমাজ ও স্বদেশীয় ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তাঁর অকাল মৃত্যু না হলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব থাকত অকল্পনীয়।

স্ট্রাককার বা সংগঠনের বাঁধুনিই রশিদ চৌধুরী ট্যাপেস্ট্রি ও অন্যান্য শিল্পের জোরালো গুণ। এই সংগঠনের জোড়ালো সূত্রগুলো কী? সেগুলো নিতান্তই সরল পরিমিত এবং বেসিক ডিজাইন ও মৌলিক নকশায় নিয়ম মেনে গড়া। মূল গল্পটি তিনি নিয়েছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিগ্রহশৈলী থেকে। বিশেষ করে দেবী প্রতিমার রুপের আদল থেকে। সেখানেও দশভূজা দুর্গা, রাধাকৃষ্ণ ও কালীমূর্তির উত্তোলিত হাতের বিভিন্ন বিন্যাস তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। তবে এখানেই তিনি বসে থাকেননি। প্রাথমিক বর্ণ ব্যবহারের উদ্দীপনাটি তিনি লাভ করেছিলেন লোক চিত্রকলার ঐতিহ্য থেকে, বিশেষ করে পটচিত্র ও লক্ষীর সরার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল বেশি। অবশ্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সফি উদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী সবাই এ মাধ্যমে কাজ করেছেন। কিন্তু রশিদ চৌধুরীর ধারাটি ভিন্ন। তাঁর গ্রহণের ধারণা অনেকটাই অপ্রতক্ষ্য, রুপকাশ্রিত ও রুপান্তরিত। অন্যরা যেখানে আকৃষ্ট হয়েছেন লোককলার সহজীয়া দৃশ্যগত উপাদানে সেখানে রশিদ চৌধুরী রেখে গিয়েছেন লোকজীবনের অপ্রতক্ষ্য পুরাণ পুঁথি, পাঁচালি, পূজা-পার্বন আর স্মৃতি ও স্বপ্নের জগৎ। তিনি সে সবকে এমনভাবে বিমূর্ততায় রুপান্তরিত করেছেন যে, তাঁর ক্যালিওগ্রাফীতে বাংলার সম্প্রদায়গত গোষ্ঠী মানুষের ধর্মীয় চেতনারও সকল প্রকাশ রয়েছে। ইউসুফ হোসেন চৌধুরী ছিলেন রাজবাড়ির একজন জাদরেল উকিল ও রাজনীতিবিদ। তিন পুরুষের জমিদারীর পিতামহ ফয়েজ বক্স। পিতামহের ভ্রাতা করিম বক্স। চাচা আলীমুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন উকিল, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। হাড়োয়ায় পুরাতন আটচালা বাড়ি। সাঁইত্রিশ একর জুড়ে ছিল তার সীমানা। ঘর থেকে বের হয়ে খানিকটা এগুলেই বড় বড় দুটো পুকুর।


রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম তারপর দীর্ঘ প্রাচীর এবং পিছনে পদ্মা নদী। গোয়ালন্দ-কলিকাতা বিস্তৃত রেলপথ বাড়ির আঙিনা ঘেঁষে চলে গেছে। পাশেই রেলস্টেশন। নদীর কুল কুল ধ্বনি, রেলের ঝমাঝম, মানুষের কর্ম কোলাহল তাঁর মন ছুঁয়ে যায়। তিনি স্বর্ণকান্তি ছিলেন না। ছিলেন কালো, ছিপছিপে, রুগ্ন। এ জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে তাঁর পারিবারিক চৌহদ্দীর মধ্যেও কৃষিসামন্ত-সংস্কৃতি বহমান ছিল। পহেলা বৈশাখে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নাচ-গান, মহররমের সময় লাঠিখেলা, পদ্মায় নৌকাবাইচ, যাত্রা, রাধাকৃষ্ণের পালা, কনক (বশির চৌধুরীর ডাক নাম) এসব দেখছেন। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ধারার সঙ্গে তাঁর চেতানার প্রথম সংযোগ ঘটেছিল। ছেলেবেলার পদ্মানদী তাঁর হৃদয়ের অনেকটা জুড়ে ছিল। বর্ষাকালে তরঙ্গমুখর পদ্মা প্রমত্তরুপ এবং শীতকালে দিগন্ত বিস্তৃত রুপালি বালুর মায়াবী বিছানা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকতো। নদীর কোলে কুটির বাসিকে নদীর ভাঙ্গনে ভাঙ্গে কপাল। আবার যখন ঐ নদীর বুকে জাগে চর -----ফিরে পায় তাদের জমি, ভিটে, তখন মুখে তাদের হাসি ধরে না। পিতার কাছে তিনি লাঠিয়ালদের গল্প শুনেছেন, শুনেছেন চর দখলের রক্তাক্ত কাহিনী। রশিদ তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘এরা আমার মনোজগতের স্থায়ী সম্পদ।’

তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়। এরপর রজনীকান্ত হাইস্কুল, এরপর আলীমুজ্জামান হাইস্কুল বেলগাছি এবং কলিকাতায় পার্কসার্কাস হাইস্কুল। ভালো ছাত্র ছিলেন বলা যায় না। প্রবেশিকা পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। একদিন তাদের বাড়িতে আসেন এনামুল হক চৌধুরী। তাদের হেনা কাকা যার সাথে জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসানের পরিচয় ছিল। তিনি দেখেন কনক বাড়ির বাইরে গরুর গাড়ির ছবি আঁকায় মগ্ন। হেনা কাকাকে দেকে খুব ভালো লাগল। তিনি তাঁকে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। পিতা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন কিন্তু এ্র্যাডমিশন টেস্টে কৃতকার্য হতে পারলেন না। তবুও তিন মাসে ভালো করার শর্তে অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন তাঁকে ভর্তি করে নেন।

