সঙ্গীত ও নৃত্য

সঙ্গীত ও নৃত্য

বামন দাস গুহরায়

সঙ্গীত, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির অঙ্গনে বামনদাস গুহরায় এক কিংবদন্তি নাম। কেবল রাজবাড়িতে নয়, সর্বগুণে তিনি সারা ভারতবর্ষে পরিচিতি লাভ করেন। শিল্প সাহিত্যের নানা অঙ্গনে ছিল তাঁর বিচরণ। তিনি ছিলেন তৎকালীন সংস্কৃতি জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। রাজবাড়ির শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য, খেলাধুলায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি রাজবাড়িকে উচ্চতর স্তরে উন্নিত করে গেছেন। সর্বভারতীয় সঙ্গীতজগতে ‘জলতরঙ্গ’ বাদ্যে তিনি পৃথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। মেঘের দেশের প্রাপ্য জল আর সাধারণ পাত্র দিয়ে যে সুরের লহড়ী তুলতেন সে মূর্চছনায় নিত্য আনন্দ বহমান হত। সে সুরের সাগরে অবগাহন করা যেত। ‘টুং টাং টুংটাং চুড়ির তালে জলতরঙ্গ বাজেরে’-----এ যেন হৃদয় তন্ত্রীতে নাড়া দেয়। বিগত চল্লিশের দশকে বামনদাস গুহরায়ের জলতরঙ্গের একক বাদ্যসঙ্গীত হিসেবে আকাশ বাণী

কলিকাতা কর্তৃক গ্রামোফোন রেকর্ড করা হয় এবং কলিকাতা দিল্লী, শিলিগুড়ি বেতার কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত মাঝে মধ্যে প্রচার করা হয়। এই প্রথিতযথা শিল্পী রাজবাড়িতে সভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন আইনজীবী ও সমাজসেবক। বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। সেতারবাদক মীর সাহেব, তবলা বাদক লেদুদাস, বংশীবাদক ধীরেন প্রমুখের সাথে তিনি যেভাবে রাজবাড়ির সঙ্গীত জগতের সমৃদ্ধি করে গেছেন সেকথা আজও মানুষ স্মরণ করে। বর্তমান চিত্রা সিনেমা হলের নাম তখন ডানলফ হল। ডানলফ হল, হোসনেবাগ হলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। এসব অনুষ্ঠানের বামনদাসের জলতরঙ্গ ছিল প্রধান আকর্ষণ। জলতরঙ্গ বাজিয়ে হিসেবে তার একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীত রচয়িতা ও সুরকার। তিনি নাটক রচনা করতেন এবং তা মঞ্চস্থ করার ব্যবস্থা করতেন। ‘ছায়ানট’ ‘চোরাচালান’ ‘দুর্নীতি’ প্রভৃতি নাটক তিনি রচনা করেন। তিনি ছিলেন ফরিদপুর আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক। বর্তমানে এটি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমী। তিনি ছিলেন কৃতি ফুটবল খেলোয়াড়। তার সুযোগ্য কন্যা দিপ্তী গুহ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে নৃত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর হাতে গড়া শাম্মি আক্তার বর্তমানে দেশবরণ্য সঙ্গীতশিল্পী। জামাতা চিত্তরঞ্জন গুহ প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সফল আইনজীবী। চলচ্চিত্র শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক এবং জাতীয় ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্তের ছেলের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন গুহের মেয়ের বিবাহ হয়। সংস্কৃতি জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বামন দাস জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কর্তব্য নিষ্ঠায় ছিলেন আন্তরিক। ১৯৬৭ সালে ফরিদপুর আর্ট ও সঙ্গীত নিকেতন থেকে রাজবাড়ি আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। রাজবাড়ি রশিদ চৌধুরী স্মৃতি পরিষদ কর্তৃক ১০ এপ্রিল ২০০৯ রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীতে তাঁকে মরণোত্তর সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। পদক গ্রহণ করেন তাঁর কন্যা দিপ্তী গুহ। এ মহান শিল্পী রাজবাড়ি তথা জাতির জন্য অনন্য অবদান রেখে গেছেন।

হাজেরা বিবি

হাজেরা বিবি রাজবাড়ির সঙ্গীত জগতের ঐতিহ্য। যে সময়ে যাত্রা, নাটকে ছেলেরা মেয়ে সেজে অভিনয় করত সে সময়ে গ্রামে গ্রামে হাজেরা বিবির গানের আসর বসত। তিনি ছিলেন বিচার গান ও লোকসঙ্গীত শিল্পী। হাজেরা বিবির নাম ও গান পঞ্চাশ ও ষাট দশকে ফরিদপুর জেলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত। বিচার গানে ফরিদপুর জেলার হালিম বয়াতী এবং রাজবাড়ির হাজেরা বিবি ছিলেন একমাত্র জুটি। রাজবাড়ি জেলা বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে বিদ্যালয়ের মাঠে বিচার গানের আসর বসত। কোনো আসরে হালিম বয়াতী মারেফাত, হাজেরা বিবি শরিয়ত পক্ষ, আবার কোনো আসরে এর বিপরীত। ১৯৫৭ সালে নাড়ুয়া ইউনিয়নের মধুপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে প্রথম তাদের গান শুনি। আমি তখন ঐ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। গানের মর্মকথা তখন ভালোভাবে বুঝতাম না। তবে হালিম-হাজেরার গলার সুরের রেশ এখনো মনে নাড়া দেয়। এরপর ৫/৬টি আসরে তাদের গান শুনেছি।


হাজেরা বিবি রাজবাড়ি জেলার সূর্যনগরে জন্মগ্রহণ করেন। পরে ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। তিনি পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের সাহচার্য থেকে সঙ্গীত জগতে স্থান করে নেন। জসীম উদ্দিন রচিত পল্লীগীতি, মুর্শীদি গেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। বিচার ও জারীগানে সমান তার জনপ্রিয়তা। ১৯২৭ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। তাঁর নিজের রচিত গান গ্রামবাংলায় খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করে।

কাঙ্গালিনী সুফিয়া

কাঙ্গালিনী সুফিয়া কীসের কাঙ্গাল? টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায় সারাদিন পরিশ্রমের পর মজুরী নিতে এসে দেখে পুরুষের চেয়ে তার বেতন কম। তিনি প্রশ্ন করেন আমার বেতন কম ক্যা? সুফিয়াকে দেখে তখন মনে হয় সে নারী সমাজের প্রতিনিধি। প্রতিবাদ তুলেছে মেয়েদের মজুরী কম দেওয়ার বিরুদ্ধে। সুফিয়া মেয়েদের দাবি আদায়ের কাঙ্গাল। ‘প্রাণের বান্ধবরে বুড়ি হলাম তোর কারণে’। সুফিয়া যখন এ গানের সুর তার গলায় তোলেন তখন মনে হয় সুফিয়া প্রেমের কাঙ্গাল। সুফিয়া বঞ্চিত। আর বঞ্চনাই সুফিয়াকে জীবনের এ স্থানে এনে দিয়েছে। রাজবাড়ির রামদিয়া গ্রামের এক দরিদ্র ঘরে জন্ম নিয়ে জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়ে সমাজ সংসারের কাছে আবার নিজেকে সমর্পণ করেছেন। এই সমর্পণ বঞ্চনার প্রতিবাদে কটাক্ষ নয়। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মানুষের ব্যাপক কর্মের পরিধিতে কেমন করে গোলাপ ফোটানো যায়। কাঙ্গালিনী সুফিয়া আজ বাউল সুরে দেশেই নয়, বিশ্বকে মাতিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ টিভি ও বাংলাদেশের বেতারের শিল্পী ছাড়াও দেশে বিদেশে অনেক অনুষ্ঠান করেছেন। জয় করেছেন অনেক পুরস্কার। রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুফিয়া অতিপরিচিত এবং আদরণীয়। তা সত্ত্বেও যেন তার দেশ নাই। অতি সাধারণ হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়ে কাঙ্গালিনী সুফিয়া তার কর্মের মাধ্যমে জাত পাত, কাল ধর্মকে অতিক্রম করেছেন। তা সত্ত্বেও তিনি রাজবাড়ির কাঙ্গালিনী সুফিয়া।

