সঙ্গীত ও নৃত্য - পৃষ্ঠা নং-৮

১৯৪০ সালের দিকে বাণীবহের জমিদার কালিপ্রসন্ন মজুমদার বর্তমান চিত্রা সিনেমার স্থানটি দান করেন এবং সেখানে গড়ে ওঠে রাজবাড়ি টাউন হল। পরবর্তীতে ডিসট্রিক্ট কাউন্সিলের অনুদানে হলটি পরিচালিত হত। এ হলটির নাম বিভিন্ন সময়ে ডানলপ হল, নূর মহল, অরোরা, রক্সি এবং সর্বশেষ চিত্রা হল হিসেবে পরিচিতি পায়। এ হলে তৎকালীন সময়ে সপ্তাহে তিন দিন নাটক অনুষ্ঠিত হত। অভিনয় করতেন হাবিবুর রহমান, নরেশ রায়, মনমথ সেন প্রমুখ। ১৯৫৫ সালে চলন্তিকা কিশোর নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এটিএম রফিক উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সুভাষ সিং প্রমুখ।

রাজবাড়ি জেলার পালাগান, যাত্রা, নাটকে বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। জেলার গ্রামাঞ্চলে একসময় চাঁদ সওদাগর, বেহুলা লক্ষীন্দরের কাহিনী অবলম্বনে স্থানীয় ভাষায় ভাসানযাত্রা বিশেষ পরিচিত ছিল। লাইলী মজনু, ‍রুপবান, রোস্তম সোহরাব পালাগানের দল ছিল। রামদিয়া, সোনাপুর, নাড়ুয়া, বালিয়াকান্দি, মৃগী, খানখানাপুর, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি, পাংশায় দেশের নামি-দামি যাত্রানুষ্ঠান অুনষ্ঠিত হত। রাজবাড়িতে নাট্য চর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল হোসনেবাগ হল। রাজবাড়িতে শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পরও অনেক নাট্যনুষ্ঠান হোসেনেবাগ হলে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ১৯৩৮ সালে হাবিবুর রহমান, মনমথ রায়ের উদ্যোগে প্রথম সিরাজ-উদ-দ্দৌলা নাটক রাজবাড়ি হোসনেবাগ হলে অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাত্তোরকালে ঢাকা মহিলা সমিতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের স্বর্ণযুগ শুরু হয় থিয়েটার গ্রুপের মাধ্যমে। যার পুরোভাগে থাকেন আব্দুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দ্র মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার-সহ অনেক নামী নাট্যতারকা। এদেরই অনুপ্রেরণায় তৎকালীন রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে দুর্বার নাট্যগোষ্ঠী, রাজবাড়ি থিয়েটার গ্রুপ। রাজবাড়ির নাট্য আন্দোলনে রাজবাড়ি থিয়েটার গ্রুপের ভুমিকা অনস্বীকার্য। থিয়েটার গ্রুপের পাশাপাশি এ সময় আরো বেশ কিছু গ্রুপ গড়ে ওঠে তারমধ্যে মৈত্রী থিয়েটার, উত্তরণ নাট্য সংস্থা, চারণ থিয়েটার, সূর্যতোরণ থিয়েটার, ভিন্ন থিয়েটার উল্লেখযোগ্য। এ সমস্ত থিয়েটার গ্রুপে যারা নেতৃত্ব দিতেন তাদের মধ্যে অন্যতম মনসুর আলী খান (দিপু), খালেদ সালাউদ্দিন (জগলু), সাঈদুল হক খোকন, সেলিম চৌধুরী, বাবলা চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, আব্দুল জব্বার মিয়া, নুরুল ইসলাম (নুরু), এমএ হামিদ (বাবলু), গোলাম আকা, আকতার হোসেন, রওশন মওলা মন্টু, মকবুল হোসেন বাবু, এম বাচ্চু রহমান, শাহাজান আলী সাজু, হাসান মঞ্জু, ফিরোজ মওলা, সাজ্জাদ সিদ্দিকী নয়ন, বাদল নাগ, সুমন আহমেদ প্রমুখ। তৎকালীন সময়ে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তেমন কোনো নারী অভিনেত্রী পাওয়া যেত না তবে প্রফেশনালভাবে উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি গ্রুপেই অভিনয় করতেন অর্চচনা, ডলি, শিরিন, রেখা প্রমুখ, এদেরমধ্যে অর্চচনা এবং ডলি ছিল প্রতিভাবান নাট্যশিল্পী। ১৯৮২ সালে রাজবাড়ি থিয়েটারের উদ্যোগে রাজবাড়িতে প্রথম নাট্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেছিলেন রাজা সূর্যকুমারের পুত্র কুমার বাহাদুর। প্রতিযোগিতায় অভিনয়ের জন্য প্রথম পুরস্কার পান বাবলা চৌধুরী, দ্বিতীয় পুরস্কার মকবুল হোসেন বাবু এবং তৃতীয় পুরস্কার পান এম বাচ্চু রহমান। রাজবাড়ি নাট্যাঙ্গনের সেই জৌলুস না থাকলেও এখনো রাজবাড়িতে নাট্য চর্চার কমতি নেই। বর্তমানে রাজবাড়িতে ‘আমরা ক’জনা থিয়েটার’ এর মাধ্যমে এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন----গোলাম মোর্তজা সাগর, বিনয় কুমার সাহা, সঞ্জয় ভৌমিক, সঞ্জীব ভৌমিক, অনুপ কুমার ঘোষ, অজয় দাস তালুকদার, সম্রাট মিয়া, ফয়সাল আহমেদ তৌহিদ, সুব্রত প্রামাণিক, শাম্মী আক্তার বৃষ্টি, রেবেকা সুলতানা, শারমীন সুলতানা, ফারজানা ইয়াসমিন প্রমুখ। গোয়ালন্দ উপজেলায় ‘সমকাল নাট্যচক্র’ নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

পার্থপ্রতিম মজুমদার

মুকাভিনয়ে যারা  বিশ্বব্যপী খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে পার্থ প্রতিম মজুমদার একজন। বাংলাদেশ তথা পশ্চিমবাংলা ও ভারতের যে কোনো অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের নিকট পার্থ প্রতিম মজুমদার সুপরিচিত নাম। বাংলাদেশ টিভি পর্দায় প্রায়শই তাঁকে দেখা যায়। অভিনয় জগতে মুকাভিনয় উচ্চমান শিল্প। তবে সাধারণ অভিনয় থেকে মুকাভিনয় শক্ত কাজ। দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার সংখ্যা অগণিত। সেক্ষেত্রে মুকাভিনয়ের শিল্পী স্বল্প সংখ্যক। সাধারণ অভিনেতা শ্রুত বাক্য; ইন্দ্রীয় ভঙ্গী; অ্যাকশন দ্বারা বিষয়বস্তুকে দর্শক সম্মুখে তুলে ধরেন ও কণ্ঠনিঃসৃত বাক্যমালা শ্রোতাকে আকৃষ্ট ও অভিভূত করে।

Additional information