তখন জমিদারী প্রথার বিলুপ্তিতে (১৯৫০) পরিবারটি আর্থিক সঙ্কটে নিপতিত তার উপর পদ্মার ভাঙ্গনে পরিবারটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন। রাজনীতির খরচ মেটাতে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। গোটা পরিবারটি ঢাকায় আসে। এই অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যেও পুরোদমে ছবি আঁকার পাঠ চলে। সারাদিন খাটতেন। চেষ্টার পর চেষ্টা তারপর আবারও চেষ্টা, আরো ভালো করার জন্য। এরই মধ্যে আবারো বিপদ আসে। পিতা যক্ষায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসা ও পথ্য যোগার কঠিন হয়ে ওঠে। রশীদ ছোট কাজ করতেও দ্বিধান্বিত হন না। পথ্য কেনার জন্য নিজের সাইকেলটিও বিক্রি করে দেন। অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার ফলাফলস্বরুপ ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট স্কুল থেকে ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলেন। এরপর ভাস্কর্য শেখার জন্য ১৯৫৬ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তিতে মাদ্রিদে গমন করেন। স্পেনের মাদ্রিদে কেন্দ্রীয় চারুকলা বিদ্যালয়ে ‘ধ্রুপদী’ শৈলীর প্রতিকৃতি ও মাইকেল এ্যাঞ্জোলোর ভাস্কর্য শেখার জন্য এক বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ইউরোপে অবস্থানকালে মার্ক শাগালের প্রলঙ্করী প্রভাবে তিনি আকৃষ্ট হন। দেশে ফিরে এসে ১৯৫৮ সালে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে কিছুকাল শিক্ষাকতা করার পর আবার বিদেশ গমনের সুযোগ পান। ফরাসী সরকারের বৃত্তিতে চিত্রশিল্পীদের স্বপ্নপুরী প্যারিসের বিখ্যাত চারু বিদ্যালয়ে একাডেমীর অব জুলিয়াতে ভাস্কর্য, ফ্রেসকো ও ট্রাপেস্ট্রি বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য গমন করেন। সেখানে তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি শিল্প মাধ্যম যা দ্বারা দেশমাতৃকার সেবা করা যায়। এ স্বপ্ন তাঁর সার্থক হয় ট্যাপেস্ট্রি শিল্প  এবং এটাই তিনি ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এই শিল্প মাধ্যমটিই তাঁকে অবশেষে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি প্যারীকন্যা এ্যানির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার নাম দেন সুচরিত এ্যানি। জমজ দুই কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে নাম রোজা ও রীতা। তিনি ১৯৬৫ সালে দেশে ফিরে এসে ঢাকা আর্ট কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর স্ত্রী ও কন্যাদের মমতায় আবারও প্যারি গমন করেন। দেশের প্রতি যার টান তিনি বিদেশ বিভুইয়ে থাকতে পারে? কিছুকাল পরে প্যারিস থেকে দেশে ফিরে এলেন এবং ১৯৬৯ সালে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ খোলার দায়িত্ব নিয়ে ঐ বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তিনি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম অধ্যাপক ও সভাপতি। এ সময় পূর্ণ উদ্যম ও উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে শুরু হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ। নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ আর ধর্ষণ শিল্পীকে হতবাক করে তোলে।


ইয়াহিয়ার সরকার বাঙালি মনের ক্ষোভ প্রশমনে দেশবরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিকে স্বর্ণপদক প্রদান ঘোষণার কুটকৌশল গ্রহণ করে। তাদের মধ্যে রশীদ চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণায় তিনি মর্মাহত হন এবং স্বর্ণপদক প্রত্যাখান করেন। তাঁর প্রত্যাখানের ভাষা ছিল------

রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম‘যেখানে  জীবনের মূল্য নেই, যেখানে বাঙালিদের পথে ঘাটে পশুর মতো ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে লুণ্ঠন, আগুন, হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা----যা নিজের চোখে দেখা, যেখানে মেয়েদের ব্যারাকে উলঙ্গ করে পাশবিক অত্যাচারের রাজত্ব, কান্নায় বিদ্ধস্ত বাংলা যেখানে এক দোজখে পরিণত; সেখানে শিল্পীর সম্মান এক উলঙ্গ বাচালতা ! তাই সে উলঙ্গ পশুকে সম্মোধন করে বলছি, তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্যের জন্য তোমার দেয়া কোনো সম্মান কোনো বিবেক সম্পন্ন বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলার শিল্পীর সম্মান, বাঙালীর হাত থেকেই গ্রহণযোগ্য। তোমার কোনো অধিকার নেই সম্মাননার। তোমার স্বর্ণপদক তোমার মুখে ছুঁড়ে আজ একমাত্র তোমার ধ্বংস কামনা করে বাঙালী। সফল হোক জয় বাংলার। বাংলার জয় হোক।’ (সম্পূর্ণ বিবরণ ১৯৭১ ও রশীদ চৌধুরী। ত্রৈমাসিক পত্রিকা পৃষ্ঠা-৭৫-৭৯)।

ইতিপূর্বে এপ্রিল মাসে তিনি স্ত্রী ও কন্যাদের প্যারিসে পাঠিয়ে দেন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসে গমন করেন। একাত্তরের বিজয় তাঁর শিল্পী সত্ত্বাকে জাগ্রত করল। অবিলম্বে তিনি দেশে ফিরে আসার মনস্থ করলেন। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারের কাছ থেকেও কাজে যোগদানের জন্য তাগাদাপত্র পাচ্ছিলেন। তিনি প্যারীতে খুব অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন রাষ্ট্রদূতের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে কাজে যোগদান করেন। কিন্তু নানা অজুহাতে তাঁর বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য পরবর্তীতে এ সঙ্কট দূর হয়। কর্মজীবনে রশীদ চৌধুরী প্রথম ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে অঙ্কন ও চিত্রাঙ্কন বিদ্যার শিক্ষক (১৯৫৪-১৯৬০), চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রাচ্য শিল্পের প্রভাষক (১৯৬০-১৯৬৫) বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদে খণ্ডকালীন শিক্ষক (১৯৬৪-১৯৬৬), চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (১৯৭৮-১৯৮০)। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সভাপতি (১৯৭১-১৯৭৭)। তাঁর নিজের গড়া স্টুডিওতে ট্যাপিস্ট্রি উৎপাদন (১৯৮১-১৯৮৬)।

রশীদ চৌধুরীর সৃষ্টিকর্ম

একক প্রদর্শনী

১৯৫৪-একক পেইন্টিং ও ড্রইং প্রদর্শনী, প্রেসক্লাব, ঢাকা

১৯৫৫-পেইন্টিং ড্রইং প্রদর্শনী, কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, চট্রগ্রাম