লেদু দাস

লেদু দাস ছিলেন বিশিষ্ট তবলা বাদক। ষাটের দশকে লেদু দাস লেদু দা রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিত ব্যক্তি। কোনো অনুষ্ঠানই লেদু দাসের তবলার বাদ্য ছাড়া জমতো না।

 

 

নিখিল কুমার নাগ (দুলাল দা)

রাজবাড়ি জেলার সংস্কৃতি বিকাশে যে ব্যক্তির অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে তিনি নিখিল কুমার নাগ (দুলাল দা) এককালের জেলার শ্রেষ্ঠ ফুটবলার কিভাবে সঙ্গীতের সাধনায় ডুবে গেলেন তা ভাবতে অবাক লাগে। দুলাল দা-এর রবীন্দ্র সঙ্গীত সুরজ্ঞান অপূর্ব। তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠক, শিক্ষক, শিল্পী। তার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী রাজবাড়ির রবীন্দ্র সঙ্গীতে উৎকর্ষতার ছাপ রেখে চলেছে।

 

 


মোঃ রস্তম আলী (রস্তম ভাই)

রাজবাড়ির এক প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী ছিলেন মোঃ রস্তম আলী। তিনি শুধু কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নয় নাটক ও নৃত্যেও তার প্রতিভা ছিল। তিনি ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল মিউজিক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। অমায়িক সদা হাস্য রস্তম আলী পরিণত বয়সেও রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ‍উজ্জীবিত করে গেছেন।

 

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

বর্তমান দেশের প্রখ্যাত নাট্যাভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দীর্ঘকাল রাজবাড়িতে কাটিয়েছেন এবং বলা যায় রাজবাড়ি থেকেই তার নাট্যচর্চা শুরু। তিনি আর এস কে ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ছিলেন। তিনি রাজবাড়ির ‘আবোল তাবোল’ শিশু সংগঠনের সাথে জড়িত। সময় পেলে রাজবাড়িতে ছুটে আসেন।

 

 

শাহীনূর বেগম (পপি আপা)

কেবল কবিতায় নয়, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্টি করে গেছেন নতুন ঘরানা। নজরুলের লেখা গানের কথা, সুর, রাগ, ঢং, তাল, লয়ের আঙ্গীকতা, মনোমুগ্ধকর, চিত্তাকর্ষক। এ গানের গায়ক গায়িকারা বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে মানুষের কাছে প্রিয়। শাহীনুর বেগম রাজবাড়ির মানুষের কাছে তাই শিক্ষকের চেয়েও বেশি প্রিয় শিল্পী হিসেবে। আর সে কারণেই সকলের নিকট তিনি ‘পপি আপা’। শাহীনুর বেগম প্রায় তিন দশক ধরে বেতার ও টিভির নিয়মিত গ্রেডেশনভুক্ত শিল্পী। তার কন্ঠে নজরুলের গান বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। শুদ্ধ সুরে তাঁর সঙ্গীত সাধনা প্রশংসার দাবি রাখে। শুধু সঙ্গীতেই নয়, নৃত্যে ১৯৬০ সালে ইস্ট পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্সে ১ম স্থান অধিকার করেন এবং অল পাকিস্তান মিউজিক কনফারেন্সে ২য় স্থান অধিকার করেন। রাজবাড়িতে সত্তর দশকের প্রথম দিকে যখন শিল্পকলা গড়ে ওঠে, সে সময় ফজলু ভাই, দুলাল নাগ, দীপ্তি গুহ, এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টার, শাহীনুর বেগম প্রমুখ বিশেষ অবদান রাখেন। এ শিল্পী রাজবাড়ি সরকারি জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও নিয়মিত সঙ্গীত সাধনা করে চলেছেন। জড়িত আছেন অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে। সৃষ্টি করেছেন অনেক শিল্পী। তিনি লেখকের সহধর্মিনী। শাহীনুর বেগম ১০/৩/২০১০ এর রাজবাড়ি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

দীপ্তি গুহ

প্রখ্যাত জলতরঙ্গ বাদক বামনদাশ গুহরায়ের কন্যা দীপ্তি গুহ। তিনি এক কালের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে অল পাকিস্তান মিউজিক প্রতিযোগিতায় নৃত্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। সাংস্কৃতিক পরিবারে আজন্ম লালিত এই শিল্পী রাজবাড়ির শিল্পাঙ্গনে উৎকর্ষতার জন্য কাজ করে চলেছেন।


 নজরুল হোসেন কুটি

সঙ্গীতের উৎকর্ষতার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজবাড়ি শিল্পকলা, গোয়ালন্দ শিল্পকলা, পাংশা শিল্পকলার অবদান স্মরণীয়। এ সকল শিল্পকলার শিক্ষক হিসেবে নজরুল হোসেন কুটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক থাকার কারণে তিনি ওস্তাদ কবির খান, ছগিরুদ্দিন খানের নিকট তালিম গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি সংগীত সাধনায় সুরের প্রতি দক্ষতা অর্জন করেন। উচ্চাঙ্গ, নজরুলগীতির শিক্ষক হিসেবে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। এ গুণী শিল্পী ২০০৯ সালের ২ অক্টোবর পরলোকগমন করেন।

 

প্রণব সরকার

কথায় বলে জর্দা ছাড়া পান আর তবলা ছাড়া গান। ষাটের দশকে একমাত্র লেদু দাস ছাড়া তবলা ছিল না বললেই চলে। এ সময় প্রণব সরকার তবলায় তালিম গ্রহণ করে রাজবাড়ির সঙ্গীত অঙ্গনে একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেন। তিনি বেতার ও টিভির শিল্পী ছিলেন। অত্যন্ত দক্ষ এ তবলাবাদক দীর্ঘদিন জাতীয় পর্যায়ের গুনী শিল্পী বশীর আহম্মেদ এর ব্যক্তিগত তবলাবাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি শুধু তবলা বাদকই নন একজন উচ্চাঙ্গ সংগীতশিক্ষকও বটে। তার ছাত্রী রাজবাড়ির আবিদা সুলতানা উচ্চাঙ্গ সংগীতে জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হয়।

 

ড. ফকীর শহিদুল ইসলাম (সুমন)

ড. ফকীর সুমন রাজবাড়িতে সঙ্গীত জগতের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত একমাত্র ফকীর শহিদুল ইসলাম সুমন। ফকীর আব্দুল জব্বারে পুত্র ফকীল শহিদুল ইসলাম। ছোট বেলা থেকেই ছেলের সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক দেখে পিতা তাকে ঢাকা মিউজিক কলেজে ভর্তি করে দেন। অতঃপর বিশ্বভারতী থেকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এবং কোলকাতা থেকে সঙ্গীতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। সঙ্গীত বিষয়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ফকীর সুমন উচ্চঙ্গ, নজরুল সঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করে বর্তমানে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী।

 

ছায়া রানী কর্মকার

রবীন্দ্র সঙ্গীতের অনন্য প্রতিভা ছায়া রানী কর্মকার। তিনি দেশ ও বিদেশে রবীন্দ্র সঙ্গীতে আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ১৯৮৯ সালে এইচএসসি পাস করার পর কলিকাতা রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ১৯৯৮ সালে মিউজিকে বিএ অনার্স (রবীন্দ্র সঙ্গীত) এবং উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে মিউজিকে এমএ (রবীন্দ্র সঙ্গীত) ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্র থাকাকালীন তিনি ১৯৯২ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীতে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ছায়া রানী কর্মকার ১৯৭৩ সালে ৮ মে রাজবাড়ি সজ্জনকান্দায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি নিখিলচন্দ্র নাগ (দুলাল দা) এর নিকট রবীন্দ্র সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ করেন।


অতঃপর রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীতে সঙ্গীত বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেন। তিনি স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ির সঙ্গীত জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। ঢাকায় মাস্টার মেইনড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মিউজিকের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি টিভির একজন নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। তিনি জাতীয়ভাবে রবীন্দ্র, নজরুল, উচ্চাঙ্গ, গণসঙ্গীত, দেশাত্মবোধ সঙ্গীতের বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনে কাজ করে চলেছেন।

