সঙ্গীত ও নৃত্য

সঙ্গীত ও নৃত্য

বামন দাস গুহরায়

সঙ্গীত, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির অঙ্গনে বামনদাস গুহরায় এক কিংবদন্তি নাম। কেবল রাজবাড়িতে নয়, সর্বগুণে তিনি সারা ভারতবর্ষে পরিচিতি লাভ করেন। শিল্প সাহিত্যের নানা অঙ্গনে ছিল তাঁর বিচরণ। তিনি ছিলেন তৎকালীন সংস্কৃতি জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। রাজবাড়ির শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, খেলাধুলায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি রাজবাড়িকে উচ্চতর স্তরে উন্নিত করে গেছেন। সর্বভারতীয় সঙ্গীতজগতে ‘জলতরঙ্গ’ বাদ্যে তিনি পৃথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। মেঘের দেশের প্রাপ্য জল আর সাধারণ পাত্র দিয়ে যে সুরের লহড়ী তুলতেন সে মূর্চছনায় নিত্য আনন্দ বহমান হত। সে সুরের সাগরে অবগাহন করা যেত। ‘টুং টাং টুংটাং চুড়ির তালে জলতরঙ্গ বাজেরে’-----এ যেন হৃদয় তন্ত্রীতে নাড়া দেয়। বিগত চল্লিশের দশকে বামনদাস গুহরায়ের জলতরঙ্গের একক বাদ্যসঙ্গীত হিসেবে আকাশ বাণী

কলিকাতা কর্তৃক গ্রামোফোন রেকর্ড করা হয় এবং কলিকাতা দিল্লী, শিলিগুড়ি বেতার কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত মাঝে মধ্যে প্রচার করা হয়। এই প্রথিতযথা শিল্পী রাজবাড়িতে সভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন আইনজীবী ও সমাজসেবক। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। সেতারবাদক মীর সাহেব, তবলা বাদক লেদুদাস, বংশীবাদক ধীরেন প্রমুখের সাথে তিনি যেভাবে রাজবাড়ির সঙ্গীত জগতের সমৃদ্ধি করে গেছেন সেকথা আজও মানুষ স্মরণ করে। বর্তমান চিত্রা সিনেমা হলের নাম তখন ডানলফ হল। ডানলফ হল, হোসনেবাগ হলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। এসব অনুষ্ঠানের বামনদাসের জলতরঙ্গ ছিল প্রধান আকর্ষণ। জলতরঙ্গ বাজিয়ে হিসেবে তার একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত রচয়িতা ও সুরকার। তিনি নাটক রচনা করতেন এবং তা মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা করতেন। ‘ছায়ানট’ ‘চোরাচালান’ ‘দুর্নীতি’ প্রভৃতি নাটক তিনি রচনা করেন। তিনি ছিলেন ফরিদপুর আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক। বর্তমানে এটি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমী। তিনি ছিলেন কৃতি ফুটবল খেলোয়াড়। তার সুযোগ্য কন্যা দিপ্তী গুহ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর হাতে গড়া শাম্মি আক্তার বর্তমানে দেশবরণ্য সঙ্গীতশিল্পী। জামাতা চিত্তরঞ্জন গুহ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সফল আইনজীবী। চলচ্চিত্র শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক এবং জাতীয় ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্তের ছেলের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন গুহের মেয়ের বিবাহ হয়। সংস্কৃতি জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বামন দাস জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কর্তব্য নিষ্ঠায় ছিলেন আন্তরিক। ১৯৬৭ সালে ফরিদপুর আর্ট ও সঙ্গীত নিকেতন থেকে রাজবাড়ি আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। রাজবাড়ি রশিদ চৌধুরী স্মৃতি পরিষদ কর্তৃক ১০ এপ্রিল ২০০৯ রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীতে তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। পদক গ্রহণ করেন তাঁর কন্যা দিপ্তী গুহ। এ মহান শিল্পী রাজবাড়ি তথা জাতির জন্য অনন্য অবদান রেখে গেছেন।

হাজেরা বিবি

হাজেরা বিবি রাজবাড়ির সঙ্গীত জগতের ঐতিহ্য। যে সময়ে যাত্রা, নাটকে ছেলেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করত সে সময়ে গ্রামে গ্রামে হাজেরা বিবির গানের আসর বসত। তিনি ছিলেন বিচার গান ও লোকসঙ্গীত শিল্পী। হাজেরা বিবির নাম ও গান পঞ্চাশ ও ষাট দশকে ফরিদপুর জেলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত। বিচার গানে ফরিদপুর জেলার হালিম বয়াতী এবং রাজবাড়ির হাজেরা বিবি ছিলেন একমাত্র জুটি। রাজবাড়ি জেলা বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বিদ্যালয়ের মাঠে বিচার গানের আসর বসত। কোনো আসরে হালিম বয়াতী মারেফাত, হাজেরা বিবি শরিয়ত পক্ষ, আবার কোনো আসরে এর বিপরীত। ১৯৫৭ সালে নাড়ুয়া ইউনিয়নের মধুপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে প্রথম তাদের গান শুনি। আমি তখন ঐ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। গানের মর্মকথা তখন ভালোভাবে বুঝতাম না। তবে হালিম-হাজেরার গলার সুরের রেশ এখনো মনে নাড়া দেয়। এরপর ৫/৬টি আসরে তাদের গান শুনেছি।

Additional information