১৯৬৯- পেইন্টিং ড্রইং ও জলরং, কোয়ে দে বো আর্ট গ্যালারী প্যারি, ফ্রন্স

১৯৬২-পেইন্টিং ড্রয়িং ও জল রং গ্যালারী পারনিয়ে প্যারী, ফ্রান্স

১৯৬৪- পেইন্টিং ড্রয়িং ও জল রং গ্যালারী পারনিয়ে প্যারী, ফ্রান্স

১৯৬৫- ট্যাপেস্ট্রি, পেইন্টিং, ড্রয়িং ও জল রং, বাংলা একাডেমী, ঢাকা

১৯৬৬- পেইন্টিং ও ড্রয়িং সোসাইটি অব কনটেমপোরারী আর্ট, রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান

১৯৭০- ট্যাপিস্ট্রি ও পেইন্টিং, আলিয়ঁস ফ্রাসেইজ, চট্রগ্রাম


১৯৭২- ট্যাপিস্ট্রি, পেইন্টিং ও ড্রয়িং, কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউট, লন্ডন

১৯৭৩- ট্যাপিস্ট্রি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথ্যকেন্দ্র, চট্রগ্রাম

যুক্ত প্রদর্শনী *১

১৯৫১ - প্রথম বার্ষিক প্রদর্শনী, ঢাকা গ্রুপ, ঢাকা

১৯৫২ - দ্বিতীয় বার্ষিক প্রদর্শনী, ঢাকা আর্ট গ্রুপ, ঢাকা

১৯৫৩ - প্রথম বার্ষিক প্রদর্শনী, গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস, ঢাকা

১৯৫৪ - নিখিল পাকিস্তান চিত্র প্রদর্শনী, ঢাকা

১৯৫৭ - নয়জন পূর্ব-পাকিস্তান চিত্রকর, ওয়াশিংটন ডিসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

১৯৫৮ - গ্রুপ শো, বৃটিশ কাউন্সিল মিলনায়তন, ঢাকা

১৯৫৯ - দ্বিতীয় জাতীয় বার্ষিক প্রদর্শনী, করাচী, পাকিস্তান

১৯৬০ - তৃতীয় বার্ষিক চিত্র ও ভাস্কর্য প্রদর্শনী, করাচী, পাকিস্তান

১৯৬১ - সমকালীন পাকিস্তানি চিত্রশিল্প, মিলান, ইতালি

১৯৬১ - দ্বিতীয় দ্বি-বার্ষিক আন্তর্জাতিক তরুণ চিত্রশিল্পী প্রদর্শনী, মিউজিয়াম অফ আর্টস প্যারী ফ্রান্স

১৯৬১ - সমকালীন চিত্র কর্ম, ঢাকা

১৯৬২ - ঢাকা স্কুল অব পেইন্টিংস, ঢাকা

১৯৬৮ - তৃতীয় দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক তরুণ চিত্রশিল্প প্রদর্শনী, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্টস, প্যারীস, ফ্রান্স

১৯৬৬ - পূর্ব-পাকিস্তানী চিত্রশিল্পী, রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান

১৯৬৬ - পঞ্চম তেহরান দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী, তেহরান, ইরান

১৯৭২ - নবম দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী, সা-তোঁ, ফ্রান্স

১৯৭৪ - সমকালীন বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী, কলিকাতা, দিল্লী ও মুম্বাই, ভারত

১৯৭৪ - বাংলাদেশের চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের রজত জয়ন্তী, ঢাকা

১৯৭৮ - চতুর্থ ত্রিবার্ষিক, ভারতবর্ষ, নয়াদিল্লী, ভারত

১৯৮০ - জাতীয় চিত্রশিল্প প্রদর্শনী, শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা

১৯৮০ - এশীয় চিত্রশিল্প প্রদর্শনী পার্ট-২, ফাকাউকা, জাপান

১৯৮১ - এশীয় চিত্রশিল্প বাংলাদেশ, ঢাকা


১৯৮৫ - এশীয় চিত্রশিল্প বাইয়েনিয়্যাল, ঢাকা

অর্পিত কার্য সম্পাদন *১

রশীদ চৌধুরী দেশে বিদেশে বিভিন্ন সরকারের হয়ে চিত্রকর্ম সম্পাদন করতেন। ১৯৬৩ সালে ফরাসী সরকারের মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ট্যাপেস্ট্রি ও ডিজাইনের কাজ সম্পাদন করেন। ১৯৬৪ ফ্রান্সের ইসুসুয়াতে অবস্থিত সরকারি কলেজে মুরাল এর কাজ করেন। ১৯৬৫-১৯৬৭ সালে যথাক্রমে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ পাট বিপণন সংস্থার ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে ট্যাপিস্ট্রির কাজ সম্পাদন করেন। ১৯৬৯ সালে ট্যাপিস্ট্রি ছাড়াও ফ্রেসকো চিত্রণের কাজে তাঁকে যেতে হয় ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ঐ একই বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের দেয়াল রশীদ চৌধুরীর ট্যাপিস্ট্রি লাভ করে। এরপর ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ এই তের বছর দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুরোধ আসে ট্যাপিস্ট্রির জন্য। আসে গণভবন থেকে (১৯৭৩), ম্যানিলাস্থ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে (১৯৭৫), জেদ্দার ইসলামী ব্যাংক (১৯৭৮), বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় (১৯৭৬), ব্যাংক অব ক্রেডিট এন্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা (১৯৭৮-১৯৮১), ব্যংক ক্রেডিট ইন্টারন্যাশনাল (১৯৭৯) চট্রগ্রাম। সংসদ ভবন ঢাকা, ওসমানী মিলনাতন ঢাকা থেকে ট্যাপিস্ট্রি সংগ্রহের অনুরোধ আসে। উল্লেখ্য ঢাকা ক্যন্টমেন্টস্থ বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে তাঁর টেরাকোটা ম্যুরালের কাজও অপূর্ব।