আবিদা সুলতানা

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ শিল্পীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি ১৯৯০ সালে। তার বাবা মকবুল হোসেন বাবু’র কাছে। রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীর শিক্ষক নিজাম আনছারী ও প্রণব সরকারের নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিয়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং দেশাত্মবোধক গানে ১ম পুরস্কার অর্জন করে। শিল্পী ছায়নটে কিছুদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বর্তমানে অনিল কুমার সাহার নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিভাগ থেকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং লালন সঙ্গীতে ৩য়,  ১৯৯৫ সালে ঐ একই প্রতিযোগিতায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে জাতীয় পুরস্কার (স্বর্ণপদক) লাভ করে। 

রাজবাড়ি, ফরিদপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে উচ্চাঙ্গ, লালন ও নজরুল সঙ্গীতে ১ম স্থানের গৌরব অর্জন করে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ১৯৯৭ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে নজরুল সঙ্গীতে এবং ১৯৯৮ সালে রাজবাড়ি জেলায় উচ্চাঙ্গ এবং নজরুল সঙ্গীতে ১ম স্থান অধিকার করে। ১৯৯৮-৯৯ সালে রাজবাড়ি সরকারি কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। অতঃপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে ফয়জুন্নেছা হলের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নজরুল, লালন এবং আধুনিক গানে ১ম পুরস্কারের ধারা বজায় রাখে। সম্প্রতি বেঙ্গল মিউজিক থেকে ‘ঝালমুড়ি’ নামক একটি সিডি প্রকাশ করেছে তাতে শিল্পীর নিজের লেখা ও সুরের একটি গান----‘প্রজাপতিটা যখন তখন’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শ্রোতামহলে গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আবিদা সম্প্রতি ‘ফিরে এসো বেহুলা’ নামের একটি ছায়াছবিতে প্লেব্যক করেছে। মুক্তি প্রতিক্ষিত এ ছবিটির গান নিয়ে ‘ফিরে এসো বেহুলা’ নামে ২৩/০৫/২০১০ তারিখে একটি সিডি প্রকাশিত হয়েছে। আবিদা সুলতানার স্বামী শৌভিক করিম ওরফে অর্জুন একজন গানের মানুষ। ‘ফিরে এসো বেহুলা’ ছবির গানের কথা, সুর এবং কণ্ঠ দিয়েছেন আবিদা এবং অর্জুন। উক্ত ছবির কয়েকটি গানের মধ্যে ‘ভালোবাসা তোমার ঘরে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক’ এবং ‘যা, যারে যা’ গান দুটি ঢাকার এফএম রেডিওতে বহুল প্রচারিত এবং জনপ্রিয়। আবিদার একক এ্যালবাম প্রকাশের অপেক্ষায়। এ শিল্পী রাজবাড়ি সরকারি কলেজে অধ্যায়নকালীন সময়ে লেখকের প্রিয় ছাত্রী ছিল।

কাজী আবু শরীফ (যিপু)

কাজী আবু শরীফ রাজবাড়িতে এককালের অতি পরিচিত মাউথ অর্গানবাদক ছিলেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মাউথ অর্গান প্রতিযোগিতায় দুইবার (১৯৬৪ ও ১৯৬৫) ইস্ট পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি একজন অভিনেতা এবং অনির্বাণ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। একসময় রেডিও পাকিস্তানের ঘোষক ছিলেন। তিনি মৎস্য ও পশু সম্পদ দপ্তরের পরিচালক ছিলেন। উপসচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে কাজীকান্দায় বসবাস করেছেন।


পুলক চৌধুরী

গলায় সুর বের না হলেও তাকে যেন সব অনুষ্ঠানেই যোগ দিতে হবে। আমি তাকে দেখতাম কখনো গাইছে গান, কখনো সঙ্গত করছে আবার কখনো গীটার হাতে স্টেজে। সুর থাকতো শুদ্ধ আর তাল লয় ছিল পাকা। পুলক চৌধুরী সঙ্গীত জগতে অনেক উপরে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের স্টাফ আর্টিস্ট এবং চাকরিসূত্রে বাংলাদেশ বেতারের সাথে দীর্ঘ ৩০ বৎসর সংশ্লিষ্ট হয়ে আছেন। পুলক চৌধুরীর বাড়ি রাজবাড়ি জেলার বরাটের কাঁচরন্দ গ্রামে।

 

মোঃ খাতের আলী ফকির

রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি থানায় নাড়ুয়া ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে ১৯০০ শতকে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ খাতের আলী ফকির। তিনি সামরিকবাহিনীতে যোগ দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯) অংশগ্রহণ করেন। অতঃপর বৃটিশ সরকারের ভাতা নিয়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। মূলত তিনি ছিলেন গায়ক ও গান রচয়িতা। বেশিরভাগ সময় তিনি মুর্শিদী, মারফতী গান রচনা করে তা নিজেই গাইতেন। এলাকায় তিনি খাতের ফকির হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন তরিকাপন্থী লোক ছিলেন। সাধু তত্ত্বের উপর তিনি অনেক গজল রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে অত্র এলাকায় মুক্তিবাহিনী সংগঠিত করে নিজেই ট্রেনিং দিতেন। তিনি ১৯৯৯ সালে পরলোকগমন করেন।

আক্কাছ আলী বয়াতী

আক্কাছ আলী বয়াতীর জন্ম রাজবাড়ির ধুঞ্চি গ্রামে। মুর্শিদী মারফতী গানে ইতিমধ্যে সুনাম অর্জন করেছেন। আক্কাছ আলী বয়াতী তাৎক্ষণিক গান রচনা করে নিজ গলায় গেয়ে থাকেন।

 

 

অসীম বাউল

রাজবাড়ি জেলা কালুখালী সন্নিকটে বেশ কিছু বাউল পরিবার রয়েছে। এদের মধ্যে অসীম বাউল সঙ্গীত রচনা ও সঙ্গীত পরিবেশনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি সরকার থেকে সোনার মেডেল প্রাপ্ত।

 

 


 ক্ষুদে কণ্ঠশিল্পী কবি

বিগত কয়েক বছর যাবৎ টিভি চ্যানেলে সঙ্গীত জগতের উৎকর্ষতার লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে ক্ষুদে শিল্পী সঙ্গীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০০৮ এ চ্যানেল আই আয়োজিত দেশব্যাপী ‘ক্ষুদে গানরাজ’ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় রাজবাড়ির  ক্ষুদে কণ্ঠশিল্পী কবি ৭ম রাউন্ডে সেরা ৪ নির্বাচিত হয়। সে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সবুজ কুঁড়ি শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্র সঙ্গীতে ১ম স্থান ও নজরুল সঙ্গীতে ২য় স্থান অধিকার করে। ২০০৫ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্র, নজরুল ও দেশত্মবোধক সব কটিতেই তার প্রথম স্থান। কবি রাজবাড়িতে অতিপরিচিত ছখিনা আপার নাতি, পিতা প্রকোশলী শাখাওয়াত হোসেন শামীম, মামা রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর সৈয়দ আশরাফ আলী (অব)। কবি বড় হয়ে রাজবাড়ি তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে এ আশা সকলের।

আব্দুস ছাত্তার কালু

রাজবাড়ির সংস্কৃতির অঙ্গনে আব্দুস সাত্তার কালু এক কিংবদন্তি নাম। তিনি তাঁর কর্ম প্রচেষ্টায় এ অঙ্গনকে উচ্চতর স্থান দান করেছেন। শিশুকাল থেকেই নৃত্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকায় ঢাকায় দীপা খন্দকার, হাসান ইমাম, বেলায়েত হোসেন, সাজু আহমেদের নিকট নৃত্যে তালিম গ্রহণ করেন। এরপর কলিকাতার খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী মাধুরী মগডাল এর নিকট ক্লাসিক এবং আধুনিক নৃত্যে বিশিষ্টতা অর্জন করেন। এ সময় থেকেই তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ করে বিটিভিতে নৃত্য প্রদর্শন করেন নৃত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, চীন, ভুটান, মালদ্বীপ, রাশিয়া, ভারত ভ্রমণ করেন। আব্দুস সাত্তার কালু নৃত্য জগতকে সমৃদ্ধ করতে এবং উচ্চতর মাত্রা দান করার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে সজ্জনকান্দায় ঢাকা দিব্যকলা নৃত্য প্রতিষ্ঠানের শাখা স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ পর্যন্ত শত শত ছাত্র-ছাত্রী নৃত্যে পারদর্শীতা অর্জন করে। এসব ছাত্র-ছাত্রী শিল্পকলা একাডেমীসহ নানা অনুষ্ঠানে নৃত্য প্রদর্শনে বিমোহিত করে। এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে দিলরুবা খানম সাথী, ইভা, আতাউর রহমান মোহন, চয়ন----- জাপান, চীন, কোরিয়া, ভারত, নেপাল গমন করে এবং দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনে। আব্দুস সাত্তার কালুর অংশগ্রহণ এবং পরিচালনায় ‘চিত্রাঙ্গদা’ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ নৃত্যনাট্য অনুপম সৃষ্টি। ঢাকা, জসিম মেলা, রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত নৃত্যনাট্য ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী নৃত্য অনুশীলন করছে।

সদালাপী, সদাহাস্য কালু কেবল রাজবাড়ি নয় দেশের গর্ব। প্রায়শই তিনি জাতীয় অনুষ্ঠানসহ টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে নৃত্য পরিবেশন করেন। রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক জগতে তিনি অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। তিনি রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীর নৃত্য শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন সময়ে নিয়োজিত। অকৃতদার কালুর মানসজগত নৃত্য ও নৃত্যের উৎকর্ষতা নিয়ে আবর্তিত।

যাত্রা, নাট্য ও চিত্রজগৎ

অনেক পূর্বে রাজবাড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে জিমিদার বাড়িতে নাট্যচর্চা হত। নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে রাজা সূর্যকুমার ও তাঁর পুত্র কুমার বাহাদুর বিশেষ অবদান রেখে গেছে। বাণীবহের জমিদার পরিবারও নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিল। যে স্থানটিকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ির নাট্য আন্দোলন গড়ে ওঠে উক্ত স্থানটি ছিল বর্তমানের চিত্রা হল।


১৯৪০ সালের দিকে বাণীবহের জমিদার কালিপ্রসন্ন মজুমদার বর্তমান চিত্রা সিনেমার স্থানটি দান করেন এবং সেখানে গড়ে ওঠে রাজবাড়ি টাউন হল। পরবর্তীতে ডিসট্রিক্ট কাউন্সিলের অনুদানে হলটি পরিচালিত হত। এ হলটির নাম বিভিন্ন সময়ে ডানলপ হল, নূর মহল, অরোরা, রক্সি এবং সর্বশেষ চিত্রা হল হিসেবে পরিচিতি পায়। এ হলে তৎকালীন সময়ে সপ্তাহে তিন দিন নাটক অনুষ্ঠিত হত। অভিনয় করতেন হাবিবুর রহমান, নরেশ রায়, মনমথ সেন প্রমুখ। ১৯৫৫ সালে চলন্তিকা কিশোর নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এটিএম রফিক উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সুভাষ সিং প্রমুখ।

রাজবাড়ি জেলার পালাগান, যাত্রা, নাটকে বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। জেলার গ্রামাঞ্চলে একসময় চাঁদ সওদাগর, বেহুলা লক্ষীন্দরের কাহিনী অবলম্বনে স্থানীয় ভাষায় ভাসানযাত্রা বিশেষ পরিচিত ছিল। লাইলী মজনু, ‍রুপবান, রোস্তম সোহরাব পালাগানের দল ছিল। রামদিয়া, সোনাপুর, নাড়ুয়া, বালিয়াকান্দি, মৃগী, খানখানাপুর, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি, পাংশায় দেশের নামি-দামি যাত্রানুষ্ঠান অুনষ্ঠিত হত। রাজবাড়িতে নাট্য চর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল হোসনেবাগ হল। রাজবাড়িতে শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পরও অনেক নাট্যনুষ্ঠান হোসেনেবাগ হলে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ১৯৩৮ সালে হাবিবুর রহমান, মনমথ রায়ের উদ্যোগে প্রথম সিরাজ-উদ-দ্দৌলা নাটক রাজবাড়ি হোসনেবাগ হলে অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাত্তোরকালে ঢাকা মহিলা সমিতিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের স্বর্ণযুগ শুরু হয় থিয়েটার গ্রুপের মাধ্যমে। যার পুরোভাগে থাকেন আব্দুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দ্র মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার-সহ অনেক নামী নাট্যতারকা। এদেরই অনুপ্রেরণায় তৎকালীন রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে দুর্বার নাট্যগোষ্ঠী, রাজবাড়ি থিয়েটার গ্রুপ। রাজবাড়ির নাট্য আন্দোলনে রাজবাড়ি থিয়েটার গ্রুপের ভুমিকা অনস্বীকার্য। থিয়েটার গ্রুপের পাশাপাশি এ সময় আরো বেশ কিছু গ্রুপ গড়ে ওঠে তারমধ্যে মৈত্রী থিয়েটার, উত্তরণ নাট্য সংস্থা, চারণ থিয়েটার, সূর্যতোরণ থিয়েটার, ভিন্ন থিয়েটার উল্লেখযোগ্য। এ সমস্ত থিয়েটার গ্রুপে যারা নেতৃত্ব দিতেন তাদের মধ্যে অন্যতম মনসুর আলী খান (দিপু), খালেদ সালাউদ্দিন (জগলু), সাঈদুল হক খোকন, সেলিম চৌধুরী, বাবলা চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, আব্দুল জব্বার মিয়া, নুরুল ইসলাম (নুরু), এমএ হামিদ (বাবলু), গোলাম আকা, আকতার হোসেন, রওশন মওলা মন্টু, মকবুল হোসেন বাবু, এম বাচ্চু রহমান, শাহাজান আলী সাজু, হাসান মঞ্জু, ফিরোজ মওলা, সাজ্জাদ সিদ্দিকী নয়ন, বাদল নাগ, সুমন আহমেদ প্রমুখ। তৎকালীন সময়ে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তেমন কোনো নারী অভিনেত্রী পাওয়া যেত না তবে প্রফেশনালভাবে উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি গ্রুপেই অভিনয় করতেন অর্চচনা, ডলি, শিরিন, রেখা প্রমুখ, এদেরমধ্যে অর্চচনা এবং ডলি ছিল প্রতিভাবান নাট্যশিল্পী। ১৯৮২ সালে রাজবাড়ি থিয়েটারের উদ্যোগে রাজবাড়িতে প্রথম নাট্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেছিলেন রাজা সূর্যকুমারের পুত্র কুমার বাহাদুর। প্রতিযোগিতায় অভিনয়ের জন্য প্রথম পুরস্কার পান বাবলা চৌধুরী, দ্বিতীয় পুরস্কার মকবুল হোসেন বাবু এবং তৃতীয় পুরস্কার পান এম বাচ্চু রহমান। রাজবাড়ি নাট্যাঙ্গনের সেই জৌলুস না থাকলেও এখনো রাজবাড়িতে নাট্য চর্চার কমতি নেই। বর্তমানে রাজবাড়িতে ‘আমরা ক’জনা থিয়েটার’ এর মাধ্যমে এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন----গোলাম মোর্তজা সাগর, বিনয় কুমার সাহা, সঞ্জয় ভৌমিক, সঞ্জীব ভৌমিক, অনুপ কুমার ঘোষ, অজয় দাস তালুকদার, সম্রাট মিয়া, ফয়সাল আহমেদ তৌহিদ, সুব্রত প্রামাণিক, শাম্মী আক্তার বৃষ্টি, রেবেকা সুলতানা, শারমীন সুলতানা, ফারজানা ইয়াসমিন প্রমুখ। গোয়ালন্দ উপজেলায় ‘সমকাল নাট্যচক্র’ নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