প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহ *১

১। বঙ্গভবন - ট্যাপেস্ট্রি

২। বিদেশ মন্ত্রণালয় প্যারী, ট্যাপেস্ট্রি

৩। ভারতীয় জাতীয় জাদুঘর, ট্যাপেস্ট্রি

৪। ঢাকা যাদুঘর, ট্যাপেস্ট্রি

৫। সেক্রেটারী জেনারেল, জাতিসংঘ, ট্যাপেস্ট্রি

৬। প্রেসিডেন্ট ভবন, মিশর, ট্যাপেস্ট্রি

৭। প্রেসিডেন্ট ভবন, যুগোশ্লাভিয়া, ট্যাপেস্ট্রি

৮। প্রেসিডেন্ট ভবন, ভারত, ট্যাপেস্ট্রি

৯। প্রধানমন্ত্রী ভবন, অষ্ট্রেলিয়া, ট্যাপেস্ট্রি

১০। প্রধানমন্ত্রী ভবন, ব্রহ্মদেশ, ট্যাপেস্ট্রি

১১। চট্রগ্রাম জাদুঘর, ট্যাপেস্ট্রি

পুরস্কার

১৯৬১ - প্যারীস্থ রোজ আর্ট কর্তৃক ফ্রেসকো চিত্রকর্মের জন্য প্রথম পুরস্কার

১৯৬৭ - তেহরান আর, সি, ডি - দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার


১৯৭৭ - চারুকলায় বিশেষ করে ট্যাপেস্ট্রিতে সৃজন ক্ষমতার জন্য একুশে পদক

১৯৮০- বাংলাদেশ শিল্পকলা ‍একাডেমী পুরস্কার

১৯৮৬ - জয়নুল পুরস্কার

* তথ্যসূত্র- রশীদ চৌধুরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, পৃষ্ঠা - ৩৬, ৩৭, ৩৮ ট্যাপেস্ট্রি শিল্পকর্মে রশীদ চৌধুরীর অবদান------

ট্যাপেস্ট্রি হল এমন এক শিল্পকর্ম যা উঁচু মানের বস্ত্রের উপর রঙিন এমব্রয়ডারী অথবা বুননের মাধ্যমে সমাধা করা। বোনার কাজটি সম্পন্ন করা হয় অলঙ্কার অথবা নানা চিত্র সম্বলিত নকশা অনুসরণ করে। তাপিশ্রীর কাজ জানালার পর্দা বসার আবরণী, উৎসবাদিতে জানালা অথবা ঝুল বারান্দায় ঝুলন্ত বর্হিভূষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দ্বি-মাত্রিক পেইন্টিং ও গ্রাফিক আর্টের মতো তাপিশ্রীও বহু বাড়ির দেয়ালসজ্জার উপকরণ রুপে ব্যবহার দেখা যায়। দামী কাপড়ের উপর যেখানে অলঙ্কার ও চিত্র সম্বলিত নকশা। পোড়েনের সুতো দিযে বোনা হয় তা সাধারণত রঙিন উল, বিশিষ্ট অথবা পাট এর হয়ে থাকে। পোড়েনের সুতা সোনালি অথবা রুপালি রঙের হয়। ট্যাপেস্ট্রি অন্যান্য বয়ন শিল্পের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। এর পোড়েনের সুতো পুরো নকশা জুড়ে বিস্তৃত হয় না। আবার অনেক সময় নকশার রঙ বুঝে কিম্বা এলাকা বুঝে ট্যাপেস্ট্রির পটভূমিতে পোড়েনের সুতা ব্যবহৃত হয়।

ট্যাপেস্ট্রি খুবই পুরনো শিল্প মাধ্যম। প্রাচীনকালের পিরামিডের অভ্যন্তরে এর সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রাচ্য দেশে প্রথমত এর ব্যবহার দেখা গেলেও ৮ম, ৯ম শতাব্দী থেকে পাশ্চাত্যে বিশেষ করে ইউরোপে এর বিকাশ ঘটে। আধুনিক বিশ্বে ফ্রান্সই হল ট্যাপেস্ট্রির বড় উৎপাদক দেশ। বেলজিয়াম, পর্তুগাল এবং আরো কিছু পশ্চিমা দেশে ট্যাপেস্ট্রি উৎপাদিত হয়। এই শিল্পটি খুবই শৈল্পিক সূক্ষ্ণ সমন্বিত কাজ। চাহিদার তুলনায় এর উৎপাদন কম, দামও বেশি। এর জনপ্রিয়তার কারণ ট্যাপেস্ট্রি অন্যান্য সুকুমার শিল্পের চোখে খুবই হালকা, সহজেই বহনযোগ্য, ভাঁজ করা যায় রক্ষণাবেক্ষনের ব্যায় খুবই কম এবং অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের মতো ভঙ্গুর নয়। সবচেয়ে বড় ট্যাপেস্ট্রি সজ্জিতকরণ দেয়াল বা বসার স্থান যেন মুহুর্তেই অহঙ্কারী হয়ে ওঠে এই উপলদ্ধি ট্যাপেস্ট্রি সংগ্রাহকদের। এ কারণেই ধনী দেশের নাগরিক ও  প্রতিষ্ঠান ট্যাপেস্ট্রির অধিকারী হয়ে গর্ববোধ করে।