পার্থপ্রতিম মজুমদার

মুকাভিনয়ে যারা  বিশ্বব্যপী খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে পার্থ প্রতিম মজুমদার একজন। বাংলাদেশ তথা পশ্চিমবাংলা ও ভারতের যে কোনো অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের নিকট পার্থ প্রতিম মজুমদার সুপরিচিত নাম। বাংলাদেশ টিভি পর্দায় প্রায়শই তাঁকে দেখা যায়। অভিনয় জগতে মুকাভিনয় উচ্চমান শিল্প। তবে সাধারণ অভিনয় থেকে মুকাভিনয় শক্ত কাজ। দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার সংখ্যা অগণিত। সেক্ষেত্রে মুকাভিনয়ের শিল্পী স্বল্প সংখ্যক। সাধারণ অভিনেতা শ্রুত বাক্য; ইন্দ্রীয় ভঙ্গী; অ্যাকশন দ্বারা বিষয়বস্তুকে দর্শক সম্মুখে তুলে ধরেন ও কণ্ঠনিঃসৃত বাক্যমালা শ্রোতাকে আকৃষ্ট ও অভিভূত করে।


মুকাভিনয়ের ক্ষেত্রে কণ্ঠ একেবারেই অনুপস্থিত। শিল্পী এখানে বোবা-কালা। কেবল অঙ্গভঙ্গীতে বিষয়বস্তুকে হৃদয়গ্রাহী করে তোলেন। পার্থপ্রতিম মজুমদার এমনি একজন মুকাভিনেতা। তাঁর অভিনয় দেশ বিদেশে প্রশংসিত। দর্শক তার অভিনয়ে ভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করে। তিনি মুকাভিনয় জগতকে ভিন্নতা দান করেছেন।

এই মহৎ শিল্পীর জন্ম রাজবাড়ি জেলা পাংশা উপজেলার বাগডুলিতে। পিতা হিমাংশু মজুমদার জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। এই জমিদার বংশ ছিল খুবই প্রতাপশালী। তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সাধারণ প্রজা ছাতা মাথায় বা পায়ে জুতা পরে হাঁটত না। তাদের ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ বিদ্যমান রয়েছে। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলে হিমাংশু মজুমদার পরিবারসহ পাবনা শহরে গমন করেন এবং বসতি স্থাপন করেন। পাবনা শহরে ‘ধুপছায়া স্টুডিও’ গড়ে তোলেন। পার্থপ্রতিম পাবনা থাকাকালীন মুকাভিনয়ে নানা শৈলী অর্জন করেন এবং উচ্চতর শিক্ষার জন্য ফ্রান্স গমন করেন পরবর্তীতে পরিবারটি পশ্চিমবাংলার চন্দন নগরে স্থায়ী বসতি গড়ে তুললেও আপন মাটির মায়া ভুলে যান না। সময় পেলেই ছুটে আসেন বাগডুলিতে। ফেলে যাওয়া নানা স্মৃতি ক্যামেরা বন্দি করে নেন। পার্থ প্রতিম মজুমদার ২০০৯ সালের শেষার্ধে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমীতে মাসব্যাপী মুকাভিনয়ের প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। এই শিল্পীকে ২০১০ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

আব্দুর রউফ (রাজা ভাই)

আব্দুর রউফ (রাজা ভাই) দেশের একজন খ্যাতিমান যাত্রাশিল্পী ছিলেন। রাজবাড়ি শহরে ডা. আব্দুর রহমান একজন বিশেষ ধার্মিক ব্যক্তি। পরিবারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকেও তার পুত্রগণের মধ্যে আব্দুর রউফ, আব্দুর রব, এটিএম রফিক ‍উদ্দিন রাজবাড়িতে একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে আব্দুর রউফ সাংস্কৃতিক জগতে দেশের বিশেষ স্থান অধিকার করে নেন। প্রথমে রাজবাড়ি শহরে নাট্যভিনেতা হিসেবে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি নিউ বাসন্তী অপেরায় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে একবার শিল্পকলা একাডেমীতে যেখানে অমলেন্দু বিশ্বাস, রত্নেশ্বর চক্রবর্তী, নয়ন মিয়া, আনোয়ার হোসেনের মতো বিশিষ্ট শিল্পীগণ অভিনয় করতে দ্বিধাগ্রন্থ তিনি সেখানে সিরাজ-উদ-দ্দৌলা নাটকে অভিনয় করে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হন। তিনি পরলোকগমন করেছেন।

সুভাস সিংহ

রাজবাড়ি শহরের বিশেষ নাট্য ব্যক্তিত্ব সুভাস সিংহ যার কৈশোর আর যৌবন কেটেছে অভিনয়, নাট্য আন্দোলন আর নাট্য পরিচালনা নিয়ে তিনি রাজবাড়ি তথা দেশের খ্যাতনামা নাটক ও যাত্রাশিল্পী আব্দুর রউফের (রাজা ভাই) সহচার্যে থেকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার অভিনীত ও নির্দেশিত নাটকের সংখ্যা ১০০ এর উপর। তিনি ১৯৮৪ সালে শিল্পকলার পক্ষ থেকে টিভিতে অভিনয় করেন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। রাজবাড়ি নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে তার অবদান স্মরণীয়। তিনি ইহধাম ত্যাগ করেছেন।

 


নিতাইচন্দ্র বসাক

নিতাই চন্দ্র বসাক রাজবাড়ি সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে চাকরিরত। শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে তিনি স্থান করে নিয়েছেন রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দীর্ঘ ২৫ বৎসর তিনি রাজবাড়ি সরকারি কলেজ সংসদের নাট্য ও বিনোদন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকের পর থেকে রাজবাড়ির নাট্য আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। তিনি মৈত্রী থিয়েটার গ্রুপের সভাপতি। ১৯৯৭ সালে রাজবাড়িতে নাট্য সপ্তাহ পালনে তিনি গুরু দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি অভিনয়ের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করেছেন। উদীচীসহ অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত। নানাভাবে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

চিত্রনায়িকা রোজিনা

চিত্রজগতের স্বপ্নকন্যা রোজিনা। জীবনের তরঙ্গ ঢেউয়ের দোলায় গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন নিজেকে। অনেক কষ্টের অতীত পেরিয়ে আজ তিনি কেবল দেশেই নয় বিশ্বে নন্দিত চিত্রনায়িকা। বিগত শতাব্দীর সত্তর দশকের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত চিত্রজগতে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, আবশ্যক ও ব্যস্ত নায়িকা। মেধা, মনন, অধ্যবসায়, কুশলতায় তিনি সমৃদ্ধ করেছেন চিত্রপুরী। বয়ে এনেছেন নিজের ও দেশের সুনাম। এ স্বপ্নকন্যার জন্ম গোয়ালন্দে তাঁর নানার বাড়িতে। পিতা দলিল উদ্দিন ছিলেন ব্যবসায়ী। মা খোদেজা বেগম গৃহিনী। তারা রাজবাড়ি শহরের বাসিন্দা ছিলেন। আজকের দিনে রাজবাড়ি শহরে যে বিত্ত বৈভবের জৌলুস চোখে পড়ে তখনকার দিনে তেমন ছিল না। সকল পরিবারেই কম বেশি দারিদ্রক্লীষ্ট, আয় উপার্জনহীন। চার কন্যা আর দুই পুত্র সন্তানের পরিবারে অভাব অনাটন লেগেই থাকত। তারমধ্যেও জেষ্ঠকন্যা রোজিনার তুষ্টির জন্য পিতার আয়োজন কম ছিল না। মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের সুখ সমৃদ্ধির আশায় আদরের মেয়ে রেনুকে (চিত্র জগতে এসে রোজিনা) বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক আবহ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। নাটক, সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে রুটিন কাজ। নায়ক নায়িকা হন আপন ভুবনের সাথী। একসময় মিশে যেতে ইচ্ছে করে শিল্প মোহনায়। নানা বাধাবিপত্তি, অবজ্ঞা, অনুশোচনা, শাসন, বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে জীবনযুদ্ধে বিজয়িনী রোজিনা চিত্রশিল্প জগতের মানসকন্যা। সাগরে ফুলের সুবাস এমন অলীকতার মতই ‘সাগর ভাসা’ সিনেমার রেনু আপন প্রতিভায় আয়নার-----‘শায়লা’, মায়াবড়ির--‘মায়ারানী’ সবশেশে লক্ষ হৃদয়ের ‘রোজিনা’। রোজিনা দিনকাল ছবিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৮৬ সালে পাকিস্তানে ‘হাম দো হায়’ অভিনয়ের জন্য জার্মানীতে ‘নিগার এ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এ ছবির জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন নাদিম। রোজিনা নেপাল, শ্রীলঙ্কায় কো-প্রডাকশনের ছবিতে অভিনয় করেন। ১৯৮৪ সালে রোজিনা ভারতের সাথে কো-প্রডাকশনের ছবি অবিচার, এ ছবিতে বোম্বের সুপার স্টার নায়ক মিঠুন চত্রবর্তীর বিপরীতে অভিনয় করেন। এ ছবির পরিচালক ছিলেন হাসান ইমাম ও শক্তি সমান্ত। ১৯৯০ সালে এসে তার অভিনিত ছবির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫৫টি। ১৯৯০ এরপর তিনি কলিকাতায় পাড়ি জমান। মাঝে মধ্যে ইংল্যান্ডে বসবাস। কলিকাতায় থাকাকালীণ সেখানে ‘সবার উপরে মা’, বাংলার বধু’, ‘মাতাপিতা’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘আমার স্বামী’, ‘এই ঘর’, ‘কুচ বরণ কন্যা’ ইত্যাদি সমাজ সচেতনমূলক ছবিতে অভিনয় করেন। দীর্ঘদিন পর ফিরে আসেন দেশে। এ সময় তিনি নাটক নির্মাণে বেশি ব্যস্ত। শরৎচন্দ্র ও নজরুল ইসলামের লেখা কাহিনী ও গল্প নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘ষোড়শী’, ‘মেজদিদি’, ‘বনের পাপিয়া’ নাটক। নির্মাণ করেছেন ‘দরজার ওপাশে’, ‘সম্পর্ক’, ‘কবি কিংকর চৌধুরী’, ‘বদনাম’, ধারাবাহিক নাটক।


কাজী নাসির ও শাবনূর

শাবনুর কাজী নাসির ও তার বড় কন্যা শারমীন নাহিদ নুপুর (চিত্রনায়িকা শাবনূর) বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্য জগতে অতি পরিচিত নাম। কাজী নাসিরের পৈতৃক নিবাস রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার বাগমারা গ্রাম। পিতা কাজী ওয়াহেদ হোসেন ছিলেন শান্তি নিকেতনের শিক্ষক। সাহিত্য সমালোচক ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওয়াদুদ কাজী নাসিরের আপন চাচা। কাজী নাসির কলিকাতায় সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করেন। কলিকাতায় কাজী ভীস্মদেব চট্রাপাধ্যায় ও শ্রীকৃষ্ণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন। শান্তি নিকেতনের কমলা বসুর নিকট রবীন্দ্র সঙ্গীতে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্র থাকাকালীন তাঁর রচিত গীতিনাট্য মলুয়া’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলে প্রফেসর মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয়। ১৯৮৪ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বাংলার লোকসঙ্গীত’ শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০-৭১ এ বাংলা একাডেমীতে লোকসঙ্গীত সংরক্ষণ অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারী কোম্পানিতে ‍উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি লন্ডন প্রবাসী হন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সুরমা’ ও ‘জনমতে’ তিনি লিখতেন। মূলত তিনি একজন গবেষক, শিল্পী, সুরকার, স্বরলিপিকার, লোকসাহিত্য সংগ্রাহক, কবি ও লেখক। তাঁর লোকগীতির স্বরলিপিগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘লোকগীতির সুর সঞ্চায়ন’ হাচন রাজার গান’ সিলেটের লোকসঙ্গীত’, উত্তর বঙ্গের ভাওয়াইয়া ও বিয়ের গীত, চরগ্রামের আঞ্চলিক লোকগীতি সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তাঁর রচিত ‘কোলা ব্যাঙের বিয়ে’ ছড়া গ্রন্থটি শিশুদের জন্য প্রিয়। এই গুণী শিল্পী এখন নিরব নিভৃত পল্লীর আঁনাচে-কাঁনাচে ঘুরে বেড়ান। কাজী নাসিরের বড় কন্যা কাজী শারমীন নাহিদ নুপুর শাবনূর নামে চিত্রনায়িকা। চিত্র জগতে শাবনূর নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

মোতাহার উদ্দিন

চিত্রজগতের অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক মোতাহার উদ্দিন রাজবাড়ির ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন নাট্য পাগল এবং স্থান করে নিয়েছিলেন চিত্রশিল্প জগতে। চলচ্চিত্রে অভিনয়সহ অনেক সৃষ্টিধর্মী ও রুচিশীল চিত্রনির্মাতা ও পরিচালক ছিলেন।

 

দেবাহুতি চক্রবর্তী

রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত নাম দেবাহুতি চক্রবর্তী। পিতা নারায়ণ চন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন সংস্কৃতিমনা এবং সমাজসেবক। পারিবারিক পরিবেশে শিল্প সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে তিনি বেড়ে ওঠেন। রাজবাড়ি কলেজের মেধাবী ছাত্রী দেবাহুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ এবং এলএলবি পাস করেন। সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রাজবাড়ি আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। সফল ও বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে। দেবাহুতি চক্রবর্তী নানা সামাজিক কর্মের মধ্যেও সংস্কৃতি চর্চা তাঁর নেশা। তাঁর উদ্যোগে শিশুদের মনোজগতের বিকাশে ‘আবোল তাবোল’ শিশু সংগঠন গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রচর্চায় নিবেদিত দেবাহুতি চক্রবর্তী প্রতিষ্ঠিত করেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন কেন্দ্র।


তাঁকে আহবায়ক করে গড়ে ওঠেছে ‘শিল্পী রশীদ চৌধুরী স্মৃতি পরিষদ। তিনি রাজবাড়ি নারী অধিকার ও নারী চেতনার নেত্রী। রাজবাড়ি মহিলা পরিষদের সভাপতি। সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে জাতীয় পত্র পত্রিকায় জ্ঞানগর্ভ লেখা প্রকাশিত হয়। তিনি সুবক্তা এবং আলোচক। রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নানা কর্মের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

প্রফেসর সৈয়দ আশরাফ আলী হাসু

বিগত শতকের ষাটের দশকের শেষে রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফ আলী, সৌমেন পালসহ আরো অনেকে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর নামের আড়ালে হাসু নামটি মুখে মুখে উচ্চারিত হত। যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে উপস্থিত ও দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যেত। তিনি শতদল, কচিকাঁচার মেলাসহ কয়েকটি নাট্য সংগঠন গড়ে তোলেন। শতদল সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ঝিমিয়ে পড়া অঙ্গনে প্রাণ সঞ্চার করেন। কেবল সংগঠনই ‍সৃষ্টি করেন না, স্বরচিত গানে নিজেই সুর এবং কণ্ঠ দিতেন। তিনি রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিত্ব। ছাত্রজীবন থেকেই রাজবাড়ি কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনকে সংগঠিত করে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে দেন। এ সময় গণসঙ্গীতের মাধ্যমে আন্দোলনকে বেগবান করেন। একজন সফল শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ। পদার্থ বিজ্ঞানে অগাধ পাণ্ডিত্য। বিভিন্ন সরকারি কলেজে চাকরি করেন। রাজবাড়ি সরকারি মহিলা আদর্শ কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একজন ভালো আবৃত্তিকার এবং কবিতা প্রেমিক। সৈয়দ আশরাফ আলী হাসু রাজবাড়ি সজ্জনকান্দায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করেছেন।