রশিদ চৌধুরীর শিল্পকর্ম শিল্পী রশীদ চৌধুরীই একমাত্র ব্যক্তি যিনি উপমহাদেশে ১৯৬৪ সালে প্রথম একলুম বিশিষ্ট ঢাকাতে ট্যাপিস্ট্রি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তা মীরপুর দশ নম্বর সেকশনে চারলুম বিশিষ্ট স্টুডিওতে পরিণত হয়। তিনি নিজে তাঁত শিল্পী ও প্রশাসনিক কর্মকার্তাকে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নতমানের ট্যাপেস্ট্রি উৎপাদন শুরু করেন। বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক তাঁতী এ প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ট্যাপেস্ট্রি পল্লী গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর ভাবনা ছিল পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে এদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে। এ বিষয়ে তিনি তাঁর মতামত এভাবেই ব্যক্ত করেন-------‘এই মাধ্যমটিকে একটি আধুনিক হস্তশিল্পের মধ্যে ধরা হলেও চারুকলা বা ফাইন আর্টের মাধ্যমরুপে এর বেশি পরিচয়। তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসে রঙ লাগানোর পরিবর্তে রঙিন সুতো (রেশম পশম) দিয়ে ‍বুনিয়ে একটি ছবি তৈরিকেই ট্যাপেস্ট্রি বা তাপশ্রী বলা হয়। বর্তমানে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে দেয়াল চিত্রের মাধ্যম হিসেবে এর খুবই সমাদর। বেশিরভাগই এগুলো উন্নত দেশগুলোতে তৈরি হয় তবে চারুকলার মাধ্যম হিসেবে ফ্রান্সের দক্ষতাই সবচেয়ে উপরে। মাধ্যমটি মূলত প্রাচ্য দেশ থেকেই ইউরোপে গিয়েছিল। ব্যবহারের অভাবে বর্তমান প্রাচ্যে এর প্রচলন ও খুবই কম। বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে গত ষোল বছর কাজ করে আসছি। প্যারীতে রোজ আর্টে  আমি চার বছর বিষয়টি নিয়ে বহু কাজ করেছি এবং একই সাথে ফরাসী সরকারের নিজস্ব তাপশ্রী কারখানা গোবলাতে আঙ্গিক বা টেকনিক্যাল শিক্ষানবিশ ছিলাম। গত চার বছর যাবৎ দেশে বিভিন্ন উপাদান নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি। বিশেষ করে দেশজ পাট ও রেশম নিয়ে। বিদেশে তৈরি তাপিশ্রী থেকে আমাদের দেশে এর দাম পড়ে চারভাগের একভাগে। আধুনিক অভ্যন্তরীণ গৃহসজ্জার একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে এর সমাদর রয়েছে, সমগ্র বিশ্বে।


আমাদের নিজস্ব ডিজাইন ও পাট রেশম দিয়ে তৈরি করলে বিদেশে উৎপাদিত তাপিশ্র্রীর চেয়ে এর নিজস্বতা ও বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে সেই সাথে দামও পড়বে আনুপাতিক হারে কম। ‘বাংলার রুপ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রুপ আমি খুঁজিতে চাই না’ জীবনানন্দের এই উক্তি শিল্পী রশীদের কাছে মায়া মমতার এক মূর্তরুপ। তাঁর শিল্পকর্ম বাংলার গণমানুষের ভাগ্যোন্নোয়নে নিবেদিত। বাংলার সূচিশিল্প, মসলিন, জামদানী, হস্তশিল্প আবহমানকালের ঐতিহ্য যা তাঁর মানসলোকের প্রতিভাসরুপে ট্যাপিস্ট্রিতে প্রকাশ লাভ করে। ট্যাপিস্ট্রির মাধ্যমে তিনি বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন, দারিদ্রপিড়ীত বাংলার গণমানুষের সুখ ও স্বাচ্ছন্দের দ্বার খুলে দিয়েছেন। আজকের দিনে পোশাক শিল্প যেভাবে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার খুলে দিয়েছে এর পিছনে রশীদের ট্যাপিস্ট্রি উৎপাদন প্রয়াস ক্ষুদ্র করে দেখার অবকাশ নেই। এ মহান শিল্পী ১২ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

শিল্পী মনসুর উল করিম

চিত্রশিল্পী মনসুরুল করিম ২৪ অক্টোবর ২০০৭। রাজবাড়ি পৌর মিলনায়তনে শিল্পী মনসুর উল করিম ও তাঁর কন্যা সাদিয়া শামীম মনসুর এর যৌথ চিত্র প্রদর্শনী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আয়োজক অরণি সংঘ। প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক বেগম তৌহিদা বুলবুল। বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার, ড. ফকীর আব্দুর রশীদ, প্রফেসর শংকর চন্দ্র সিনহা, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর, অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল আলম দুলাল। সভাপতি ড. সুলতানা আলম। উপস্থাপনা করছেন সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান। না গরম না শীতের বিকেলে পৌর মিলনায়তানের বারান্দায় মঞ্চে অতিথিবৃন্দ। সামনে খোলা আকাশের নিচে শ্রোতা দর্শক। পড়ন্ত বিকেলের আলো আঁধারীর সম্মোহনে বক্তা ও শ্রোতা আনন্দ বিহবল। রাজবাড়িতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর আঁকা ছবির আড়ম্বরপূর্ণ এমন প্রদর্শনী পূর্বের ইতিহাস খোঁজ করে পাইনি। বিশ্বখ্যাত মহান শিল্পী রশীদ চৌধুরীর জন্ম ও জীবনের একাংশ রাজবাড়িতে কেটেছে। তাঁর চিত্র কর্মের প্রদর্শনী করা সম্ভব হয়নি। তাঁরই যোগ্য ছাত্র শিল্পী মনসুর উল করিম ও তাঁর যোগ্য সন্তান সাদিয়া শামীম মনসুরের আঁকা ছবির প্রদর্শনী নিঃ সন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা। শুরুতেই এ মহান শিল্পী নিজ জন্মস্থান কালিকাপুর ও শৈশবের স্মৃতিমাখা পথ, ঘাট মাঠ, বন, বৃক্ষ, লতা, ফুল, রং জীবনের নানা চড়াই উৎড়াই নিয়ে কথা শুরু করলেন এভাবে ‘মনে পড়ে, মনে পড়ে না’------সঠিক অর্থেই শিল্পী মনের অভিব্যক্তি। একে একে রাজবাড়ি জেলা স্কুলের স্মৃতিমাখা দিনের কথা, শিক্ষাগুরু গুফুর স্যার এর উৎসাহের কথা, আবেগভরে কলেজে অধ্যয়নকালে (১৯৬৫-১৯৬৭) ছবি আঁকার কথা, তাঁর প্রতিভা বিকাশে ড. ফকীর আব্দুর রশীদ স্যার এর আন্তরিক উৎসাহ ও পথ নির্দেশের কথা, প্রফেসর শঙ্কর স্যারের প্রতি শ্রদ্ধার কথা ব্যক্ত করলেন। শিল্পী তাঁর বক্তব্যে সংক্ষিপ্ত বিবরণে শিল্পী জীবনের শুরু, সংগ্রাম আর প্রাপ্তির কথা তুলে ধরলেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছবি আঁকতেন। পদ্মার উত্থিত দ্বীপের কোলের রাজবাড়ি শস্য শ্যামল। পলল মাটির উর্বরতায় সবুজের মধ্যে সাদা শাপলা, লাল সাদায় পদ্ম, লাল গোলাপ, টকটকে লাল জবা। রাজবাড়ির সবুজ ‍বৃক্ষ, শস্য শ্যামল ক্ষেত, রক্তলাল জবা শৈশবে তাঁর চেতনায় মায়াবী প্রতিভাসের ছায়া ফেলেছিল। এর প্রতিচ্ছবি মনসুর উল করিমের শিল্পের বিশেষ অঙ্গসৌষ্ঠব। ফলে তাঁর সকল ছবিতেই প্রাধান্য পায় সবুজ আর লাল রং। রাজবাড়ি জেলার মাটির স্পর্শ নিয়ে তাঁর কেটেছে শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের একাংশ। জীবনের পরবর্তী অংশ কাটে পাহাড় আর সমতলের চট্রগ্রামে। বসতির সমীকরণে মূল বসতির মাটি তাঁকে ফিরে ফিরে টানে। শিল্পীর অবচেতন মনে মূল বসতির মাটির অনুভব ফিরে আসে বারবার। ‘মৃত্তিকার নানা কথা’ নামক এ প্রদর্শনীতে মাটির প্রতি সে মায়া মমতার কথা এসেছে। চিত্রপ্রদর্শনী পরিচিতিপত্রে তিনি লিখেছেন------