এম গোলাম মোস্তফা

মোঃ গোলাম মোস্তফা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক পরিচিত নাম। গীতিকার ও সুরকার। নিজের লেখা কবিতার সংখ্যা কয়েকশত। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সম্পাদনায় সাময়িকী প্রকাশিত হয়। নিজে মুক্তিযোদ্ধা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্মৃতিচারণ এবং লেখা রাজবাড়ির মুক্তিযুদ্ধের দলিল বলে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা আকর্ষণীয়। প্রকৃতিপ্রেমিক এমজি মোস্তফা নিজ বাসা ও বিসিক নগরীতে গড়ে তুলেছেন নার্সারী। ফুল, ফলসহ তিনি শত প্রজাতির গোলাপ ফুটিয়েছেন এসব নার্সারীতে। শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমীসহ নানা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। জেলা প্রশাসন ও নানা প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত জাতীয় দিবসসহ গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখে থাকেন। প্রতিবছর বৃক্ষমেলার আয়োজনে বিশেষভুমিকা রাখেন এবং একটানা দশ বছর প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তিনি সমাজ ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। স্বাধীনতা উত্তরকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি কারারুদ্ধ হন। দারিদ্র ও জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে তিনি ভেঙ্গে পড়েন না। নানাভাবে তিনি সংস্কৃতি সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে বিভিন্ন আঙ্গীকের ৪১ টি গান নিয়ে স্বরলিপিসহ ‘কিছু কথা কিছু গান’ এবং ২১টি গান নিয়ে স্বরলিপিসহ ‘বুনোফুল’ নামে দু’টি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করলেও অর্থাভাবে প্রকাশ করতে পারছেন না। তাঁর গান কবিতার সংখ্যা দুই হাজারের অধিক এবং বিলুপ্ত প্রায় লোকজ সংগীত, কবিতা ও উপন্যাস সংগ্রহে রয়েছে।


সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান

রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অতিপরিচিত নাম সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান। শহরে এ অঙ্গনকে সুসংগঠিত করা এবং বহমান রাখায় তাঁর ভূমিকা অসামান্য। বিগত দশ বছর যাবৎ রাজবাড়ির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগে মোজাফফর আহমেদ, সুলতানা কামাল, ড. আতিউর রহমান, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি সমুদ্র গুপ্ত, কবি হাসান শাহরিয়ার, ড. সাজিদ কামাল এর মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্ব রাজবাড়িতে বিভিন্ন সময়ে নানা অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। রাজবাড়িতে আবুল হোসেন কুইজ এক ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েক হাজার দর্শকের উপস্থিতে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে তিনি কয়েক ঘন্টাব্যাপী সুশৃংখলভাবে উপস্থাপনার গুরু দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি আবুল হোসেন কুইজের জেলা প্রশাসক মনোনীত একজন সম্মানিত জীবন সদস্য। রাজবাড়িতে আবৃত্তি শিল্পের বিকাশে তিনি রবিশঙ্কর মৈত্রীর পরিচালনায় শিল্পকলায় কয়েকটি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। তিনি একটি আবৃত্তি সংঘ গড়ে তুলেছেন। মুক্তবুদ্ধির চর্চায় তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মুক্তি পাঠচক্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রাজবাড়ি শাখার ছাত্রছাত্রীদের গ্রন্থপাঠ ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি কেএস আলম ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিবেশ সংরক্ষণে অরণি ক্লাবের সদস্য সচিব। প্রথম আলো বন্ধুসভা এবং শিল্পী রশিদ চৌধুরী স্মৃতি সংসদের সম্পাদক। রাজবাড়ি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে জেলা প্রশাসনসহ স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং নানা সেমিনার ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তার সাবলীল উপস্থাপনা নিখুঁত ও চমৎকার। চাকরিসূত্রে বিশ বছরেরও অধিকাল রাজবাড়িতে বসবাস, বর্তমান রাজবাড়ি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)। তিনি শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য এবং শিশু সংগঠক। শিক্ষাবিস্তারসহ শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তিনি অনন্য ব্যক্তিত্ব। বাঙময় সংগঠন তাকে ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ পদক প্রদান করে। তিনি বিএসবি ফাউণ্ডেশন এ্যাডওয়ার্ড (শ্রেষ্ট শিক্ষক) লাভ করেন।

জেলা শিল্পকলা একাডেমী

এক সময় সঙ্গীত চর্চা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ছিল না। ঘরোয়া পরিবেশে ওস্তাদের নিকট সঙ্গীত শিক্ষা প্রাধান্য পেয়েছে, এ জন্যে সঙ্গীতকে গুরুমুখী বিদ্যা বলা হয়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানভিত্তিতে সঙ্গীত, নৃত্যকলা প্রসার লাভ করেছে। রাজবাড়িতে প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুরু হয় একথা বলা যায়। স্বাধীনতা উত্তরকালে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টারকে সম্পাদক, ফজলুল হক, নিখিলকৃষ্ণ নাগ, শাহিনুর বেগম, আব্দুর রব, হাসমত আলী, নজরুল ইসলাম, জামাল হাবীব, দীপ্তি গুহসহ অনেককে নিয়ে বর্তমান যেখানে অফিসার্স ক্লাব সেখানে একটি টিনের চালাঘরে রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমীর পথচলা। এসময় ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমী বিশেষ সুনাম অর্জন করে। তৎকালীন সময়ে এ শিল্পকলা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টার। আশির দশকের শুরু থেকে শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কেন্দ্রীয় শিল্পকলার অধীনে বিধিবদ্ধ নিয়মের মাধ্যমে তা পরিচালিত হতে থাকে। এ সময় এটিএম রফিক উদ্দিন, সুকুমার ভদ্র, সুভাস সিংহ, মোঃ সানাউল্লাহ, প্রণব সরকার, তপন কুমার দে, নজরুল হোসেন কুটি, আবদুল মান্নাফ মোহন, আবুল হোসেন মাসুদ-সহ অনেকে এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। সুকুমার ভদ্র (সঞ্জু) দীর্ঘদিন সম্পাদক পদে থেকে এর ভৌত অবকাঠামোসহ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেনে।


রাজবাড়ি জেলা শিল্পকলা একাডেমী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম এর পৃষ্ঠপোষকতায় দোতলা ভবন নির্মিত হয়। শিল্পকলা একাডেমীতে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নিখিলকৃষ্ণ নাগ, নজরুল হোসেন কুটি, দীপ্তি গুহ, নিজাম আনসারী, তপন কুমার দে, সুব্রত চক্রবর্তী, আব্দুস ছাত্তার কালু, গোলাম মোস্তফা চৌধুরী রন্টু, অমলেম পাল, বিমল রায়, চপল সান্যাল, প্রণব সরকার প্রমুখ। রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমী থেকে অনেক শিল্পী জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমীর সভাপতি জেলা প্রশাসক (পদাধিকার বলে)। বর্তমানে আবুল হোসেন মাসুদ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, রাজবাড়ি জেলা সংসদ

ভারতীয় উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ থেকে মক্তি তথা গণমানুষের অধিকার আদায়ে শিল্পী সাহিত্যিকের ভূমিকা এদেশে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। পাকিস্তান শাসনামলেও শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে অনেক প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন গণমানুষকে উজ্জীবিত করে। এমনি একটি সংগঠন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী। ১৯৬৮ সালের ঊনত্রিশে অক্টোবর সংগ্রামী সত্যেন সেনের নেতৃত্বে ঢাকা নগরের উত্তর প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উদীচী। এর সাথে সংশ্লিষ্ট হন রনেশ দাস গুপ্ত, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, মঞ্জুর  মোর্শেদ চৌধুরীসহ অনেক ত্যাগী নেতৃবৃন্দ। প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডের দ্বারা অচলায়তনের বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তবুদ্ধির চেতনার প্রসার ঘটানো এ সংগঠনের উদ্দেশ্য। রাজবাড়ি অতীত থেকেই সংস্কৃতি সচেতন। মুক্ত বুদ্ধির বিকাশে তারা সকল সময়েই কাজ করেন। উদীচীর শাখা বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার কালে ১৯৭৫ এ রতনদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয় যার নেতৃত্বে থাকেন সৌমেন দাস (ভরত)। রাজবাড়িতে ১৯৮৩ সালে রাজবাড়ি ইয়াছিন উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে প্রথম রাজবাড়ি উদীচীর কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি থাকেন সৌমেন্দ্র কুমার এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বাবলা। আরো সংশ্লিষ্ট থাকেন আশু ভরদ্বাজ, মুনসুফি মৃধা, আজিজুল হাসান, মনি ভাই, কৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রমুখ। ১৯৮৭ সালে রাজবাড়ি জেলা উদীচীর দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্বে থাকেন সৌমেন্দ্র কুমার আসাদুজ্জামান বাবলা, মনিসুফি মৃধা, বাবু মল্লিক প্রমুখ। উদীচীর কার্যক্রমের প্রসারতায় রাজবাড়িতে ১৯৮৯ সালের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী নতুন কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির সভাপতি থাকেন মানুষের মুক্তির চেতনায় সদ সচেতন এক জেদী প্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট কমলকৃষ্ণ গুহ। সহ-সভাপতি থাকেন ষাটের দশকের রাজবাড়ি কলেজের ছাত্রনেতা এবং সদ্য রাজবাড়িতে বদলী হয়ে আসা এক প্রতিবাদী সমাজকর্মী তৎকালীন মার্কেটিং অফিসার আব্দুল কাইয়ুম (কাইয়ুম ভাই)। সাধারণ সম্পাদক থাকেন মকবুল হোসেন বাবু। কমল কৃষ্ণ গুহ এবং কাইয়ুম ভাই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ইইলোক ত্যাগ করেন। দায়িত্বে থাকেন এনায়েতুল করিম সেন্টু। ‘৯০ এর গণআন্দোলনে উদীচী রাজবাড়ি জেলা সংসদ প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মকবুল হোসেন বাবুর রচনা ও সুরে এলাকার মানুষকে আন্দোলনে উদ্দীপ্ত করার লক্ষ্যে রচিত হয় এরশাদ বিরোধী গণসঙ্গীত। উদীচীর শিল্পীবৃন্দ সে সময় প্রতিদিন শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে এই সঙ্গীত পরিবেশন করে আন্দোলনরত মানুষের অনুপ্রেরণা যোগাত। এরমধ্যে একটি গান খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল----‘দেশে নাইকো গণতন্ত্র.....’। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃবৃন্দ বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার কালে পথসভা এবং ভ্রাম্যমান সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষের মানবিক চেতনা জাগ্রত করতে সচেষ্ট হন----‘মানুষকে ভালোবাসা দাও....’ মকবুল হোসেন বাবুর রচনা ও সুরের এই গণসঙ্গীতটি তখন খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। অতঃপর ১৯৯৩ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে ২১ সদস্যবিবিষ্ট নতুন কমিটি গঠিত হয়। সভাপতি হন বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী, সহ-সভাপতি আবুল কালাম, সাধারণ সম্পাদক মকবুল হোসেন বাবু, সহ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার, ইকবাল হোসেন, নাট্য সম্পাদক-আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ। তবে যিনি এর প্রাণ পুরুষ হয়ে সবসময় কাজ করে চলেছেন তিনি আবুল কালাম (কালাম ভাই)। আবুল কালাম, মকবুল হোসেন বাবু, সৌমেন দাস ভরত এবং সংগঠনের সকল সদস্যদের আপ্রাণ চেষ্টায় উদীচী রাজবাড়ি জেলা সংসদের একটি নিজস্ব ভবন হয়েছে।


এটি চিত্রা মার্কেটের উত্তরে খালপাড়ে অবস্থিত। বর্তমানে ২০০৮ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে বর্তমান সভাপতি ডা. সুনিল কুমার বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার। ডা. সুনিল কুমারসহ কমিটির সকল সদস্যদের প্রচেষ্টায় বর্তমানে সংগঠনটি নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে থাকে।

রাজবাড়ি জ্ঞান চর্চাকেন্দ্র ও ডা. আবুল হোসেন কুইজ

সহজ অর্থে জ্ঞানের অর্থ কোনো বিষয়ের সঠিক বিবরণ। বিবরণে তত্ত্ব ও তথ্য আবশ্যক। তত্ত্ব ও তথ্য বিকাশের ধারায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিজন কান্তি সরকার জেলা প্রশাসনের আওতায় ২০০৩ সালে ‘রাজবাড়ি জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেন। কেন্দ্রের মাধ্যমে তিনি জেলার সর্বস্তরের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জ্ঞান বিকাশের স্বপ্ন দেখেন। ঐ বছরই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। জেলার মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতার পর উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় ৪টি উপজেলা থেকে ৪জন এবং রাজবাড়ি সদর পৌরসভা থেকে দুইজন মোট ছয়জনকে বাছাই করে ২১ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ি জেলা স্কুল ময়দানে সাড়ম্বরে ফাইনাল প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। মাঠভর্তি দর্শক শ্রোতার উপস্থিতিতে বিপুল আয়োজন ও উৎসবমুখর পরিবেশে ছয়টি বিষয়ের উপর মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সফলভাবে উপস্থাপন করেন তৎকালীন পৌরনির্বাহী ও উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন। জাকজমকপূর্ণ এ অনুষ্ঠানের সফলতা ও জ্ঞান চর্চার এমন বৈশিষ্ঠপূর্ণ কাজের অনন্ত স্থিতির কথা বিদগ্ধ বিজন কান্তি সরকার তাৎক্ষণিক ভাবতে থাকেন। মুহুর্তেই যেন তার ভাবনার অবসান ঘটে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডা. আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম মঞ্জুরুল আলম দুলাল, ডা. আবুল হোসেনের ভগ্নিপতি ভবদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু ইউসুফ আওয়াজ দেওয়ান ও জেলা প্রশাসক বিজন কান্দি সরকার লন্ডনে ডা. আবুল হোসেন এর সাথে টেলিফোনে কথা বলেন। ডা. আবুল হোসেন লন্ডন থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র ফান্ড প্রদানে স্বীকৃত হন। এ ঘোষণায় জেলা স্কুলের মাঠ করতালি, ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, ডা. আবুল হোসেন, বিজন কান্তি সরকার উচ্চারণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সে এক অভাবনীয় অনুভূতি। ঐ বছর প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার ছিল দশ হাজার, দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল সাত হাজার, এবং তৃতীয় পুরস্কার ছিল পাঁচ হাজার টাকা যা জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রদান করা হয়। এছাড়া উপস্থিত জাতীয় সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ও নাসিরুল হক সাবু প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীকে তিন হাজার টাকা করে প্রদান করেন। পরবর্তীতে ‘জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র’ ও ডা. আবুল হোসেন কুইজকে শক্ত ভিত প্রদানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি কমিটি এবং কনস্টিটিউশন প্রস্তুত করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি জ্ঞান চর্চা কেন্দ্র ডা. আবুল হোসেন কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। বিগত বছরগুলোতে এর উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান। একুশ উপলক্ষ্যে প্রতিবছর জেলা প্রশাসন বইমেলা ও ডা. আবুল হোসেন কুইজ আয়োজন করে। বিষয়টি রাজবাড়ি জেলাবাসীর ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

রাজবাড়ি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ

রাজবাড়ি জেলার সাহিত্য চর্চা, সাহিত্য বিকাশ ও শিল্প সাহিত্যের ঐতিহ্য লালনে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, রাজবাড়ি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ। সংগঠনটির সভাপতি থাকেন প্রফেসর মতিয়র রহমান এবং সম্পাদক আবুল হোসেন মাসুদ। সাংগঠনিক বিভিন্ন সময়ে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, এয়াকুব আলী চৌধুরী, জগদীশ গুপ্ত, শিল্পী রশিদ চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করে। স্থানীয় লোকজ সংস্কৃতির সংগ্রহসহ, স্থানীয় লেখক ও কবিদের গ্রন্থ আলোচনা করে থাকে। এ সংগঠনটি ২০০৯ থেকে প্রতি দুই বছর পরপর বাংলা ভাষার প্রথম মুসলমান উপন্যাসিক, সাহিত্য বিকাশের কালপর্বের স্রষ্টা ও কালজয়ী গ্রন্থ বিষাদ সিন্ধুর লেখক, ‘মীর মশারফ হোসেন স্মৃতি পদক’ ঘোষণা করে। দেশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান গবেষক ও সাহিত্যসেবী প্রফেসর ড. আবুল আহসান চৌধুরীকে ২০০৯ সালে পদক ও দশ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এ পদক প্রদানে পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহম্মদ, ডা. আবুল হোসেন, সিরাজুল ইসলাম খাজা, নাসিম শফি, প্রফেসর কেরামত আলী, ইমদাদুল হক বিশ্বাস, মহম্মদ আলী চৌধুরী, জেলা পরিষদ।

Additional information