‘শৈশবের কথা মনে পড়ে কত বছর হবে। কয়েক দশক আগে। কত উচ্ছলতা ছিল প্রাণে। স্কুল, খেলাদুলা, আড্ডা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি ছবি আাঁকা। সবই ছিল প্রাণের আলোয়। সেই মাটিতেই এতদিন পর আঁকা ছবির প্রদর্শনী। শুধু আমার একার নয়।


আমার স্নেহময়ী কন্যার আঁকা ছবি ফিরে এসেছে এই শহরে। এই মাটির সোঁদা গন্ধে। আমি তো দীর্ঘপথ যাত্রী আর আমার কন্যা সাদিয়া শামীম মনসুর সবে যাত্রা শুরু করেছে তার গন্তব্যের পথে। সেও আলোর প্রত্যাশী। ছবি আঁকার হাতেখড়ি পড়েছে মাত্র। জীবনকে কেবল চিনতে শুরু করেছে। চিনতে সাহস করেছে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি ছবির প্রদর্শনী করতে। চট্রগ্রামে বেড়ে ওঠা শৈশব কৈশোর অতিক্রম করে পদ্মা নদীর এপাড়েই তার জীবন। সে কথা শুধু মনের নয়, শুধু প্রাণেরও নয়, স্বপ্নে আকাশে কুসুমে।’

মাটির প্রতি তাঁর ও কন্যার এ ভালোবাসার কথা তিনি জানালেন। তাঁর অনেক ছবিরই ভাব অনুকরণ রাজবাড়ির মাটি, গ্রাম, নদী, মানুষ যেখানে তাঁর মানসলোকের উৎপাদন সম্ভার মনোজগতে লুকিয়ে আছে। প্রদর্শনীতে অনুপম ছবির মধ্যে সাদীয়া শামীমের আঁকা ‘মাছধরা’, ‘বানভাসী’, ‘অরণ্য’, ‘লাল মাছ’ ‘সবুজ জাল’ যা রাজবাড়ির নৈমত্তিক জীবন। পেইটিংএ রঙের বাহারে অতুলনীয়। শিল্পীর তুলির আঁচড়ে কৌশলী ও নিপুণতার ছাপ। মূর্ত আর বিমূর্তের সংমিশ্রণ ঘটেছে। মূর্ততা ছাড়িয়ে তিনি বাবার বিমূর্ততাকে হয়ত একদিন ছাড়িয়ে যাবেন। রাজবাড়ির তথা দেশের সম্মান বৃদ্ধি করবেন।

শিল্পী মনসুর উল করিমের মৃত্তিকার নানা কথা সিরিজের সকল ছবিই বিমূর্তের প্রকাশ। মূর্ত মাটি মানুষ, জীব, বৃক্ষ, লতা, সাগর, পাহাড়, ফুল, ফল একে অপরের গ্রন্থীযোগে আবদ্ধ। তারপরেও মাটিই আদি, অকৃত্রিম। কৃত্রিমতার সাথে আদি অকৃত্রিম মাটি কত ভাগে, কত ঘাতে, কত ভাঙ্গনে, কত সংহারে, কত ভালোবাসায়, কত রুপে রুপ বদলায়। তারই বিমূর্ত রুপ দেখি তাঁর প্রদর্শনীর মৃত্তিকার নানা কথা ছবির সিরিজে। বিমূর্ততা সাধারণ্যে অগম্য, অবোদ্ধ। অথচ আমাদের মনের টান ঐ দিকেই। শিল্পী ছবি আঁকেন ক্যানভাসে। এই ক্যানভাসের আসল কোনো পরিচিতি নেই। কাগজের তৈরি ক্যানভাস, কাঠের তৈরি ক্যানভাস, কাপড়ের তৈরি ক্যানভাস সবই ক্যানভাস। অনুরুপ পাহাড়ের গা, পাথরের গা, মাটির গা এমনি আমাদের গা ক্যানভাস। আদিমকাল থেকেই গায়ে ছবি আঁকার অভ্যাস মানুষের সহজাত। দুই মাত্রার তলে যে ছবিই আঁকা হোক না কেন তার প্রকাশ ঘটে বিমূর্ততায়। দুই মাত্রার ক্যানভাসে শিল্পী যে ছবি আঁকেন তারও গ্রামাটিক্যাল পরিমাপ দুই মাত্রার যদিও শিল্পীর দৃষ্টি থাকে বহুমাত্রিক। মাত্রা বিশ্লেষণে দুইমাত্রায় তল (মূলগত ভূতল), তিন মাত্রায় ঘনবস্তু যেমন মানুষ, পাহাড়, জীব জন্তু, বই, খাতা, কলম, তুলি, প্রান্তর শ্যামল শস্য, বৃক্ষ, পাহাড়, সাগর। তিন মাত্রায় আমরা পার্থিব যত ঘটনা অবলোকন করি। আলবার্ট আইনস্টাইন আর এক ধাপ এগিয়ে স্থান-কালের মাত্রা যোগ করে চার মাত্রায় সঠিক অর্থে সঠিক ঘটনার মূর্ততা ব্যক্ত করলেন। শিল্পীর মন থাকে ঐ চার মাত্রারও পরের মাত্রা সংযোজন। ব্রহ্মাণ্ড বিমূর্ততার মূর্ত প্রকাশ। এর অর্ধেক বুঝি আর অর্ধেক বুঝি না। শিল্পীর মন থাকে ঐ না বোঝা অংশের দিকে যেখানে বহুমাত্রা ব্যবহারে ঐ বিমূর্ত অংশকে মূর্ত করে তুলতে চান। জাত শিল্পীর বিমূর্ত প্রতীক তাই আমাদের কাছে হয়ে ওঠে আবোদ্ধ। সেখানে আমাদের গমনাগমন হয় দুরুহ। অথচ গভীর দৃষ্টিতে দেখলে বুঝতে পারি বা যারা প্রকৃত বোদ্ধা তারা বোঝেন এ এক অনন্য সৃষ্টি। যার মধ্যে বহুমাত্রার সকাশে বিমূর্ততা মূর্ততায় ধরা দিয়েছে। জাত শিল্পীর সার্থকতা এখানে। শিল্পী মনসুর উল করিম জাত শিল্পীর দলে। আধুনিকতা ছাড়িয়ে উত্তরাধুনিকতার দিকে তাঁর বিচরণ। ক্যানভাসে বিমূর্ত ভাব প্রকাশ তাঁর শিল্পী স্বত্বার নির্দেশনা। তিনি অধ্যাপনার পাশাপাশি ছবি এঁকে চলেছেন। রং ও কৌশলের ব্যবহার নিপুণ। তাঁর শিল্প মান বিচারে তিনি জয়নুল আবেদীন, রশীদ চৌধুরী, এসএম সুলতান, কামরুল ইসলাম দেশ ও বিদেশ খ্যাত শিল্পীদের দলে। লিউনার্দো দ্য ভিঞ্চি, পাবলো পিকাসোর ব্যকরণিক সূত্র দিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে তাঁর দৃষ্টি শৈল্পিক কোনো অবদানের দিকে। ‘উৎস’, মৃত্তিকার নানা কথা’ ইত্যাদি ছবির সম্ভার সে ইঙ্গিত দেয়। জীবনানন্দ দাস এ দেশের প্রকৃতির কবি। বাস্তবতার উর্ধেব পরাবাস্তবতার স্বাদ পাই তাঁর কবিতায়। তিনি অঙ্কিত ছবিতে কবিতা লিখেছেন, যদিও তা তিনি করেননি। তাঁর কবিতা আর ছবিতে ভেদ নেই। শিল্পী মনসুর উল করিম এ কাজটি করেছেন। ‘লাবণ্য বাংলাদেশ’ এ সিরিজে আমরা রুপসী বাংলার রুপ দেখব তাঁর শিল্পকর্মে এ মহান শিল্পী ০১ মার্চ ১৯৫০ সালে রাজবাড়ি জেলার কালুখালির অনতিদূরে কালিকাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি জেলা স্কুলের পাঠ শেষ করে রাজবাড়ি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন ১৯৬৫ সালে।


স্কুল জীবন থেকেই ভালো ছবি আঁকতেন। সাথে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট খেলা। কলেজ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ তিনি এঁকে দিতেন। শিল্পী জগতের দিকপাল ও শিল্পচর্চার পথিকৃত রাজবাড়ি জেলার তিন প্রতিভাধর শিল্পীর জীবনের মধ্যে এক বিশেষ মিল দেখা যায়। তা হলো দারিদ্র। কারো এসেছে আগে। কারো এসেছে পরে। শিল্পী রশীদ চৌধুরীর জীবনীকার রশীদ চৌধুরীর শেষজীবনের দারিদ্র চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর গ্রন্থে। সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন পথিকৃত শিল্পী আবুল কাশেম এর শৈশবের দারিদ্র চিত্র তুলে ধরেছেন। আর মনসুর উল করিম শৈশবের দারিদ্র ও সঙ্কটের কথা বললেন তিনি নিজে। এসএসসি পাসের পর তিনি ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু দারিদ্র্যতার কারণে তখন ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। অতঃপর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর শিল্পী রশীদ চৌধুরী চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে ভর্তি হন। এভাবেই তাঁর শিল্পীস্বত্ত্বার বিকাশ। বর্তমান কেবল দেশেই নয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। অর্জন করেছেন বিরল সম্মান ‘গ্রান্ড এওয়ার্ড। একবার নয় দুইবার। পেয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, ভূষিত হয়েছেন একুশের পদকে। বর্তমান তিনি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক।

মনসুর উল করিমের অর্জন

একক চিত্র প্রদর্শনী : ১৭টি (চিত্রকলা ও ড্রইং) ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট, ভারত।

আয়োজনে : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বেঙ্গল গ্যালারী অব ফাইন আর্টস, শিল্পাঙ্গন আর্ট গ্যালারী, ডিজাইন আর্ট গ্যালারী (বাংলাদেশ) চিরকুট আর্ট গ্যালারী (ভারত) চট্রগ্রাম শিল্পকলা একাডেমী ও চট্রগ্রাম শিশু একাডেমী (ব্যক্তিগত), চট্রগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট (সিটিআই)।

উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন : হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারী (লন্ডন), ফুকুওকা আর্ট মিউজিয়াম (জাপান), ওসাকা আর্ট গ্যালারী (জাপান), জাতিসংঘের ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী (যুক্তরাষ্ট্র) ও গ্যারী (জাপান), কয়েত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী (কুয়েত), কেনিয়া আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী (কেনিয়া) জিম্বাবুয়ে চিত্র প্রদর্শনী (জিম্বাবুয়ে), দিল্লী আন্তর্জাতিক চিত্রকলা প্রদর্শনী (দিল্লী), এশিয়া আর্ট বিয়েনাল (ঢাকা), চারুকলা প্রদর্শনী (ঢাকা), বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর (ঢাকা), হোগো চিত্রকলা প্রদর্শনী (জাপান)। এ ছাড়া চীন, হংকং, জাপান, ভারত নেপাল জার্মান ও আফ্রিকায় প্রায় ১৭টি প্রদর্শনী।

সম্মাননা :

গ্রান্ড এ্যওয়ার্ড : অষ্টম আন্তর্জাতিক দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী (ভারত)

গ্রান্ড এ্যওয়ার্ড : ৬ষ্ঠ এশিয়ান দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী, ঢাকা

একাডেমী এ্যাওয়ার্ড : সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা

পারভেজ এ্যাওয়ার্ড : ললিতকলা একাডেমী দিল্লী (ভারত)

শ্রেষ্ঠ পুরস্কার : নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ঢাকা

সম্মান পুরস্কার : (২য় বার) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ঢাকা

প্রথম পুরস্কার : স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার--সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়


দ্বিতীয় পুরস্কার : আলিয়াস ফ্রাঁসেস আয়োজিত চিত্রকলা প্রদর্শনী চট্রগ্রাম

তৃতীয় পুরস্কার : আন্তর্জাতিক বাটা চিত্রকলা প্রদর্শনী চট্রগ্রাম

শ্রেষ্ঠ পুরস্কার : ছাপচিত্র বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় আয়োজিত, ঢাকা.

দ্বিতীয় পুরস্কার : চট্রগ্রাম বন্দর আয়োজিত শতবর্ষ স্মারক ভাস্কর্য প্রতিযোগিতা, চট্রগ্রাম বাংলাদেশ

একুশে পদক : ২০০৯ (রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান লাভ)

শিল্পী শিল্পকর্ম যে সব স্থানে সংগৃহীত আছে --------

ললিত কলা একাডেমী (দিল্লী), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ, ঢাকা, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম, উপজাতীয় জাদুঘর রাঙ্গামাটি (বাংলাদেশ), চিরকুট আর্ট গ্যালারী কলকাতা (ভারত), বাংলাদেশ ব্যাংক, ঢাকা, গণভবন, ঢাকা, বার্জার বাংলাদেশ লিঃ ঢাকা, ডানকান ব্রাদার্স, ঢাকা, সালেহ গ্রুপ লিঃ চট্রগ্রাম, বেঙ্গল ফাইন্ডেশন, ঢাকা, শিল্পাঙ্কন গ্যালারী, ঢাকা, ডিজাইন আর্ট গ্যালারী, ঢাকা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম

মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে চিত্রকলা এ্যালবাম প্রকাশে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। ইটালীর ফ্লোরেন্স এ আর্ট ক্যাপ্মে অংশগ্রহণ। কলকাতায় ভারত বাংলাদেশ যৌথ আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ। ৮ম ত্রিবার্ষিক আন্তর্জাতিক চিত্রকলা প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের কমিশনার হিসেবে অংশগ্রহণ (দিল্লী, ভারত)। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত চিত্রকলা কর্মশালার পরিচালনা। কিডস গুয়েনিকা ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব পালন (চট্রগ্রাম)। জাতীয় ও এশিয়ান প্রদর্শনীর নির্বাচন কমিটির ও জুড়ি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন (চট্রগ্রাম)। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এশিয়ান আর্ট ক্যাম্পে অংশগ্রহণ। সদস্য আর্ট কোয়েস্ট ও পেইন্টারস গ্রুপ ঢাকা। চেয়ারম্যান সমকালীন চট্রগ্রাম ৯৫। ফরমাল চেয়ারম্যান চারুকলা বিভাগ, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। জীবনের এ প্রান্তে মাটি ও মানুষের টানে ফিরে আসেন বারবার গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন -----রশীদ চৌধুরী স্মৃতি পরিষদ, রাজবাড়ি।

কার্টুনিস্ট শেখ তোফাজ্জেল হোসেন

বালিয়াকান্দি থানার নাড়ুয়া ইউনিয়নের খালিয়া মধুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শিল্পী ও কবি শেখ তোফাজ্জেল হোসেন ------‘কার্টুনিস্ট তোফা’। পিতার ব্যবসার সূত্রে পাহাড়ের দেশ আসামে শিশুকাল কাটান। পাহাড় আর সমতলের নিসর্গের কোমল কঠোর প্রতিচ্ছবি তোফাজ্জেলের মনে রেখাপাত করে। তাই শিশুকাল থেকেই আঁকিয়ে তোফাজ্জেল, লেখার খাতায়, ব্লাকবোর্ডে, ওয়াল ম্যাগাজিনে বিভিন্ন রঙের ছবি আঁকতেন। শেখ তোফাজ্জেল ষাটের দশকে ঢাকায় আসেন এবং পত্রিকার কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ষাটের দশকের শেষে দেশব্যাপী ছয় দফার আন্দোলন চলছিল। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শোষণ চিত্র তিনি একটি গাভীর কার্টুনে প্রকাশ করেন। গাভীটির মুখ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে, যেখানে গাভীটি খাদ্য গ্রহণ করে ঋষ্টপুষ্ট হচ্ছে কিন্তু তার দুধ দোহন করছে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। এ জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরিরত।


 কার্টুনিস্ট এমএ কুদ্দুস

ধৈর্য্য আর অধ্যবসায় নিয়ে শিল্প জগতে এগিয়ে চলেছেন রাজবাড়ির এক কৃতি সন্তান এম এ কুদ্দুস। রাজবাড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র, আঁকার হাতেখড়ি রাজবাড়ির শিল্পী গোলাম আলীর নিকট। তিনি দৈনিক সংবাদের নিয়মিত কার্টুনিস্ট। তিনি রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীতে ১৬ এপ্রিল ১৯৯৯ একক প্রদর্শনী করেন। জাপানে অনুষ্ঠিত ২০ ইওমুরি আন্তর্জাতিক কার্টুন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমানে রাজবাড়িতে মোঃ গোলাম আলী, মোঃ মোশারফ হোসেনসহ আরো অনেকে স্থানীয়ভাবে চিত্রশিল্পকে অগ্রগামী করেছেন।

Additional information